Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২২ শুক্রবার, নভেম্বার ২০১৯ | ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

বিশ্বে শিল্পের বিকাশে মুসলমানদের ভুমিকা

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:৪৪ AM
আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:৪৪ AM

bdmorning Image Preview


রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পর খোলাফায়ে রাশেদা, উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে মুসলিম সাম্রাজ্যের আয়তন বৃদ্ধির সঙ্গে তার জীবনযাত্রার মানও উন্নত হতে থাকে। এ সময় মুসলিম বিশ্ব ইউরোপ, পারস্য ও ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়। জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হওয়ায় উন্নতমানের পণ্যের চাহিদাও তৈরি হয় মুসলিম বিশ্বে। বিশেষত আব্বাসীয় শাসকরা বহু শিল্প ও কারিগরি বিদ্যার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম বিশ্ব জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-সংস্কৃতি, শিল্প ও প্রকৌশলে পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। মুসলিম শাসকরা যেসব শিল্পের মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তার কয়েকটি তুলে ধরা হলো—

পোশাক ও তাঁত শিল্প

মুসলিম শাসন আমলে পোশাক ও তাঁত শিল্পের বিশেষ উন্নয়ন হয়েছিল। মুসলিম বিশ্বের প্রায় সর্বত্র এই শিল্পের বিকাশ হয়। পোশাকশিল্প ছিল মুসলিম বিশ্বের সর্ববৃহৎ শিল্প। পোশাকশিল্পে আরবদের হাতেখড়ি রোমান ও পারসিকদের কাছ থেকে হলেও মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় একসময় তারা তার নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। আরবের বিভিন্ন শহর ও সেখানে উৎপাদিত পণ্য পৃথিবীতে খ্যাতি অর্জন করে। ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকায় রপ্তানি হতো আরবের উন্নতমানের কাপড়। মুসলিম শাসনামলে পোশাকশিল্পের কেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত ছিল ইরাকের বাগদাদ, বসরা ও মসুল, সিরিয়ার দামেস্ক, রাক্কা ও হারব, মিসরের কায়রো, আরব উপদ্বীপের আমুদ শহর, পারস্যের বোখারা ও খোরাসান। পোশাকশিল্পে বাগদাদের অবস্থান ছিল সবার ওপরে। সেখানে উন্নতমানের ও রংবেরঙের পোশাক উৎপাদিত হতো। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তা উচ্চ মূল্যে বিক্রি হতো। বাগদাদে উৎপাদিত পোশাকের ভেতর পুরুষের ঢোলা জুব্বা, মেয়েদের জরিদার রঙিন কামিজ, রুমাল, পাগড়ি, পাতলা সুতি সাদা কাপড় ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। আরবদের উদ্ভাবিত জনপ্রিয় কয়েকটি পোশাক হলো—ফুসতিয়ান, দামেস্কি, মসলিন, তাবিস, আরজুঝ, কিরবিস, তায়ালিস প্রভৃতি। (জার্জিস ফাতহুল্লাহ, তুরাসুল ইসলাম, পৃষ্ঠা ২০০; তারিখুল ইরাকি আল ইকতিসাদি ফি করনির রাবে, পৃষ্ঠা ৯০)

