Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২২ মঙ্গলবার, অক্টোবার ২০১৯ | ৭ কার্তিক ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

রাজধানীতে মিলছে না তরল দুধ

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩১ জুলাই ২০১৯, ০৯:৪৫ AM
আপডেট: ৩১ জুলাই ২০১৯, ০৯:৪৫ AM

bdmorning Image Preview


রাধানীতে মিলছে না তরল দুধ। ফলে ঢাকার ক্রেতাদের মধ্যেই হাহাকার দেখা দিয়েছে। এ সুযোগে অবৈধ ব্যবসায়ীরা অতিরুক্ত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের কারুপল্লীর মিল্ক ভিটার বিক্রয় কেন্দ্রে তরল দুধ নিতে এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন ক্রেতারা। তাদের অনেকেই নিয়মিত দুধ নেন আবার কেউ কেউ গলির দোকানে দুধ না পেয়ে ছুটে এসেছেন এ বিক্রয় কেন্দ্রে। সেখানেও দুধ না পেয়ে নিয়মিত পাস্তুরিত দুধে পরিবারের চাহিদা মেটানো অনেক ক্রেতার মধ্যেই হাহাকার।

তরল দুধ না পেয়ে কেউ কেউ গুঁড়া দুধ নিয়ে যাচ্ছেন। শুধু মিল্ক ভিটার এ বিক্রয় কেন্দ্রেই নয়, রাজধানীর অধিকাংশ দোকানেই সোমবার দুধ কিনতে গিয়ে পাননি ক্রেতারা। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পাস্তুরিত দুধ উৎপাদনকারীরা সোমবার বিকাল পর্যন্ত কোনো দুধ সরবরাহ ও ক্রয় করেনি। এতে হাজার হাজার দুধ উৎপাদনকারী খামারি লাখ লাখ লিটার দুধ বিক্রি না করতে পেরে চরম বিপাকে পড়েছেন। পাবনা ও সিরাজগঞ্জে ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজিতে দুধ বিক্রি হয়েছে। পাবনায় দুগ্ধ খামারিরা সড়কে দুধ ঢেলে প্রতিবাদ ও মানববন্ধন করেছেন।

এদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাংলাদেশ মিল্ক প্রডিউসারস কো-অপারেটিভ ইউনিয়ন লিমিটেডের (মিল্ক ভিটা) পাস্তুরিত দুধ উৎপাদন ও বিক্রির ওপর হাইকোর্টের জারি করা নিষেধাজ্ঞা আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত করে দিয়েছেন সুপ্রিমকোর্টের চেম্বার আদালত। মিল্ক ভিটার এক আবেদনের শুনানি করে চেম্বার বিচারপতি মো. নুরুজ্জামান সোমবার এ আদেশ দেন। এতে বাজারে মিল্ক ভিটার দুধ বিক্রিতে কোনো বাধা থাকছে না।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ বিক্রয় কেন্দ্রে তরল দুধ নেই। পশ্চিম তেজতুরি বাজারের সজীব ট্রেডার্সের বিক্রয় কর্মী আবদুস সালাম জানান, সকালেই দুধ শেষ হয়ে গেছে। সোমবার আর দুধের সরবরাহকারীদের গাড়ি আসেনি। পান্থপথের রাবেয়া স্টোরের বিক্রয় কর্মী জানান, তাদের কাছে অল্প কয়েক প্যাকেট দুধ আছে। দুপুরের আগেই শেষ হয়ে যাবে। নতুন করে দুধের সরবরাহকারীরা আসেনি। ক্রেতারা দুধ নিতে এসে ফিরে যাচ্ছেন।

মোহাম্মদপুরের খান কনফেকশনারির মালিক শফিকুল ইসলাম বলেন, আমার দোকানে আগে প্যাকেটজাত দুধ বিক্রি করতাম কিন্তু কয়েক দিন ধরে গাড়ি আসছে না। পাস্তুরিত দুধ রোববারই শেষ হয়ে গেছে। ধানমন্ডির ঝিগাতলার মতলব কনফেকশনারিতে মিল্ক ভিটা, আড়ং ও প্রাণের প্যাকেটজাত তরল দুধ বিক্রি করতে দেখা যায়। দোকানের বিক্রেতা হামিদ বলেন, কয়েক দিন ধরে দুধের গাড়ি কম আসছে, তাই একসঙ্গে বেশি পরিমাণে কিনে রেখেছিলাম। প্যাকেটজাত অনেক কোম্পানির দুধ বিক্রি নিষেধ। তার পরও কেন বিক্রি করছেন- এমন প্রশ্নে বিক্রেতা বলেন, বিষয়টি শুনেছি কিন্তু কী করব চাহিদা আছে। তাছাড়া এলাকার প্রায় সব দোকানে বিক্রি হচ্ছে।

