Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২২ বুধবার, মে ২০১৯ | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

মা দিবসে মা-কে নিয়ে সাত গল্প

সজীব সরকার
প্রকাশিত: ১২ মে ২০১৯, ০৯:৪১ PM
আপডেট: ১২ মে ২০১৯, ০৯:৪১ PM

bdmorning Image Preview


মা। অনেক আদরের আর মমতার সম্পর্ক তাঁর সঙ্গে। কেননা আমরা প্রত্যেকেই নিজের মায়ের শরীরের অংশ। মা তাঁর সন্তানদের কতোখানি ভালোবাসেন, আর সন্তানের জন্যে মা যে কতো কী করতে পারেন, এ নিয়ে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হাজারো গল্প; এর কিছু সত্যি, কিছু কল্পনা। কিন্তু কল্পনা হলেও সেগুলো একেবারে মিথ্যে নয় এ জন্যে যে মা তাঁর সন্তানের জন্যে সত্যিই ওইসব গল্পের মতোই সব করতে পারেন; আর তাই তো প্রতিটি মা একেকজন অসামান্যা, মহীয়সী!

যদিও বছরের প্রতিটি দিনের ওপর সবচেয়ে বেশি অধিকার মায়েদের, তবু কাগজে-কলমে আজ মা দিবস। মা-কে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পড়া অগুণতি গল্প থেকে কয়েকটি আজ মা দিবস উপলক্ষে সবার জন্যে তুলে ধরছি:

এক.

ভিনদেশি এক ছেলের একটি গল্প: আমার মায়ের একটি চোখ ছিলো না। একটি চোখ না থাকায় সেটির শূন্য কোটর দেখা যেতো এবং তাকে বেশ কুৎসিত দেখাতো। তার এই বীভৎস চেহারার জন্যে আমার প্রচ- রাগ ছিলো কেননা এজন্যে আমাকে লোকজনের সামনে বিব্রত হতে হতো। আমার মনে পড়ে, আমাদের স্কুলের ক্রীড়া দিবসে অন্য সবার বাবা-মায়ের মতো আমার মা-ও এসেছিলো। তাকে দেখে আমার বন্ধুরা ভয়ে পালিয়ে যায়। এর পর থেকে তারা সবাই আমার মায়ের ‘কানা’ চোখ নিয়ে আমাকে খেপিয়ে তুলতো। আমার সবসময় মনে হতো, আমার মা কেন মরে যায় না? সে মরে গেলে তো আমি শান্তি পেতাম, আমার জীবনে কোনো দুর্ভোগ থাকতো না! একনি মাকে আমি বললাম, ‘তুমি মরতে পারো না? তোমার জন্যে আমার জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে গেছে, সবাই আমাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে...।

মা তখন কোনো জবাব দেয়নি। সেদিন রাতে আমি ঘুমের মধ্যে উঠে পানি খেতে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন হঠাৎ দেখি মা সেখানে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বুঝতে পারলাম, কান্নার শব্দে আমার যেন ঘুম না ভাঙ্গে সেজন্যে সে দু’হাতে মুখ চেপে ধরে কাঁছিলো। আমি বিরক্ত হয়ে সেখান থেকে ফিরে এলাম। তখন অবশ্য আমার একবার মনে হলো, আমি মায়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি। কিন্তু তার ওপর আমার সবসময় যে রাগ ছিলো, তা তাকে ওভাবে বলতে পেরে অবশ্য আমার ভালোই লাগলো, কেননা আমি তাকে প্রচ- ঘৃণা করতাম। আমরা অনেক গরিব ছিলাম। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, যেভাবেই হোক, বড় হয়ে সফল হবো। সফল হয়ে আমার আর্থিক অবস্থা অনেক ভালো করবো এবং এই শহর আর আমার ‘চোখ-কানা’ মায়ের থেকে নিজেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবো।

