Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২১ শনিবার, সেপ্টেম্বার ২০১৯ | ৬ আশ্বিন ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

ভেদরগঞ্জের শিক্ষদের যথাযথ দায়িত্ব পালনে বাধ্য করায় শিক্ষকদের রোষানলে শিক্ষা কর্মকর্তা

শরীয়তপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০১৯, ০৮:৩০ PM
আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০১৯, ০৮:৩০ PM

bdmorning Image Preview


শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার চরসেনসাস ক্লাস্টারে দায়িত্বরত সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. চঞ্চল শেখ অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় কতিপয় শিক্ষকদের রোষানলে পড়েছেন। 

নিয়মিত তদারকি, স্লিপ ও উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বুঝে নেয়া, অনিয়মের জবাবদিহিতা করা, আকস্মিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করা ও শিক্ষদের যথাযথ দায়িত্ব পালনে বাধ্য করায় এ শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা প্রকার অপ্রাসঙ্গিক বিষয়াদি উল্লেখ্য করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে ঐ শিক্ষকরা। কিন্তু সংবাদ সংগ্রহকালে এসব অভিযোগের কোন প্রকার প্রমান দেখাতে পারেনি তারা। ফলে বিষয়টি নিয়ে সাধারন শিক্ষক ও সচেতনদের মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

ভেদরগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিস ও সরেজমিন ঘুরে জানাগেছে, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার চরসেনসাস ক্লাস্টার এর আওতাধীন মোট ৩১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বেশীরভাগ বিদ্যালয়ই চরাঞ্চলে অবস্থিত।

উপজেলা সদর থেকে এসব বিদ্যালয়ে যাতায়াতের ব্যবস্থা খুবই কঠিন। এসবের কোন কোন বিদ্যালয়ে পৌছাতে হলে পাড়ি দিতে হয় উত্তাল নদী, আর কোন কোনটিতে পৌছাতে হয় বিশাল খাল-বিল অতিক্রম করে।

যাতায়াত ব্যবস্থার এ দুর্বলতাকে পুঁজি করে ঐ ক্লাস্টারের কিছু অসাধু প্রধান শিক্ষক যখন তাদের বিদ্যালয় গুলোকে নিজেদের পরিবার বানিয়ে ব্যবসায়ীক কেন্দ্রে পরিনত করে তুলছিল ঠিক তখনই ঐ ক্লাস্টারের দায়িত্ব পায় ভেদরগঞ্জ উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. চঞ্চল শেখ।

দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই এ কর্মকর্তা বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করে। বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ও পাঠদানে অবহেলাকারী শিক্ষদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ শুরু করেন তিনি। স্লিপ ও ক্ষুদ্র উন্নয়ন প্রকল্পের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে বাধ্য করেন। প্রতিদিন মোবাইল ফোনে খোঁজ নেন বিদ্যালয় ও শিক্ষদের। আকস্মিক পরিদর্শন শুরু করেন বিদ্যালয়গুলো আর অনিয়ম পেলে শোকজ করেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকে।

কিন্তু শিক্ষা কর্মকর্তা চঞ্চল শেখে এ কঠোর নিয়ম পালন করতে অভ্যস্ত নন এ ক্লাষ্টারের অনেক শিক্ষক। কারন একবছর আগেও তারা নিজ স্বাধীনমত বিদ্যালয় পরিচালনা করছেন। নিজ ইচ্ছা মত তছরুপ করতে পেরেছেন সরকারি বরাদ্দের টাকা। ফলে তার বিরুদ্ধে নানা প্রকার চক্রান্ত শুরু করেন অসাধু শিক্ষকরা।

আর এদেরকে নেতৃত্বদেন ৪১নং ছুরিরচর বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জার, ১১৪ নং প্রগতি বিদ্যানিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দিন এবং ১০৬ নং ছুরিরচর বেপারী কান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফরিদ উদ্দিন। এরাই ১৩বিষয় উল্লেখ্য করে দায়ের করা অভিযোগপত্রের প্রথম স্বাক্ষককারী।

কিন্তু অভিযোগপত্রে উল্লেখ্যিত বিষয়গুলোর মধ্যে ১ নং অভিযোগে বলা হয়েছে, One day one word প্রকল্পের জন্য বিদ্যালয় গুলোতে ডায়েরী সরবরাহ করে চঞ্চল শেখ শিক্ষকদের চাপ প্রয়োগ করে ২৬টাকা মূল্যের ডায়েরীটি ৩৪.৫০ টাকা নিয়েছেন। কিন্তু ভেদরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্বনামধন্য লাইব্রেরীতি গিয়ে দেখা যায়, একই জাতীয় ডায়েরী ৫০-৬০টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।