খনিজ পদার্থভিত্তিক শিল্প

মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তৃত সীমানার নিরাপত্তা, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও গতি স্বাভাবিক রাখা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার জন্য মুসলিম শাসকরা খনিজ পদার্থের অনুসন্ধান ও তার উন্নয়নে বিশেষ মনোযোগ দেন। তার আন্তরিক প্রচেষ্টায় এই শিল্পের বিশেষ উন্নয়ন সাধিত হয়। ইসলামের আগমনের আগ থেকে আরব উপদ্বীপের ইয়েমেন লৌহশিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। পারস্যের খাওয়ারিজম, ফারগানা, সমরকন্দের খনিজ পদার্থ ও খনিজশিল্পের বিশেষ কদর ছিল বিশ্ববাজারে। তবে তার বেশির ভাগই ব্যবহৃত হতো সরমাস্ত্রশিল্পে। মুসলিম শাসকরা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে এই শিল্পে বিপুল বিনিয়োগ ও পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ফলে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে নতুন নতুন খনিজ শিল্পকেন্দ্র গড়ে ওঠে। মুসলিম শাসকদের অনুদানে আরবের মসুল, হারান ও নাসিবাইনে বৃহৎ লৌহ ও ইস্পাত কারখানা গড়ে ওঠে। যেখানে উন্নতমানের চেইন, ছুরি, কিরিস, পরিমাপযন্ত্র, রোলার, প্রকৌশলবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, বিজ্ঞান গবেষণা উপকরণ তৈরি হতো। (আল মাকদিসি, পৃষ্ঠা ১৪১ ও ১৪৫; আল হাদারাতুল ইসলামিয়া ফি করনির রাবে আল হিজরি, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা ২৩০)

মসুলে চীনা মাটির পাত্র, মুদ্রা ও তামাশিল্পের বিকাশ হয়। দামেস্কে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ধাতব মুদ্রার কারখানা ছিল। সিজিস্তান ও সমরকন্দ উন্নতমানের তৈজসপত্র তৈরিতে মানুষের আস্থা অর্জন করে। উন্নতমানের প্রদীপ তৈরির জন্য ফিলিস্তিন এবং তালা তৈরির জন্য খাওয়ারিজম, ইস্পাহান, নিশাপুরের বিশেষ খ্যাতি ছিল। তৎকালীন পারস্যের ফারগানা শহরে স্থাপিত হয় খনিজ পদার্থের বৃহৎ শোধনাগার। যেখানে সোনা, রুপা, খনিজ তেল, লোহাসহ অন্যান্য খনিজ দ্রব্য শোধন করা হতো। (তুরাসুল ইসলাম, পৃষ্ঠা ১৮১; হামদানি, মুখতাসারু কিতাবিল বুলদান, পৃষ্ঠা ২৫৪)

মুসলিম শাসকরা খনিজ পদার্থের অনুসন্ধানে শক্তিশালী দল গঠন করেন। তাঁরা জায়হুন নদীর উপকূলে ও সমরকন্দের খাসনাক উপত্যকায় স্বর্ণ এবং বলখের বামিয়ান উপত্যকায় তামা ও সিসা অনুসন্ধান করতেন। বুজখুশান অঞ্চলে হীরা, স্ফটিক, লাজওয়ার্ড, বেলে পাথর ও কঠিন পাথর খনি আবিষ্কৃত হয় মুসলিম শাসনামলে। এ ছাড়া কিরমান, ইয়ামান, বৈরুত, হারব, রিহাব ও মিসরেও গুরুত্বপূর্ণ খনি আবিষ্কৃত হয়। (ইয়াকুবি, আল বুলদান, পৃষ্ঠা : ২৯২)

কার্পেট ও জায়নামাজ শিল্প

ইরাক ও ইরানের আরবাঞ্চলে কার্পেটশিল্পের প্রসার ঘটে ইসলাম আগমনের বহু আগে। প্রাচীনকাল থেকেই ইরাকের উন্নতমানের পশম ও সুতার সুখ্যাতি ছিল আরবে। ইসলাম আগমনের পর কার্পেটশিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয় জায়নামাজশিল্প। দৃষ্টিনন্দন কার্পেট ও জায়নামাজ তৈরি হতো অত্র অঞ্চলে। বিশ্বের বিভিন্ন রাজদরবারে তা শোভা পেত। আর্মেনিয়া অঞ্চলের তাঁতিরা আরব অঞ্চল থেকে উন্নতমানের পশম নিয়ে সুতা তৈরি করত এবং তা দিয়ে পাটি তৈরি করত। মিসান অঞ্চলেও তৈরি হতো উন্নতমানের পাটি। রেশমি পর্দা, বিছানার চাদর, গালিচা ও বালিশ ইত্যাদিও তৈরি হতো বিস্তৃত আরব অঞ্চলে। হীরা শহরটি ছিল স্বল্পমূল্যের মানসম্পন্ন কাপড়ের কারখানা। যাকে তানাফিস বলা হতো। মুসলিম শাসনামলেই আরবে রঙিন ও ছাপার পোশাকের প্রচলন হয়। এসব পোশাকে ফুল, গাছ, পাখি ও প্রাণীর ছবি থাকত। মসুলের উৎপাদিত পর্দা ও পাপোশ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি হতো। (জাহেজ, আত-তাসসুর বিল তিজারা, পৃষ্ঠা ৩২; আসরুন নুহদা ফিল ইসলাম, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা : ৩০৪)