এরপর থেকে আমি বেশ ভালো করে পড়াশোনা শুরু করলাম। পরে অন্য একটি দেশের এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলাম। সেখানে চলে গেলাম, পড়ালেখা শেষ করে ভালো চাকরি পেলাম, নিজের বাড়ি-গাড়ি কিনলাম। সেখানে বিয়ে করলাম, আমার সন্তান হলো। একসময় বুঝতে পারলাম, ওই ছোট শহর, দরিদ্র্য আর আমার ‘কানা’ মাকে নিজের জীবন থেকে সরিয়ে দিয়ে বেশ সুখে আছি, কেননা এখানে এতসব সুখ আর আতিশয্যের মধ্যে আমার বীভৎস চেহারার মায়ের কথা প্রায় মনেই পড়তো না।

এভাবে দিনের পর দিন যখন আমার সুখ বেড়েই চলেছে, তখন হঠাৎ একদিন, আমার বাসার রজায় কলিং বেল বেজে উঠলো। দরজা খুলেই চমকে গেলাম; বীভৎস চেহারার এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে, মলিন চেহারা, জরাজীর্ণ বস্ত্র, আর একটি চোখ নেই! আমার ছোট মেয়েটি তাকে দেখে ভয়ে চিৎকার দিয়ে ঘরের ভেতরে চলে গেল। তাকে দেখে আবারো মেজাজটা বিগড়ে গেল; প্রচণ্ড রাগে চিৎকার করে বকতে লাগলাম তাকে: ‘এখানে কী চাও? কেন এসেছো? আমি তোমাকে চিনি না, বেরিয়ে যাও বলছি!’ প্রথমে আমাকে দেখে বৃদ্ধাটির মুখে হাসি ফুটলেও এবার সে ভড়কে গেল; বললো, ‘আমি দুঃখিত! আমি বোধ হয় ভুল ঠিকানায় চলে এসেছি, আমাকে ক্ষমা করবেন আমি চলে যাচ্ছি।’

মা আমাকে চিনতে পারেনি ভেবে আমার ভালো লাগলো। মনে মনে ভাবলাম, জীবনে কোনোদিন আমি তাকে আর দেখার চিন্তা করিনি, দেখতে চাইনি এবং ভবিষ্যতে চাই-ও না! তখন মনের মধ্যে একটু শান্তি লাগলো।

এর মধ্যে একদিন হঠাৎ আমার নিজের শহরের সেই ছোট্ট স্কুলটির পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে একটি চিঠি এলো। আমার হঠাৎ কী মনে হলো, সেখানে যাবো বলে স্থির করলাম। বাসায় বললাম চাকরির কাজে বাইরে যাবো।

স্কুলের অনুষ্ঠান শেষে হঠাৎ আমার মনে কৌতূহল চাপলো, আমি আমাদের সেই নোংরা, জরাজীর্ণ ছাপড়া ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। গিয়ে দেখলাম ঘরটি আগের চেয়ে আরো বেশি জরাজীর্ণ অবস্থায়, কিন্তু দরোজায় তালা লাগানো। এমন সময় পাশের বাড়ি থেকে এক ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এসে আমার নাম জিজ্ঞেস করলো। নাম বলার পর সে আমার হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললো, আমার মা কয়েকদিন আগে অসুখে ভুগে মারা যাওয়ার সময় তার কাছে এটি দিয়ে বলেছে, আমি কোনোদিন এখানে এলে যেন তা আমার হাতে দেয়।

কেন জানি না, আমার কেমন লাগলো; বিস্ময় নিয়ে কাগজটি খুলে পড়তে শুরু করলাম: ‘প্রিয় সন্তান, আমার মনে হয় আমি অনেক দীর্ঘ জীবন যাপন করে ফেলেছি; এখন আর বাঁচার কোনো অর্থ হয় না। আর, আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, আর কোনোদিন আমি তোমার বাড়িতে গিয়ে হাজির হবো না। কিন্তু আমি যদি মনে মনে আশা করি, অন্তত একটিবার হলেও তুমি এখানে এসে আমাকে দেখে যাবে, তবে কি তোমার কাছে খুব বেশি আশা করা হয়ে যাবে? আমি যখন শুনলাম তুমি তোমার স্কুলের পুনর্মিলনীতে আসবে, তখন বেশ খুশি হলাম। কিন্তু আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম, আর কখনো তোমার স্কুলে তোমাকে বিব্রত করতে যাবো না...।

