Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৮ সোমবার, নভেম্বার ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র রক্ষায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন সাংবাদিক হৃদয়

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ০১:০৭ AM
আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ০১:০৭ AM

bdmorning Image Preview
নিজস্ব


স্টাফ রিপোর্টার:

প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরেই অনেকটা নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন মৌলভীবাজারের তরুণ সাংবাদিক হৃদয় দেবনাথ। প্রচার বিমুখ এ সাংবাদিক ২০১০ সাল থেকে বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকে সফলতার সাথে কাজ করে বর্তমানে দেশের স্বনামধন্য একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার পাশাপাশি একটি  জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেলের মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত আছেন। সংবাদ মাধ্যমে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র নিয়ে প্রতিবেদন তুলে ধরার পাশাপাশি ব্যাক্তিগত উদ্যোগে মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন হাওর অঞ্চলে বসবাসরত মানুষদের পাখি শিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলার পাশাপাশি পাখি শিকার অবাধে বৃক্ষ রোপন এবং বন্যপ্রাণী হত্যা করা আইনত অপরাধ, আর এই বন্যপ্রাণী আইন সম্পর্কেও বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বন্যপ্রাণী আইন সম্পর্কে ধারণা দিয়ে যাচ্ছেন। অতিথি পাখি ও জীববৈচিত্র পরিবেশের জন্য কতটা উপকারী সে সম্পর্কেও সচেতন করে তুলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন এ তরুণ সাংবাদিক।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ছাড়াও বন্যপ্রাণী বসবাস করে এমন অঞ্চলগুলোতে বসবাসরত মানুষদের একত্রিত করে উঠান বৈঠকের আয়োজন করে বন বিভাগের লোকজনকে সাথে নিয়ে বন ও বন্যপ্রাণী বিষয়ে তিনি জনসচেতনতা সৃষ্টির কাজ করে যাচ্ছেন নিভৃতে। মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর এলাকার বাসিন্দা দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র হাফিজ আহমেদ (১৮) বলেন, সাংবাদিক হৃদয় ভাই প্রতি মাসে একবার হলেও আমাদের এলাকায় আসেন। আমি এবং আমার সমবয়সী লোকজনকে নিয়ে প্রতি বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাখি শিকার করা পরিবেশের জন্য কতটা ক্ষতি সে বিষয়ে বুঝান।

হাফিজ বলেন, আমাদের এলাকায় শিক্ষার হার খুব কম। পাখি শিকার আইন সম্পর্কে অবগত না থাকায় এক সময় আমাদের এই হাওরে অতিথি পাখি সহ প্রচুর পাখি এবং বালি হাঁস শিকার হতো। কেউ জেনে শুনে করতো আবার অনেকে এই সম্পর্কে না জেনেই করতো।সাংবাদিক হৃদয় ভাই এই সম্পর্কে প্রতিনিয়ত সচেতন করায় অতিথি পাখি এবং বালি হাঁস শিকার এখন অনেকটাই কমে এসেছে।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা সড়কে রাস্তা পারাপারের সময় গাড়ি চাপায় প্রাণ হারান অসংখ্য বন্য প্রাণী!তাই এ সড়কের গাড়িচালকদের মধ্যে লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি বন বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী বন এলাকার ভেতরে সর্বোচ্চ বিশ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য গাড়ি থামিয়ে চালকদের মধ্যে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এদিকে লাউয়াছড়া উদ্যানের আশপাশ এলাকাগুলোতেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে সমমনা তরুণদের সাথে নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। বন্য প্রাণী হত্যার ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে বন্য প্রাণীদের ছবি দেখিয়ে দেখিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে বন্য প্রাণী সম্পর্কে ধারণা দিয়ে যাচ্ছেন। বন এবং বন্যপ্রাণী মানুষের জন্য কতটা উপকারী সে সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে ধারণা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

খাবার সংকটে প্রায়শঃই বিরল অনেক বন্যপ্রাণী খাদ্যের সন্ধানে লাউয়াছড়ার আশপাশের লোকালয়ে চলে যায়। বন্যপ্রাণী ও বন্যপ্রাণী আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে কেউ কেউ এসব বন্যপ্রাণীদের মেরে ফেলেন। আবার কখনো স্থানীয়রা বনবিভাগের লোকজনকে খবর দেন। বনবিভাগের লোকজন লোকালয়ে চলে যাওয়া এসব বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে লাউয়াছড়ায় ফের অবমুক্ত করেন।

রেঞ্জ অফিসার মোনায়েম হোসেন জানান, সাংবাদিক হৃদয় দেবনাথ জীববৈচিত্র অবাধে বৃক্ষ নিধন ও বন্যপ্রাণী নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে নিঃস্বার্থভাবে জনসচেতনতামূলক যে কাজগুলো করে যাচ্ছেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তার এই ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কর্মকান্ডের ফলে বন্যপ্রাণী হত্যা, গাছ কাটা অনেকটাই কমেছে।

