Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২০ বৃহস্পতিবার, জুন ২০১৯ | ৫ আষাঢ় ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

কড়াইল বস্তিকে নিয়ে যেমনটা ভাবছেন একদল হবু স্থপতি

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৯ মে ২০১৯, ১২:২১ PM
আপডেট: ২৯ মে ২০১৯, ১২:২১ PM

bdmorning Image Preview


ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশান ও বনানীর মাঝে অবস্থিত কড়াইল বস্তি। জমির মালিকানা নিয়ে সরকারের  অভ্যন্তরীণ অমীমাংসার জেরে জমিটি পরিত্যক্ত থাকার সুযোগে এতে বস্তি গড়ে উঠেছে। আর বস্তির জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে ভরাট হয়ে দখল হয়েছে গুলশান-বনানী লেক। করাইলকে ঘিরে থাকা অভিজাত এলাকার জীবনযাত্রা উন্নত হলেও, বস্তির মানুষরা অনেকক্ষেত্রেই বঞ্চিত। ঘর বা আবাসনের মান নিয়ে প্রশ্ন তো থাকেই, সঙ্গে আছে অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ভৌত ও সেবা কাঠামোগত সমস্যা এবং সেখানকার মানুষের সামাজিক স্বীকৃতির অভাব।

অথচ বস্তিতে বসবাসকারী মানুষরাই শহরের কর্মসংস্থানের বড় অংশজুড়ে অবস্থান করে। অভিজাত এলাকার ঘরবাড়ি, শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানের নানাবিধ স্তরের কাজের সঙ্গে যুক্ত তারা। সবকিছু ছাপিয়ে কড়াইলবাসীর কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ ফেলেছে উচ্ছেদ-পরিকল্পনা। একদিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হাতে নিয়েছে গুলশান-বনানী লেক ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট, যার কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।

অন্যদিকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ একটি হাইটেক পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে কড়াইলের প্রায় সব মানুষকেই ঘরছাড়া হতে হবে। ফলে যে প্রশ্নটি প্রসঙ্গতই সামনে আসে তা হল, এই শহরটি কি শুধু উচ্চবিত্ত মানুষের জন্য? বস্তি উচ্ছেদ করা হলে কড়াইলে গত তিন দশক ধরে বসবাসরত নিম্নআয়ের মানুষদের ভাগ্যে কী ঘটবে সে নিশ্চয়তা এখনো দিতে পারেনি কেউ। কিন্তু পরিকল্পনাটা একটু ভিন্নভাবে সাজানো হলেই টিকে থাকবে তাদের মাথা গোঁজার ঠাই। কারণ, মানবিকতার বিবেচনা থেকে ভাবলেও সহাবস্থান তাদের ন্যায্য দাবি। 

এই বিষয়টিই ভেবেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের চতুর্থ বর্ষের একদল শিক্ষার্থী। স্থাপত্যের শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পড়াশোনায় বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের কথা ভাবতে হয়। সুপরিকল্পিত নকশা প্রণয়নের মাধ্যমে তা হতে পারে যেকোনো সামাজিক সমস্যারও সমাধান। আর এই কাজে নির্দিষ্ট বিষয়টি সম্পর্কে প্রচুর তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট সাধারন মানুষদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে তৈরি করা হয় একেকটি নকশা। চতুর্থ বর্ষের শুরুতে ‘আরবান’ স্টুডিও কোর্সের মাধ্যমে শেখানো হয় নগর ও অঞ্চল নিয়ে পরিকল্পনার নানা বিষয়।

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের তেরোজন শিক্ষার্থী তাদের 'স্প্রিং ২০১৯' সেমিস্টারের শুরু থেকে কড়াইলে আসা-যাওয়া শুরু করেন; সেখানে বসবাসরত নানান শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানতে চান তাদের ভাবনা ও স্বপ্নগুলো।

স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক স্থপতি খন্দকার হাসিবুল কবীর, স্থপতি তানজিল শফিক ও প্রভাষক পরিকল্পনাবিদ তাসফিন আজিজ এ যাত্রায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছিলেন। সার্বিক দিকনির্দেশনা দেন স্থাপত্য বিভাগের চেয়ারপারসন প্রফেসর ড. জায়নাব ফারুকী আলী। ব্র্যাক আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের কারিগরি টিমও শিক্ষার্থীদের এই চেষ্টায় নানাবিধ তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করে।
  
