Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৪ শুক্রবার, আগষ্ট ২০২০ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭ | ঢাকা, ২৫ °সে

মাকে দেওয়া কথা রেখেছেন ফায়ারম্যান সোহেল

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ১২:১৯ PM
আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ১২:১৯ PM

bdmorning Image Preview
সংগৃহীত ছবি


মায়ের দেওয়া কথা রেখেছেন ফায়ারম্যান সোহেল রানা। চাকরির নিয়োগপত্র পেয়ে মাকে সালাম করে বলেছিলেন ‘দোয়া করো মা। দেশের সেবায় যেন জীবন দিতে পারি’। বনানীর এফ আর টাওয়ারের আগুন নেভাতে গিয়ে নিহত সোহেল রানা। অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে আহত হয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

গত ২৮ মার্চ বনানীর এফআর টাওয়ারে দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। ভবনের ভেতরে আটকা পড়েছে শত শত মানুষ। আগুনের কুণ্ডলিতে মধ্যে মানুষগুলোর বেরিয়ে আসার আপ্রাণ আকুতি। এই মানুষগুলোকে উদ্ধারে অভিযানে যোগ দিয়েছিলেন ফায়ারম্যান সোহেল রানা। ২৩তলা ওই ভবনে আটকা পড়া মানুষদের ল্যাডারের মাধ্যমে নামাচ্ছিলেন তিনি।
সোহেল রানা বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ফায়ারম্যান ছিলেন। নিজের জীবন বাজি রেখে একের পর এক মানুষজনকে উদ্ধার করে নিচে নামাচ্ছিলেন।  

এ সময় ভবনের ভেতরটা আগুনের লেলিহান শিখায় আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। মানুষজন জানালার গ্লাস ভেঙে মাথা বের করে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছিল। এমনকি জীবন বাঁচাতে নিচে লাফও দেয় অনেকে।

এ পরিস্থিতিতে সোহেল চার-পাঁচজন আটকে পড়া ব্যক্তিকে উদ্ধার করে নিচে নামাতে চান। উদ্ধারকারী ল্যাডারটি ওভারলোড দেখাচ্ছিল। ওভারলোড হলে সাধারণত সিঁড়ি নিচে নামে না। স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক হয়ে যায়। তাই ল্যাডারের ওজন কমাতে একপর্যায়ে সোহেল নিজেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ল্যাডার থেকে নিচে নামার চেষ্টা করেন। যেন ল্যাডারটির ওজন কমে যায়।

এরপরই ঘটে দুর্ঘটনা। ল্যাডারের ভেতরে সোহেলের একটি পা ঢুকে যায়। এ সময় তার শরীরের সেফটি বেল্টটি ল্যাডারে আটকে পেটে প্রচণ্ড আঘাত লাগে। এরপর থেকেই সংজ্ঞাহীন সোহেল। দুর্ঘটনার পরপরই সোহেলকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রতিদিন চার ব্যাগ রক্ত দেয়া হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নতি হচ্ছিল না। পেটের ক্ষতের কারণে সমস্যা হচ্ছিল রানার।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য গেল ৫ এপ্রিল সোহেল রানাকে পাঠানো হয় সিঙ্গাপুর। তার দেখাশোনা করার জন্য ফতুল্লা ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার রায়হানুল আশরাফকেও তার সঙ্গে পাঠানো হয়। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে গেল সোমবার স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ১৭ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১৭ মিনিট) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মারা যান দেশের সেবায় নিয়োজিত এক রিয়েল হিরো। মায়ের কাছে দোয়া চেয়ে এই মৃত্যুই যেন চেয়েছিলেন সোহেল।

এদিকে সোহেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই তার বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। প্রিয় সন্তানের অকালমৃত্যুতে পাগলপ্রায় মা হালিমা খাতুন। বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন তিনি। বড় ভাইকে হারিয়ে কাঁদছে রুবেল ও দেলোয়ার। কৃষক বাবা নুরুল ইসলামও বাকরুদ্ধ। বড় বোন সেলিনা আক্তার করছেন বিলাপ। শুধু পরিবারের লোকজনই নয় এলাকাবাসীও যেন নিথর হয়ে গেছে তার এই মৃত্যুতে।

সোহেলের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার চৌগাঙ্গা ইউনিয়নের কেরুয়ালা গ্রামে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কিছুতেই কান্না থামছে না সোহেল রানার মা হালিমা খাতুনের। চারদিকে কান্নার রোল। প্রিয় ভাইয়ের মৃত্যুর খবরে বুক চাপড়ে মাতম করছেন ছোট দুই ভাই ও একমাত্র বোন। বাকরুদ্ধ বাবার চোখে শুধু পানি। এমন একজন পরোপকারী ও ভালো মানুষের মৃত্যুতে পুরো জেলার মানুষ যেন শোকাহত হয়ে পড়েছে।

সোহেল রানার ছোট ভাই রুবেল মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, সর্বশেষ গেল ১৫ মার্চ ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন সোহেল রানা। ছুটি শেষে ২৩ মার্চ তিনি কর্মস্থলে যোগ দেন।

তিনি আরো বলেন, ভাইই ছিলেন আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যু আমাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে। সামনে আমাদের জীবন অন্ধকার।

Bootstrap Image Preview