Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৯ বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বার ২০১৯ | ৪ আশ্বিন ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

সংসদ বিতর্কের জায়গা গানের মঞ্চ নয়

পীর হাবিবুর রহমান
প্রকাশিত: ২৬ জুন ২০১৯, ০৫:৫২ PM
আপডেট: ২৬ জুন ২০১৯, ০৫:৫২ PM

bdmorning Image Preview
সংগৃহীত


জাতীয় সংসদ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলাপ-আলোচনা, বিতর্কের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণের তীর্থস্থান। সার্বভৌম সংসদে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জাতীয় ইস্যুতে তুমুল বিতর্কের মধ্য দিয়ে সমাধান দিয়ে থাকেন। সরকার যেমন তার রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি ও কর্মসূচি তুলে ধরে, তেমনি বিরোধী দল ভ্রান্তনীতির বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর সমালোচনার তীর ছুড়ে জবাবদিহি আদায় করে। বাজেট প্রণয়ন থেকে রাষ্ট্রীয় সব সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা হলো সংসদ। অর্থাৎ জাতির ভাগ্য নির্ধারণের সর্বোত্তম জায়গা হচ্ছে জাতীয় সংসদ। সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় সংসদই হলো সেই তীর্থস্থান যার দিকে জনগণ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকবে। সংসদীয় গণতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা বাইসাইকেলের মতো দুই চাকা-নির্ভর। একটি হলো সরকারি দল, আরেকটি বিরোধী দল। নব্বই-উত্তর গণতন্ত্রের নবযাত্রায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদ প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে শক্তিশালী সরকারের পাশাপাশি শক্তিশালী বিরোধী দলের অস্তিত্বই শুধু দৃশ্যমান ছিল না; তুমুল বিতর্ক, আলোচনা, ওয়াকআউটে প্রাণবন্ত করে, জনগণের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট বিশাল বিজয় অর্জন করে ক্ষমতায় আসে। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ২৯টি আসন নিয়ে বিরোধী দলের আসনে বসে। সে সংসদও ছিল শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত এবং বিতর্কের ঝড় ছিল নিয়মিত। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি জোট অংশগ্রহণ না করায় সাংবিধানিকভাবে ওয়াকওভার নিয়ে সংসদে নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রধান শরিক জাতীয় পার্টি সরকারি ও বিরোধী দলে অবস্থান নেওয়ায় সংসদ আর প্রাণবন্ত হয়নি। শক্তিশালী সরকারি দলের পাশাপাশি সরকারের অনুগত দুর্বল বিরোধী দলের কারণে সংসদ প্রাণহীন হয়ে পড়ে। নির্বাচনে বিভ্রান্ত নীতি অনুসরণ করে সংসদে এলেও সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদ বিরোধী দলের নেতা হতে পারেননি।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট ঐতিহাসিক বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় আসে ও সংসদে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দলের আসনে বসিয়ে দেওয়া হয়। নির্বাচনে মামলায় দন্ডিত কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া অংশগ্রহণ করতে পারেননি। বিএনপির শক্তিনির্ভর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট হাতে গোনা কয়েকটি আসনে জয়লাভ করে। তারা এ নির্বাচনের আগের রাতে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে ও নতুন নির্বাচনের দাবি তোলে। নানা নাটকীয়তার পর একে একে প্রথমে গণফোরামের কোটায় নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ শপথ গ্রহণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত বিএনপির নির্বাচিতরাও সংসদে শপথ নিয়ে আসেন।

বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের প্রতিনিধিদের সংসদে যোগদান শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি এবং নির্বাচনের প্রতি তাদের বৈধতাদানের স্বীকৃতি মুজিবকন্যার জন্য একটি বড় অর্জন। ২০১৪ সাল থেকে ভুলের রাজনীতিতে পথহাঁটা বিএনপি এখানে বড় ভুলটি করেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে সংসদেই যখন বিএনপি গেল, তাহলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সংসদে না পাঠিয়ে কেনই বা তার শূন্য আসনে উপনির্বাচনে জি এম সিরাজকে বিজয়ী করে এনেছে? সংরক্ষিত (মহিলা) আসনে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে সংসদে এনে যে সঠিক সিদ্ধান্তের পরিচয় দিয়েছে, তেমনি মির্জা ফখরুলকে সংসদে না পাঠিয়ে তাদের দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।

