Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৪ রবিবার, মার্চ ২০১৯ | ৯ চৈত্র ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

'শুধুমাত্র নারী বলে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বৈষম্য করা হয়'

মেরিনা মিতু
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮ মার্চ ২০১৯, ০৩:০২ PM
আপডেট: ০৮ মার্চ ২০১৯, ০৩:০২ PM

bdmorning Image Preview


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফরিদা ইয়াসমিন। থাকেন হলে। একবার হলের বন্ধুদের নিয়ে বই মেলায় যান। আর সেখানে গিয়ে সম্মুখীন হোন এক অপ্রীতিকর ঘটনার। কোনো এক ঘটনার সূত্র ধরে তার এক রুমমেটের ওপর হুমরি খেয়ে পড়ে একদল ছেলে। মার্শাল আর্ট জানা ফরিদা তখন নিজেই সেই ছেলেদের শায়েস্তা করেন। 

সেদিনের সেই সাহসী শিক্ষার্থী ফরিদা ইয়াসমিন  বর্তমানে ওমেন সাপোর্ট এন্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের ডিসি। 

লালমনিরহাটের হিরামানিক গ্রামে বড় হওয়া ফরিদা ছোট থেকেই উদ্যমী ছিলেন। স্কুল জীবন থেকেি স্কাউটিংয়ের সাথে জড়িত ছিলেন। কলেজ পর্যন্ত পড়াশুনা মফস্বলেই শেষ করেন। পরে এসে ঢাকা বিশ্বাবদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে ভর্তি হন। তবে রোভারিংটা তিনি ছাড়েননি তখনও। ২০০২ সালে প্রথম মেয়ে হিসেবে প্রেসিডেন্ট রোভার স্কাউট এওয়ার্ডটাও লুফে নেন প্রেসিডেন্টের হাত থেকে।

ফরিদা ইয়াসমিন জানান, ছেলেবেলা থেকেই তার বাবা-মা তাদের ভাইবোনদের মধ্যে কোনো বৈষম্য করেননি। তাই তিনি নিজেকে মেয়ে ভেবে কোনো চ্যালেঞ্জ পাশ কাটিয়ে যাননি। কাউকে কাউকে নেতৃত্ব আর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার জন্য সাহসী হতে হবে। তাই বিসিএস পরীক্ষায় পছন্দের তালিকায় প্রথমই রেখেছেন পুলিশকে।

বিসিএস দিয়ে ফরিদার প্রথম পোস্টিং হয় মুন্সীগঞ্জে। সেখানে পারিবারিক মামলাগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় তার। গ্রামের নিরীহ মানুষের দুরবস্থা তাকে পেশার মাধ্যমে মানুষের জন্য কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে। সেখান থেকে স্পেশাল ব্র্যাঞ্চ হয়ে আসেন ইমিগ্রেশনে। তারপর প্রমোশন পেয়ে র্যাবের এডিশনাল এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলে যান পূর্ব তিমুর মিশনে। সেটা ২০১০-১১ সালের কথা। মিশন থেকে ফিরে আবার র্যাবে যোগ দেন। সেখান থেকে প্রমোশন পেয়ে সিআইডিতে চার বছর কাজ করেন। এ সময় ফরিদা বেশকিছু চাঞ্চল্যকর মামলায় কাজ করার সুযোগ পান। পরে আসেন ওমেন সাপোর্ট এন্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের ডিসি হয়ে।

পেশা হিসেবে মেয়েদের জন্য পুলিশের কাজ কতটা উপযোগী প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, মেয়েদের জন্য অবশ্যই পুলিশের কাজ উপযোগী। তবে অন্যসব পেশার মতো এখানোও সব যোগ্যতা থাকার পরও নারী বলে একজন বঞ্চিত হতে পারে। আমি শুধু নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বলবো না।  আমার পেশার অনেক মেয়ে সহকর্মী ও অন্য পেশা এবং বন্ধুদের সাথে কথা বলে উপলব্ধি করি, শুধুমাত্র নারী বলে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বৈষম্য করা হয়। আবার সংসারে কর্মজীবী নারীকে অধিক পরিশ্রম করতে হয়। 