স্থপতি তানজিল শফিক বলেন, বস্তিটি কীভাবে গড়ে উঠেছে, বর্তমানে কতজন মানুষ এখানে থাকছে, কি কারনে তাদের এখানে বসবাস, শহরের সাথে এর সম্পর্ক কী –এ সেমিস্টারের শুরু থেকেই আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেছি। তাদেরকে নিয়ে বারবার সেখানে গেছি, তারা বস্তিবাসীর সঙ্গে কথা বলে তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা জানতে চেয়েছে। সমাধান খুঁজতে গিয়ে আমাদের তেরোজন শিক্ষার্থী মিলে তেরোটি ভিন্ন বিষয়ে কাজ করেছে, যার সবকিছু মিলে একটা চূড়ান্ত কড়াইল ভিশন দাঁড়িয়েছে। আমরা তাদের জীবনমান উন্নয়নের প্রতিটি বিষয় নিয়ে ভেবেছি। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রকল্পগুলোকে এমনভাবে সাজিয়েছে, যা কড়াইলে বসবাসরত মানুষেরা বিশেষজ্ঞদের সামান্য সহযোগিতা পেলে নিজেরাই বাস্তবায়ন ঘটাতে পারবে। 

গত ১০ এপ্রিল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের মাজহারুল ইসলাম গ্যালারিতে এই প্রকল্পগুলোর ‘জুরি’ অনুষ্ঠিত হয়। পরে চলতে থাকে সপ্তাহব্যাপী প্রদর্শনী। শিক্ষার্থীদের প্রকল্পগুলোর খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করেন আমন্ত্রিত কয়েকজন স্থপতি ও নগরপরিকল্পনাবিদ। ব্র্যাকের আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের কর্মকর্তাদেরকেও সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যারা এই প্রকল্পগুলো দেখেন ও এর বাস্তবায়ন সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। এছাড়া কিছু প্রকল্প নিয়ে  তাঁরা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানান।

প্রদর্শনী ঘুরে দেখা গেল, শিক্ষার্থী আয়মান আশহাব তার প্রকল্প ‘কড়াইলের নগরকথনে’ শহরের সাথে কড়াইলের সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। আয়মান বললেন, বস্তিতে বসবাসকারীদেরকে বৈষম্যের চোখে দেখা যাবেনা। আর এই এলাকার জলাবদ্ধতা এড়াতে লেক পুনরুদ্ধার করার প্রয়োজন হলেও বস্তিকে সবচেয়ে কম উচ্ছেদ করার পথ খুঁজতে হবে। তাছাড়া শহরে প্রায় সব বড় সড়ক উত্তর-দক্ষিণ বরাবর, তাই কিছু পূর্ব-পশ্চিম বরাবর যোগাযোগ বাড়াতে হবে, যা হতে পারে লেকের উপর দিয়ে কিছু ব্রিজ নির্মাণ করে।

২০০১ সালে লেক প্রায় ফাঁকা ছিল, তখনও সেভাবে দখল হয়নি। ২০১৩ সালেও ফাঁকা ছিল অনেকটাই। কিন্তু ২০১৯ এ এসে প্রায় পুরোটা ভরাট হয়ে গেছে। অন্তত ২০১৩ সালের অবস্থায় ফিরে গিয়ে বস্তির মানুষদের উচ্ছেদ না করে সহাবস্থানের পাশাপাশি অন্যান্য প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে কী করণীয়, তার দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখা ভেবেছেন এই শিক্ষার্থী। ‘নিরাপদ ও উন্নত কড়াইল’ শিরোনামে অদিতি হক ভেবেছেন - কিভাবে সম্ভাব্য আগুন বিপর্যয় এর হাত থেকে বাঁচানো যায়।

হলি-আর্টিজানের হামলার ঘটনার পর কড়াইল থেকে গুলশান যাবার একমাত্র নৌকা ঘাটটি বন্ধ করা হয়। এখন সেখান থেকে গুলশান যেতে হলে বস্তির মানুষদেরকে দেড় ঘণ্টার পথ ঘুরে হেটে যেতে হয়। অথচ তারা কাজ করেন অভিজাত এলাকাতেই। এছাড়া বস্তির ভেতরের কিছু নির্দিষ্ট রাস্তা প্রশস্ত করার বিষয়টি বলা হয়েছে, যাতে যেকোনো জরুরীসেবার গাড়ি প্রবেশ করতে পারে।