সংসদে বিরোধী দলের নেতা এইচ এম এরশাদ অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী। বিরোধী দলের উপনেতা রওশন এরশাদ ও জাতীয় পার্টি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক শক্তি ও ইমেজের ওপর ভর করে সংসদে এসে বিরোধী দলের আসন গ্রহণ করায়, জনগণের আকর্ষণ ও আগ্রহের জায়গায় নেই। সেখানে ঐক্যফ্রন্টের হাতে গোনা সাতজন সদস্য কথা বললে সংসদ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বিতর্কের ঢেউ খেলে যায়। ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার বক্তব্য সরকারি দলের এমপিদের প্রতিবাদের মুখে যেখানে ঝড় তুলছে, সেখানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখন দাঁড়িয়ে কথা বলতেন, তখন সরকারি দল যেমন তার বক্তব্য গুরুত্বসহকারে মনোযোগ দিয়ে শুনত, তেমনি গণমাধ্যমও লুফে নিত, জনগণের মধ্যেও তার প্রভাব পড়ত। আর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদে আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে কার্যত অঘোষিত বিরোধী দলের নেতায় পরিণত হতেন।

নব্বই-উত্তর গণতন্ত্রের যাত্রাপথে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় দেশকে উত্তরণে পঞ্চম সংসদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঐকমত্যের ভিত্তিতে যাত্রা করেছিল। আর রাজনীতিতে শেখ হাসিনার বিকল্প যেমন খালেদা জিয়া, তেমনি খালেদা জিয়ার বিকল্প শেখ হাসিনাই মানুষের সামনে নেতৃত্বের জায়গায় আবির্ভূত হয়েছিলেন। বিগত দুটি নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার বিকল্প আর খালেদা জিয়া নেই। রাজনীতির ময়দান থেকে অন্য কেউ উঠে আসবেন সেই সম্ভাবনা বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। তাই এখন পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, শেখ হাসিনাই শেখ হাসিনার বিকল্প হয়ে আছেন। নব্বই-উত্তর গণতন্ত্রের জমানায় সংসদীয় রাজনীতিতে পাঁচ বছর পরপর ব্যালটের রায়ে ক্ষমতার পরিবর্তনের যে পালাবদল চলছিল, রাজনীতিতে যে আস্থা-বিশ্বাস ও সমঝোতার সংস্কৃতি বহমান ছিল, বিএনপি-জামায়াত শাসনামলের অপশাসন, একের পর এক রাজনৈতিক হত্যাকান্ড, এরশাদের পর আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-নির্যাতন, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের উত্থান, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাদান, একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলায় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের উড়িয়ে দেওয়ার বর্বরোচিত প্রচেষ্টা এবং সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বিতর্কিত করে দলীয় রাষ্ট্রপতির অধীনে সরকার প্রতিষ্ঠা করে একতরফা নির্বাচনে ক্ষমতায় টিকে থাকার ভ্রান্তনীতি সেই আস্থা-বিশ্বাস ও সমঝোতার সংস্কৃতির কবর দিয়ে দেয়।