আরেকটি কথা; তোমার জন্যে আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে, তোমার মা হতদরিদ্র এবং তার একটি চোখ নেই বলে সারা জীবন তোমাকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু বাবা, তুমি যখন খুব ছোট, তখন একটি দুর্ঘটনায় তোমার একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। তোমার একটি চোখ নেই, মা হয়ে আমি তোমার এই অবস্থা কিছুতেই মেনে নিতে পারিনি। তাই পরে আমার একটি চোখ আমি তোমাকে দিয়েছি; সবসময় আমার গর্ব হতো এই ভেবে যে, তুমি আমার চোখ দিয়ে পৃথিবীটাকে দেখছ...! তুমি আমাকে যতোই ঘৃণা ভরে তিরস্কার করেছ, আমি ভেবে নিয়েছি আমার জন্যে সেটিই তোমার ভালোবাসা...। তুমি যখন ছোট্টটি ছিলে, আমার কাছাকাছি থাকতে, সেই দিনগুলোর কথা এখন বড় বেশি মনে পড়ে...। তোমার কথা বড্ড বেশি মনে পড়ে, তোমাকে অনেক ভালোবাসি; তুমিই আমার পৃথিবী...।’

আমার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল! মনে হলো, গোটা আকাশ যেন এখন আমার মাথায় ভেঙ্গে পড়েছে! আমার গোটা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগলো... যে আমার জন্যে তার সবকিছু বিসর্জন দিয়েছে, তাকেই আমি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে এসেছি আমার সারা জীবন ধরে; কী করলে আমার এই পাপ আমি খণ্ডাতে পারি, ভেবে কোনো কূল-কিনারা পেলাম না!

দুই.

সে অনেকদিন আগের কথা। এক দেশে এক ছোট্ট গ্রাম, সেই গ্রামের ঘটনা। রূপে-গুণে অনন্য একটি ছোট্ট ছেলে, আর তার মা। ছেলেটিকে সবাই ভালোবাসে, সবাই তাকে নিয়ে গর্ব করে। কিন্তু ছেলেটি দেখে, তার মায়ের মুখটি সবসময় বেজার হয়ে থাকে; তার মুখে কোনো হাসি নেই।

একদিন ছেলেটি তার মাকে জিজ্ঞেস করে, ‘মা, তোমার কী হয়েছে? কেন তুমি সবসময় মনখারাপ করে থাকো?’ মা বললেন, ‘তোমাকে দেখে এক জ্যোতিষি বলেছিলেন, এমন দাঁত যে ছেলের আছে, সে বড় হয়ে জগদ্বিখ্যাত হবে।’ ছেলেটি অবাক হয়ে মাকে বললো, ‘তাহলে কি তুমি তোমার ছেলের সুনাম হলে খুশি হবে না?’ মা তখন ছেলেকে জড়িয়ে ধরে সান্ত¦না দিতে লাগলেন, ‘আরে বোকা, ছেলের নাম হলে কোন মা খুশি হবে না?’ ‘তাহলে তোমার কেন মন খারাপ থাকে?’ ‘কারণ, আমার ভয় হয়, তোমার নাম-যশ হলে তুমি আমার থেকে দূরে সরে যাবে ও আমাকে ভুলে যাবে।’

মায়ের এই কথায় ছোট্ট ছেলেটি মনে বেশ আঘাত পেল। তখনই সে পুকুর পাড়ে গিয়ে একটি ইঁটের ঢেলা কুড়িয়ে নিয়ে সেটি দিয়ে আঘাত করে নিজের সামনের দুটি দাঁত ভেঙ্গে ফেললো। তা দেখে মা দৌঁড়ে সেখানে গিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে তার মুখ থেকে ঝরা রক্তপ্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করতে লাগলেন আর এমন কাজ করার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। ছেলেটি বললো, ‘যে জিনিস আমার মায়ের মনের কষ্টের কারণ, সেই জিনিস আমি চাই না।’

ছেলেটি পরে সত্যিই জগদ্বিখ্যাত হয়েছিলো; ছেলেটি হলো চাণক্য! বড় হয়ে তিনি অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে পাণ্ডিত্যের জন্যে জগদ্বিখ্যাত হয়েছিলেন।

তিন.