কিন্তু, রাস্তা প্রশস্ত করলে ঘর ভাঙতে হবে, সেক্ষেত্রে উচ্ছেদ হওয়া মানুষদের সমাধান কী হতে পারে তাও ভেবেছেন শিক্ষার্থীরা। পুনর্বাসনের জন্য যদি বেশি উঁচু ভবন তৈরি করা হয়, তবে তা সেই মানুষদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। বরং বাঁশ বা স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা কাঁচামাল দিয়ে তারা বর্তমানে যেধরনের ঘর বানাচ্ছে, সেটিকেই কয়েকতলাবিশিষ্ট করা হলে অল্প জমিতে বেশি মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা যাবে –বললেন অদিতি। আরেক শিক্ষার্থী মাঈশা তাসনিম ভেবেছেন, লেক পুনরুদ্ধার করে লেকের উপরই ডেকের মত ভাসমান কিছু বাসস্থান তৈরির কথা। থাকছে বর্জ্য বাবস্থাপনার সমাধানও। আর এই ভাবনায় লেককেও দখল করতে হচ্ছে না, আবার মানুষের বাসস্থানেরও বাড়তি ব্যবস্থা হচ্ছে।

পাশাপাশি লেকে জলযান চলাচল পুনরায় চালু ও জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। মাঈশার এই পরিকল্পনার নাম ‘জলোত্তরণ’। ঘরের ছাদে কৃষি ফসল ফলানো ও বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ব্যাপারে ভেবেছেন ফাবলিহা আরাফ। তার প্রকল্পের নাম ‘নগরকৃষি উন্নয়ন’। বর্তমানে করাইলে যেধরনের ঘরবাড়ি আছে, সেগুলোতেই সহজে ও অল্প খরচে সংযোজন করা যাবে এই ব্যবস্থা। শুধু বাসস্থানের উন্নয়ন নয়, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিষয়টিও এসেছে এই শিক্ষার্থীদের পরিকল্পনায়। আমানা ইফতেখার তৈরি করেছেন ‘আস্থা কেন্দ্র’ নামে আরবান প্রাইমারি হেল্থ কেয়ার সেন্টারের নকশা। তার মতে, বস্তির ভেতরে কোনো কার্যকর প্রাথমিক চিকিৎসালয় নেই। হাসপাতাল দূরে বলে তাদের বাড়তি খরচ করতে হয়। ফলে বস্তির লোকজন অনেক সময়ই রোগ পুষে রাখে, যা পরে বড় আকার ধারণ করে। প্রতিবন্ধী ও গর্ভবতী মায়েদের পোহাতে হয় বঞ্চনা ও অবর্ণনীয় কষ্ট। ‘আস্থা কেন্দ্র’ হতে পারে কড়াইলবাসীর আস্থার আশ্রয়, যা থাকবে হাতের নাগালে ও স্থাপত্যের নান্দনিকতায় হবে প্রশান্তিদায়ক। ‘প্রান্ত রূপান্তর’ নামের প্রকল্প ভাবনায় পুনম প্রিয়ম তৈরি করেছেন কমিউনিটি সেন্টার।

মহাখালী থেকে টিঅ্যন্ডটি কলোনির রাস্তা দিয়ে যাবার সময় কড়াইলে প্রবেশের আগে ময়লার ভাগাড় চোখে পড়ে। এটি যেন অভিজাত এলাকা থেকে বস্তিকে আরও বিচ্ছিন্ন করেছে। অথচ সেই জায়গায় যদি একটা কমিউনিটি সেন্টার স্থাপন করা হয়, যেখানে কড়াইলের মানুষদের অনুষ্ঠানাদির পাশাপাশি স্বল্পভাড়ায় মহাখালীর লোকদেরও অংশগ্রহণ তৈরি করা যাবে, তবে এর মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন হবে ও দূরত্ব কমবে। 

