Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৭ মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বার ২০১৯ | ২ আশ্বিন ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

গৃহবধুকে গাছে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন, গর্ভের সন্তান নষ্ট

শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১২ জুন ২০১৯, ০৭:১২ PM
আপডেট: ১২ জুন ২০১৯, ০৭:১২ PM

bdmorning Image Preview
সংগৃহীত


শেরপুরের নকলায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ডলি খানম (২২) নামে এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধুকে গাছে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বরোচিত নির্যাতন করে তার গর্ভের সন্তান নষ্ট করার অভিযোগ উঠেছে।

সোমবার (১০ জুন) রাতে প্রায় এক মাস আগে ওই নারীকে নির্যাতন করার একটি ভিডিওচিত্র ফাঁস হলে এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। ডলি খানম নকলা পৌর শহরের কায়দা এলাকার দরিদ্র কৃষক শফিউল্লাহর স্ত্রী ও স্থানীয় চন্দ্রকোনা কলেজের ডিগ্রি শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী।

এ ঘটনায় নির্যাতিতার স্বামী শফিউল্লাহ গত ৩ জুন শেরপুরের আমলী আদালতে তার ভাই আবু সালেহসহ ৫ জনকে স্বনামে ও আরো অজ্ঞাতনামা ৫/৭ জনকে আসামি করে একটি নালিশী মামলা দায়ের করছেন। পরবর্তীতে আদালতের বিচারিক হাকিম শরীফুল ইসলাম খান ভিকটিমের এমসি তলব (ডাক্তারি পরীক্ষার সনদ) সাপেক্ষে ঘটনার বিষয়ে তদন্তপূর্বক ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য জামালপুর পিবিআই’র ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার প্রতি নির্দেশ প্রদান করেন।

অপরদিকে প্রকাশ পাওয়া ভিডিওচিত্রে দেখা যায়,একটি ধানক্ষেতের আইলের পাশে থাকা একটি ইউক্যালিপটাস গাছের সঙ্গে ডলি খানমের হাত পেছনে এবং দুই পা রশিতে বাঁধছেন বোরখা পড়া দুই নারী। একপর্যায়ে বাঁধা পা দুটিকে বোরখার ওড়না দিয়ে পাশের অন্য গাছের সঙ্গে টানা দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। এভাবেই ডলি খানমের ওপর নির্যাতন চলছিলো।

এসময় ভিডিওতে পাঞ্জাবি, টুপি ও চশমা পরিহিত এক ব্যক্তিকে পাশেই দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলতে দেখা যায়। এছাড়াও আরো নারীসহ বেশ কয়েকজনকেও পাশে দেখা যায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নকলা পৌর শহরের কায়দা গ্রামের মৃত হাতেম আলীর ছেলে মো. শফিউল্লাহর সঙ্গে এক খণ্ড জমি নিয়ে তার সহোদর বড় ভাই আবু সালেহ (৫২), নেছার উদ্দিন (৪৮) ও সলিম উল্লাহর (৪৪) বিরোধ ও দেওয়ানী মোকদ্দমা চলে আসছিল।

এর জের ধরে গত ১০ মে সকালে স্থানীয় গোরস্থান সংলগ্ন শফিউল্লাহর স্বত্ব দখলীয় জমির ইরি-বোরো ধান আবু সালেহ ও তার লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে কাটতে গেলে শফিউল্লাহ বাধা দেন। এতে তিনি প্রতিপক্ষের ধাওয়ার মুখে পিছু হটে নকলা থানায় ছুটে যান। ততক্ষণে আবু সালেহর নেতৃত্বে একদল লোক ধান কাটতে শুরু করলে শফিউল্লাহর ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ডলি খানম চিৎকার দিয়ে বাধা দিতে গেলে আবু সালেহর হুকুমে তার ছোট ভাই সলিমউল্লাহ, স্ত্রী লাখী আক্তারসহ অন্যান্যরা তাকে ঘেরাও করে এ নির্যাতনের ঘটনা ঘটায়।

পরবর্তীতে, থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় ডলি খানমকে উদ্ধার এবং ঘটনায় জড়িত আবু সালেহ ও তার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী লাখী আক্তারকে আটক করে থানায় নিয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসার কথা বলে ডলি খানমকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানোর পর প্রভাবশালীদের তদবিরে ছাড়া পেয়ে যান আটক দুইজন।

এবিষয়ে নির্যাতিতার স্বামী শফিউল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, ‘জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে তার বড় ভাই সেনা সদস্য নেছার উদ্দিনের ইন্ধনে তার স্ত্রী লাখী আক্তার এবং অপর দুই ভাই আবু সালেহ ও সলিমউল্লাহসহ তাদের ভাড়াটে লোকজন আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর উপর বর্বরোচিত নির্যাতন চালিয়ে গর্ভের সন্তান নষ্ট করে দিয়েছে। এছাড়াও তার প্রভাবেই থানা পুলিশের এসআই ওমর ফারুক নারী কনস্টেবলসহ সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ডলি খানমকে উদ্ধারের পরও কোনো প্রতিকার পাইনি।’

এসময় তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে আরো বলেন, ‘নির্যাতনের ভিডিওটিও থানাতেই গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। তবে অনেক চেষ্টায় ঘটনার প্রায় এক মাস পরে হলেও সেই ভিডিওর কিছু অংশ এক প্রতিবেশির কাছ থেকে সংগ্রহ করেছি। এমন বর্বর নির্যাতনের পরও তারা আজ বুক ফুলিয়ে ঘুরছে। আর আমি অসহায়। আমি এ ঘটনার উপযুক্ত বিচার চাই।’

প্রসঙ্গত, মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বর নির্যাতনে ডলি খানমের রক্তক্ষরণ শুরু হলে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। কিন্তু ১৬ মে পর্যন্ত ৭ দিন চিকিৎসা দেওয়ার পরও তার অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় শেরপুর জেলা হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। সেখানেও ২২ মে পর্যন্ত ৭ দিন চলে তার চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায়, নির্যাতনের কারণে ডলি খানমের অকাল গর্ভপাত হয়েছে।

এবিষয়ে নকলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী শাহনেওয়াজ বলেন, ‘জমি-জমার বিষয় নিয়ে ভাইদের মধ্যে বিরোধ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামার আশঙ্কার খবর পেয়ে পুলিশ পাঠিয়ে দুই পক্ষকেই শান্ত করা হয়েছিল। গৃহবধুকে নির্যাতনের বিষয়ে কোনো অভিযোগ না পাওয়ায় ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি।’

এঘটনায় জামালপুর পিবিআই’র দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সীমা রাণী সরকার বলেন, ‘মামলাটি এখনো হাতে পাইনি। হাতে পেলেই দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Bootstrap Image Preview