Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২১ মঙ্গলবার, মে ২০১৯ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

‘কপিরাইট আইন প্রতিষ্ঠা করে বছরে শত কোটি টাকা আয় সম্ভব’

মেরিনা মিতু
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৯, ০৮:১২ PM
আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৯, ০৯:২৩ PM

bdmorning Image Preview


ওলোরা আফরিন। পেশায় একজন আইনজীবী। তবে তার পরিচয় শুধুমাত্র এখানেই থেমে নেই। তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা আসনে আওয়ামী লীগের একজন এমপি প্রার্থীও ছিলেন। 

তবে চমকটা অন্য একটি জায়গায়। পেশায় আইনজীবী এই নারী দেশকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা দেয়ার লক্ষ্যে ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট সেক্টর' এ গবেষণা শুরু করেন। স্বউদ্যোগে নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি দেশের শিল্পীদের তাদের প্রাপ্য রয়্যালিটি বুঝিয়ে দেয়া, সম্পদের মর্যাদা রক্ষা ও সংরক্ষণের পাশাপাশি রয়্যালিটি খাত থেকে দেশের জন্য নতুন আয়ের উৎস সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছেন। আর সেই পরিকল্পনার একটি সম্ভাবনার কথা জানলে হয়তো বেশ অবাকই হবেন সবাই। আর তা হলো, বাংলদেশে কপিরাইট আইনকে প্রতিষ্ঠিত করে রয়্যালিটি খাত থেকে প্রতি বছরে আনুমানিক একশত কোটি টাকা সরকারি তহবিলে ঢুকানো সম্ভব। 

মাত্র ১৬ বছর বয়সেই আর্ত-মানবতার সেবায় মেয়েদের সাবলম্বী হওয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করা আফরিন মানিকগঞ্জের সিংগাইর থানার মেয়ে। বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ওয়াজেদ আলী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আইন উপদেষ্টা। এলএলবি অনার্স শেষে লিংকনস ইন থেকে  বার-এট-ল ডিগ্রি অর্জন করে ২০১২ সালে দেশে ফিরে আসেন। তখন থেকেই তিনি বাংলাদেশে কপিরাইট আইন এবং তার রয়্যালিটি নিয়ে কাজ করে যান এবং এ লক্ষ্যে দেশে প্রথমবারের মত তাকে আইনি সহায়ক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় অধিনস্থ কপিরাইট অফিস।

কপিরাইট অফিসে নিয়োগের ব্যাপারে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আফরিন বলেন, গতবছরের কপিরাইট দিবসের সেমিনার হয়েছিলো জাদুঘরে। সেখানে শিল্পীরা অভিযোগ করছিলো আমরা দেশের জন্য এতো কিছু করার বিপরীতে সরকার আমাদের কি দিচ্ছে? আমাদের গান দেশে বিদেশে যায়, দেশের সম্পদ হওয়ার পরেও আমরা সঠিক মূল্য পাচ্ছি না।

তখন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বললেন, 'কি সমস্যা তোমাদের? তোমরা কি চাও?' শিল্পীরা তখন কথার উত্তরে বললেন যে, 'আমরা আইনী সহায়তা পাই না, আমাদের গাইড করার মতো কেউ নেই।'

এ কথা শুনে আমি স্বেচ্ছাসেবী মনোভাবে বললাম, কি সার্ভিস লাগবে, আমি সময় দিব। মন্ত্রী সাহেব তখন বললেন এই মেয়ে যেহেতু নিজে থেকে এই দায়িত্ব নিতে চায় তখন একেই দায়িত্ব দাও কপিরাইট অফিসে।

সেই থেকে সপ্তাহে একদিন করে বসেন তিনি আইনী সেবা প্রদানের জন্য। মজার বিষয় হলো, তার আগে দীর্ঘ ৪৫ বছরে এই দায়িত্বে কেউ ছিল না। ব্যারিস্টার আফরিনই প্রথম যে কিনা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় অধিনস্থ কপিরাইট অফিসে আইনি সহায়ক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। 

ব্যারিস্টার আফরিন বলেন, কপিরাইট আইন বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরত্বপূর্ণ। কারণ এই সেক্টরে আয়ের উৎস অনেক বেশি এবং এখনো অব্দি এটা নিয়ে কোনো কাজ করা হয়নি। কপিরাইট আরও এজন্য দরকার কারণ আমাদের দেশের শিল্পীরা, প্রডিউসাররা তাঁরা কোনো রয়্যালিটি পায়না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো এগ্রিমেন্ট করে সেটা কিনে নেয়নি মানে সেটা থেকে কি পরিমানের রয়্যালিটি আসতেছে সেটার কোনো নির্দিষ্ট পরিমাপ নাই। যার ফলে এই যে শিল্পী এবং তাদের পরিবার পুরো রয়্যালিটি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কতোটুকু টাকা রয়েলিটি থেকে উঠতেছে সেটার ইনকাম ট্যাক্স কোনোকিছুরই সরকারিভাবে কোনো রেকর্ড নাই।

'একজন গান গাইতেছে সে জানেনা তার মৌলিক অধিকার কি! একজন পেইন্ট করতেছে সেও জানেনা তার অধিকার সম্পর্কে। এই যে এতো মেধা এতো সবকিছু, তাদের গাইড করবে কে?' বলেন আফরিন। 

ব্যতিক্রমধর্মী কাজ করতে ভালোবাসা এই আইনজীবী এই রয়্যালিটি নিয়ে কাজ করছেন আজ প্রায় তিন বছর। জাপানেও গিয়েছিলেন এ সংক্রান্ত কাজে।

তিনি বলেন, জাপানে এই রয়্যালিটির ব্যবসা ৩০ বছরের। আর আমাদের কেবলই শুরু। তাদের মতো করে আমাদের দেশে এখনো এটি গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাই সবার আগে যেটি প্রয়োজন তা হলো এ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। দেশি-বিদেশি সেমিনারের আয়োজন করতে হবে। তাছাড়া সাংস্কৃতিক বিষয়ে সরকারি বাজেটও অনেক কম। তাই গণসচেতনতা বৃদ্ধি করাটাই মূলত জররি। আর এই সচেতনতা বৃদ্ধি করে কপিরাইট আইন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে প্রতিবছর দেশের ১০০ কোটি টাকা বাঁচানো সম্ভব।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে 'উইমেন ইন আইপি' নামে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানও প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এখানে সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিচিত্র পেশার নারীরা তাদের মেধা সম্পদ সংরক্ষণ বিষয়ক সচেতনতা, ট্রেনিং এবং আইনী সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন। 

স্থানীয় সূত্রমতে, তিনি আর্ত-মানবতার সেবায় নিজ এলাকায় ২০১৫ সাল থেকে ব্যারিস্টার আশফাক মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন এর মাধ্যমে দুস্থ, অসহায়, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছেন।

'অচিরেই আমার নিজের এলাকা মানিকগঞ্জে স্বাস্থ্য সেবাটা নিয়ে কাজ করবো। বিশেষ করে নারী ও শিশু স্বাস্থ্য সমস্যাটাকেই বড় করে দেখতেছি। তাছাড়া শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, নারী-শিশু নির্যাতন, গর্ভবতী নারীদের নিউট্রিশন নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে চাই' যোগ করেন ব্যারিস্টার আফরিন। 

সবাই যে রাস্তায় চলে সেখানে হাঁটার চাইতে সেখানে নিজের বানানো রাস্তায় হাঁটতে চান তিনি, যার মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন বিদ্যমান। বাংলাদেশের সবাই কপিরাইট আইন মেনে চলবে এটাই তার স্বপ্ন।  

Bootstrap Image Preview