Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৫ শনিবার, মে ২০১৯ | ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

একজন দজ্জাল নারী সার্জেন্ট এবং ১৩ হাজার ৩২৯ জন নারী পুলিশ

মেরিনা মিতু
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮ মার্চ ২০১৯, ০১:৩৭ PM
আপডেট: ০৮ মার্চ ২০১৯, ০২:৪৩ PM

bdmorning Image Preview
ছবিঃ বিডিমর্নিং


নতুন বাইক কিনেছে রাসেল। ক্যাম্পাসের বড় ভাই শিখিয়ে পড়িয়ে নিচ্ছেন নিয়ম-কানুন গুলো। পকেটে ৫০ কি ১০০ টাকা আলাদা করে রেখে দিবি। রাস্তায় মাঝেমধ্যে দরকার পড়বে। কিন্তু খবরদার মহিলা সার্জন টার্জন থাকলে দূর দিয়া যাবি কিংবা অন্য রাস্তায় যাবি। যে মহিলারা নিজের স্বামীরে ছাড় দেয় না সে তোরে কি দিব? বুঝোস নাই?

'শামিম বাইক থামা, বাইক থামা। হেলমেটটা পইড়া লো। সামনে ঐ দজ্জাল সার্জন। টেহা দিলেও ছাড়বোনা, মামলা একখান দিয়াই দিব।' 

তেজগাঁও শিল্প এলাকার ব্যস্ত রাস্তায় বাইকে থাকা মাঝবয়সী দুই ব্যক্তি এভাবেই আলোচনা করতেছিলেন। সামনে তাকায় দেখি একজন মহিলা সার্জন দাঁড়িয়ে রয়েছেন। বুঝতে বাকি নেই বাইকে থাকা দুজন উনাকেই ইঙ্গিত করে কথা বলছিলেন।মুখ ফসকে হলেও স্বীকার করেছেন মহিলা সার্জনের সততার কথা। 

রোদ মাথার উপর চড়াও হয়ে বসেছে যখন ঠিক সে মূহুর্তে যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণের কাজ করছেন সার্জেন্ট আসমা। 

বাংলাদেশের সর্বত্র যেখানে নারীদের জয়জয়কার। সেখানে পিছিয়ে নেই পুলিশ বাহিনীতেও। ১৯৭৪ সালে মাত্র ১৪ নারী কনস্টেবল দিয়ে যাত্রা শুরু হওয়া পুলিশ বাহিনীতে বর্তমানে নারী পুলিশের সংখ্যা ১৩ হাজার ৩২৯ জন। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে চলেছেন তারা দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে। তাদের হাতে ছোট থেকে ভারি অস্ত্র, শোভা পাচ্ছে ওয়্যারলেস সেট। মাথায় হেলমেট দিয়ে অংশ নিচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে। কাজ করছেন যান চলাচল নিয়ন্ত্রণেও। বর্তমান সরকার পুলিশ বাহিনীতে নারীর অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত করতে জাতিসংঘ মিশনেও নারীদের পাঠাচ্ছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। জাতিসংঘে শান্তি রক্ষায় পুরুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন। নারী পুলিশের অগ্রযাত্রা এখন চোখে পড়ার মতো।

আর এক ধাপ পদোন্নতি হলেই নারী পুলিশ হবেন পুলিশ প্রধান (আইজিপি)। আর একজন নারী যদি পুলিশের আইজি হন তাহলে পুলিশ বাহিনীর শীর্ষেও স্থান করে নেবেন একজন নারী। নারী পুলিশ আগ্নেয়াস্ত্র গোলাবারুদ হাতে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করছেন। সেবামূলক কাজ করছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাজপথে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট করছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছেন নারী পুলিশ সদস্যরা। পুলিশ সদর দফতর সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

পুলিশ সদর দফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ স্টাফ কলেজের এডিশনাল আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন একমাত্র নারী এডিশনাল আইজিপি রৌশন আরা। আর এক ধাপ পদোন্নতি পেলেই তিনি হয়ে যেতে পারেন পুলিশ প্রধান (আইজিপি)। আর পুলিশ প্রধান হলেই পুলিশ বাহিনীতে একজন নারী আইজিপি। এরপরই আছেন চার এডিশনাল ডিআইজি। এরা হচ্ছেন সিআইডি পুলিশের এডিশনাল ডিআইজি রওশন আরা বেগম, সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার আমেনা বেগম, স্পেশাল ব্রাঞ্চের এডিশনাল ডিআইজি রখফার সুলতানা ও র‌্যাবের এডিশনাল ডিআইজি আতিকা ইসলাম। পুলিশ সুপার পদে গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার ও রাজবাড়ী জেলা পুলিশ সুপার আসমা সিদ্দিকা মিলি সফলতার সাক্ষর রেখে চলেছেন।

