Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৫ রবিবার, ডিসেম্বার ২০১৯ | ১ পৌষ ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

পীরের নামে জমি লিখে দিলেই মিলবে বেহেস্তের টিকিট!

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০১৯, ০৬:০২ PM
আপডেট: ২০ জুলাই ২০১৯, ০৬:০২ PM

bdmorning Image Preview
সংগৃহীত


বেহেস্তের টিকিট দেয়ার কথা বলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জমি নেয়ার অভিযোগ উঠেছে মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠনের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি একটি বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশনের অনুষ্ঠান তালাশের একটি পর্বে এ অভিযোগের কথা উঠে আসে।

সংগঠনটির সভাপতির নাম মনির উল্লাহ। সে নিজেকে পীর বলেও দাবি করেন। চট্টগ্রামের রাউজানের কাগতিয়া ইউনিয়নে কাগতিয়া মুনিরীয়া দরবার শরীফও আছে।

স্থানীয় গৃহবধূ জাহানারা বেগম বলেন, আমাদের বসতভিটার জায়গা আমার শাশুড়ির কাছ থেকে ফুসলিয়ে নিয়ে গেছে। তারা বলেছিল, বেহেস্তের টিকিট দেবে। কিন্তু বেহেস্তের টিকিট তো পাইনি।

শুধু জাহানারার শাশুড়ি নন, বেহেস্তের টিকিটের আশায় সংগঠনটিকে আরও অনেকেই এভাবে জমি দান করেছেন। এ বিষয়ে স্থানীয় একজন যুবক বলেন, ওরা বলেছিল বেহেস্তের টিকিট দিবে। তাই আমার আম্মু বেহেস্তের টিকিট পাওয়ার আশায় জমি দান করেন।

এদিকে, মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটিকে একটি উগ্র ও জঙ্গিবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে এলাকাবাসী। অভিযোগ রয়েছে, ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গা থেকে কেউ জমি দিতে রাজি না হলে জবর দখল করে সংগঠনটি।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস ছালাম বলেন, দক্ষিণ পাশের একটি জায়গা আমার বাবার সম্পত্তি। মনির উল্লাহ জোরপূর্বক ওখানে ভরাট করছে। এগুলো কি পীরের কাজ? আমি বাধা দিলে বলে, সব লোকেই বেহেস্তের জন্য জায়গা দেয়।

মালিকানার প্রমাণ হিসেবে জমির দলিলও দেখান আব্দুস ছালাম। যেখানে দেখা যায়, ৪৩৪ নম্বর খতিয়ানের ১৩৬০ নং দাগের জমির মালিকের জায়গা আব্দুস ছালামের নাম রয়েছে।

স্থানীয় আরও কয়েকজন বাসিন্দা ছাড়াও কয়েকজন প্রবাসী বলেন, তরিকতের নাম দিয়ে তারা চাঁদাবাজি করে।

দুবাই প্রবাসী আলমগীর হোসেন বলেন, রাউজানের যত প্রবাসী আছে ধর্মের কথা বলে সবার কাছ থেকে টাকা নিত তারা। যখন শুনি তারা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করছে, তখন টাকা দেয়া বন্ধ করে দিয়েছি।

এদিকে, মনির উল্লাহ ও তার ভগ্নিপতি কায়েস চৌধুরীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ টাকা লেনদেনের তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মনির উল্লাহর সোনালী ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট এবং কায়েস চৌধুরীর ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে প্রায় প্রতিদিনই লাখ-লাখ টাকা এসে জমা হচ্ছে। এই টাকাগুলো যোগ করলে কোটি-কোটি টাকার হিসাব দাঁড়াবে।

মনির উল্লাহর সাথে থাকা একজন বলেন, ওর যতোটুকু বয়স তার চেয়ে টাকা-পয়সা বেশি হয়ে গেছে। ১৪ হাজার কোটি টাকা আছে তার।

অভিযোগ রয়েছে, মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটির এসব কার্যকলাপের বিরোধিতা করলে অনেককেই আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আহত হওয়া একজন বলেন, যতরকম মিথ্যা স্বপ্ন, ধোঁকাবাজি, ভন্ডামি আছে, তারা সবকিছুই করেছে। এগুলোর বিরুদ্ধে বলার কারণে আমার পায়ের রগ কেটে দিয়েছে।