ফরিদার স্বামী একই পেশায় আছেন। কাজের কারণে বেশির ভাগ সময় ঢাকার বাইরে থাকেন তিনি। তাই পুলিশি দায়িত্বের পাশাপাশি ফরিদাকে সংসারের সিংহভাগ দায়িত্ব পালন করতে হয়। তারপরও ফরিদা বলেন, তার কমিটমেন্টের কথা। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে তার সহকর্মী আর এনজিও ও চিকিত্সক সবাই একটি টিমে কাজ করেন। মানুষের যে কত রকম ঝুকিপূর্ণ অবস্থা হতে পারে তা না দেখলে বোঝা যায় না বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ফরিদা বলেন, ঝুকিপূর্ণ নারী, শিশু আর পুরুষের জন্য আমরা শুধু পেশাগত দায়িত্ব পালন করি না। আমাদের কাজটা মানবতার সেবা। আমি আমার পেশাগত দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে এই মানবিক দায়িত্ব পালন করে যেতে চাই।

ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, সর্বক্ষেত্রে নারীদের সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। তাদের অধিকার নিজেদেরই আদায় করতে হবে। নারীকে নারী নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। আমাদের সমাজের নারী-পুরুষের ব্যাপক বৈষম্য করা হয়। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না। একজন নারী কোনও অংশে পুরুষের চেয়ে কম নয়। তারা যে কোনও কাজ সুচারুভাবে সম্পাদন করতে পারে।

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সারা বিশ্বজুড়ে দিনটি নারী দিবস হিসেবে পালিত হলেও পৃথিবীর কোনো অংশে এটি উদযাপনের দিন, কোথাও বা প্রতিবাদের। নারীদের অধিকার, ঘরে-বাইরে নারীদের বৈষম্য, নারীদের অগ্রযাত্রা,সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বলেছেন ডিসি ফরিদা ইয়াসমিন। 

নারীকে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে

আমাদের সমাজে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সমস্যার সৃষ্টি করে সেটি হলো ঘরে ও বাইরে নারীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়। তার অধিকার হনন করা হয়। তাকে মানুষ হিসেবে না দেখে নারী হিসেবে দেখা হয়। এটি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

ঘরে -বাইরে নারীর অধিকার

নারীর অধিকার আদায়ের কথা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বলা হলেও তা আদায় হয় না। এছাড়া নারীরা বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়। যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে ধর্ষণ পর্যন্ত হচ্ছে। এর জন্য নারীদের আরো বেশি অ্যাকটিভ হতে হবে। ফিজিক্যালি ভাষা হোক প্রতিবাদের ভাষা। নারীকে না বলা শিখতে হবে।

বেতন বৈষম্য

কর্মক্ষেত্রে এখনো নারী কর্মীদের বেতন বৈষম্য হয়। একজন নারী পুরুষের চেয়ে বেশি কাজে দক্ষ হলেও তাকে মূল্যায়ন করা হয় না। এছাড়া তাদের অগ্রগতির পথে সব সময় বাধা দেয়া হয়। সুযোগ দেয়া তো অনেক দূরের বিষয়।

স্বামীকে সহযোদ্ধা মনোভাব রাখতে হবে

একজন স্বামীর সব সময় মনে রাখতে হবে- স্ত্রী আমার জীবনসঙ্গী আমার সংসার জীবনের সহযোদ্ধা। তাকে অবমূল্যায়ন করা যাবে না।

সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক সহযোগিতা

নারী এগিয়ে যাওয়ার জন্য সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক সহযোগিতা অনেক প্রয়োজন। সমাজকে একটি বিষয় বোঝাতে হবে নারী শুধু ঘরের কাজের জন্য নয়। নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণে গড়ে উঠতে পারে একটি সুন্দর দেশ ও সমাজ।

Bootstrap Image Preview