সুদীর্ঘকাল আগের কথা। সূর্য, বায়ু ও চাঁদ ছিলো তিন বোন। আর তাদের মা ছিলো মহাকাশের দূর নক্ষত্র। একদিন তিন বোনকে রাতের খাবারের নিমন্ত্রণ দিলো বজ্র ও বিদ্যুৎ- তাদের আঙ্কেল ও আন্টি। তাদের মা মেয়েদের নিমন্ত্রণে পাঠানোর সময় বললো, ‘তোমরা যাও, আমি তোমাদের জন্যে এখানে অপেক্ষা করবো; তোমরা না আসা পর্যন্ত আমি এখানে আছি; তোমরা দাওয়াত খেয়ে মজা করে এসো, সে গল্প না শুনে আমি যাবো না!’

তিন বোন মহাখুশি। সূর্য তার নিজের সাথে মিলিয়ে সোনার তৈরি জামা পড়েছে, বায়ু পড়েছে লম্বা ঝুলের জামা। চাঁদ পড়েছে রূপালি রঙের গাউন। এই সাজে তিন বোন চললো তাদের আঙ্কেল-আন্টির বাড়ি দাওয়াতে।

রাতের খাবার-দাবার দেখে তিন বোন রীতিমতো মুগ্ধ; টেবিলে বিছানো রয়েছে রংধনুর চাদর- সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে পাহাড়ের চূড়োয় জমে থাকা বরফকুচি। খাবার-দাবারে রয়েছে তুলার মতো নরম তুলতুলে ও সাদা মেঘের মতো মোলায়েম কেক আর পৃথিবীর চারদিক থেকে বেছে বেছে আনা শ্রেষ্ঠ ফল-মূল। সূর্য আর বায়ু এতো সুস্বাদু খাবার-দাবার পেয়ে তাদের প্লেট খালি করে একেবারে হাতসহ চেটে-পুটে খেয়ে নিলো। কিন্তু চাঁদ তার প্লেটে দেয়া খাবার থেকে কিছু কিছু করে বাঁচিয়ে সবার চোখের আড়ালে সেগুলো নিজের গাউনের মধ্যে লুকিয়ে নিলো বাড়ি ফিরে তার মাকে দেবে বলে।

তিনজনই বাড়ি ফিরে দেখলো মা তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে- যা তিনি বলেছিলেন। তিন বোনকে মা কাছে ডাকলেন। প্রথমে সূর্যকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মা আমার, তুমি যে দাওয়াত খেতে গেলে, সেখান থেকে আমার জন্যে কী এনেছ?’ সূর্য খুব বিস্মত ও বিরক্ত হয়ে বললো, ‘আমি সেখানে গিয়েছি নিজে আনন্দ করতে, তোমার জন্যে কিছু করতে নয়; তোমার জন্যে তাহলে আমি কেন কিছু আনবো?’

একইভাবে মা বায়ুকেও জিজ্ঞেস করলেন এবং সে-ও সূর্যের মতো একই জবাব দিলো: ‘আমি সেখানে আমার নিজের আনন্দের জন্যে গিয়েছি; তোমার কথা আমি সেখানে কেন ভাববো?’ এবার মা-নক্ষত্র চাঁদকে প্রশ্ন করলে সে নিজের গাউন থেকে খাবারগুলো বের করে মাকে দেখিয়ে বললো, ‘মা, এই দেখো, আমি আমার খাবারের অর্ধেক খেয়ে বাকি অর্ধেক তোমার জন্যে নিয়ে এসেছি।’ মা তখন সেই খাবারগুলো বেশ তৃপ্তি করে খেলেন।