‘স্নেহালয়’ নামে বাচ্চাদের ডে-কেয়ার নিয়ে ভেবেছেন নুজহাত তাসনিম রিফা। একইভাবে নাজিয়া নূরের প্রকল্পের নাম ‘খেলাঘর’। বস্তির অধিকাংশ কর্মজীবী নারীরা তাদের শিশুসন্তানকে ঘরে তালাবদ্ধ করে রেখে যান। ফলে এই শিশুরা পার করে করুণ এক শৈশব। তাদেরকে সুশিক্ষা ও যত্নে গড়ে তোলার জন্য স্নেহালয় ও খেলাঘরের পরিকল্পনা। আর ফারহিন ইকবালের প্রকল্প ‘প্রজন্ম প্রাঙ্গন’ হবে এমন এক জায়গা, যেখানে বস্তির কিশোর-তরুণরা মাদক থেকে দূরে থাকা এবং সুন্দর ভাবনা নিয়ে বেড়ে ওঠার শিক্ষা পাবে। সায়েম আনোয়ার তুহিনের পরিকল্পনা ‘স্বনির্ভর কড়াইল’ হলো একটি স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার। এখানে থাকবে বিভিন্ন বয়সী মানুষদের জন্য কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা। 

তারান্নুম মাহমুদের ‘নবরূপে কাপড়পট্টি’কে করাইলের নারীদের কাপড়ের ব্যবসা ও সেলাইয়ের কাজকে প্রদর্শন, বিক্রি ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আয়ের উৎস হিসেবে তৈরি করেছেন। শতাব্দী তাপাদারের প্রকল্প ‘লেকপাড় গণপরিসর’। বস্তিকে পাশে রেখেই পুনরুদ্ধার করা লেকের ধারে হাঁটার রাস্তা, বসার জায়গা, গাছপালা, বিকেলে আড্ডা দেয়াসহ কড়াইলবাসীর বাড়তি আয়ের একটি ক্ষেত্র তৈরির চেষ্টা ছিল তার।

শতাব্দী মনে করেন, ‘লেকপাড় গণপরিসর’ এর সফল বাস্তবায়ন গুলশান ও করাইলের মানুষের মাঝে বিদ্যমান সামাজিক দূরত্ব কমিয়ে আনবে। সর্বশেষ প্রকল্পটি ইফতেখার জাহান ফয়সালের।

‘অদেখা স্বপ্ন’ নামের এই ভাবনায় বস্তিকে একপাশে রেখেই কীভাবে লেকের পাড়কে কাজে লাগিয়ে একইসঙ্গে হাই-টেক পার্ক ও তার নিচে খোলা জায়গা তৈরি করা যায়, সেটি দেখিয়েছেন তিনি।

ফয়সাল বললেন, হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ যে পরিকল্পনাটি করেছে, তাতে এই জায়গার বৈশিষ্টগুলোকে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে অনেকটা জায়গা নষ্ট হচ্ছে, বস্তিকেও উচ্ছেদ করতে হচ্ছে। অথচ পরিকল্পনাটা ভিন্নভাবে করলে তা বরং বস্তির মানুষদের জন্যও উপকারী হতো। দিনের বেলা বস্তির যে লোকগুলো বাইরে রিকশা চালায় বা অন্য কাজ করে, তাদেরকে রাতে কোনো একটা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এছাড়া পার্কের নিচের খোলা জায়গাটি সরাসরি লেকের দিকে উন্মুক্ত থাকবে, এতে থাকবে বসার জায়গা ও নৌকা থামবার ঘাট। সীমানাপ্রাচীরে ঘেরা না রেখে উপভোগ্য করা যাবে পুরো জায়গাটা।

আলাপচারিতায় এই শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাই বললেন, সমাজের বিত্তবানদের একটা বড় অংশ বস্তিকে সবসময় নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন। এক অংশ মনে করে, বস্তির মানুষরা মাদকাসক্ত হয় এবং তারা নানারকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটায়। অথচ কড়াইলের ভেতরে গেলে দেখা যায়, সেখানকার মানুষেরা নিজেরা একজোট হয়ে মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। সেখানের মেয়েরা প্রতিদিন নিরাপদে কর্মস্থলে যাচ্ছে। কারোর কোনো সমস্যা হলে অন্যরা এগিয়ে আসছে। বেশ গুছিয়ে ওঠা একটা সমাজ, যেখানে সহমর্মিতা ও সহযোগিতার চমৎকার উদাহরন দেখা যায়।  
 