মিসরের ফুয়ুম শহর মূল্যবান পর্দা, দীর্ঘ দীর্ঘ বিছানা, পশমের তাঁবুর জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। কখনো কখনো একটি পর্দার দৈর্ঘ্য ৩০ গজেরও বেশি হতো। তার মূল্য হতো ৩০০ স্বর্ণ মুদ্রারও বেশি। হিরাব ও আর্মেনিয়া অঞ্চলেও উন্নতমানের কার্পেট ও জায়নামাজ তৈরি হতো। ইবনে জাওজি ২৯৯ হিজরির ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনায় লিখেছেন, ‘আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান অঞ্চলের গভর্নর ইউসুফ বিন আবিস-সাজা খলিফা মুকতাদির বিল্লাহর কাছে যে উপঢৌকন পাঠান তাতে আর্মেনীয় বিছানার চাদরও ছিল। একটি বিছানা পাঠিয়েছিলেন তার দৈর্ঘ্য ৭০ গজ এবং প্রস্থ ৬০ গজ ছিল। প্রায় ১০ বছর সময়ে তা তৈরি হয়। কেউ তার মূল্য নির্ধারণ করতে পারছিল না।’ (ইবনে জাওঝি, আল মুনতাজিম ফি তারিখিল মুলুকি ওয়াল উমাম, খণ্ড-৬, পৃষ্ঠা : ১১০)

মৃৎ ও কাচ শিল্প

মুসলিম শাসনামলে ইসলামী বিশ্বে মৃৎ ও কাচের বিকাশ ও সমৃদ্ধি ঘটেছিল। এ শিল্পে মুসলিমরা ভারতীয় ও চীনাদের চেয়ে এগিয়ে যায়। অবশ্য ইরাকের প্রাচীন সভ্যতাগুলোয় মৃিশল্পের উন্নত চর্চা ছিল বলেও ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়। ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার পর অত্র অঞ্চলে এই শিল্পের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। বিশেষত বাগদাদ ও সামরা শহর নির্মাণের সময় মুসলিম শাসকরা মৃিশল্পের উন্নয়নে মনোযোগ বৃদ্ধি করেন এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন। এ সময় মৃৎ ও কাচ শিল্প উন্নতির চরম স্তরে পৌঁছে। বাগদাদ শহরের নির্মাণের সময় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দক্ষ ও অভিজ্ঞ যেসব কারিগর ছিলেন তাঁদের ভেতর বিপুলসংখ্যক মৃিশল্পীও ছিলেন। একইভাবে সামরা শহর নির্মাণের সময় খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ বসরা ও কুফার দক্ষ মৃিশল্পী ও কাচের কারিগরদের নিয়োগ দেন। (হামদানি, মুখতাচারু কিতাবুল বুলদান, পৃষ্ঠা : ২৫২)