এ সময় চঞ্চল শেখের সরবরাহকৃত ডায়েরীটি দেখিয়ে দাম জিজ্ঞাসা করলে সাইফুল লাইব্রেরীর মালিক সাইফুল ইসলাম বলেন, এ ডায়েরীটি যদি ৩৪.৫০ টাকা করে দেয়া হয় তবে তুলনা মূলক কম দামে দেয়ে হয়েছে। কারন বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী ডায়েরীটি ৪০থেকে ৫০টাকা রাখালেও খুব বেশী দাম পড়েনা।

তবে অবাক করার বিষয় হচ্ছে, অভিযোগ পত্রটির ৯নং অভিযোগে বলা হয়েছে যে, এ বছর স্লীপ ও ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা থেকে চঞ্চল শেখ বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে ৫ থেকে ১০হাজার টাকা মাসোয়ারা নিয়েছেন।

উল্লেখ্য করা হয়েছে, ১২৯নং শিকদার বাড়ি বিদ্যালয় থেকে ৫ হাজার ও ১১২নং মল্লিক কান্দি বিদ্যালয় সহ বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে ৫ হাজার টাকা করে ঘুষ নিয়েছেন তিনি। কিন্তু বিদ্যালয় দুটির প্রধান শিক্ষকরা এ বিষয়ে কিছুই জানেনা।

বিদ্যালয় দুটির প্রধান শিক্ষক সেলিম মিয়া ও আব্দুস সাত্তার মিয়া বলেন, এ অভিগের বিষয়ে আমরা কিছুই জানিনা। আমাদের না জানিয়ে এখানে মিথ্যা লেখা হয়েছে।

যারা চঞ্চল স্যারের নিয়ম কানুন মানতে পারেনা, নিজেদের ইচ্ছেমত চলতে পারেনা। তারাই স্যারের পেছনে লেগেছে। তাছাড়া আমাদেরকেও ঐ অভিযোগ পত্রে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল কিন্তু আমরা করিনি।

এছাড়া অন্যান্য অভিযোগ গুলোর মধ্যে রয়েছে, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অজুহাতে শোকজ করে টাকা নিয়েছেন শিক্ষা কর্মকর্তা চঞ্চল শেখ। তবে, এসব অভিযোগের নূন্যতম প্রমানও দিতে পারেনি স্বাক্ষরকারী শিক্ষকরা।

৪৮ নং দক্ষিন সখিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিক রেজাউল ইসলাম বলেন, চঞ্চল স্যার সব ক্ষেত্রেই নিয়ম পছন্দ করেন। তার তদারকির করনেই আমাদের এ ক্লাস্টারের বিদ্যালয় গুলোর লেখাপড়ার মান উন্নয়ন হতে চলছে। যারা তার নিয়মকানুন মানতে পারেন না তারাই এসব অভিযোগ করেছেন।

৪২ নং তারাবুনিয়া বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ফাতেমা খাতুন বেগম বলেন, কই! আমাদের কাছ থেকেতো চঞ্চল স্যার কোন সময় কোন বিষয়ে টাকা নেয়নি। উল্টো তিনি অনেক পরিশ্রম করে ক্লাস্টারের বিদ্যালয় গুলোতে পরিবর্তন এনেছেন। মূলত, যারা ফাঁকি দিতে পারেনা তাদের কাছেই তিনি সমস্যা।

প্রধানীয়া বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইউসুফ মিয়া বলেন, আমার শিক্ষকতার জীবনে এমন একজন শিক্ষা কর্মকর্তা পাইনি। যিনি বিদ্যালয়ের সকল বিষয়ে সঠিক তদারকি করেন এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার।

কখনই তিনি কোন বিষয়ে টাকা পয়সা চাননি। এক কথায়, যারা তার ভয়ে টাকা আত্মসাৎ করতে পারেনা, তারাই তাকে সরানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।

তারাবুনিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, অন্যান্য বছর গুলোতে এ অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে তেমন কোন কাজ চোখে পড়েনি। কিন্তু এবছর বিদ্যালয় গুলোকে নানা রঙ্গে সাজানো হয়েছে। উন্নত আসবাবপত্র আনা হয়েছে। এক কথায় খুব সুন্দর এক পরিবেশ।