২০০৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে মহাজোট সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা চিরতরে মুছে দেয়। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করে বাংলাদেশ। অন্যদিকে নির্বাচন বর্জন, প্রতিরোধ ও সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা, সহিংস হরতাল, অবরোধের রাজনীতি, মামলার জালে আটকে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল বিএনপিকে যেমন পঙ্গু করে দেয় তেমনি গণরায় নিয়ে ক্ষমতায় এসে জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের যুদ্ধাপরাধের মামলায় ফাঁসিতেই ঝুলিয়ে দেয়নি, তাদের সহিংস আন্দোলনের সুবাদে কঠোর দমননীতিতে দমিয়েই দেয়নি, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবন্ধন বাতিল হয়ে যায়। গণতন্ত্রের নবযাত্রায় ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ও বিরোধী দল সংসদে শক্তিশালী অবস্থান নিলেও একদিকে সংসদ বর্জন, অন্যদিকে রাজপথের হরতাল, অবরোধ কর্মসূচি দেশের ব্যবসায়ী সমাজকে ক্ষুব্ধই করেনি, অর্থনীতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গত পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে দেশের রাজনীতি কার্যত হরতাল-অবরোধসহ সংঘাতের রাজনীতি থেকে মুক্ত হলেও রাতারাতি সব শ্রেণি-পেশার মানুষ শাসক দলের হয়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে এখন সুবিধাবাদীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো রাজনৈতিক শক্তি এখন দৃশ্যমান নয়।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ উন্নয়নের মহাসড়কেই ওঠেনি, পদ্মা সেতুসহ একের পর এক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নই হচ্ছে না; দেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকাভুক্ত হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুনিয়ার সামনে বিস্ময়কর জায়গায় চলে গেছে। কিন্তু দেশের সামাজিক সংকট, অস্থিরতা, অপরাধ যেমন একের পর এক দেখা যাচ্ছে, তেমনি সুশাসনের ঘাটতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ খেলাপি হয়েছে। ব্যাংকিং খাত আশঙ্কামুক্ত এখনো হয়নি, ফিরে আসেনি শৃঙ্খলা। শেয়ারবাজার লাখো লাখো মানুষকে রিক্ত-নিঃস্ব করে মুনাফালোভী সিন্ডিকেটকে লাভবান করে সেই যে কবরে শায়িত হয়েছিল, সেখান থেকে এখনো উঠে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ঘুরে দাঁড়াতে পারবে এমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করায় শেখ হাসিনার সরকারের দুর্নীতি দমন সংস্থা দৌড়ঝাঁপ করলেও এখন পর্যন্ত বড় বড় দুর্নীতিবাজদের, ব্যাংক লুটেরাদের, অর্থ পাচারকারীদের, শেয়ার বাজিকরদের আইনের আওতায় আনতে পারেনি। দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চললেও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন হামেশাই উঠছে। অনেক উন্নয়নকাজে একদিকে গতি নেই, আরেকদিকে কাজের মান নিম্ন, প্রকৌশলী ঠিকাদাররা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় জনগণের সম্পদ লুট করে নিচ্ছেন। ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে বিদেশে। দেশের অর্থনীতিতে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। অর্থ পাচারকারীদের আইনের আওতায় আনা দূরে থাক, পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনা দূরে থাক, দেশের অর্থ পাচারের পথ এখনো বন্ধ করা যাচ্ছে না। ওয়ান ইলেভেনে জোর করে নেওয়া ব্যবসায়ীদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়াও হয় না। ইয়াবা, মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যুদ্ধে জনগণ সমর্থন দিলেও দেশকে ইয়াবার আগ্রাসন থেকে মুক্ত করা যাচ্ছে না। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষক রাজনীতি ও দলীয়করণের আগ্রাসনের শিকারই নয়, নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে আজ অভিযুক্ত। গবেষণাসহ শিক্ষার মান এমনকি শিক্ষকদের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হচ্ছে। প্রোডাকশন মান মেধার দিক থেকে, দক্ষতার দিক থেকে উন্নত হচ্ছে না। প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, স্বাস্থ্যসহ সব খাতই সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। আবজাল নামের কর্মচারী ধরা খায় এত সম্পদ নিয়ে। তাহলে রাঘবরা কোথায়? পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুষ না দিতে মাইকিং করা হচ্ছে।

