Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ০৬ শনিবার, জুন ২০২০ | ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ | ঢাকা, ২৫ °সে

টিউশনি বন্ধ, শাহ আলী মাজারের একবেলা খাবার খেয়েই বেঁচে আছি

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩ এপ্রিল ২০২০, ০৯:৩৪ AM
আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২০, ০৯:৩৪ AM

bdmorning Image Preview


প্রতিদিন রাতে শাহ আলী মাজারে খাবার দেয়। মাস্ক দিয়ে মুখ ঢেকে খেয়ে আসি। রাতে এই একবেলা খেয়েই বেঁচে আছি। এমন আকুতির সঙ্গে জানিয়েছেন এক কারমাইকেল কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করে ঢাকা আসা রাব্বী রহমান।

রাব্বী রহমানের বাড়ি দিনাজপুর। বাবা নেই। বাড়িতে মা একা। বোনদের সহযোগিতায় কোনরকম চলে যায় মায়ের। আর রাব্বী ঢাকায় এসেছেন একটা চাকরি জোটাতে। টিউশনির টাকাই তার সম্বল। একটি বাড়িতে যেয়ে ৪ জনকে পড়াতেন। বলেন, স্কুল বন্ধ হল। আমি পড়াতে গেলাম। যেয়ে দেখি তারা বাড়িতে নেই। ফোন দিলে বললেন, স্কুলতো বন্ধ। আমরা আর ঢাকায় থাকব না। স্কুল খুললে ফের যেতে বললেন। জানিয়ে দিলেন, টাকা কয়েকদিন পরে পাঠিয়ে দেবেন।

রাব্বী বলেন, বাড়ি যাবো কিনা ভাবছিলাম। বুঝতে পারিনি পরিস্থিতি এত খারাপ হবে। ভেবেছিলাম মাসখানেকের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

চার শিক্ষার্থীর অভিভাবককে ফোন দেই, টাকার জন্য। ২ জন পাঠিয়েছেন আর ২ জন দেননি। এখন ফোন দিলে আর ফোনও ধরেন না তারা। হাতে কোন টাকা নেই। আপুর কাছ থেকে ৫শ' টাকা নিয়েছিলাম, সেটাও শেষ।
এখন চলছে কিভাবে? এই প্রশ্নের জবাবে রাশভারী হয়ে যায় তার কণ্ঠস্বর। প্রায় ১০ সেকেন্ড চুপ থাকার পর বলেন, প্রতিদিন রাতে শাহ আলী মাজারে খাবার দেয়। মাস্ক দিয়ে মুখ ঢেকে খেয়ে আসি। রাতে এই একবেলা খেয়েই বেঁচে আছি। এমনি অবস্থা টুথপেস্ট শেষ হয়ে গেছে ৬দিন হলো। পেস্টটাও কিনতে পারছি না। মেসে প্রিপেইড মিটার, কারেন্টও চলে যাবে কদিনপর।
একটি বিপনি বিতানে কাজ করেন ইশিতা প্রামানিক। অনার্স পড়ছেন মিরপুর মহিলা কলেজে।  ইশিতার দিন ভালোই কাটছিল। হঠাৎ নেমে এলো দুর্যোগ। করোনার প্রভাবে বন্ধ দোকানটি। সঙ্গে বেতন। ইশিতা বলেন, পরিবারের অমতে বিয়ে করেছিলাম। এরপর আবার পরিবারের অমতেই ডিভোর্স হয়। আমার বাবা-মায়ের অনেক অপমান হয়েছে আমার জন্য। পারলে আমাকে অস্বীকার করেন তারা। তাই দোকান বন্ধ হলেও বাড়িতে আর যাওয়া হয়নি।

তিনিও বলেন, বুঝতে পারিনি এতদিন বন্ধ থাকবে। এত খারাপ অবস্থা হবে। কজন মিলে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকি। সবাই চলে গেছে। আমরা দু’ জন আছি এখন। বাবার কাছে লজ্জা লাগলেও কিছু টাকা চাই। বাবার কাছেও আর টাকা চাইতে পারছি না। বাবারও আয়ের উৎস দোকান। সেটাও বন্ধ পড়ে আছে। বাবার টাকায় কেনা খাবার প্রায় শেষ। দু'জনের হাতেই কোন টাকা নেই। এরই মাঝে বাড়িওয়ালা বাসা ভাড়ার জন্য তাড়া দিচ্ছেন। সামনের দিনগুলোতে কি হবে আল্লাহ জানে।

