Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২২ মঙ্গলবার, অক্টোবার ২০১৯ | ৭ কার্তিক ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

চিরনিদ্রায় পলান সরকার পাশে তার পাঠাগার

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২ মার্চ ২০১৯, ০৫:১৭ PM
আপডেট: ০২ মার্চ ২০১৯, ০৫:১৯ PM

bdmorning Image Preview
সংগৃহীত


বই প্রেমী পলান সরকার, কে না জানে তার নাম? অবশেষে দুনিয়ার মায়া সাঙ্গ করে পারি জমালেন পরপারে। নিজের বাড়ির সঙ্গে গড়ে তোলা পাঠাগারের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন এই বইপ্রেমী চির তরুণ প্রাণ।

আজ শনিবার (২ মার্চ) সকাল ১০টার দিকে বাঘার হারুনুর রশিদ শাহ দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে তারা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে পাঠাগারের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

জানাজার আগে জেলা প্রশাসক এসএম আব্দুল কাদের ও জেলা পুলিশ সুপার মো. শহীদুল্লাহসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের উদ্যোগে তার মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

একুশে পদকপ্রাপ্ত বইপ্রেমী পলান সরকার শুক্রবার দুপুরে ৯৮ বছর বয়সে বাঘার বাউসায় নিজ বাড়িতে বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান।

নিজের টাকায় বই কিনে পাঠকের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বই পড়ার আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য ২০১১ সালে একুশে পদক পান পলান সরকার। ২০০৭ সালে জেলা পরিষদের অর্থায়নে তার বাড়ির আঙিনায় একটি পাঠাগার করে দেওয়া হয়। সারা দেশে তাকে অসংখ্য সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। তাকে নিয়ে 'সায়াহ্নে সূর্যোদয়' নামে শিমুল সরকার একটি নাটক নির্মাণ করেছেন। চ্যানেল আই তা প্রচার করেছে।

বাঘা উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা বাউসা থেকে বইয়ে আলো ছড়িয়ে সারা দেশকে আলোকিত করতে চেয়েছিলেন পলান সরকার। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা গ্রাম থেকে বই বিলি করে গেছেন তিনি। বিশেষ করে গৃহিনীদের এনেছেন পাঠকের তালিকায়। বইয়ের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে আশপাশের অন্তত ২০ গ্রাম।

প্রথমে আশপাশের দশ গ্রামের মানুষই কেবল জানতেন পলান সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে। ২০০৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিটিভির জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ তাকে তুলে আনে আলোকিত মানুষ হিসেবে। এরপর তিনি ২০১১ সালে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক লাভ করেন।

২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম ডে’ উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার দৈনিকে তার ওপর প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। তার জীবনের ছায়া অবলম্বনে নির্মিত হয় নাটক, বিজ্ঞাপন চিত্র। শিক্ষা বিস্তারের অন্যান্য আন্দোলন গড়ে তোলায় ইউনিলিভার বাংলাদেশ পলান সরকারকে ‘সাদা মনের মানুষ’ খেতাবে ভূষিত করে।

পলান সরকারের পাঠাগার জুড়ে থরে থরে সাজানো বই। একটি বইয়ের তাকে সাজানো পলান সরকারের যাবতীয় অর্জন। দেয়ালে ঝোলানো হরেক ছবি।

১৯২১ সালের ১ আগস্ট নাটোরের বাগাতিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন পলান সরকার। বাবা-মা নাম রেখেছিলেন হারেজ উদ্দিন সরকার। তবে মা ‘পলান’ নামে ডাকতেন। তার পাঁচ বছর বয়সে বাবা হায়াত উল্লাহ সরকার মারা যান। এরপর আর্থিক সংকটে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় চতুর্থ শ্রেণিতেই। পরে নানা ময়েন উদ্দিন সরকার তার মা মইফুন নেসাসহ পলান সরকারকে নিয়ে আসেন নিজ বাড়ি বাউসায়।

সেখানকার স্কুলে ভর্তি হন তিনি। ষষ্ঠ শ্রেণির পর ইতি টানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার। তবে থেকে যায় বই পড়ার নেশা। প্রথমে বই ধার করে এনে পড়তেন। তার নানা ময়েন উদ্দিন সরকার ছিলেন স্থানীয় ছোটমাপের জমিদার। যৌবনে তিনি নানার জমিদারির খাজনা আদায় করতেন। দেশভাগের পর জমিদারি ব্যবস্থা বিলুপ্ত হলে বাউসা ইউনিয়নে কর আদায়কারীর চাকরি পান তিনি। নানার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ৪০ বিঘা জমির মালিকানাও পান।

ব্রিটিশ আমলেই তিনি যাত্রাদলে যোগ দিয়েছিলেন। অভিনয় করতেন ভাঁড়ের চরিত্রে। লোক হাসাতেন। আবার যাত্রার পাণ্ডুলিপি হাতে লিখে কপি করতেন। মঞ্চের পেছন থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সংলাপও বলে দিতেন। এভাবেই বই পড়ার নেশা জেগে ওঠে তার।

১৯৬৫ সালে ৫২ শতাংশ জমি দান করে বাউসা হারুন অর রসিদ শাহ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন পলান সরকার। ১৯৯০ সাল থেকে বাউসার ওই বিদ্যালয়ে মেধাতালিকায় থাকা প্রথম ১০ জনকে বই উপহার দিতে শুরু করেন।

এরপর অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও বইয়ের আবদার করলে সিদ্ধান্ত নেন তাদেরও বই দেবেন। শর্ত দেন পড়ার পর তা ফেরত দেয়ার। এরপর গ্রামের মানুষ ও তার কাছে বই চাইতে শুরু করেন। ১৯৯২ সালে ডায়াবেটিকসে আক্রান্ত হন পলান সরকার। ওই সময় তিনি হাঁটার অভ্যাস করেন। এরপর বাড়ি বাড়ি হেঁটে বই পৌঁছে দেয়া শুরু করেন।

Bootstrap Image Preview