বেশিররভাগ সচেতন শিক্ষকরা যখন চঞ্চল শেখের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট হয়ে বিদ্যালয়ের মানউন্নয়নের চেষ্টা করছেন, তখন ৪১নং ছুরিরচর বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জার, ১১৪ নং প্রগতি বিদ্যানিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দিন এবং ১০৬ নং ছুরিরচর বেপারী কান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফরিদ উদ্দিন।

কেন এ সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা চঞ্চল শেখের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেছেন এবং কেনইবা অন্যদের উৎসাহিত করছেন অভিযোগ দায়ের করতে,

এমন প্রশ্ন নিয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিস ও কাগজপত্রাদি অনুসন্ধান করে দেখা যায় ৪১নং ছুরিরচর বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক এক সময় সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত থাকলেও পরবর্তীতে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেব পদন্নোতি পান। অভিযোগ রয়েছে, এ পদন্নোতির ক্ষেত্রে তিনি নিয়েছেন এ ভয়াবহ জালিয়াতির আশ্রয়।

সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে উন্নিত হতে হলে অবশ্যই যে,, সি. ইন. এ্যাড সনদ অর্জন করতে হয় তা তিনি ঐ সময় করেন নি। ২০০৩ সালে তিনি পদোন্নতি নিলেও সি. ইন এ্যাড করেছেন দুই বছর পর ২০০৫ সালে।

এছাড়া এ বছর স্লীপ ও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য পাওয়া ৬লক্ষ টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে গড়িমসি শুরু করেন এ প্রধান শিক্ষক। সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা চঞ্চল শেখের জোরালো তদারকিতে কিছুটা কাজ করলেও দিয়েছেন শুভঙ্করের ফাঁকি।

তবে ছুরিরচর বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আমি নিজেই জানিনা সি ইন এ্যাড ছাড়া কিভাবে অফিস আমাকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি দিয়েছিল।

এদিকে ১১৪নং প্রগতি বিদ্যা নিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দিনের জালিয়াতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, উপজেলা শিক্ষা কমিটির সুপারিশ এবং জেলা শিক্ষা অফিসের সুপারিশ ছাড়াই তিনি রহস্যজনকভাবে পদোন্নতি নিয়েছেন।

ফলে তার সমস্ত কাগজপত্রাদি নিয়ে অফিসে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। এছাড়া তিনি স্লীপ ও উন্নয়নকাজের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা সঠিকভাবে ব্যয় করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দিন বলেন, মন্ত্রনালয়ের নিয়ম অনুযায়ী আমি পদোন্নতি নিয়েছি। আমার পদোন্নতিতে কোন জালিয়াতি নেই। অভিযোগটি মিথ্যা।

আর ১০৬ নং বেপারী কান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফরিদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে রয়েছে ক্লাস চলাকালীন সময়ে প্রাইভেট পড়ানোর অভিযোগ। কয়েকদিন আগে এ বিষয়টির জন্য তাকে শোকজ করছিলেন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা চঞ্চল শেখ।

এছাড়া স্লীপ প্রকল্পের কাজেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। যা শত চেষ্টা করেও পুরোপুরি করানো যায়নি বলে নিশ্চত করেছে শিক্ষা কর্মকর্তা চঞ্চল শেখ।

এ বিষয়ে সহকারি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা চঞ্চল শেখ বলেন, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজে নিয়মিত তদারকির কারেনই আমার প্রতি অনেক শিক্ষক ক্ষুব্ধ। কারন এর আগেও তারা নিজেদের মত করে বিদ্যালয় পরিচালনা করেছেন।

ফলে এ এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থারমান নিম্নমূখী হচ্ছিল। এছাড়া কাজ ফাঁকি দিয়ে টাকা আত্মসাৎ করতে তারা আমাকে টাকাও দিতে চেয়েছিল। আমি টাকা প্রত্যাখ্যান করে কাজ করতে বাধ্য করায় তারা আমার পিছনে লেগেছে।

এ বিষয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সুলতানা রাজিয়া বলেন, আমদের সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা চঞ্চল শেখের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগপত্র পেয়েছি এবং ৪১নং ছুরিরচর বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জার, ১১৪ নং প্রগতি বিদ্যানিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দিন এর পদোন্নতির ব্যাপারে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। তাদেরকে কাগজপত্র নিয়ে অফিসে আসতে বলেছি।

শরীয়তপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের দুটি বিষয়ই আমরা গুরুত্বের সাথে দেখছি।

Bootstrap Image Preview