সংসদীয় রাজনীতির প্রতি শেখ হাসিনার আন্তরিকতা সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। রাষ্ট্র পরিচালনায় ১৮ ঘণ্টা কাজ করা শেখ হাসিনা সব সময় সংসদে সময় দেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব, মন্ত্রীর বদলে সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে এমনকি বিরোধী দল থেকেও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত করার বিধান চালু করেছিলেন। আমাদের সংসদের অতীত বর্ণাঢ্য। এ দেশের অনেক বরেণ্য পার্লামেন্টারিয়ান নানা দল থেকে নানা সময়ে নির্বাচিত হয়ে সংসদ অলঙ্কৃত করেছেন। অনেক জনপ্রিয় স্পিকার সংসদ পরিচালনা করেছেন। আমাদের পেশাগত রিপোর্টিং জীবনে সেন্স অব হিউমার নিয়ে দক্ষতার সঙ্গে সংসদ পরিচালনায় স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরীকে দেখেছি। পঞ্চম সংসদে স্পিকার আবদুর রহমান বিশ্বাস তৎকালীন গণতর্ন্ত্রী পার্টি ও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে সংসদ অধিবেশন কক্ষ থেকে বের করে দিতে সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস তলব করলে তৎক্ষণাৎ সংসদে প্রবেশ করে বিরোধীদলীয় নেতা ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কীভাবে সামাল দিয়েছেন, সেই সংসদীয় রাজনীতির দৃশ্যপট অবলোকন করেছি। একজন সংসদ সদস্য কথা বলার জন্য টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে যাওয়ার রেওয়াজও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রয়েছে। পঞ্চম সংসদে স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে সংসদ পরিচালনা করেছিলেন বলেই সেদিন তোফায়েল আহমেদের মতো পার্লামেন্টারিয়ান বিএনপির মন্ত্রী জেনারেল মাজেদুলে হকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে সংসদে তুলকালাম বাধিয়েছিলেন। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিরোধী দল পদত্যাগ করতে গেলে সমঝোতার শেষ চেষ্টাই করেননি, পদত্যাগপত্র ঝুলিয়েও রেখেছেন অনেকদিন। স্পিকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীকে বিএনপির অনেক উগ্র সংসদ সদস্য বাপ তুলে গালিও দিয়েছিলেন। তিনি ভদ্রতা, উদারতা ও নমনীয়তার উদাহরণ রেখে তাদের কথা বলতে যেমন দিয়েছেন, বিদেশ সফরেও তালিকাভুক্ত করেছেন। আড়ালে তাদের অনেককে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর পায়ে ধরে সালাম করতেও দেখেছি। বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনা তথ্য-উপাত্তসহ বিএনপি সরকারকে তির্যক বাক্যবাণে ধুয়েমুছে দিতেন।