মৃিশল্প ও তৈজসপত্র নির্মাণে বাগদাদের স্থান ছিল সবার ওপরে। যেখানে অভিনব ডিজাইন ও রঙের পাত্র তৈরি হয়। তখন বাগদাদে স্বর্ণ-রৌপ্যখচিত বিশেষ ধরনের পাত্রও তৈরি হতো। স্বচ্ছ কাচের মগ, কাপ, বাটি ও থালা তৈরি হতো। কাচের পাত্রে দৃষ্টিনন্দন নকশাও থাকত। কুফা ও হিরাত অঞ্চলে রঙিন কাচের বাসনপত্র তৈরি হতো। সূক্ষ্ম কারুকাজের কাচের পাত্রও তৈরি হতো সেখানে। ইসলামী শরিয়তে স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ায় উন্নতমানের কাচের পাত্র বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষত অভিজাত আরবদের কাছে কাচের তৈজসপত্র সমাদৃত হয়। অভিজাত অঞ্চলের বাড়িঘর, মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অঙ্গসজ্জায় মাটি ও কাচের তৈরি বিভিন্ন নকশা ব্যবহার করা হতো। আবু ইবরাহিম আহমদের শাসনামলে কিরওয়ানের মসজিদগুলোর সৌন্দর্যবর্ধনে কাচ ও মৃিশল্পের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। (তারিখুল ইরাকি আল ইকতিসাদি ফি করনির রাবে, পৃষ্ঠা : ৯০; আরনাসাত কাভিল, আল ফান্নুল ইসলামী, পৃষ্ঠা : ৪১ )

কাচের সূক্ষ্ম কারুকাজের জন্য দামেস্ক ছিল মানুষের আস্থার প্রতীক। এটা দামেস্কের রোমান উত্তরাধিকার। রোমান সাম্রাজ্যের শাসনামলে দামেস্কে কাচশিল্পের সূচনা হয়। তবে আরব শিল্পীরা তাঁদের মেধা, মনোযোগ ও শ্রমের বিনিময়ে রোমানদের ছাড়িয়ে যান। ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতায় তাঁরা এগিয়ে যান একসময়। আরবরা কাচের পাত্রের নকশায় স্বর্ণ-রৌপ্যও ব্যবহার করতেন। এ ছাড়া ফিলিস্তিন, সাওর, ফুসতাস, ফুয়ুম ও ইস্কান্দারিয়া প্রভৃতি শহরও মৃৎ ও কাচশিল্পে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। (মারজুক, আল ইরাকু মাহদু ফন্নিল ইসলামী, পৃষ্ঠা ৭০; জোসেফ মিল, আল হাদারাতুল আরাবিয়্যা, পৃষ্ঠা ৯২)

চামড়াশিল্প

আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী বাগদাদ নগর কেন্দ্র করে বিশাল চামড়াশিল্প গড়ে ওঠে। সেখানে দুই ধরনের চামড়াশিল্প গড়ে ওঠে। দারিস ও লাক্কা। ইয়েমেনের জুবায়েদ নগরী চামড়া শোধন ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করে। ইয়েমেনের চামড়া কারখানা থেকে উদুম নামক এক ধরনের চামড়া রপ্তানি করা হতো। তার ওপরে পশম অবশিষ্ট রাখা হতো। পশমের রংও নষ্ট হতো না। বিশ্বব্যাপী উদুমের বিশেষ চাহিদা ছিল। মিসরেও চামড়া প্রক্রিয়াকরণের অনেক কারখানা ছিল। এ ছাড়া মধ্য এশিয়ার জুরজান ও বুখারা থেকে পরিশোধিত চামড়া বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি হতো। তবে খাওয়ারিজমের চামড়া শ্রমিকরা গৃহপালিত পশুর পাশাপাশি অনেক বন্য প্রাণীরও চামড়া শোধন ও তার দ্বারা বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় পণ্য তৈরি করত। কাঠবিড়ালি, খরগোশ, শিয়াল, বনবিড়াল, বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর চামড়া দিয়ে তারা বালিশের কভার, বিছানা, দস্তরখানা, তরবারির খাপ, খেলনা ইত্যাদি তৈরি করত। তারা মূলত তুর্কিস্তানের বিস্তৃত অঞ্চল থেকে এসব বন্য প্রাণীর চামড়া সংগ্রহ করত। (হামদানি, মুখতাসারু কিতাবিল বুলদান, পৃষ্ঠা : ২৫২; মাকদিসি, আহসানুত তাকাসিম ফি মারিফাতিল আকালিম, পৃষ্ঠা : ৯৮)

