Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২০ শনিবার, এপ্রিল ২০২৪ | ৬ বৈশাখ ১৪৩১ | ঢাকা, ২৫ °সে

বাস চালায় হেলপার, দরজা-জানালা লাগিয়ে ধর্ষণ করে স্বর্ণলতার ড্রাইভার

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২ মে ২০১৯, ০৯:১৫ PM
আপডেট: ১২ মে ২০১৯, ০৯:১৫ PM

bdmorning Image Preview


কিশোরগঞ্জে চলন্ত বাসে নার্স শাহীনুর আক্তার তানিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে রিমান্ডে থাকা ‘স্বর্ণলতা’ বাসের চালক নূরুজ্জামান ও হেলপার লালন মিয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্যে স্বর্ণলতা পরিবহনের ওই বাসটি গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বাসটির তিন জায়গায় রক্তের দাগ পাওয়া গেছে।

পুলিশের কাছে চালক নূরুজ্জামান ও হেলপার লালন মিয়া স্বীকার করেছে, ধর্ষণ ও হত্যায় তারা নিজেরাসহ সরাসরি আরো একজন জড়িত ছিল। কিন্তু তৃতীয় ব্যক্তিটির নাম তদন্তের স্বার্থে পুলিশ গণমাধ্যমকে জানাতে অস্বীকৃতি জানায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাজিতপুর থানার একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলন্ত বাসের দরজা জানালা লাগিয়ে তানিয়াকে ধর্ষণ করে তারা। হেলপারকে গাড়ি চালাতে দিয়ে প্রথমে ড্রাইভার তানিয়াকে ধর্ষণ করে। এরপর আরো দুজন ধর্ষণ করে তাকে। তানিয়া নিজেকে বাঁচাতে সজোরে তাদের কিল ঘুষিও মারে। ধর্ষণের পর তানিয়াকে গলাটিপে বা অন্য কোনো উপায়ে হত্যা করতে চেয়েছিল ধর্ষণকারীরা। এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে তাদের বাকবিতন্ডা হয়। পরে মাথায় আঘাত করে খুলি ফাটিয়ে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা।

সূত্র জানায়, ধর্ষণ ও হত্যার পর ধর্ষণকারীরা বিষয়টি সড়ক দুর্ঘটনা প্রমাণ করতে নাটক সাজিয়েছিল। ধর্ষণের পর তানিয়াকে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেওয়ার পর ধর্ষকরা নিজেরাই আবার ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে মেয়েটিকে পড়ে থাকতে দেখে অনেক স্থানীয় মানুষও এগিয়ে আসে। কিন্তু ধর্ষকরা স্থানীয়দের জানিয়েছিল এয়ারফোনে গান শুনতে শুনতে মেয়েটি বাস থেকে পড়ে গেছে, আমরাই হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। তাদের কথা বিশ্বাসও করেছিল স্থানীরা। পরে অচেতন অবস্থায় তানিয়াকে পিরিজপুর বাজারের সততা ফার্মেসিতে নিয়ে যাওয়া হয়। ফার্মেসি থেকে মেয়েটিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার কথা বললে স্বর্ণলতা বাসের স্টাফ আল আল আমিন ও রফিকে দিয়ে কটিয়াদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায় তারা। এরপর তানিয়াকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার বর্ণনা দেয় ড্রাইভার ও হেলপার। হাসপাতালের আশপাশ থেকে রফিককে গ্রেফতার করলেও পালিয়ে যায় আল আমিন।

কিশোরগঞ্জ পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান বলেন, তদন্ত দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। আমরা বাসটি আটক করেছি। মেয়েটির ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, বাসে বহন করা টেলিভিশন ও কাপড়ের ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। আমরা একেবারেই নিশ্চিত যে তানিয়াকে চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