খাওয়া শেষে মা সূর্যকে বললেন, ‘তুমি স্বার্থপরের মতো শুধু নিজেরটাই ভেবেছ। তোমার জন্যে ঘরে অপেক্ষা করে কেউ একজন বসে আছে, অথচ তুমি তার কথা ভাবোনি। তোমার স্বার্থপরতার জন্যে পৃথিবীতে সব মানুষ তোমাকে সবসময় অপছন্দ করবে। তোমার রশ্মি আজ থেকে প্রচণ্ড উত্তপ্ত হবে; তুমি সবকিছু জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। তুমি সবকিছুর জন্যে ক্ষতিকর হবে। তোমাকে দেখলে মানুষ বিরক্তিতে মুখ লুকাবে।' আর এজন্যেই সূর্যের আলো এতো প্রখর ও রোদ এতো তপ্ত হয়।

মা বায়ুকে বললেন, ‘তুমিও সূর্যের মতোই স্বার্থপর ও লোভী মনের পরিচয় দিয়েছ; যে তোমার জন্যে ঘরে বসে অপেক্ষা করছে, তোমার কাছে তার আবেগের কোনো মূল্য নেই। তাই এখন থেকে তুমি সূর্যের প্রচণ্ড তাপের সঙ্গে হল্কা হয়ে বইবে, আর মানুষ তোমার থেকে দূরে থাকতে চাইবে- কেউ আর তোমাকে ভালোবাসবে না।’ আর তাই গরমের দিনের হাওয়া এত তপ্ত ও অস্বস্তিকর।

এবার মা চাঁদকে ডেকে বললেন, ‘তুমি তোমার মায়ের কথা মনে রেখেছ, তুমি নিঃস্বার্থ ও উদার মনের পরিচয় দিয়েছ। যারা নিজের মায়ের প্রতি অনুগত থাকে ও মাকে শ্রদ্ধা করে, তাদের জীবন মায়ের আশীর্বাদপুষ্ট হয়। আজ থেকে তুমি সবসময়ের জন্যে নরম, কোমল ও মনোমুগ্ধকর আলোর অধিকারিণী হবে; তুমি অন্ধকার রাতকে আলোকিত করবে, গোটা মানবজাতি তোমাকে ভালোবাসবে।’
আর সেই থেকে চাঁদ এত সুন্দর, এত মনোহর!

চার.

এক ভদ্রলোক একদিন তার মায়ের জন্যে ফুল কিনতে একটি ফুলের দোকানে ঢুকবেন, এমন সময় দেখলেন একটি ছোট মেয়ে রাস্তার পাশে বসে কাঁদছে। তিনি মেয়েটির কাছে গিয়ে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। মেয়েটি বললো, ‘আমি আমার মায়ের জন্যে একটি লাল গোলাপ কিনতে চাই। আমার কাছে মাত্র ৪ টাকা আছে কিন্তু গোলাপের দাম ১০ টাকা।’ লোকটি তখন হেসে মেয়েটিকে বললেন, ‘এসো, আমি তোমাকে গোলাপ কিনে দিচ্ছি।’ মেয়েটি খুশি হয়ে তার সঙ্গে ফুলের দোকানে ঢুকলো। লোকটি মেয়েটিকে একটি লাল গোলাপ কিনে দিলেন আর নিজের মায়ের জন্যে একটি ফুলের তোড়া কিনে তার মাকে কুরিয়ার করে দিতে বললেন তিনি প্রায় ২০০ মাইল দূরে অন্য একটি শহরে থাকেন বলে।

ফুলের দোকান থেকে বেরিয়ে লোকটি বললেন, ‘আমার গাড়ি আছে, তুমি চাইলে আমি তোমাকে তোমার মায়ের কাছে পৌঁছে দিতে পারি।’ মেয়েটি খুশি হয়ে গাড়িতে উঠলো। মেয়েটির দেখানো পথ ধরে চলতে চলতে একসময় লোকটি দেখলেন তারা যেখানে এসেছেন, সেটি একটি কবরস্থান। গাড়ি থেকে নেমে মেয়েটি দৌঁড়ে একটি কবরের সামনে গিয়ে ফুলটি সেখানে বিছিয়ে দিল। লোকটি খেয়াল করলেন, কবরটি নতুন; মেয়েটির মা হয়তো দুয়েকদিনের মধ্যেই মারা গেছেন। সেখান থেকে লোকটি তখনই গাড়ি নিয়ে ছুটলেন ওই ফুলের দোকানে। সেখানে গিয়ে কুরিয়ারের অর্ডার বাতিল করে ফুলের তোড়াটি নিয়ে নিজেই গাড়ি নিয়ে ২০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে মায়ের কাছে পৌঁছলেন ও ফুলগুলো তার হাতে তুলে দিলেন।

পাঁচ.

