Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২০ রবিবার, অক্টোবার ২০১৯ | ৫ কার্তিক ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

নুসরাতের জন্য আমার ছেলেকে পুরস্কৃত করা উচিত: ওসি মোয়াজ্জেমের মা

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১ জুন ২০১৯, ১০:১২ PM
আপডেট: ১১ জুন ২০১৯, ১০:১২ PM

bdmorning Image Preview
সংগৃহীত


গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে পলাতক সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির জবানবন্দি ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানোর মামলায় আসামি তিনি।

গত ১৭ মে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) দেয়া তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মাদ আস সামছ জগলুল হোসেন মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন। এরপরই গা ঢাকা দেন মোয়াজ্জেম। পৈতৃক বাড়ি যশোরেও নেই ওসি মোয়াজ্জেমের কোনো খবর।

ওসি মোয়াজ্জেমের বাবার নাম খন্দকার আনসার আলী। পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি বড়। তার এক ভাই সৌদি আরবে ও আরেক ভাই আমেরিকা প্রবাসী। তাদের আদি বাড়ি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বৈডাঙ্গা গ্রামে।

বাবার চাকরি সুবাদে তারা দীর্ঘদিন ধরে যশোর শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ১৯৯৭ সালে উপ-পরিদর্শক পদে পুলিশে যোগদান করেন মোয়াজ্জেম হোসেন। ২০১০ সালের দিকে পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পান। প্রায় দেড় বছর সোনাগাজী থানায় ওসির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

যশোর শহরের চাঁচড়া ডালমিল এলাকায় ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বাড়ি। পৈতৃক দোতলা বাড়িতে ছোট দুই ভাই ও একমাত্র বিবাহিত বোন ও মা থাকছেন। মোয়াজ্জেমের স্ত্রী-সন্তানদের কেউ এখানে থাকেন না।

এমন অবস্থায় ওসি মোয়াজ্জেমের মা তার অবস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন। তার ভাইয়েরা আছেন দুশ্চিন্তায়। আবার নানাজনের নানা কথায় তারা বিব্রত। আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর থেকে পরিবারের সঙ্গে নেই ওসি মোয়াজ্জেমের যোগাযোগ।

জানা যায়, নুসরাত যখন চিকিৎসাধীন ছিলেন তখনো আসামিদের গ্রেফতার না করে মামলা দায়ের বিলম্বিত করেছেন ওসি মোয়াজ্জেম। ৮ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ঘটনায় কোনো আসামি ছাড় পাবে না ঘোষণা দিলে ওসি মোয়াজ্জেমের ভিডিও ছড়ানোর বিষয়টি সামনে চলে আসে।

এরপর গত ১৫ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন বাদী হয়ে ওসির বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করেন। ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত।

একপর্যায়ে ফেনীর সোনাগাজী থানা থেকে তাকে প্রত্যাহার করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়। রংপুর রেঞ্জে যোগ দিলেও ঈদের পর থেকে তাকে আর খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ।

গত ২৬ মে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামস জগলুল হোসেন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। ১৭ জুন পরোয়ানা তামিল-সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়।

স্বজনরা জানিয়েছেন, আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর থেকে পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই তার। কোথায় আছেন, কেমন আছেন, সেটিও তাদের জানা নেই।

ওসি মোয়াজ্জেমের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে জীবনে কোনো অন্যায় কাজ করেনি। তাকে ফাঁসানো হয়েছে। আমার ছেলে নিরাপদে ফিরে আসুক, এটাই আমার দাবি। নুসরাত হত্যার বিচার হোক। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। আমার ছেলেকে পুরস্কৃত করা উচিত, আমার ছেলের জন্যই নুসরাতের হত্যাকারীরা ধরা পড়েছে।’

ওসি মোয়াজ্জেমের ভাই আরিফুজ্জামান খন্দকার বলেন, ওয়ারেন্ট জারির (২৬ মে) পর আর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি ভাই। আগে নিয়মিত কথা হতো। এখন কোথায় আছেন, কেমন আছেন জানি না।