আতর ও সাবান শিল্প

মুসলিম বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বড় শহরে সাবান ও আতরের কারখানা ছিল। মুসলিম জনগণের দৈনন্দিন জীবনে সাবান ও আতরের ব্যাপক চাহিদা থাকায় নগরে নগরে এই শিল্প গড়ে ওঠে। তবে সব শহরের আতর ও সাবানের মান এক ছিল না। কোনো কোনো শহরে অনেক উন্নতমানের আতর উৎপাদিত হতো। যা অভিজাত ব্যক্তিরা উচ্চমূল্যে কিনতেন। আরব উপদ্বীপের রাক্কা, ফিলিস্তিন, মধ্য এশিয়ার বলখ ও তিরমিজ শহরে উন্নতমানের সাবান উৎপাদিত হতো। তবে আরজান নগরীর সাবানের বিশেষ চাহিদা ছিল আরব ও অনারবে। ইরাকের বসরায় তৈরি হতো উচ্চমূল্যের সুগন্ধি আর কুফাবাসী উৎপাদন করত উত্কৃষ্ট মানের ধূপ। বসরার আতর আর কুফার ধূপ রাজত্ব করত আরবের বাজারগুলোতে। এ ছাড়া দামেস্ক, ফরমা, বুখারা ও মিসরের কোনো কোনো শহরে উন্নতমানের আতর ও ধূপ তৈরি হতো। (ইবনে হাওকাল, সুরাতুল আরদ, পৃষ্ঠা ২৬২; জাহেজ, আততাবাসসুর বিততিজারা, পৃষ্ঠা ৩২)

খাদ্যশিল্প

মুসলিম শাসনামলে মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হওয়ায় ‘খাদ্য উৎপাদন’ শিল্পে রূপ নেয়। বিভিন্ন ধরনের দুগ্ধজাত খাবার ও মিষ্টান্নের বাণিজ্যিক উৎপাদন হতো মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল ও শহরে। বড় শহরগুলোতে গড়ে উঠেছিল রেস্টুরেন্ট ও হোটেল ব্যবসা। ‘সরাইখানা’ নামে একধরনের আবাসিক হোটেলেরও প্রচলন ছিল তখন। অভিজাত পরিবারগুলোতে খাবার তৈরির জন্য দক্ষ বাবুর্চি ও কারিগর রাখা হতো। তাদের বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উচ্চ বেতনে নিয়োগ দেওয়া হতো। মধ্য এশিয়ায় বিস্তীর্ণ তৃণভূমি থাকায় এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে ঘি ও মিষ্টান্ন তৈরি হতো। মসুল ও বুখারায় চর্বিজাতীয় খাবারের কারখানার সন্ধান পাওয়া যায় আব্বাসীয় আমলে। মিসরের ফারমা শহরে ছিল ভোজ্য তেলের বৃহৎ বাজার। মিসরীয় কৃষকরা নীল নদের অববাহিকায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তেলবীজের চাষ করত। তিকরিতে ছিল জ্বালানি তেলের বড় বাজার। এ ছাড়া খোরাসান, সানজার, বলখ, ওয়াদি শালাত, তাহরাত শহরেও ভোজ্য তেল উৎপন্ন হতো। (ইয়াকুবি, আল বুলদান, পৃষ্ঠা ৩৫৮; ইবনে হাওকাল, সুরাতুল আরদ, ১২৯)