আরেকজন মায়ের গল্প। ছোট্ট ছেলেটি তার অসুস্থ, ঘুমিয়ে আছে বিছানায়। তার পাশে তিন দিন ও রাত ধরে টানা জেগে বসে আছেন মা- তার চোখ একটুখানি বুঁজে এলেই মৃত্যু এসে নিয়ে যাবে তার সন্তানকে। এভাবে আরো কয়েকদিন চলার পর, হঠাৎ মায়ের চোখ ঘুমে একটু মুঁদে এলো, আর মৃত্যুদূত এসে নিয়ে গেল ছেলেটিকে- ছেলেটি মারা গেল। চোখ খুলে মা সন্তানকে মৃত দেখে মেনে নিতে পারলেন না, ছুটে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। বাইরে এসে তার দেখা হলো অন্ধকার রাতের সঙ্গে। রাতকে মা জিজ্ঞেস করলেন, মৃত্যুদূত কোন পথে গেছে। অন্ধকার রাত বললো, ‘মৃত্যু বাতাসের চেয়ে দ্রুতবেগে হাঁটে, তুমি তাকে খুঁজে পাবে না। মা বললেন, ‘আমি যেভাবেই হোক তাকে খুঁজে নেবো, তুমি শুধু আমাকে বলে দাও সে কোন পথ দিয়ে গেছে।’ অন্ধকার রাত তাকে মৃত্যুদূতের যাওয়ার পথ দেখিয়ে দিল।

অন্ধকার রাতের দেখানো পথে মা ঘন জঙ্গলের দিকে ছুটলেন। কিন্তু শর্ত হলো, এ পর্যন্ত যতগুলো ঘুমপাড়ানি গান তিনি তার সন্তানকে শুনিয়েছেন, তার সবগুলো এখন চলার পথে গাইতে গাইতে যেতে হবে। জঙ্গলের মাঝখানে একটি কাঁটাঝোপকে দেখে মা আবারো মৃত্যুদূতের যাওয়ার পথ জানতে চাইলেন। কাঁটাঝোপ বললো, ‘আমি প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় কষ্ট পাচ্ছি; আমাকে তুমি তোমার বুকে জড়িয়ে ধরে উষ্ণতা দিলে আমি পথ দেখাতে রাজি আছি।’ সন্তানকে মৃত্যুদূতের কাছ থেকে ফিরিয়ে আনতে মরিয়া মা কাঁটাঝোপকে জড়িয়ে ধরে নিজের বুক রক্তাক্ত করে তার দেখানো পথে আবারো ছুটলেন। এবার মা দেখা পেলেন এক জলাশয়ের। সে বললো, ‘তুমি যদি তোমার চোখদুটি আমাকে দিয়ে দাও তাহলে আমি তোমাকে মৃত্যুদূতের যাওয়ার পথ দেখাতে পারি।’ মা নিজ হাতে নিজের দুটি চোখ তুলে ফেললেন। চোখ হারিয়ে অন্ধ মা এবার কোনোমতে চললেন জলাশয়ের দেখানো পথে।

