Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২১ শনিবার, সেপ্টেম্বার ২০১৯ | ৬ আশ্বিন ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

হজ-পরবর্তী জীবনচিত্র

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১ আগস্ট ২০১৯, ০৫:০৪ PM
আপডেট: ২১ আগস্ট ২০১৯, ০৫:০৪ PM

bdmorning Image Preview
সংগৃহীত ছবি


হজ ইসলামের মৌলিক স্তম্ভ। শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত। হজের মাধ্যমে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ও আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়ার উপযোগী বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে। হজের আনুষ্ঠানিকতা ব্যক্তির মধ্যে তীব্র দায়িত্বানুভূতির সৃষ্টি করে, ইমানকে বলিষ্ঠ করে। ফলে সে হজপূর্ব অবস্থার চেয়ে মুমিন হিসেবে অনেক বেশি কার্যক্রম চালাতে পারে।

সাধারণভাবে মনে করা হয়, দুনিয়ার ঝামেলামুক্ত হয়ে হজে যাওয়া দরকার। ফলে অনেকে বৃদ্ধ বয়সে হজে যায়। হজ থেকে এসে জগৎ-সংসারে সময় দিতে চায় না। কেউ কেউ দুনিয়াবিমুখ হয়। অনেকে হজ থেকে ফিরে এসে হালাল-হারাম বাচবিচার না করে আগের মতো চলতে থাকে।

হজ প্রস্তুতির আগে হজ পথযাত্রী অবশ্যই ‘রাফাস’- অশ্লীলতা, ‘ফুসুক’- পাপাচার ও ‘জিদাল’- ঝগড়া-বিবাদ থেকে পবিত্র থেকে ‘তাকওয়া’ অর্জনের অনুশীলন করবে (সূত্র : সূরা আল বাকারাহ, আয়াত ১৯৭)। তাকওয়াকে পাথেয় করে রওনা হবে। হজে ‘মাবরুর’ (কবুল হজ)-এর জন্য যেমন তাকওয়ার প্রস্তুতি দরকার, তেমন সফল হাজীর হজ-পরবর্তী জীবন কার্যক্রম সর্বাত্মকভাবে ইসলামের অনুসারী হতে হবে। ‘হাজী’ তকমা নিয়ে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কর্মকান্ডে তৎপর হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

(সূত্র : সূরা আল বাকারাহ, আয়াত ২০৩-২০৬)। আমরা হজব্রত পালনের অন্যতম স্লোগান লাব্বায়েক ধ্বনি নিয়ে একটু ভেবে নিই। ‘হাজির হে আল্লাহ! তোমার দুয়ারে হাজির, (এ ঘোষণা দিতে) যে, তোমার কোনো শরিক নেই, নিশ্চিতভাবে সকল প্রশংসা তোমার, সকল নিয়ামত তোমার হাতে, সার্বভৌমত্ব একান্তভাবে তোমারই এবং সকল শিরকি ও অপবিত্রতা থেকে তুমি বিমুক্ত।

 এভাবে আবেগজড়িত কণ্ঠে হজব্রত পালনকারী শিরকি, কুফুরি সম্পূর্ণরূপে পরিহার করে একান্তভাবে কোরআন-সুন্নাহর জীবনে ফিরে আসে (তওবা করে) এবং আল্লাহর যে কোনো ডাকে সাড়া দেওয়ার ব্যাপারে সদাপ্রস্তুত থাকার দৃঢপ্রত্যয় ঘোষণা দেয়। হজের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, আরাফাতে অবস্থান, তাওয়াফে জিয়ারতসহ বাস্তব নিদর্শন ও রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্মৃতিবিজড়িত পূতপবিত্র স্থানসমূহ প্রত্যক্ষ করার ফলে হাজীদের চিন্তা-চেতনা, চরিত্র ও কর্ম এবং জীবনবৈশিষ্ট্যে ইতিবাচক পরিবর্তন হতে বাধ্য।

শয়তানকে কঙ্কর মারার মাধ্যমে তার মধ্যে তাবৎ শয়তানি শক্তি দূর হয়। মশহুর হাদিসের ভাষায়- ‘হজ শেষে নিষ্পাপ শিশু হয়ে ফিরে আসে’। নিজেকে ‘সিবগাতাল্লাহ’- আল্লাহর রঙে রঙিন করে নেয়। ‘আল্লাহর পরম স্নেহশীল’ বান্দায় পরিণত হয়, যা মৃত্যুকাল পর্যন্ত কখনো মুছে যায় না।

সাফা-মারওয়ায় সায়ি তার মনে দৃঢ় আশা ও মহান আল্লাহর রহমতের শাশ্বত প্রত্যাশা বৃদ্ধি করে। সায়ি স্মরণ করিয়ে দেয় আল্লাহর সাহায্য পেতে হলে প্রচুর চেষ্টা বা মেহনতের প্রয়োজন হয়। নিশ্চিন্তে বসে না থেকে ছোটাছুটি করলে আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়া যায়। সূরা বাকারাহর ১৫৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সাফা-মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত।

