Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৩ শনিবার, মার্চ ২০১৯ | ৮ চৈত্র ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

সৌদিতে কর্মসংস্থান সংকট, হুমকির মুখে দেশের অর্থনীতি

ইসতিয়াক ইসতি
ক্রাইম রিপোর্টার
প্রকাশিত: ০৭ মার্চ ২০১৯, ০৩:২৭ PM
আপডেট: ০৭ মার্চ ২০১৯, ০৩:২৭ PM

bdmorning Image Preview


কান্নার শব্দের প্রায় প্রতিদিন রাতে ভারি হয়ে উঠছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ।এই কান্না মধ্যপ্রাচ্যের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের। আরো সুনির্দিষ্ট করে বলে সৌদি ফেরত প্রবাসী শ্রমিকদের। বিভিন্ন সময় অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরা নারীদের নিয়ে নানা কার্যক্রম হলেও আধারে থেকে যাচ্ছে পুরুষ শ্রমিকদের দেশে ফেরার করুণ গল্পগুলো।

বাংলাদেশের ৫০৭টি  উপজেলার  ৪,৪৮৪টি ইউনিয়নের প্রতি গ্রামের যুব থেকে শুরু করে মধ্য বয়সী পুরুষদের একটি বড় অংশ ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বিদেশে পারি দেয়ার স্বপ্ন দেখে। আর খরচ কম ও অ্যাজেন্সির গুলোর লোভনীয় সব প্রলোভনের ফাঁদে আটকে কোনো রকম যাচাই বাচাই ছাড়া প্রতি মূহূতে অনিশ্চিত প্রবাস জীবনের দিকে আগ্রসর হচ্ছে এদের একটি বড় অংশ।

তাঁদের একজন লক্ষ্মীপুরের মোহাম্মদ সাইফুল উদ্দিন। ২০১৮ সালের আগস্টে মাসে ভগ্নিপতি কাছ হতে উচ্চ সুধে টাকা নিয়ে পারি জমান সৌদিতে। কিন্তু বছর না ঘুরতেই চলতি মাসের(মার্চ) ২ তারিখে দেশে ফিরতে হয়েছে তাঁকে।

মোহাম্মদ সাইফুল উদ্দিন শনিবার( ২ মার্চ) রাতে ১০ টা ৪৫ মিনিটে দেশে ফিরলেও এখন পর্যন্ত নিজের গ্রামের বাড়ি ফিরে যাওয়া হয়নি। তাঁর সাথে যোগাযোগ করে কথা হলে তিনি বলেন, ভাই আমি কিভাবে বাড়ি যাব। আমার এই চেহারা দেখলে আম্মা আব্বা মারা যাবে। দুলা ভাই টাকার চিন্তায় বড় বোনেকে মারবো। কেমনে গ্রামে যাই ভাই।

মাত্র সাত মাসে কেন ফিরে আসতে হলো আপনাকে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ভাইয়া আমি যে  অ্যাজেন্সির মাধ্যমে সৌদি গিয়ে ছিলাম তারা বলেছিলো আমাকে একটা রুটির বেকারিতে কাজ দিবে। খাওয়া ও থাকা মালিকের এবং মাসিক বেতন বাংলাদেশের ৪০ হাজার টাকা দিবে। কিন্তু আমাকে নিয়ে কাজ দেওয়া হয় একটি বাড়ির(৬তলা ভবন) টয়লেট পরিষ্কারের কাজ। মাসে বেতন দিয়েছে মাত্র ২৮ হাজার টাকা। তাতেও কষ্ট করে আমি থেকে গিয়ে ছিলাম। কারণ আমার দুলাভাইয়ের থেকে নেওয়া ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা সুদসহ দেড় বছরের মধ্যে দিতে হবে।

তাহলে হঠাৎ করে দেশে চলে আসলেন কেন ?

ভাই আসলে আমি আসতে বাধ্য হয়েছি। জানুয়ারি মাসে আমাকে মাত্র ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে । আর অত্যাচারের বিষয়ে নাই বলি।  বিদেশের মাটিতে আমরা বড় অসহায়। আমাদের দেশে যারা ভিক্ষা করে তাঁরাও আমাদের চেয়ে ভালো থাকে।

কি রকম নির্যাতন করা হয় এমন প্রশ্নের উত্তরে নিজের গায়ের কাপড় তুলে দেখান সাইফুল উদ্দিন। পিঠে ও বুক জুড়ে কালো কালো দাগ। সাইফুল উদ্দিন জানান এগুলো হচ্ছে বেল্টের মারের দাগ। কাজে ভুল হলেই নানা ভাবে তাঁদের নির্যাতন করা হত।

সাইফুল উদ্দিন একা নয়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব থেকে আসা একাধিক প্রবাসী একই তথ্য দিয়েছেন। জানিয়েছে বর্তমানে সৌদি ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে বাংলাদেশিদের।