কোনোভাবে চলতে চলতে মা একটি গ্রিনহাউসে পৌঁছলেন যেখানে মৃত্যুদূত থাকে। সেখানে অনেকগুলো ছোট ছোট গাছের চারা রয়েছে যেগুলোর প্রতিটি আসলে একেকটি মানুষের জীবন। সেগুলোর মধ্যে একটি ছোট রোগা গাছের চারার হৃৎস্পন্দন শুনে মা তার নিজের সন্তানকে চিনতে পারলেন। এ সময় সেখানে মা এক বৃদ্ধাকে পেলেন যে ওই চারাগুলোর যত্নআত্তিতে মৃত্যুদূতকে সাহায্য করে। ওই বৃদ্ধা বললেন, মা যদি তার চুল তাকে দেয়, তাহলে সে মৃত্যুদূতের সাথে কথা বলে নিজের ছেলেকে ফিরিয়ে নেয়ার বুদ্ধি বাতলে দেবে। মা তার চুল ছিঁড়ে ওই বৃদ্ধাকে দিলে বৃদ্ধাটি বললো, মৃত্যুদূত এলে মা যেন সবগুলো গাছের চারা উপড়ে ফেলার হুমকি দেয় কেননা প্রতিটি চারার জন্যে তাকে ঈশ্বরের কাছে জবাবদিহি করতে হবে; কারণ একমাত্র ঈশ্বরই ঠিক করেন, কোন চারার ভাগ্যে কী ঘটবে।

এমন সময় মৃত্যুদূত ওই ছেলেটিকে নিয়ে সেখানে পৌঁছে। সে অবাক হয়ে মাকে প্রশ্ন করে, কীভাবে তিনি সেখানে পৌঁছলেন। মা উত্তর দিলেন, ‘আমি যে মা!’ আর মা তখন ওই বৃদ্ধার কথামতো দুটি চারা ধরে মৃত্যুদূতকে তার সন্তানকে ফিরিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে বলেন, না হলে তিনি ওই চারাদুটিকে উপড়ে ফেলবেন। মৃত্যুদূত তখন বলেন, ‘তুমি যদি তোমার মতোই অন্য দুজন মাকে ব্যথিত করতে চাও তাহলে এগুলো উপড়ে ফেল।’ এ কথা শুনে মা তৎক্ষণাৎ চারাদুটি ছেড়ে দিলেন। মৃত্যুদূত তখন মাকে তার চোখ ফিরিয়ে দিয়ে একটি কুয়োর মধ্যে তাকাতে বললেন। এ সময় মা দেখলেন, সেখানে দুটি শিশুর ভবিষ্যত দেখা যাচ্ছে; একটি শিশুর জীবন আনন্দময়, বাবা-মায়ের ভালোবাসায় পরিপূর্ণ আর অন্যটির জীবন একেবারে এর উল্টো : দুঃখ, কষ্ট আর অবহেলায় ভরা। মৃত্যুদূত মাকে বললেন, তোমার সন্তানকে বাঁচিয়ে তুললে এ দুটির যে-কোনো একটি জীবন পাবে সে।

মা তখন কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন; হাঁটু গেড়ে মাটি বসে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, ‘এদের মধ্যে আমার সন্তান কোনটি? এই বদ্ধ অন্ধকার কুয়োর এমন জীবনের চেয়ে বরং আমার সন্তানকে ঈশ্বরের রাজত্বে পাঠিয়ে দাও... হা ঈশ্বর, আমার সন্তানের জন্যে যা ভালো মনে হয়, তুমি তা-ই করো; তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমি কিছু চাইলে আমার কথা তুমি কানে তোলো না...!’

ছয়.

দেবি দূর্গার দুই ছেলে কার্তিক আর গণেশ একদিন মায়ের কোলে বসে আছে। কথাচ্ছলে মা জিজ্ঞেস করলেন, কে তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। দুই ছেলের দুজনই দাবি করলো, সে-ই মাকে বেশি ভালোবাসে। একসময় ঠিক হলো, দুজনই নিজ নিজ বাহনে চড়ে পৃথিবী ভ্রমণে বের হবে, আর যে আগে ফিরে আসবে, প্রমাণ হবে সে-ই মাকে বেশি ভালোবাসে।