কাগজশিল্প

খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে চীনারা প্রথম কাগজ উৎপাদন করে। এই শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদানও রাখে তারা। এরপর দীর্ঘ ৬০০ বছর কাগজশিল্পের নিয়ন্ত্রণ ছিল চীনাদের হাতে। পরে ধীরে ধীরে ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী দেশগুলোয় কাগজ উৎপাদন শুরু হয়। ৭৫১ খ্রিস্টাব্দে আরবরা চীনাদের কাছ থেকে সমরকন্দ শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এ সময় কাগজ কারখানার কয়েকজন কারিগর আরবদের হাতে বন্দি হয়। তাদের মাধ্যমে সমরকন্দে কাগজ কারখানা চালু করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে কাঁচামাল হিসেবে খড়কুটো ও পশুর চামড়া ও শিং ব্যবহার করা হতো। মুসলিম বিশ্বের শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে কাগজের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। সে অনুসারে কাগজশিল্পেরও ব্যাপক উন্নতি হয়। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে কাগজশিল্প বাগদাদে স্থানান্তরিত হয়। ৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে খলিফা হারুনুর রশিদের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাগদাদে কাগজ কারখানা স্থাপিত হয়। ধীরে ধীরে মিসর ও দামেস্কেও কাগজ কারখানা স্থাপন করা হয়। খ্রিস্টীয় বারো শতকে স্পেনের মুসলিমদের মাধ্যমে ইউরোপে কাগজ উৎপাদন শুরু হয়। তবে কাগজ উৎপাদনে কোনো শহরই সমরকন্দকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। সেখানেই উৎপাদিত হতো বিশ্বের সর্বোত্কৃষ্ঠ কাগজ। (অর্নাল্ড, তুরাসুল ইসলাম, পৃষ্ঠা ৪৬২; ওয়াহাল, হাদারাতুল আরাবিয়া, পৃষ্ঠা ৩২৬)

দড়িশিল্প

মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নির্মাণকাজে প্রচুর পরিমাণে দড়ি ব্যবহৃত হয়। মুসলিম শাসনামলে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন শহরে উন্নতমানের দড়ি উৎপাদন হতো। ইরাকের পারস্য সীমানা থেকে খোজিস্তান পর্যন্ত, বসরা, ফারমা ও সিজিস্তানে উন্নতমানের দড়ি উৎপাদন হতো। বিভিন্ন ধাতব পদার্থ, সুতা, পশম, চামড়া ও গাছের ছাল ব্যবহার করে দড়ি উৎপাদন করা হতো তখন। (মাকদিসি, আল মাসদারু নাফসুহু, পৃষ্ঠা ১৮০; হামদানি, মুখতাসারু কিতাবিল বুলদান, পৃষ্ঠা ৬৬)

স্থাপত্যশিল্প

উমাইয়া শাসকদের শুরুর সময় থেকে এই শিল্প মুসলিম শহর-বন্দর-নগরে বিকশিত হতে থাকে। এরপর আব্বাসীয়, উসমানীয়, সেলজুক, ফাতেমি ও মোগল শাসকরা স্থাপত্যশিল্পে অসামান্য অবদান রাখেন। মুসলিম স্থাপত্যশিল্পের বিকাশে শাসকদের বিলাসিতার প্রমাণ যেমন পাওয়া যায়, তেমনি শহর রক্ষাকারী দুর্গ, দৃষ্টিনন্দন মসজিদ-মাদরাসাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান তৈরিতে তাদের সুরুচি, উচ্চ মনোবল ও উদারতার পরিচয় পাওয়া যায়। ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার যেসব অঞ্চল মুসলিমরা শাসন করেছিল, যেসব অঞ্চলে এখনো সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে স্থাপত্যশিল্পের অনেক বিস্ময় ও অহংকার। স্পেনের আল-হামরা প্রাসাদ ও কর্ডোভা মসজিদ, সিরিয়ার উমাইয়া মসজিদ, মিসরের আল-আজহার, ভারতের লালকেল্লা, তাজমহল ও ফতেহপুর সিকরি, তুরস্কের টোপাকোপি প্রাসাদ, আয়া সুফিয়া মসজিদসহ অসংখ্য স্থাপনা কালের সাক্ষী হয়ে পৃথিবীর বুকে টিকে আছে। যা থেকে স্থাপত্যশিল্পে মুসলমানদের অবদান স্পষ্ট হয়। (বিস্তারিত দেখুন : স্থাপত্যশিল্পের উদ্ভব ও বিকাশে মুসলমানদের অবদান, ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, ৪৭ বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা, জানুয়ারি-মার্চ ২০০৮, পৃষ্ঠা ১০০)

Bootstrap Image Preview