এদিকে গতকাল শনিবার রাতে বাসের চালক নূরুজ্জামানের জবানবন্দি রেকর্ড করেন কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আল-মামুন। আদালত ও পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জবানবন্দিতে নূরু জানিয়েছে, ঘটনার দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কের বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর ইউনিয়নের গজারিয়া বিলপাড় এলাকায় রাস্তার পাশে প্রথমে চালক নূরুজ্জামানের খালাতো ভাই বোরহান তানিয়াকে বাসের ভেতরে ধর্ষণ করে। পরে চালক নূরুজ্জামান এবং শেষে হেলপার লালন নার্স তানিয়াকে ধর্ষণ করে।

ধর্ষণের সময় বাসের হেলপার লালন নার্স তানিয়ার ঠোঁটে কামড় দিলে তানিয়া তাকে সজোরে লাথি মেরে বাঁচার জন্য বাসের ভেতর ওঠে দাঁড়ান। এ সময় চালক নূরুজ্জামান হঠাৎ ব্রেক করে। এতে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে বাস থেকে ছিটকে রাস্তায় পড়ে যান তানিয়া।

এ অবস্থায় হেলপার লালন তানিয়াকে ফেলে যাওয়ার জন্য বললে চালক তাতে রাজি হয়নি। এ নিয়ে দুইজনের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়। এ সময় চালক বাস থামিয়ে দিলে রাস্তায় চলাচলকারী দুটি মোটরসাইকেল ও একটি অটো সেখানে আসে। তাদের জানানো হয়, মেয়েটি বাস থেকে পড়ে গেছে। পথচারীদের সহযোগিতায় তানিয়াকে আবারও বাসের ভেতর তোলা হয়। তখনো জীবিত ছিলেন তানিয়া।

চালক, হেলপার ও বোরহান মিলে তানিয়াকে বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর বাজারে সততা ফার্মেসি নামে একটি ওষুধের দোকানে নিয়ে যায়। ফার্মেসির মালিক তানিয়ার শরীরের রক্ত মুছে দিয়ে অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাকে ভাগলপুর জহুরুর ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। ঘটনাটি পিরিজপুরে স্বর্ণলতা বাসের কাউন্টার মাস্টার আলামিনকে জানানো হয়। আলামিন, বোরহান ও অন্য আরেক ব্যক্তি মেয়েটিকে কটিয়াদী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে আবারও বাসে উঠায়। এ সময় হেলপার লালন পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে পালিয়ে যায়।

রাত ৯টার দিকে তানিয়াকে বাসে রেখে কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকে বাসের চালক। আলামিন ও বোরহানকে সিএনজি আনতে বললেও তারা বাস থেকে নামতে রাজি হয়নি। এ অবস্থায় চালকও বাস থামিয়ে বসে থাকে। একপর্যায়ে আলামিন মেয়েটিকে নিয়ে গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে। কথামতো চালক নূরুজ্জামান বাস চালিয়ে কাপাসিয়ার দিকে যায়। কটিয়াদী উপজেলার বেতাল যাওয়ার পর সুপারভাইজার আলামিন চালককে জানায়, স্বর্ণলতা বাসের এমডি পাভেল তানিয়াকে কটিয়াদী হাসপাতালে রেখে যেতে বলেছেন।

জবানবন্দিতে চালক নূরুজ্জামান জানায়, এ অবস্থায় সেখানে বাস থামিয়ে ২০-২৫ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকি। মেয়েটি তখনো জীবিত এবং হাত-পা নাড়ছিল। একসময় রফিক নামে বাসের এক লাইনম্যান আসে। সে বেতাল বাজারে ফোনে কথা বলছিল। তখোন বাসের ভেতর তানিয়া ছাড়া বোরহান, আলামিন ও কালো করে আরেক ব্যক্তি ছিল। তখন আমি বাস থেকে নেমে নিজেই অটোরিকশা আনতে যাই। অটোরিকশা নিয়ে এসে আলামিন ও রফিকের কাছে মেয়টিকে বুঝিয়ে দেই। আমি বাস নিয়ে চলে যাই।

চালক জানায়, মেয়েটিকে ধর্ষণের সময় তার মাথা পেছনের দিকে এবং পা বাসের সামনের দিকে ছিল। চালকের খালোতো ভাই ধর্ষণের সময় চালক নূরুজ্জামান পেছনে এবং হেলপার লালন সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। রাত ১১টার দিকে জানতে পারি মেয়েটি মারা গেছে।