কার্তিকের বাহন ময়ূর আর গণেশের ইঁদুর। কার্তিক মনে মনে হাসলেন ও ভাবলেন, গণেশ ওই পুঁচকে ইঁদুরের পিঠে চড়ে দু-কদম যাওয়ার আগেই তিনি ময়ূরের পিঠে চড়ে সারা ব্রহ্মা- ঘুরে ফিরে আসবেন। এ ভেবে কার্তিক তাড়াহুড়ো করে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ময়ূরের পিঠে চড়ে বেরিয়ে গেলেন বিশ্বভ্রমণে। এদিকে গণেশের কোনো তাড়া নেই দেখে মা এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। গণেশ বললেন, ‘মা, তুমিই হলে আমার পৃথিবী; তোমার বাইরে আমার কোনো পৃথিবী নেই, অন্য কোনো কিছু নেই।’ এই বলে গণেশ মাকে প্রণাম করে তার বাহন ইঁদুরের পিঠে চড়ে মায়ের চারপাশে পরিভ্রমণ করলেন।

গণেশের মাতৃভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে মা ছেলেকে কোলে তুলে নিলেন। তাকে আশীর্বাদ করলেন, ‘গণেশ, তোমার মাতৃভক্তি অতুলনীয়। মানুষ অন্য সব দেব-দেবির পূজো একটি নির্দিষ্ট সময়ে ও অল্প সময়ের জন্যে করবে। কিন্তু আমি তোমাকে আশীর্বাদ করছি, মানুষ তোমার পূজো সারা বছরই করবে।’ মায়ের আশীর্বাদপুষ্ট গণেশকে হিন্দু ধর্মামলম্বী ব্যবসায়ীরা সারা বছরই পূজো করে।

সাত.

একবার একটি ছেলে তার গ্রামের এক রূপসী কন্যার প্রেমে পড়লো। দিনের পর দিন সে মেয়েটিকে প্রেম নিবেদন করেই যাচ্ছে, মেয়েটি কোনো সাড়া দেয় না। এভাবে অনেকদিন চলার পর একবার মেয়েটি ছেলেটিকে বললো, তুমি আমাকে কতোটা ভালোবাসো? জবাবে ছেলেটি বললো, তোমাকে আমি এতটাই ভালোবাসি যে তোমাকে পাওয়ার জন্যে আমি সব করতে পারি। মেয়েটি বললো, তুমি যদি তোমার মায়ের হৃৎপিণ্ড আমাকে এনে দিতে পারো, তাহলে আমি তোমার প্রস্তাবে রাজি হবো।

ছেলেটি এ কথা শুনে দৌঁড়ে বাড়ি গেলো, আর তার মায়ের কাছে গিয়ে সব বললো। সব শুনে মা হাসলেন, নিজের হৃৎপিণ্ডটা খুলে নিয়ে ছেলের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, যাও, তোমার প্রেয়সীকে এটি দিয়ে তাকে জয়করো।

মায়ের হৃৎপিণ্ডটা হাতে নিয়ে ছেলেটি প্রাণপণে ছুটলো তার পছন্দের সেই মেয়েটির উদ্দেশে। ছুটতে ছুটতে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে ছেলেটি মাটিতে পড়ে গেলো, তার হাত থেকে হৃৎপিণ্ডটা ছিটকে পড়লো দূরে। ছেলেটি খুঁজতে খুঁজতে সেটি পেয়ে কুড়িয়ে হাতে নিতেই মায়ের হৃৎপিণ্ডটি বলে উঠলো, ‘বাবা, ব্যথা পেয়েছিস?’

এই হলো মা; গল্পে আর বাস্তবে একই রকম।

মাকে নিয়ে এমন হাজারো গল্প রয়েছে। সবগুলোর মূলকথা আসলে এক; মা অতুলনীয়া, মায়ের সঙ্গে কারো তুলনা হয় না। সন্তানের সুখের জন্যে মা সব কষ্ট হাসিমুখে মেনে নিতে পারেন। মায়ের কাছে তাঁর সন্তানের চেয়ে বড় আর কিছু নেই। মায়ের চেয়ে বড় আর কোনো ঈশ্বর সত্যিই আছে? কে জানে!

সজীব সরকার

লেখক ও গবেষক

সহকারি অধ্যাপক; জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ

স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

Bootstrap Image Preview