অনেক চেষ্টা করলাম। দিনরাত এক করে চেষ্টা করলাম। চাকরিতো আর মিলে না। বাড়িতে আসতে মন চায় না। টিউশনির টাকা দিয়ে চলত। বাধ্য হয়ে বাড়ি আসলাম। এখন বাড়িতে, আত্মীয়-স্বজন সবার বাজে কথা শুনতে হচ্ছে। এভাবে আর কতদিন চলে? এভাবেই অনর্গল বলে জাচ্ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স শেষ করা এক শিক্ষার্থী। তিনি আরও বলেন, এভাবে চললে কি আর, সুইসাইড করব। আমার মতো ব্যর্থ একজন দেশ থেকে চলে গেলে কারও কোন ক্ষতি হবে না।

ফয়সাল হোসেন। বাড়িতে বাক প্রতিবন্ধী ছোট বোন। বাবা-মায়ের বয়স হয়েছে ঢের। পৈত্রিক আবাদি জমিতে চাষ করে কোনরকমে চলে সংসার। ফয়সাল রংপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন ২ বছর হল। একটা চাকরি জোটাবেন, অভাব দূর হবে পরিবারের এই আশায়। তা আর জুটছে কই। কোন রকম ৩টি টিউশনি করিয়ে চলে তার।

মাসে পান ৭ হাজার টাকা।  থাকা খাওয়াতে চলে যায় ৩ হাজার টাকা। বাড়িতে দিতে হয় ২ হাজার টাকা।
অভাব, অনটন আর ভবিষ্যত নিয়ে দুঃচিন্তায় কাটছিল ফয়সালের দিন। কিন্তু হঠাৎ সেটাও থমকে গেলো। করোনার প্রভাবে যেতে পারছেন না টিউশনিতে।

ফয়সাল বলেন, স্কুল বন্ধ হবার পরেও পড়াতে যেতাম। মাস শেষে টাকাটা যে চাই। কিন্তু কদিন পর তারাও না করে দিলেন। টিউশনির কারণে ঢাকাতেই ছিলাম। গণপরিবহন বন্ধ হল। কি এক বিপদের মাঝে আছি ভাই। মেসে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। না পারছি কিছু করতে, না পারছি বাড়ি যেতে।

তিনি আরও বলেন, হাতে টাকা পয়সা ছিল না। শিক্ষার্থীদের বাড়িতে ফোন দিয়ে বিপদের কথা বললাম। এক শিক্ষার্থীর মা ১ হাজার টাকা অগ্রীম দিলেন। তাই দিয়ে কয়েক কেজি চাল আর আলু কিনেছি। শুধু আলু ভর্তা আর ভাত খাচ্ছি প্রায় মাস খানেক হল। হাতে টাকা নেই। চাল আর আলুও শেষ হয়ে আসছে। জানি না কি করব সামনে? মেস ভাড়া দিব কি করে? আর বাবা, মা, বোন তাদের কথা ভাবলেই কান্না আসে।

বিশ্বজুড়ে করোনার থাবা। বাংলাদেশেও এর আঁচ লেগেছে ব্যাপক। প্রতিদিন হু হু করে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। কর্মহীন হচ্ছেন মানুষ। খেটে খাওয়া মানুষগুলো ত্রাণের ব্যবস্থা করছেন কোনরকম। কিন্তু দেশজুড়ে প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষিত বেকারদের অবস্থা ভয়াবহ। টিউশনি কিংবা পার্টটাইম চাকুরি করা কোন রকম দিন পার হলেও মহা বিপদের মাঝে আছেন তারা। বিষন্নতা ঘিরে ফেলছে তাদের।

টিউশনি কেন্দ্রীক কয়েকটি ফেসবুক গ্রুপের বেশ কয়েকটি পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অধিকাংশই পাননি মার্চ মাসের টাকা। "টিউশন ঢাকা" স্বত্ত্বাধিকারী হাসান ইকবাল বলেন, আমরা টিউশনি খুঁজে দিয়ে কিছু টাকা আয় করে থাকি। টাকা না পেলেও অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। কিন্তু মার্চ মাসে অধিকাংশ অভিভাবকই টাকা না দিয়েই বন্ধ করেছেন টিউশনি৷ এতে শিক্ষকরা যেমন বিপদে পড়েছেন, বিপদে পড়েছি আমরাও। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও ফলপ্রসূ কোন ফলাফল আসছে না।

সূত্রঃ মানবজমিন 

Bootstrap Image Preview