Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৬ রবিবার, জুন ২০১৯ | ২ আষাঢ় ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

সংবাদ সম্মেলনে যা জানালেন প্রধানমন্ত্রী

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০ জুন ২০১৯, ০৯:৪৫ AM
আপডেট: ১০ জুন ২০১৯, ০৯:৪৫ AM

bdmorning Image Preview
সংগৃহীত


এবারের ঈদুল ফিতরের জামাতে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা ছিল জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আন্তরিক চেষ্টায় কোনো অঘটন ছাড়াই সব কিছু সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সবাইকে সম্পৃক্ত করে এ ধরনের হুমকি মোকাবিলা করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে জনগণকে সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।

গতকাল রবিবার (৯ জুন) বিকাল ৫টায় গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে জনৈক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর সম্প্রতি জাপান, সৌদি আরব ও ফিনল্যান্ড সফর নিয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। গত ২৮ মে থেকে ৭ জুন পর্যন্ত তিনি এই তিন দেশ সফর করেন। লন্ডনে পলাতক বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছি। আজ হোক-কাল হোক এক সময় শাস্তি কার্যকর হবে। এটুকু বলতে পারি। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত পাঠানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে চীন-ভারত-জাপান সবার সঙ্গে কথা বলেছি। তারা সবাই মেনে নিয়েছে যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। সমস্যা হচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, যারা সেখানে ভলান্টিয়ার সার্ভিস দেয়, তারা চায় না রোহিঙ্গারা কোনো দিন নিজ দেশে ফেরত যাক। কারণ এ সংস্থাগুলোয় বিশাল অঙ্কের টাকা আসে। শরণার্থীরা চলে গেলে তাদের চাকরি-বাকরি থাকবে না। তা না হলে কেন তারা বিরোধিতা করবে। মুশকিল হচ্ছে, মিয়ানমারকে নিয়ে। তারা কিছুতেই রোহিঙ্গাদের নিতে চায় না।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর দুই পাশে আওয়ামী লীগের সভাপতিম লীর সদস্য ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন আসন গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিমের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিসভার সদস্য, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাসহ পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। 

সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, ঠিক কী ধরনের হুমকি ছিল ঈদের সময়। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নানা নামে নানাভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নানা ধরনের হুমকি দিতেই থাকে। সারাক্ষণ কিন্তু এগুলো আসছে। সবটা আমি বলে মানুষকে ভীত করতে চাই না। যতদূর পারি, এগুলোর পেছনে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তদন্ত করে এবং তাদের বিরুদ্ধে যা যা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার তা আমরা নিয়ে থাকি। তিনি বলেন, ঈদের জামাতের সময় আমি সত্যিই খুব চিন্তিত ছিলাম। কারণ এমন এমন ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, তা যেন কোনোমতে না ঘটে। প্রধানমন্ত্রী জানান, তিনি দেশে বা দেশের বাইরে যেখানেই থাকুন না কেন, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সব সময় তার যোগাযোগ থাকে। এবারও বিভিন্ন ঈদ জামাত সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে মেসেজ চলে গেছে। তিনি বলেন, আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ বাহিনী, র‌্যাব থেকে শুরু করে সবাই খুব আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে। সেজন্য সুষ্ঠুভাবে ঈদের জামাতগুলো সম্পন্ন হয়েছে।

জুলাইয়ে চীন সফর : প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানে যেমন আমরা সফর করেছি, চীনেও সফর হবে। আগামী জুলাই মাসে দাওয়াত দিয়েছে চীনের প্রেসিডেন্ট। ওখানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক সামিট  হবে। তখন রোহিঙ্গা বিষয়ে চীনের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলাপ-আলোচনা হবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফেরত যাক, তা সবারই আকাক্সক্ষা। কিন্তু মিয়ানমার তাদের নিতে চায় না। এখানেই সমস্যা। আমরা চুক্তি করেছি। সব রকম ব্যবস্থা নিয়েছি। তারপরও তাদের কাছ থেকে...।

পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করলে কারও দিকে চেয়ে থাকতে হবে না : ভারতে নরেন্দ্র মোদির জয় ও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা মেরিটাইম বাউন্ডারির মতো কঠিন সমস্যার সমাধান করেছি। ছিটমহল বিনিময় করেছি। অথচ এসব নিয়ে পৃথিবীর বহু দেশে যুদ্ধ হয়। কিন্তু আমরা উৎসবমুখর পরিবেশে এসব সমাধান করেছি।  তিনি বলেন, পানির জন্য কারও মুখাপেক্ষী থাকতে হবে না, ডেল্টা প্ল্যান করেছি। পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করলে পানি পানি করে কারও দিকে চেয়ে থাকতে হবে না। তাই তিস্তা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করার দরকার নেই।

যারা ফিনল্যান্ড বা বিশ্বের অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করেন তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের বিশাল এলাকা। অত্যন্ত রিসোর্সফুল জায়গা। আমাদের জায়গা তো অনেক কম। অনেকে তুলনা করেন। কিন্তু যারাই করুক, তাদের মাথায় রাখা উচিত, বাংলাদেশের মতো এই ভূখ- দিয়ে ১৬ কোটি মানুষকে বসিয়ে দিই? কতটুকু সুস্বাস্থ্য আর কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারবে তারা? তিনি বলেন, মাত্র ৫৫ হাজার বর্গমাইল এলাকায় ১৬ কোটি মানুষের দেশে যে কাজগুলো দক্ষতার সঙ্গে করতে পেরেছি সেটুকু দিয়ে তারা পারবে কিনা- এ প্রশ্ন করা দরকার।

জাপান সফর সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাপানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। আমাদের ভালো হোটেল ছিল না, সোনারগাঁও হোটেল জাপান সরকার তৈরি করে দিয়েছিল। এবার সফরে নতুন সম্রাট ও আগের সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। বাংলাদেশকে নিয়ে অনেক আগ্রহ তাদের।

বিমানের পাইলটের পাসপোর্টবিহীন কাতার যাওয়া সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, লক্ষ্যণীয় বিষয়, যখনই বিমানে উঠি, তখনই ঘটনা ঘটে বা নিউজ হয়। হয়তো পাসপোর্ট ভুলে যেতে পারে, ভুল হতে পারে। এখানে ইমিগ্রেশনে যারা ছিল, তাদের তো চেক করতে হবে। তিনি বলেন, ইমিগ্রেশন এখন পাওয়ারফুল। এখন তো সবাই ভিআইপি, ভিভিআইপি, আরও ভি লাগবে। কিন্তু কাউকে ছাড়া হবে না। প্রতিটি পাসপোর্ট সিল মারা আছে কিনা চেক করা হবে। ভিভিআইপি লাগেজও সবকিছু চেক করা হবে। তিনি বলেন, আমাকে বলে, এটা হবে তো ওটা হবে। কিন্তু আমি নিজের বিমানেই যাব। মরলে মনে হবে, দেশের মাটিতেই মরেছি। কোনো কারণে বিমান না গেলে বা পাইলট পৌঁছাতে না পারলে চলে আসব। এভাবে যে ঘটনাগুলো, আপনাদেরও দেখা উচিত কেন ঘটে।

আজ হোক কাল হোক শাস্তি কার্যকর হবে : সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাম উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই নাম নিতেও তো ঘৃণা লাগে। তবে একটা কথা আমি বলি। আমি দেখি আমাদের অনেকেরই খুব দরদ উতলে ওঠে। কিন্তু আপনারা ২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার কথা কীভাবে ভুলে যান? কীভাবে আমরা বেঁচে গেছি। বাঁচারই তো কথা নয়, আইভি রহমান মারা গেল। এতগুলো মানুষের জীবন তারা নিল ক্ষমতায় থাকতে।  তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সেই হত্যাকারী, আবার এতিমের অর্থ আত্মসাৎকারী, দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাকারবারি; এদের জন্য অনেকেরই মায়াকান্না দেখি। তাহলে আর এদেশে অপরাধীর বিচার হবে কীভাবে, সেটাই আমার প্রশ্ন? তিনি আরও বলেন, আমরা আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছি ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের সঙ্গে। তারা এত বেশি টাকা-পয়সা বানিয়ে ফেলেছে, সেই টাকায় খুব বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে। যখনই যাই তখনই তো একটা সমস্যা সৃষ্টির চেষ্টা করে। যাই হোক, আজ হোক কাল হোক একসময় শাস্তি কার্যকর হবে, সেটুকু বলতে পারি।