সৌদি থেকে ফিরে আসা কয়েকজনের সঙ্গে কথা  বলে জানা যায় , অর্থনৈতিক মন্দাভাব কাটিয়ে ওঠার জন্য বর্তমানে সৌদি সরকার বেশির ভাগ  প্রতিষ্ঠানগুলোকে সৌদিকরণের নীতি হাতে নিয়েছেন। যার ফলে নানা সমস্যার সম্মুখিন হতে হচ্ছে বাংলাদেশি প্রবাসীসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের।

ময়মনসিংহের সাঈদ আহমেদ দেশে ফিরেছেন ফেব্রুয়ারি মাসের ২৭ তারিখে । তাঁর সাথে কথা হলে তিনি বলনে, ‘আমি প্রায় ৬ বছর সৌদি আরবে ছিলাম। এমন নির্যাতনের আগে দেখি নাই। চোখের সামনে কী দেশ কী হয়ে গেল! ১০০ জনের মধ্যে ৯৫ জন(শুধু পুরুষ) বাংলাদেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।

আপনি কেন ফিরে আসছে বাধ্য হলেন, আপনি তো দীর্ঘ দিন থেকে ওইখানে  ছিলেন?

বর্তমানে সৌদিতে কর্মসংস্থানের ব্যাপক সংকট চলছে। অনেক কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে। আমার কর্মস্থালসহ আশে পাশের না হলেও শতাধিক কোম্পানি বন্ধ হয়েছে। আর নতুন যে চাকরি পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোর বেতন আগের বেতন হতে ৫০ থেকে ৪০ শতাংশ কম। উপর দিকে সৌদিতে সকল পণ্যের উপরে তো অধিক কর আছেই। একটা সময় সরকারের থেকে ফ্রি পানি পাওয়া যেত। এখন সেই পানি কিনে খেতে হয়।

তিনি আরো জানান, বর্তমানে একজন বাংলাদেশির বেতন কমে দাঁড়িয়েছে ৭০০ থেকে ১ হাজার রিয়াল। আর  আকামা নবায়নের জন্য একজন শ্রমিককে দিতে হচ্ছে ১ হাজার রিয়াল । ইন্স্যুরেন্স বাবদ  দিতে হচ্ছে ২০০ রিয়াল। থাকা ও খাওয়াও নিজের যার জন্য খরচ হচ্ছে ২০০ টাকা। আর অন্য খরচ বাবদ খরচ খরচ হয়ে যাচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা( পানির বিল, বিদ্যুৎ বিল) । আর অর্থাভাবে অনেকই এখন আকামা নবায়ন করতে পারছে না। ফলে তারা সৌদি আইনে অবৈধ বলে গণ্য হচ্ছে । এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শত শত বাংলাদেশিদের আটক করে বিভিন্ন মামলা দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

বর্তমান সৌদি পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ দিন অভিবাসন বিষয়ে কাজ করা হাসান আহমেদ চৌধুরী সাথে কথা বললে তিনি বলেন,  সৌদির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি প্রবাসীদের জন্য ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। এখন-ই আমাদের উচিৎ মধ্যেপ্র্যচের শ্রম বাজার থেকে বেড়িয়ে আসে ইউরোপ, জাপান, সিঙ্গাপুরের দিকে আমাদের নজর দেওয়া। কারণ এদেশ গুলোতে  দিন দিন বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাহিদা বাড়ছে। অন্যদিকে সৌদিসহ মধ্যপ্র্যাচের দেশগুলোতে মূলত ভবন নির্মানের কাজের জন্য একটা সময় আমাদের দেশের লোক নিত। কিন্তু বর্তমানে এই দেশ গুলোতে এই কাজের সংখ্যা অনেক কম। যার ফলে তারা বাংলাদেশিদের আর রাখতে চাচ্ছে না।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব রৌনক জাহান বলেন, সৌদি আরবের পরিস্থিতি আমরা সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। আমাদের শ্রমিকরা যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য প্রতিনিয়ত আমরা সৌদি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছি। যারা নির্যাতিত হচ্ছেন, তারা বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে প্রতিকার পাচ্ছেন।

জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সভাপতি বেনজির আহমেদ এবিষয়ে জানান, অর্থিক মন্দার কারণে সৌদি সরকার নিজ নাগরিকদের বেকারত্ব দূর করতে দেশটি ৩৬ ব্যবসাকে সৌদি নারী-পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। যার ফলে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে প্রবাসী শ্রমিকরা। সরকার যদি এখনি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে তাহলে সামনে বাংলাদেশের রেমিন্টিসের উপরে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। যা আমাদের বার্ষিক বাজেটের উপরে চাপ সৃষ্টি করবে। 

Bootstrap Image Preview