Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৫ বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২০২৪ | ১২ বৈশাখ ১৪৩১ | ঢাকা, ২৫ °সে

শার্শায় ৮০ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেই কোনো শহীদ মিনার 

শহিদুল ইসলাম, বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধিঃ
প্রকাশিত: ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৯, ১২:০১ PM
আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৯, ১২:০১ PM

bdmorning Image Preview


বাঙালি জাতির গর্ব ও অহংকারের দিন একুশে ফেব্রুয়ারি। আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত এই দিনটি। অথচ ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে যশোরের শার্শায় ৮০ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো শহীদ মিনার নেই শুরু থেকে।

সরকারিভাবে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন করার নির্দেশ রয়েছে। পালন করাও হয়। সেটা শহীদ মিনার ছাড়াই। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার না থাকায় ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারেনা শিক্ষার্থীরা।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছরেও যশোরের শার্শা উপজেলায় অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মিত হয় নি। বিশেষ করে উপজেলার ৩৩টি মাদ্রাসার একটিতেও শহীদ মিনার নেই। তাছাড়া প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়েও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই। ফলে ওই সব প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবস ও শহীদ দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন হয় না বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ আছে।

এসব কলেজ, স্কুল ও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটিতে সমাজের নামীদামী ব্যক্তিরা শীর্ষ পদে থাকলেও দীর্ঘদিনেও শহীদ মিনার নির্মাণ করতে পারে নি। নেয় নি কোন উদ্যোগ। শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে ও বরণে। ফলে নানা ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে ভাষাপ্রেমী মানুষের মধ্যে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, শার্শায় ২৬৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ১২৬ টি প্রাথমিক ও প্রি-ক্যাডেট এবং কমিউনিটি মিলিয়ে আরো রয়েছে ৫৪টি। এদের মধ্যে শহীদ মিনার আছে মাত্র ১৮ টিতে। ৩৮ টি হাইস্কুলের মধ্যে ২৬টিতে শহীদ মিনার আছে। ১২ টি কলেজের মধ্যে মাত্র ৩ টিতে শহীদ মিনার আছে। ৩৩ টি মাদরাসার মধ্যে একটিতেও কোনো শহীদ মিনার নেই। সব মিলিয়ে অর্ধ-শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার আছে। এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করা হয়।

অভিযোগ আছে, মাদ্রসাগুলোতে দিবসটি পালন করা হয় না। কোনো কোনো মাদ্রাসায় নাম মাত্র মিলাদ মাহফিল ও পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা প্রশাসনসহ ব্যক্তি উদ্যোগে গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো শহীদ মিনার নির্মাণ না হওয়ায় ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারেন না শিক্ষার্থীসহ এলাকার মানুষ।

উপজেলার নাভারণ বুরুজবাগান ফাজিল মাদরাসার সুপার এ কিউ এম ইসমাইল হোসাইন জানান, মাদ্রাসাটি ১৯৬৫ সালে নির্মিত হলেও অদ্যবধি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয় নি। তবে আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা ও শহীদ দিবস পালন করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

একই দাবি করেন উপজেলার লক্ষণপুরের রহিমপুর আলিম মাদরাসার সুপার মাওলানা শহিদুল্লাহ। মাদরাসায় শহীদ মিনার না থাকলেও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।

ধান্যখোলা ডি এস সিনিয়র মাদরাসার সুপার মাওলানা আনোয়ার হোসেন জানান, অনেক মাদরাসা মানুষের দানে চলে। তাছাড়া জায়গা সংকট রয়েছে। এ কারণে শহীদ মিনার নির্মাণ করা সম্ভব না মাদ্রাসার পক্ষে। তারপরও আমরা তো (মাদ্রাসাতে) আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা ও শহীদ দিবসে দোয়া অনুষ্ঠান করি।

নাভারণ ফজিলাতুনন্নেছা মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী শারমীন নাহার জানান, আমাদের কলেজে শহীদ মিনার না থাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার পায়ে হেঁটে বুরুজবাগান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হয়। অথচ আমাদের কলেজের পরিচালনা পরিষদে নামীদামী ব্যক্তিরা রয়েছে। তারা ইচ্ছা করলেই ৭ দিনের মধ্যে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করে দিতে পারেন।

বেনাপোল সরকারি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ইজ্জত আলী বলেন, ১৯৫২ সালে মার্তৃভাষার জন্য যারা শহীদ হয়েছিল যাদের স্মরণে আজও শার্শা উপজেলায় ৮২ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো শহীদ মিনার গড়ে না ওঠায় শিক্ষার্থীরা শ্রদ্ধা ও স্মরণ করতে পারে না।

রুদ্রপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মানের উদ্যোগ নিলেও ভীত পর্যন্ত নির্মাণ করে তা পয়সার অভাবে থমকে গেছে।

একই কথা বলেন, বেনাপোলের সিনিয়র মাদরাসার সুপার মো. ইলিয়াস হুসাইন। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্যে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের স্মরণ করতে পারেন না অনেকে। মাদরাসাগুলোতে গড়ে ওঠেনি কোনো শহীদ মিনার। এ ব্যাপারে সরকারের কাছে সহযোগিতা কামনা করেন তারা।

নাভারণ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খলিল জানান, আমাদের কলেজের পাশেই হাইস্কুলের শহীদ মিনার থাকায় এখানে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয় নি।

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হাফিজুর রহমান চৌধুরী জানান, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার থাকা বাধ্যকতা থাকলেও শার্শা-বেনাপোলের অনেক প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই। উপজেলার ১২ টি কলেজ, ৩৮ টি হাইস্কুল, ৩৩ টি মাদরাসা ও অসংখ্য কিন্ডারগার্ডেন এর মধ্যে মাত্র ২৯ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার আছে। কিন্তু ৩৩টি মাদরাসার একটিতেও শহীদ মিনার গড়ে ওঠেনি।

এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণে পত্র দেওয়ার পরও তারা শহীদ মিনার নির্মাণে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তৃণমূল পর্যায়ে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের গুরুত্ব ছড়িয়ে দিতে বা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ভালবাসা জানাতে সব প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ করা প্রয়োজন। শহীদ মিনার নির্মাণে সরকারের পাশাপাশি বিত্তশালীদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

শার্শা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রব বলেন, ১২৬ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও প্রি ক্যাডেট এবং কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৫৪ টি। ১৮০টি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৬২ টিতে কোনো শহীদ মিনার নেই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সম্মতির প্রচেষ্টায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ দরকার বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

তিনি আরো বলেন, সরকারের কাছে শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ চেয়ে একটি পত্র দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শার্শা উপজেলা নির্বাহী অফিসার পুলক কুমার মন্ডল অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক স্কুল, মাদরাসা ও কলেজে শহীদ মিনার না থাকার কথা স্বীকার করে জানান, উপজেলার প্রতিটা শিক্ষা প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার থাকা উচিত। সরকারি কোন বরাদ্দ না থাকলেও প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শহীদ মিনার তৈরি করা যায়।

পাশাপাশি সকল সরকারি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনার তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার আহবান করেন।
 

Bootstrap Image Preview