মুসলিম বিশ্বে খুনোখুনিতে লাভবান অস্ত্র বিক্রেতারাই : ওআইসি সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্য প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এই  যে আমরা আত্মঘাতী সংঘাত করে যাচ্ছি, একে অপরকে খুন করছি, রণক্ষেত্র হচ্ছে সমস্ত মুসলিম কান্ট্রিতে। প্রতিটা মুসলিম কান্ট্রির মধ্যেই খুনোখুনি হচ্ছে। লাভবান কে হচ্ছে? যারা অস্ত্র তৈরি করছে, বিক্রি করছে তারাই লাভবান হচ্ছে। আর মুসলমান মুসলমানের রক্ত নিচ্ছে। তিনি বলেন, যেটা বাস্তব, যেটা সত্য, সেটাই বললাম। কারণ একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ছাড়া কারও কাছে আমরা মাথা নত করব না। আমার বাবাও করেনি। আমিও করব না। ওটা আমরা শিখিনি। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ ওআইসি সম্মেলনে দিয়ে এসেছেন বলে জানান শেখ হাসিনা।

কারও লেখায় আমি বাধা দেইনি : এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার বিবেক যদি ঠিক থাকে যে, আমি সঠিক আছি, সেটাই হচ্ছে আমার কাছে বড়। তাতে কে কী লিখল তা নিয়ে আমার মাথাব্যথার কিছু নেই। জাতীয় দৈনিকের একজন ‘সম্পাদক’ লিখতে পারেন না বলে অভিযোগ সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে সম্পাদক এ কথাটা বলছেন, যদি সত্যিই এরকম অবস্থা হতো, তো ওনি কি এই কথাটুকু বলার সাহস পেতেন, তিনি লিখতে পারেন না? যদি তার ওপরে সত্যি কোনো চাপ থাকত, তাহলে এ কথাটাই বলার সাহস পেত কিনা? আমার প্রশ্ন সেখানে। তিনি বলেন, এটা ঠিক গণতান্ত্রিক একটা পথ থাকলে তাদের ভালো লাগে না। তাদের ভালো লাগে, যদি কোনো অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থাকে, ইমার্জেন্সি সরকার হোক বা মিলিটারি সরকার হোক, এরকম কিছু হলে তখন তারা ফরমায়েশি লেখা লিখতে পারেন। একবার এক টেলিভিশনের কোন একটা টকশোতে তিনি বলছিলেন, কোনো একটা মিথ্যা নিউজ দেওয়া হয়েছিল বলে তাকে ধরছিল কেউ। তখন তিনি বলছিলেন, আমি কী করব, আমাকে ডিজিএফআই যেটা সাপ্লাই দিয়েছিল, আমি সেটাই ছাপিয়ে দিয়েছি, লিখে দিয়েছি। তার মানে দাঁড়াচ্ছেটা কী? আপনি যদি ওই কথার সঙ্গে এই কথাটার লিঙ্ক করেন, তাহলে ডিজিএফআই এখন তাকে কোনো লেখা দিচ্ছে না। কাজেই তিনি লিখতে পারছেন না। আমি তো এটাই বুঝব। তিনি ফরমায়েশিটা লিখতে পারেন। তার ওই বক্তব্যকে স্মরণ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, তিনি বলেছেন, ওখানে ডিজিএফআই যে তথ্য দিয়েছে, সেটাই তিনি লিখেছেন। আমরা তো ডিজিএফআই দিয়ে কোনো তথ্য দেওয়াচ্ছি না! তাই এখন তিনি নিজেই লিখতে পারছেন না। তিনি বলেন, কারও লেখায় আমি বাধা দেইনি তো। ওনি লেখুক না। যত খুশি লিখবেন। লিখছেন তো। কিন্তু হঠাৎ বলে ফেললেন তিনি লিখতে পারছেন না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টোকিওতে ‘দ্য ফিউচার অব এশিয়া’ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য জাপানের সঙ্গে আড়াইশ কোটি ডলারের উন্নয়ন সহায়তা চুক্তি হয়। জাপান সফর শেষে সৌদি আরবের মক্কায় ওআইসির চতুর্দশ সম্মেলনে যোগ দেন তিনি। সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর তিনি ওমরাহ পালন করেন। তিনি মহানবীর (সা.) রওজা মোবারক জিয়ারত করেন।

Bootstrap Image Preview