রাজবাড়ী জেলা পুলিশ সুপার আসমা সিদ্দিকা মিলি বলেছেন, পুরুষের তুলনায় নারীরা পিছিয়ে থাকার তো কোন কারণ দেখি না। আমরাও তো সমান তালে পরীক্ষায় পাস করে এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে যোগ্যতার ভিত্তিতেই পুলিশ বাহিনীতে ঢুকেছি। নারী হিসেবে কি আমাদের কোন রকম ছাড় দেয়া হয়েছে? অবশ্যই না। সুতরাং পুলিশ সুপার হিসেবে শুধু নয় বাংলাদেশ পুলিশের যেকোন ইউনিটে একইভাবে কাজ আগেও করেছি ভবিষ্যতেও করব। তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীতে এক সময় হাজারো সমস্যা বিদ্যমান ছিল। বর্তমান সরকার সেগুলো সমাধান করেছে। এখনও কিছু সমস্যা আছে। সীমাবদ্ধ সম্পদের মাঝেও সরকার পর্যায়ক্রমে সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনবান্ধব এবং পুলিশ বান্ধব সরকার। সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পুলিশ বাহিনীর জন্য অর্থ খরচ করাটাকে ব্যয় মনে না করে ইনভেস্টমেন্ট মনে করেন। তিনি মনে করেন, পুলিশ বাহিনীর সমস্যা দূর হলে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে দায়িত্ব পালন করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভাল রাখতে পারবে। আর তাতে জনগণ স্বস্তিতে থাকবে, নিরাপদে থাকবে দেশও স্থিতিশীল থাকবে। এতে দেশে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে, সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে দেশ।

পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানা গেছে, পুলিশ সদর দফতর থেকে শুরু করে পুলিশের সব ইউনিটেই এখন নারী সদস্যরা কাজ করছেন। কয়েকটি ইউনিটের নেতৃত্বেও আছেন নারীরা। সারাদেশের ৮টি ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টার এবং ডিএমপির উইমেন সাপোর্ট এ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন পরিচালনা করছেন নারী সদস্যরাই।

জাতীয় জরুরী সেবা ৯৯৯-এ কল টেকার হিসেবে ইতোমধ্যে নিজেদের প্রতিভার পরিচয় দিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছেন। এমনকি রাজপথে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণেও নারী সদস্যরা সবার দৃষ্টি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছেন। তারা নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলার তদন্তও করছেন। পুলিশে সার্কেল এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অনেক নারী সদস্য।

এখন কনস্টেবল থেকে এডিশনাল আইজি পর্যন্ত সব জায়গায় নারী পুলিশের সরব উপস্থিতি। পুলিশের নারী সদস্যরা মেধা, যোগ্যতা আর দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে দেশ-বিদেশে কাজ করছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নারী সদস্যরা শুধু বাংলাদেশ নয় সারা বিশ্বের পুলিশের সঙ্গে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যরা এখন নিয়মিত। তারা প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা উপার্জন করে বাংলাদেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করছেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটনের এডিশনাল ডি আই জি মিজানুর রহমান বলেন, 'নারী কিংবা আলাদা পরিচয়ে না, তাদের একমাত্র পরিচয় তারা পুলিশ পরিবারের সদস্য। যেমন একজন যোদ্ধার পরিচয় সে যোদ্ধা। নারীরা জীবন দৌড়ে অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছেন তার উজ্জ্বল দৃষ্ঠান্ত পুলিশ বাহিনীতে নারীদের সংখ্যা। মাত্র ১৪ জন যা হাতের আঙ্গুলে গোণা যেত, এখন সেটা মুখের গোণাকেও পিছনে ফেলেছে। আমরা সামণে চেষ্টা করবো এ সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করতে।' 

পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে পুলিশ বাহিনীতে ১৪ কনস্টেবল নিয়োগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশে নারী পুলিশের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এ সংখ্যা ১৩ হাজার ৩শ’ ২৯। বর্তমানে নারী পুলিশের এডিশনাল আইজি ১, অতিরিক্ত ডিআইজি ৪, পুলিশ সুপার ৭২, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ১০১, সহকারী পুলিশ সুপার ৯৬, ইন্সপেক্টর ৮শ’ ৭৯, এসআই ৭শ’৬৭, সার্জেন্ট ৫৫, এএসআই ১ হাজার ২৬, নায়েক ১১ হাজার ২ ও কনস্টেবল ১৩ হাজার ৩শ’ ২৯ জন।

আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, নারী হোক পুরুষ হোক-সবাই পুলিশ বাহিনীর সদস্য। নারী পুলিশ সদস্যকে আমরা পুলিশ সদস্য হিসেবেই ট্রিট করি। তারা পুলিশ সদস্য হিসেবেই বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালন করে নিজেদের যোগ্যতা ও দক্ষতার সাক্ষর রাখছেন। অস্ত্র হাতে অভিযান পরিচালনা, সেবামূলক কাজ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, রাজপথে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও নারী সদস্যরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছেন।

Bootstrap Image Preview