তিনি বলেন, লোকালয়ে চলে যাওয়া বন্যপ্রাণীদের মানুষ এখন আর আগের মতো মারে না। সাংবাদিক হৃদয় গণমাধ্যমে প্রকৃতি জীববৈচিত্র বন্যপ্রাণী নিয়ে প্রতিবেদনও তুলে ধরছেন সেই সাথে ব্যাক্তিগত উদ্যোগে প্রায়ই আমাদের বনবিভাগের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে বন এলাকার কাছাকাছি গ্রামগুলোতে সাধারণ মানুষদের একত্রিত করে উঠান বৈঠকের আয়োজন করে সচেতনতা সৃষ্টির কাজ করে যাচ্ছেন। তার এই কর্মকান্ড জীববৈচিত্র ও বন্যপ্রাণীদের জীবনের জন্য কিছুটা হলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বিভাগীয় বনকর্মকর্তা আ.ন.ম. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, সাংবাদিক হৃদয়কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি তার এ মহৎ কর্মকান্ডের জন্য। তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র রক্ষায় হৃদয়ের মতো অন্যান্য তরুণদের এগিয়ে আসতে উচিত।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক নাজরীন শিরিন বলেন, এমনটাই হওয়া উচিত পরিবেশ প্রতিবেশ জীববৈচিত্র রক্ষায় সংবাদ মাধ্যমে প্রতিবেদন তুলে ধরার পাশাপাশি ব্যাক্তিগত উদ্যোগে সাংবাদিক হৃদয় যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে, প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে এভাবে কাজ করলে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্রে ভরপুর থাকবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র রক্ষায় কাজ করতে গিয়ে যত ধরণের সহযোগিতা আছে আমি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করে যাবো।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশেকুল হক বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই সাংবাদিক হৃদয় নিজ দায়িত্ববোধ থেকে ব্যাক্তিগত উদ্যোগে এ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রকৃতি ও জীববৈচিত্রকে তিনি হৃদয় দিয়ে লালন করেন। সাংবাদিক হৃদয়ের মতো করে প্রত্যেককেই নিজ নিজ জায়গা থেকে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্রের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে এভাবে কাজ করে যাওয়া উচিত। একমাত্র তবেই আমরা প্রকৃতিকে রক্ষা করতে পারবো।

তিনি আরও বলেন, আমাদের নিজের জন্য আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রকৃতি ও জীববৈচিত্রকে রক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

বাপার মৌলভীবাজার জেলার সমন্বয়ক আসম সালেহ সুহেল বলেন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষায় সাংবাদিক হৃদয়ের কাজগুলো নিঃসন্দেহে পরিবেশের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে!তিনি বলেন সাংবাদিক হৃদয়ের মতো সকলকেই পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে।

এদিকে এ বিষয়ে কথা হয় সাংবাদিক হৃদয় দেবনাথ এর সাথে। তিনি জানান, দিনের পর দিন অনৈতিকভাবে গাছ পালা কেটে উজাড় করা হচ্ছে, বন্যপ্রাণীর আবাস্থল অনিরাপদ হয়ে গেছে। সেই সাথে রয়েছে একশ্রেণীর শিকারির তৎপরতা।

হৃদয় বলেন, লাউয়াছড়া সহ জেলার বিভিন্ন স্থানে গাছ উজাড় হওয়ায় বন্যপ্রাণীদের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে ফলে প্রায়শঃই অনেক বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে যাচ্ছে। আগে যখন এসব এলাকায় সংবাদ সংগ্রহে যেতাম তখন চোখের সামনে বন্যপ্রাণীদের পিটিয়ে মেরে ফেলতো। সাপ বন্য শূকর,সহ অসংখ্য বন্যপ্রাণী মেরে ফেলার দৃশ্য আমাকে নিজ চোখে দেখতে হয়েছে। তখন থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই বিষয়টি নিয়ে সিরিসলি কাজ করবো। শুধু পত্রিকা আর টেলিভিশনে রিপোর্ট করে কাজ হয় না তাই বাধ্য হয়ে নিজেই উদ্যোগী হয়ে বন্যপ্রাণী আইন, পাখি শিকার সহ গাছপালা কেটেফেলার ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে স্থানীয় তরুণদের সাথে নিয়ে মানুষজনকে বুঝিয়ে যাচ্ছি, জনসচেতনতা তৈরী করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, আমি অত্যান্তআশাবাদী, জনসচেতনতা তৈরীর পাশাপাশি বন্যপ্রাণী আইন সম্পর্কে ধারণা দেয়ায়র এ কার্যক্রমের কারণে মানুষ সচেতন হচ্ছে।এখন খাদ্য সংকটে লোকালয়ে চলে যাওয়া বন্যপ্রাণী হত্যা অনেকটাই কমে এসেছে।

হৃদয় দেবনাথ বলেন, এই কাজটি আমার নেশা হয়ে গেছে তাই আমৃত্যু প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র রক্ষার জন্য আমার এ কাজ অব্যাহত থাকবে। ইতোমধ্যে অনেকগুলো কাজ হাতে নিয়েছি। লাউয়াছড়া এলাকায় ফলদ ও বনজ গাছ লাগানোর পরিকল্পনা আছে যা খুব শিগ্রই শুরু করবো। একমাত্র খাদ্য সংকটে বন্যপ্রাণীরা লোকালয়ে চলে যাচ্ছে তাই বন্যপ্রাণীদের খাদ্যের যোগান দেয় সে সমস্ত গাছ লাগানোই আমার প্রধান লক্ষ্য, ইতোমধ্যে এ বিষয়ে আমাকে অনেকেই সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। বনে গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে, বন্যপ্রাণীর খাদ্যের যোগান দেয় সে সমস্ত গাছ বেশি করে লাগালে আমি ব্যাক্তিগতভাবে আশাবাদী যে ভালো ফল পাওয়া যাবে।

সেই সাথে বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ রক্ষায় তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। ইতোমধ্যে বৃক্ষরোপন ও সংরক্ষণে গণমাধ্যমে অসংখ্য প্রতিবেদন তুলে ধরে জনসচেতনতা সৃষ্টি করায় তিনি বিভাগীয় পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার-২০১৮ সম্মাননা অর্জন করেছেন। তবে সহযোগিতা পেলে সাংবাদিক হৃদয় ব্যাক্তিগতভাবে প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদি কাজ করে যাওয়ারও ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

Bootstrap Image Preview