স্থাপত্য বিভাগের প্রভাষক ও পরিকল্পনাবিদ তাসফিন আজিজ বলেন, কড়াইল আমাদের দেশের অন্যতম বৃহৎ বস্তি।  এমন স্বল্প আয়ের জনবসতিকে উন্নত শহর বা নগর ভাবনার প্রেক্ষাপটে অপরিকল্পিত মনে হতে পারে। কিন্তু  প্রকৃত অর্থে সেটি স্বপরিকল্পিত, সুন্দর ও স্বতন্ত্র। এখানে মানুষে মানুষে যে মিথস্ক্রিয়া তা হয়তো শহরের অন্য প্রান্তে অনুপস্থিত। কড়াইলের মানুষের এমনই ছোট ছোট সুন্দর ভাবনা, ইচ্ছে ও চাহিদার প্রতিফলনেই তৈরি শিক্ষার্থীদের তেরটি প্রকল্প যা কিনা আবার দীর্ঘ, মধ্যম ও স্বল্প মেয়াদী পরিকল্পনায় ভাগ করা। শহর ভাবনায় কোন পক্ষই  বিচ্ছিন্ন নয়। সেক্ষেত্রে শহরের উন্নয়ন সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণে তৈরি হতে পারে কার্যকরী সমাধান। এমনই একটি অনুশীলন করা হয়েছে এই ‘আরবান’ স্টুডিও কোর্সে।

স্থপতি তানজিল শফিক আরও বলেন, এই মুহূর্তে বস্তি উচ্ছেদ করা হলে পুনর্বাসনের জন্য কাউকে হয়তো জেলা বা মফস্বলের গ্রামে একটা জমি দেয়া হবে। যে লোকটা ঢাকা শহরে গ্রিল বানানোর কাজ করে রোজগার করে, সে গ্রামে গিয়ে কাজ খুঁজে না পেয়ে জমি বিক্রি করে আবার শহরে ফিরবে। অনেকে উচ্ছেদের পর পুনর্বাসন, এবং সুউচ্চ ভবন তৈরি করে আবাসনের ব্যবস্থাকে আপাতদৃষ্টিতে সমাধান ভাবতে পারেন, কিন্তু সুদূরপ্রসারী চিন্তা করলে সেটি ভাল ভূমিকা রাখবেনা। নগরায়ণ হচ্ছে, জনসংখ্যা বাড়ছে, মানুষ শহরে আসছে বা শহর বড় হচ্ছে। বস্তি থেকে যাদেরকে উচ্ছেদ করা হবে তাদের সবাইকে নতুন ভবন তৈরি করে জায়গা দেয়া  সম্ভব হবেনা। ইউএন হ্যাবিটেট বলছে স্লাম আপগ্রেডের কথা। সে পথে হেঁটে কড়াইলকে বাসযোগ্য ও মনোরম করে সাজিয়ে তোলা যেতে পারে। তাতে  যেটুকু খরচ করতে হবে, তারচেয়ে শতগুণ খরচ হবে সব ভেঙ্গে ফেলে উঁচু দালান তৈরিতে। সেটি আদৌ কতটা ফলপ্রসু হবে, তার উদাহরণ হিসেবে ভাষানটেকের পুনর্বাসন প্রকল্পের দিকে তাকাতে পারেন। নিম্নমানের নির্মাণ কাজ হয়েছে তো বটেই, যাদের ফ্ল্যাট পাওয়ার কথা ছিল তারা তা পায়নি। সিন্ডিকেট সেটিকে দখল করে নেয়ায় বরং উল্টো ভাড়া দিতে হচ্ছে। আর অনেকেই নতুন কোনো বস্তির স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে ফেরত গেছে।

তাছাড়া, বস্তির মত জায়গায় সামাজিক বন্ধনের একটা বিষয় দেখা যায়। অনেকগুলো মানুষ একসঙ্গে শেয়ার করে থাকছে,  একে অন্যের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াচ্ছে। ফ্ল্যাট কালচারে সেই বিষয়টা অনুপস্থিত। আমরা শিক্ষার্থীদের করা পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব বিষয়গুলোকেই একসঙ্গে তুলে ধরতে চেয়েছি। পুরো কাজটি সেখানকার মানুষের সঙ্গে মিশে তাদেরকে নিয়েই করা হয়েছে।  ‘এই প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন দেখতে চাই’- প্রদর্শনী দেখতে এসে এমনটাই বলেছেন করাইলবাসীদের অনেকে। শিক্ষার্থীদের চেষ্টাকে তারা সাধুবাদ জানিয়েছেন।

-সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার
 

Bootstrap Image Preview