যুদ্ধাপরাধের মামলায় ফাঁসিতে দন্ডিত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলীকে পাইকগাছার উকিলও বলেছিলেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সেন্স অব হিউমারে সংসদ মাতিয়েই রাখতেন না, সবাইকে আলোচনার সুযোগ দিয়ে সংসদ প্রাণবন্ত করে রাখতেন। উচ্চশিক্ষিত বিদুষী নারী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে স্পিকার নির্বাচিত করে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা যে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন, সংসদ পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি তার প্রমাণ রেখেছেন। সংসদে সবাইকে কথা বলার সুযোগ দিতে একজন হৃদয়বান উদার স্পিকার হিসেবে ইতিহাসে তার নাম লিখিয়েছেন। ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া এরশাদের জাতীয় পার্টির মন্ত্রী থেকে এমপি হয়ে সংসদে এসেছিলেন। এরশাদের জাতীয় পার্টির ভাঙনে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর পাল্লায় উঠেছিলেন। শেষ পর্যন্ত নৌকায় চড়ে এ সংসদে এলে শেখ হাসিনা তাকে ডেপুটি স্পিকার করেছেন। পঞ্চম সংসদে বিএনপির তথ্যমন্ত্রী নাজমুল হুদাকে বিরোধীদলীয় উপনেতা আবদুস সামাদ আজাদ ‘বেহুদা’ বলেছিলেন। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়াকে ‘বে-মজা’ বলতে কার্পণ্য করতেন না। এমনিতেই সংসদে বিরোধী দল নেই বললে চলে। শেখ হাসিনা যেখানে চান বিরোধী দলে যে কয়জনই থাক তারা কথা বলুক, সরকারের সমালোচনা করুক। কিন্তু সংসদ সদস্যদের কথা বলতে দিতে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী যতটা উদার ডেপুটি স্পিকার ততটাই রক্ষণশীল। খুব দ্রুত মাইক বন্ধ করার মধ্যে তিনি আনন্দ পান। সংসদ টিভির সুবাদে তেমনটি দেখতে পাই। সব স্পিকারই সংসদে কেউ অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করলে তা এক্সপাঞ্জ করেন। ডেপুটি স্পিকারও সেই এখতিয়ার রাখেন। কিন্তু ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলতে শুরু করলেই তিনি যেভাবে বাধাগ্রস্ত করেছেন, সেটি দৃষ্টিকটুই নয়, তর্ক জুড়ে দিয়ে পক্ষপাতদুষ্টতার চেহারাই উন্মোচিত করেছেন। সংসদে যখন অনেকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর বা বাজেট বক্তৃতার রেওয়াজ লঙ্ঘন করে চোখ বন্ধ করে লিখিত ভাষণ পাঠ করেন স্পিকারের দিকে তাকানও না, সেটি তিনি ‘আনন্দে কবুল করেন’। নোট রেখে কথা বলা যায়। ভাষণ পাঠ সংসদে অশালীন। অনেক সংসদ সদস্য কার্যপ্রণালি বিধি অনুসরণ করে ফ্লোর নেন না, অনেক সংসদ সদস্য জানেন না, সংসদ হচ্ছে জাতির ভাগ্য নির্ধারণের সেই পবিত্র স্থান, যেখানে জাতীয় নীতি নির্ধারণী বিষয় নিয়ে আলোচনা, বিতর্কের তুফান তোলা যায়। মানুষের সমস্যা নিয়ে কথা বলা যায়। সংঘটিত যে কোনো অন্যায়, অপরাধ নিয়ে কথা বলা যায়। ৩০০ বিধিতে মন্ত্রীদের কৈফিয়ত তলব করা যায়। কিন্তু বাউলগান গাওয়া যায় না। সংসদ সদস্য মমতাজ যখন প্রথম সংসদে গান গাইলেন তখন, ‘মাননীয় স্পিকার পয়েন্ট অব অর্ডার’ শিরোনামে অনুরোধ করেছিলাম, সংসদ সদস্যদের কর্মশালার ব্যবস্থা করতে। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সঙ্গে এসব বিষয়ে আমার আলোচনাও হয়েছে। তার মেধা, যোগ্যতা ও ব্যক্তিত্ব আমার শ্রদ্ধা কুড়িয়েছে। কিন্তু সোমবার বাজেট আলোচনায় সরকারি দলের সংরক্ষিত (মহিলা) আসনের সদস্য জাকিয়া তাবাসসুম আবার নিজের লেখা গান গাইলেন- এটা সংসদীয় রাজনীতির সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। এ নিয়ে স্পিকার কথা বলেন না। প্রবীণ সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে বলেন না, এখানে গান গাওয়া যায় না। তিনি যখন গান গাইছিলেন, তখন সিলেটের মানুষ যোগাযোগ দুর্ভোগে পতিত। ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতদের বাড়িতে মাতম। হাসপাতালে আহতদের আর্তনাদ। আমরা রিপোর্টার হিসেবে সংসদ কাভার করেছি, তখন সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। সংবিধান থাকত হাতের নাগালে। অনেক অনুচ্ছেদ ছিল মুখস্থ। পার্লামেন্টারিয়ানদের এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছি অনেক বিতর্ক ও ইস্যু নিয়ে রিপোর্ট করতে গিয়ে। আর দয়া করে সংসদ নেতা যেখানে চান, বিরোধী দলের সদস্যরা হাতে গোনা কম হলেও যদি তারা ন্যায্য কথাও বলে তিনি তা গ্রহণ করবেন। সেখানে তাদের কথা বলতে দিন। ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়ার কাছ থেকে আমরা সেন্স অব হিউমার আশা করছি না; সংসদে তিনি তার পূর্বসূরি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদের মতো প্রাঞ্জল পরিবেশ দিন সেটিও চাইছি না; তবে চাইছি, মাইক বন্ধ করবেন না। সংসদ সদস্যদের কথা বলতে দিন। মানুষ অন্তত দেখুক এই সংসদে বিরোধী দলকে কথা বলতে দেওয়া হয়। জবাব দেওয়ার জন্য সরকারি দলের নেতাকে কথা বলতে দিন অসুবিধা নেই। কিন্তু কারও মাইক বন্ধ করবেন না। এক মিনিট দুই মিনিট বেশি বললে ক্ষতি হবে না। মাইক বন্ধ করার ক্ষমতা থাকলেই বন্ধ করতে হয় না। বলতে না দিলে কণ্ঠ রোধের অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন। আর সংসদ আলোচনা-বিতর্কের তীর্থভূমি, গানের মঞ্চ বা জলসাঘর নয়। (সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।)

লেখক:পীর হাবিবুর রহমান

নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

Bootstrap Image Preview