Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৬ শনিবার, নভেম্বার ২০১৯ | ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

ধর্ষিতার ইজ্জতের মূল্য ২৫ হাজার টাকা

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৩১ AM
আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৩১ AM

bdmorning Image Preview


দেশব্যাপী নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা জাতীয় সমস্যায় রূপ নিয়েছে, যা প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানে সরকার এবং বিচার বিভাগ। কিন্তু সেই মুহূর্তে সালিস মীমাংসার নামে ধামাচাপা দেয়া হয়েছে কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা। থানা পুলিশ এবং স্থানীয় মেম্বাররা মিলে মাত্র ২৫ হাজার টাকায় কিনে নিয়েছে দুই সন্তানের জনক কর্তৃক ধর্ষিত অসহায় কিশোরীর ইজ্জত।

ঘটনাটি প্রায় এক মাস আগে বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বুসারের পিঠ নামক গ্রামের জনবিচ্ছিন্ন এক চরে ঘটেছে, যা নিয়ে এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

তবে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদের সাহস পাচ্ছে না এলাকার অসহায় মানুষগুলো। কেননা ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার পেছনে খোদ থানার ওসি এবং স্থানীয় প্রভাবশালী সাবেক ও বর্তমান তিন মেম্বারের সম্পৃক্ততার কারণে মুখ বুজে আছে গ্রামবাসী। তাছাড়া সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করা এক যুবককে বেধড়ক মারধরের ঘটনা ঘটে।

কিন্তু মেয়ে এবং তার পরিবারের অভিযোগ প্রকাশ্যে এত সব ঘটার পরও কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত বাবুগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমান। তার দাবি মেম্বাররা নিজেরা বাঁচতে পুলিশকে জড়াচ্ছে। আর অভিযুক্ত মেম্বাররা বলছেন যা কিছুই হয়েছে তার সবকিছু পুলিশের উপস্থিতিতেই হয়েছে।

ধর্ষিতা ১৩ বছরের কিশোরী জানায়, গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে যেকোনো বুধবার দুপুর দুইটার দিকের ঘটনা। কলস নিয়ে পানি আনতে ঘর থেকে বের হয় কিশোরী। পথিমধ্যে ধানখেতে হালচাষে ব্যস্ত থাকা মুলাদী উপজেলার কাজীরচর এলাকার বাসিন্দা মৃত আর্শেদ হাওলাদারের ছেলে দুই সন্তানের জনক দুলাল হাওলাদার পূর্বপরিচয়ের সুবাদে তার পথরোধ করে।

কিশোরী অভিযোগ করে বলে, দুলাল পথরোধ করে পার্শ্ববর্তী পাটখেতে নিয়ে যাওয়ার জন্য হাত ধরে টানাহেঁচড়া করে। যেতে না চাইলে জোর করে কোলে তুলে তাকে পাঠখেতের মধ্যে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ধর্ষণ করে। তখন কিশোরী চিৎকার দিলে পার্শ্ববর্তী দুই যুবক ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে।

এদিকে ঘটনাটি জানাজানির পরই শুরু হয় ধামাচাপা দেয়ার প্রক্রিয়া। তবে মেয়ের অসহায় পরিবার এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করে। এমনকি বিচারের দাবি নিয়ে মেয়ের মা ওইদিন মেয়েকে নিয়ে বাবুগঞ্জ থানায়ও যান। সেখানে হাজির হন বাবুগঞ্জের রহমতপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার বিএনপি নেতা জামাল হোসেন পুতুল, মুলাদীর কাজীরচর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বর সেলিম হাওলাদার, তার মেয়েজামাই বর্তমান মেম্বর ও আওয়ামী লীগ নেতা শামীম খান, মেয়ের চাচাতো ভাই সেলিম হাওলাদার, স্থানীয় হারুন মাল, নাসিরসহ বেশ কয়েকজন।

মেয়ের মা অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা মামলা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ আমাদের সহযোগিতা করেনি। বরং আমাদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।’

একপর্যায়ে বাবুগঞ্জ থানার ওসি ঘটনাটি ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে মীমাংসা করে দিতে মেম্বারসহ স্থানীয়দের নির্দেশ দেন। এমনকি ক্ষতিপূরণ বাবদ মেয়েকে ৫০ হাজার টাকা আদায় করে দেয়ার জন্যও মেম্বারদের নির্দেশনা দেন ওসি। কিন্তু ওসির বলে দেয়া ৫০ হাজার টাকা আমরা পাইনি। ঘটনাটি প্রকাশ না করার জন্য ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। এমনকি তা ইসলামী ব্যাংক রহমতপুর শাখায় মেয়ের নামে একটি এফডিআর করে জমা দেয়া হয়েছে।

মেয়ের বাবা-মা বলেন, ‘যে টাকা দিছে তা আমরা আমাদের হাত দিয়েও ধরিনি। যা করার মেম্বার এবং উপস্থিত অন্য ব্যক্তিরাই করেছে। কিন্তু আমরা এই ক্ষতিপূরণ চাইনি। আমরা চেয়েছি বিচার।’ এমনকি ক্ষতিপূরণ নয় বরং এই ঘটনায় আইনি বিচার দাবি করেছে ধর্ষিতা কিশোরী।

অভিযোগ প্রসঙ্গে বাবুগঞ্জ উপজেলার ইউপি সদস্য জামাল হোসেন পুতুল বলেন, ‘ঘটনাটি মাত্র ১০ হাজার টাকায় মীমাংসার চেষ্টা চলছিল। কিন্তু আমি জানার পরে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ২৫ হাজার টাকা করে দিয়েছি। এমনকি ওই টাকা মেয়ের নামে ৩ বছরের একটি এফডিআর করে ব্যাংকে জমা দিয়েছি। এফডিআরের জন্য যে টাকা খরচ হয়েছে, তাও আমার নিজের পকেট থেকে দিয়েছি।’

এদিকে ধর্ষক দুলালের ভায়রা সাবেক মেম্বার আব্দুল খালেক বলেন, ‘ওই ঘটনার কোনো সালিস হয়নি। এটি কোনো ধর্ষণের ঘটনা নয়। দুলাল ধানখেতে চাষ করছিল। দুই ব্যক্তি তাকে ধানখেত থেকে ডেকে এনে মেয়ের পাশে দাঁড় করিয়ে ছবি তুলে মিথ্যা অপবাদ দেয়। এ খবর পেয়েই আমি সেখানে যাই।’

অভিযোগের বিষয়ে বাবুগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমি এই থানায় নতুন এসেছি। এলাকা সম্পর্কে এখন পর্যন্ত সবকিছু জানতেও পারিনি। তাছাড়া যে ধর্ষণের ঘটনার নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়েছে, সে ধরনের কোনো অভিযোগ নিয়ে আমার কাছে কেউ আসেনি। আর এলে অবশ্যই আমি মামলা নিতাম।’

এ বিষয়ে বরিশাল জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এমন কোনো ঘটনা আমার জানা নেই। তাছাড়া পুলিশের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সত্য হলে অবশ্যই তার বিচার হবে।’

Bootstrap Image Preview