দীর্ঘ জবানবন্দিতে মামলার প্রধান আসামি নূরুজ্জামান জানায়, ৬ মে ৪টা ১৫ মিনিটে ঢাকার বিমানবন্দর স্টেশনে তানিয়া তার বাসে ওঠে। এরপর বাসটি টঙ্গী স্টেশন, গাজীপুর চৌরাস্তা, রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা, কাপাসিয়া, টোক হয়ে উজুলি আসলে তার খালাতো ভাই বোরহান বাসে ওঠে। তারপর থানাঘাট, যাত্রাঘাট, বেতাল বাজার এলাকায় বাসের কিছু যাত্রী নেমে যায়। রাত ৮টার সময় বাসটি কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে আসে। সেখানে ২০-২২ জন যাত্রী নেমে যায়।

নূরুজ্জামান জানায়, পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত হেলপার লালনকে বাসটি চালাতে বলি। কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড ছাড়ার সময় বাসটিতে আমি, হেলপার লালন, আমার খালাতো ভাই বোরহান, নিহত মেয়েটি এবং আরও দুইজন যাত্রী ছিল। কটিয়াদীর কদমতলীতে একজন এবং বাজিতপুরের উজানচরে অন্য একজন যাত্রী নেমে যায়। এ সময় মেয়েটি বাসে একা বসে থাকে। আমি বাসের পেছনের সিটে বসে সিগারেট খেতে থাকি। লালন তখন মেয়েটিকে পেছনের সিট থেকে সামনের সিটে এসে বসার জন্য বলে। মেয়েটি তার সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র নিয়ে সামনের সিটে যাওয়ার সময় বোরহান তাকে ইচ্ছা করে ধাক্কা দেয়।

মেয়েটি তখন বোরহানকে গালি দিলে বোরহান মেয়েটিকে জাপটে ধরে বাসের মাঝখানে যাত্রীদের চলাচলের পথে ফেলে দিলে মেয়েটি কান্নাকাটি শুরু করে। একপর্যায়ে তাকে ধর্ষণ না করতে চাই পা ধরে কান্না শুরু করে। কিন্তু বোরহান আকুতি-মিনতি না মেনে মেয়েটিকে ধর্ষণ করতে থাকে। এ সময় হেলপার লালন বাস চালাচ্ছিল। সে গজারিয়া বিলপাড় এলাকায় একটি কলা বাগানের কাছে বাস থামিয়ে দেয়।

গত ৬ মে রাতে ঢাকা থেকে স্বর্ণলতা পরিবহনের একটি বাসে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলেন কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুড়ি ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে ও ঢাকার কল্যাণপুর এলাকার ইবনে সিনা হাসপাতালের সিনিয়র নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়া।

বাসটি কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে আসার পর বাসের অন্য যাত্রীরা নেমে যায়। কটিয়াদী থেকে পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার পথে গজারিয়া বিলপাড় এলাকায় বাসের চালক ও হেলপার তানিয়ার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। পরে তানিয়ার মরদেহ কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমেপ্লক্সে রেখে পালিয়ে যায় তারা। এ ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে ওইদিন রাতেই চারজনের নামে বাজিতপুর থানায় একটি মামলা করেন। এ মামলায় বাসের চালক, হেলপারসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের ৮ দিন করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ।

প্রসঙ্গত, গত সোমবার রাতে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের পিরোজপুর রুটে চলাচলকারী ‘স্বর্ণলতা’ নামক বাসে নার্স শাহীনুর আক্তার তানিয়াকে ধর্ষণের পর মাথার পেছনে আঘাত করে হত্যা করা হয়। তিনি কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুরি ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের মো. গিয়াসউদ্দিনের মেয়ে। তানিয়া ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালের কল্যাণপুর ক্যাম্পাসে সেবিকা পদে কর্মরত ছিলেন।

Bootstrap Image Preview