তিনি বলেন, নুসরাত হত্যার মূল মামলা বাদ দিয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা সাইবার ক্রাইম মামলা নিয়ে বেশি তোড়জোড় শুরু হয়েছে। নুসরাত হত্যার মূল আসামিদের অনেকে এখনো গ্রেফতার হয়নি।

ভাই আরিফুজ্জামান খন্দকার বলেন, নুসরাতের যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে, সেটি আমার ভাই প্রকাশ করেননি। অন্য একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দিয়েছে। এই অপরাধে সাইবার ক্রাইমের মামলা দেয়া হয়েছে। অথচ ওই ভিডিওটি নুসরাতের দেয়া বড় ডকুমেন্ট। যার ভিত্তিতে ভাই অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে গ্রেফতার করেছিল। যার জন্য ভাইকে পুরস্কৃত করা উচিত ছিল। সেটি না করে উল্টো মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এলাকার মানুষের কাছে খোঁজ নেন, আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। কর্মজীবনে কোনো অপরাধের তথ্য নেই তার। সাধারণ জীবনযাপন করেন। এ ঘটনার পর নানা রকম কথা শুনতে হচ্ছে আমাদের।

তবে ওসি মোয়াজ্জেমের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী উম্মে হানি দাবি করেন, নুসরাতের শ্লীলতাহানির ঘটনায় জড়িতদের আটক করা সহজ ছিল না। ভাই সেটি করতে পেরেছিলেন নুসরাতের বক্তব্যের ভিত্তিতে। আমাদের ধারণা, তিনি সেফটি ডকুমেন্ট হিসেবে ভিডিওটি ধারণ করেছেন। তবে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেননি। টেবিলের ওপর ফোন রেখে বাথরুমে গিয়েছিলেন। এ ফাঁকে তার মোবাইল থেকে ভিডিওটি হস্তান্তর হয়েছিল।

এদিকে ঢাকায় পুলিশের কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঢাকাতেই অবস্থান করছেন ওসি মোয়াজ্জেম। তার অবস্থানও জানা আছে পুলিশের।

সূত্র জানায়, মে মাসেই বিভাগীয় তদন্ত ও মামলার কাজের কথা বলে ঢাকায় চলে আসেন ওসি মোয়াজ্জেম। সেই থেকে তিনি অননুমোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। এরমধ্যে নিজের যশোর সদরের চাঁচড়া এলাকার বাড়ীতেও যাননি তিনি।

সূত্র বলছে, তবে ২-১ দিনের মধ্যেই তিনি গ্রেফতার হতে পারেন।

এ বিষয়ে ফেনীর সোনাগাজী সার্কেলের এএসপি শফিকুল আহমেদ ভুঁইয়া জনিয়েছেন,‘ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেফতারে একটি টিম এখন ঢাকায় কাজ করছে।’

সে হিসাবে এ কথা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, ওসি মোয়াজ্জেম এখন ঢাকাতেই অবস্থান করছেন।

পিবিআইয়ের এসপি আহসান হাবিব পলাশ জানান, ওসি মোয়াজ্জেমকে এখন যেকোনো এলাকার পুলিশ গ্রেফতার করতে পারে। এমনকি সাধারণ মানুষও তাকে ধরে পুলিশে দিতে পারেন। তবে মূল দায়িত্বে রয়েছেন সোনাগাজী থানা পুলিশ।

এদিকে গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে পলাতক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে যে কোনো মূল্যে গ্রেফতার করা হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

গত সোমবার সচিবালয়ে নিজ দফতরে ঈদপরবর্তী মতবিনিময়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পালিয়ে গেলে ধরা তো কঠিন।সময় লাগে।তবে সরকার এ ব্যাপারে সিরিয়াস।

তাকে খুঁজে বের করতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই জানিয়ে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে খুব সিরিয়াস। হয়তো শুনবেন খুব শিগগির ধরা পড়েছে সে এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’

Bootstrap Image Preview