ঢাকার বাইরে খোলা বাজারে দুধের দাম কমে গেলেও রাজধানীতে দাম বেড়েছে। সোমবার দুধের চাহিদা বেশি হওয়ায় রাজধানীর বেড়িবাঁধ এলাকার খামারিরা খোলা দুধ লিটারে ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় পাইকারি দরে বিক্রি করেন। অন্য সময় এসব খোলা দুধ ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হয়। রায়েরবাজার ও গাবতলী হাটে দেখা যায়, খুচরা বিক্রেতারা খোলা দুধ ৮০ থেকে ৮৫ টাকা দরে বিক্রি করেন।

তবে পাস্তুরিত তরল দুধের সরবরাহ না থাকায় চাহিদা বাড়ছে গুঁড়া দুধের। ব্যবসায়ীরা গুঁড়া দুধের মজুদ বাড়াচ্ছেন। কারওয়ান বাজারের একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাস্তুরিত দুধ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গুঁড়া দুধের চাহিদা বাড়বে। তাই তারা গুঁড়া দুধের মজুদ বাড়াচ্ছেন। ঢাকা ট্রেডার্সের কর্মীরা জানান, গুঁড়া দুধের চাহিদা কিছুটা বেড়েছে। নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকলে চাহিদা দিন দিন বাড়বে। সেই ব্যাপারে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

পরিবার ও নিজের সন্তানের দুধের চাহিদা মেটাতে পাস্তুরিত দুধের ওপরই ভরসা ছিল মিরপুরে বসবাসকারী সুরাইয়া ইসলামের। কিন্তু এখন তিনি দুধ নিয়ে ভিশন আতঙ্কগ্রস্ত জানিয়ে বলেন, কয়েক দিন পরপর বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন রকম প্রতিবেদন দেয়। আদালত রোববার নিষেধ করে আবার সোমবার বিক্রির জন্য আদেশ দিলেন। তাহলে কোন দুধ খাব, আর কোনটা খাব না। দুধ খাওয়া নিয়ে এখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি।

পাস্তুরিত দুধ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৪টি কোম্পানি এখন তরল দুধ সংগ্রহ করে। তাদের দৈনিক দুধ সংগ্রহের পরিমাণ প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ লিটার। মাঝেমধ্যে দুধ উৎপাদন আরও বাড়ে। এর মধ্যে দুধ সংগ্রহে শীর্ষ তিন প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি (মিল্ক ভিটা), প্রাণ ডেইরি ও আড়ং ব্র্যান্ডের তরল দুধ বাজারজাতকারী ব্র্যাক ডেইরি অ্যান্ড ফুড এন্টারপ্রাইজ। এ তিন প্রতিষ্ঠান মিলে সাধারণ সময়ে দিনে ৫ লাখ লিটারের মতো দুধ সংগ্রহ করে।

পাস্তুরিত তরল দুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলেন, প্রধানত পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চল থেকে বেশি দুধ সংগ্রহ করা হয়। প্রতি লিটার দুধের দাম হিসেবে তারা চাষিদের দেয় ৩৬ থেকে ৪৫ টাকা। দাম নির্ভর করে দুধের ননির মাত্রার ওপর। ওই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি অনেকটা দুধের ওপর নির্ভরশীল। গড়ে ৪০ টাকা ধরে ৮ লাখ লিটার দুধের দাম ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। এখন বাধ্য হয়েই আমাদের দুধ সংগ্রহ বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। পাস্তুরিত দুধ উৎপাদন বন্ধ থাকলে কোম্পানিগুলোর ক্ষতি হবে। তবে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন খামারিরা।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, তরল দুধ বন্ধ হয়ে গেলে গুঁড়া দুধের চাহিদা বাড়বে। দেশে উৎপাদিু গুঁড়া দুধের জোগান তো একই উৎস থেকে আসছে। তরল দুধে সিসা এবং অ্যান্টিবায়োটিক থাকলে গুঁড়া দুধেও একই ক্ষতিকারক উপাদান থাকবে। তাই আমাদের সিসা বা অ্যান্টিবায়োটিকের উৎস আগে খুঁজে বের করা উচিত। এর উৎস হতে পারে গরুর খাবার, ওষুধ, মাটি ও পানি। তাই উৎস কোথায় সেটা বের করে সমাধানের সময় দেওয়া উচিত। এটা জাতীয় সমস্যা।

সমাধানেও তাই জাতীয় উদ্যোগ দরকার। আর এ সমস্যা আমরা সমাধান না করতে পারলে দেশীয় খামার ধ্বংস হয়ে যাবে। অন্যদিকে, বিদেশি গুঁড়া দুধের চাহিদা বাড়বে। দুধের জন্য আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে কোটি কোটি টাকা।

Bootstrap Image Preview