অতএব, যে ব্যক্তি এই ঘরে হজ করে কিংবা ওমরাহ করে তার জন্য এতদুভয়ের প্রদক্ষিণ করা দূষণীয় নয়। আর যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো ভালো কাজ করে আল্লাহ তার উপযুক্ত মূল্য দান করেন এবং তিনি সবকিছু জানেন।’ এ আয়াতের আগে ও পরের আয়াতসমূহে হজ ও ওমরাহর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই; কিন্তু এ আয়াতগুলো কেন এখানে সন্নিবেশিত করা হলো? এ আয়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা খুঁজতে হলে সূরা বাকারাহর ১৫১-১৬৩ আয়াতগুলো বোঝা দরকার; যার মধ্যে সায়ির তাৎপর্য ও মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব ও কর্তব্য বোঝা যায়।

ওই আয়াতসমূহের সারমর্ম হচ্ছে- রসুল সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমত মানুষের কাছে আল্লাহর আয়াত পড়ে শোনাবেন। দ্বিতীয়ত তাদের (জীবনকে) পরিশুদ্ধ করে দেবেন এবং তৃতীয়ত তিনি আল্লাহর কিতাব ও (তার অন্তর্নিহিত) জ্ঞান শিক্ষা দেবেন। সর্বোপরি তিনি এমনসব বিষয়ের জ্ঞানদান করবেন যা মানুষ আগে জানত না।

(সূরা বাকারাহ, আয়াত ১৫১)। রসুল সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবর্তমানে উপরোক্ত তিনটি কাজ মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেক সদস্যের আবশ্যিক কর্তব্য। আর যারা আল্লাহকে স্মরণ করবে, আল্লাহও তাদের স্মরণে রাখবেন। আর আল্লাহর হুকুম অমান্য করা যাবে না। (সূরা বাকারাহ, আয়াত ১৫২)। আল্লাহকে এ প্রক্রিয়ায় স্মরণ রাখতে হলে তাঁকে অবশ্যই ইসলামবিরোধী শক্তির কঠিন মোকাবিলায় দাঁড়াতে হবে। কারণ, কোরআনি কাজে শয়তানি শক্তি নিস্পৃহ থাকবে না।

শয়তানের সর্বগ্রাসী আক্রমণ মোকাবিলার জন্য ইমানদারদের (পরম) ধৈর্য ও (খালিস) নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে, কারণ আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে থাকেন। (সূরা বাকারাহ, আয়াত ১৫৩)। ইসলামের এ কার্যক্রম করতে গিয়ে বাতিল শক্তির মোকাবিলায় চূড়ান্তভাবে কিছু মুমিনকে জীবন বিসর্জন দিতে হতে পারে। (সূরা বাকারাহ, আয়াত ১৫৪)।

আল্লাহর রাস্তায় কার্যক্রমরত থাকা বাকিদের পরীক্ষা করা হবে ভয়ভীতি, ক্ষুধা-অনাহার (কখনো) জানমাল ও ফসলাদির ক্ষতিসাধন করে। (সূরা বাকারাহ, আয়াত ১৫৫)। আর সত্যিকার মুমিনরা বিপদ-মুসিবতে আপতিত হলেও কোনো পরোয়া করে না বরং তারা বলবে, আমরা তো আল্লাহরই জন্য আর নিশ্চিতভাবে আমরা তাঁর দিকে ফিরে যাব।

(সূরা বাকারাহ, আয়াত ১৫৬)। আর এ পরীক্ষায় যারা টিকে থাকবে সেই অটল বিশ্বাসীরা আল্লাহর সমগ্র অনুগ্রহ, রহমত ও হেদায়েতপ্রাপ্ত। (সূরা বাকারাহ, আয়াত ১৫৭)। এভাবে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের ইমানি পরীক্ষা পাসের অপূর্ব সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়েছে।

অতপর সূরা বাকারাহর ১৫৮ নম্বর আয়াতে সাফা-মারওয়া ‘সায়িকে জীবন্ত নিদর্শন বলা হয়েছে। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জন্য কঠিনতম পরীক্ষা, শিশুপুত্র ইসমাইল আর মা হাজেরাকে শুষ্ক মরুপ্রান্তরে ক্ষুধার জ্বালা, প্রাণনাশের আশঙ্কা নিয়ে কী পরীক্ষাই না দিতে হয়েছে। সাফা-মারওয়ার ‘সায়ি’ প্রত্যেক হাজী ও ওমরাহকারীকে আজও সূরা বাকারাহর ১৫১-১৫৭ আয়াতে বর্ণিত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে ও অপশক্তির মোকাবিলায় অগ্নিপরীক্ষায় টিকে থাকতে নির্দেশ দেয় এবং সাফল্যের সুসংবাদপ্রাপ্তিতে উৎসাহিত করে।

Bootstrap Image Preview