এদিকে, কমিটির রোষানলে পড়ে পার্শ্ববর্তী হলদিয়া ইউনিয়নের এক কিশোরের নিহত হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।

এছাড়া সম্প্রতি শফিকুল আনোয়ার নামের স্থানীয় একজন মুক্তিযোদ্ধার গায়ে হাত তোলার দায়ে এলাকাছাড়া হয়েছেন কমিটির অনেক সদস্য।

এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল আনোয়ার বলেন, আমাকে গলা টিপে ধরেছিল। আর কিছুক্ষণ হলে আমি হয়তো মারা যেতাম। তারা সব সময় সন্ত্রাসী কার্যক্রম করে।

এসব কর্মকাণ্ডের কারণে কিছু মানুষ ইতোমধ্যে সংগঠন থেকে বেরিয়ে গেছে। এরকমই একজন ব্যক্তি বলেন, এটাকে তারা টাকা কামানোর একটা ইজারা হিসেবে নিয়েছে। তাই তাদের সাথে আমি সকল কার্যক্রম ছিন্ন করেছি।

জানা যায়, ১৯৩২ সালে চট্টগ্রামের রাউজানে কাগতিয়া ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৪৯ সালে মাওলানা তোফাজ্জল হোসেন ওই মাদ্রাসায় যোগদান করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি নামের এ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

তখন এ সংগঠনের মাধ্যমে মানুষকে ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া হতো। সংগঠনের কোথাও কোন শাখাও ছিল না। ১৯৯৭ সালে মাওলানা তোফাজ্জল হোসেন শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তার ছোট ছেলে মনির উল্লাহ সংগঠনের নেতৃত্বে আসেন।

মনির উল্লাহর দুই ভাই রয়েছে। বড় ভাইয়ের নাম মোহাম্মদ উল্লাহ আর মেজো ভাইয়ের নাম হাবিব উল্লাহ। বর্তমানে তারা এলাকায় থাকেন না।

মনির উল্লাহর দুই ভাই বলেন, কেরামত জাহির করতে আমার বাবাকে কোনদিন দেখিনি। এখানে কতগুলো লোক আছে। তারা বলে, দরবারে টাকা দিলে আপনি বেহেস্ত পেয়ে যাবেন। এটা কোন তরিকত না, এটা ভন্ডামি।

সংগঠনটির বিরুদ্ধে মানুষকে অত্যাচার করার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অত্যাচার করেছে, এটা অবান্তর কথা নয়। একটা আলেমকে এভাবে মারাটা কি তরিকত?

সংগঠনটির কমিটির বিশ্লেষক আব্দুল হক বলেন, আমাদের হুজুর কেবলা রাসূলের বংশধর। হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু ছাল্লামের সাথে উনার দৈনিক কমপক্ষে একবার দেখা হতো।

এ বিষয়ে মনির উল্লাহর দুই ভাই বলেন, আমরা সৈয়দ বংশের, এটা ঠিক আছে। তবে আমার বাবা আওলাদে রাসুল ব্যবহার করেননি।

মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটির মহাসচিব ফোরকান মিয়া বলেন, কোরআন হাদিসকে আরও মজবুত করার জন্য এ তরিকত অপরিহার্য।

সংগঠনটির বিরুদ্ধে এতসব অভিযোগের বিষয়ে রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কেফায়াতুল্লাহ বলেন, নবী-রাসুলকে যেভাবে তারা ব্যবহার করেছে…কেউ যদি তাদের মতামতের বিরুদ্ধে কিছু বলে তখন তারা ওখানে হামলা করে। আগে থেকে এটা হয়ে আসছে। কেউ কোনো প্রতিবাদ করেনি।

তিনি আরও বলেন, আমাদের সকলের মনের ভেতরে অ্যাক্টিভিটি রাখা হয়েছে যে, পীরের বিরুদ্ধে কিছু বলা যায় না।

রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জুনায়েদ কবীর বলেন, মানুষের মধ্যে তারা হয়তো কোন কারণে ভীতি সঞ্চার করে রেখেছিল। তাই মানুষ মামলা করতে পারেনি। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়নি। তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রম ঘটিয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে এলাকায় অস্বস্তি বিরাজ করছে। যেহেতু এটি নজরে এসেছে, তাই প্রশাসন কিন্তু বিষয়টি এখন হালকাভাবে দেখছে না।

Bootstrap Image Preview