Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৩ শনিবার, মার্চ ২০১৯ | ৮ চৈত্র ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

হ-য-ব-র-ল শিক্ষা ব্যবস্থা, লাগামহীন শিক্ষা ব্যয়

ইসতিয়াক ইসতি
ক্রাইম রিপোর্টার
প্রকাশিত: ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৯, ০৮:০৮ PM
আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৯, ০৮:০৮ PM

bdmorning Image Preview
ফাইল ছবি


বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বর্তমানে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো। কিন্তু প্রতিনিয়ত নানা প্রশ্ন উঠলেও সরকারী কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় পাঠ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে স্কুলগুলো।  লাগামহীন ভাবে বেড়ে চলেছে শিক্ষা ব্যয়।

প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা সরকারি অধিপ্তর থেকে বছর পাঁচেক আগে দেওয়া হয়েছিল  কিন্ডারগার্টেন স্কুল তৈরি নীতিমালা। সেখানে অবকাঠামোগতসহ নানা বিষয়ে উল্লেখ্য থাকলেও, কিভাবে শিক্ষার্থীদের বেতন কাঠামো নির্ধারিত হবে তার কোনো নির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সারাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে কিন্ডারগার্ট। এসব শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছামত বেতন হাকিয়ে যাচ্ছে। আর এর সাথে যুক্ত করা হচ্ছে নানা খরচের তালিকা। অন্যদিকে সন্তানের সুশিক্ষার কথা চিন্তা করে অনেকটা বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে যাচ্ছে  অভিভাবকরা।

কতটুকু সুশিক্ষা পাচ্ছে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা এর বাস্তব চিত্র দেখার জন্য রাজধানীর কয়েকটি এলাকার কিন্ডারগার্টেন স্কুল ঘুরে যে চিত্র উঠে আসে তা অনেকটা এরকম, প্রতিটি স্কুল ভাড়া করা,  জরাজীর্ণ বাড়িতে সংকীর্ণ পরিবেশে পাঠদানের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। যেখানে নেই বাচ্চাদের খেলার মাঠ ও বিশুদ্ধ পানি ব্যবস্থা। আর বেশিভাগ স্কুলেই নীতিমালা অনুয়ায়ি নেই ছেলেমেয়েদের জন্য পৃথক টয়লেটের ব্যবস্থা।

শিশু মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ঢাকা বিভাগে পরিচালিত বেসরকারি এক জরিপের তথ্য বলছে, শতকরা ১৮.৪% শিশু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। আর এই উন্যতম কারণ হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অস্থাস্থ্যকর পরিবেশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশন অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মেহতাব খানমের কাছে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের জরাজীর্ণ পরিবেশ শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য কতটুক উপযোগি জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, আসলে শিশুর কৈশোরের বিকাশের উপরে নির্ভর করে ভবিষ্যতে তাঁর ব্যক্তিত্ব কেমন হবে। কিন্তু বর্তমানের আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের যে অবস্থা তা আসলেই ভয়ঙ্কর।  সরকারের উচিৎ এখনি ব্যবস্থা নেওয়া। তা না হলে আগামী প্রজন্মের একটি বড় অংশ মানুষিক সমস্যায় ভুগবে।   

শুধু যে পরিবেশ গত সমস্যার আছে তা নয়। বিডিমর্নিং এর সরজমিনের অনুসন্ধানের উঠে উঠেছে এই স্কুলগুলোর রয়েছে বেতন গ্রহণের অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও অদক্ষ শিক্ষক দ্বারা পাঠদান।

মিরপুরের ১ নাম্বার গোলচত্ত্বর মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের পিছনের শাপলা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্লে থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। প্রতিটি ক্লাসের বেতন নেওয়া হচ্ছে ৫০০ টাকা হতে ৬৫০ টাকা পর্যন্ত। আর সাথে যুক্ত হচ্ছে কম্পিউটার ল্যাব খরচ, পাঠাগার খরচ। তাছাড়া স্কুল থেকে বাধ্যতামূলক ভাবে বিক্রি হচ্ছে শিক্ষার্থীর ইউনিফর্ম ও প্রয়োজনীয় খাতা কলম।

মধ্যবাড্ডার ‘বাড্ডা ল্যাবরেটরি স্কুলে’ গিয়ে দেখা যায়, প্লে এর শিক্ষার্থীদের থেকে ৫৫০ টাকা করে বেতন নেওয়া হচ্ছে। তা ছাড়া স্কুলের প্রতিটি ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের এক্সট্রা কেয়ার নামে অনেকটা বাধ্যতামূলকভাবে কোচিং ক্লাস করানো হচ্ছে। যার জন্য প্রতি নামে আলাদা ভাবে নেওয়া হচ্ছে ৮০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা।

এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ভাই আমি ২য় শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে গিয়েছি এবং বাচ্চার বাবা স্কুলেই যায় নাই। কিন্তু আমাদের সন্তানকে আমরা লেখাপড়া করিয়ে সরকারি চাকরি করানোর স্বপ্ন দেখি।

তিনি আরো জানান, তাঁর ছেলে এই স্কুলে ২ বছর ধরে লেখাপড়া করছে। ভর্তি সমস্যা নানা সুবিধার কথা বললেও কিছু দেওয়া হয় না। বলা হয়েছিল অতিরিক্ত কোনো শিক্ষক লাগবে না। স্কুলের পড়া স্কুলেই শেষ করিয়ে দিবে। কিন্তু প্রথম পরীক্ষার (১ম সাময়িক) পরে জুয়েল স্যার (প্রধান শিক্ষাক) জানান আমাদের সন্তানের এক্সট্রা কেয়ারের দরকার। আর এর জন্য প্রতি মাসে বেতনের সাথে আদালা করে ৮০০ টাকা করে দেওয়া লাগবে। ভাই আপনি বলেন ক্লাস ওয়ানের কোনো বাচ্চার কি কোচিং ক্লাস লাগে ?

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন ডেভেলপার এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. ফখরুক ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে অতিরিক্ত বেতন আদায়ের বিষয়ে তিনি কিছু জানে না বলে দাবী করেন। তা ছাড়া তিনি আরো দাবী বলেন তাদের এসোসিয়েশনের কেউ অতিরিক্ত কোচিং ক্লাস বা অন্য কোনো খ্যাত দেখিয়ে অর্থ আদায় করছে না।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন সাথে কথা হয় কিন্ডারগার্টেন স্কুলের অর্থ খ্যাতের অনিয়ম ও পরিবেশগত বিষয়ে। তিনি জানান,  আসলে আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত  কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি চক্র শিক্ষার খ্যাতকে ব্যবসায় রূপান্তর করে ফেলেছে। কিন্তু বর্তমানে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের নীতিমালা তৈরি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। নীতিমালা কাজ শেষ হলে আমরা নোটিশ পাঠাবো এবং একটি নির্দিষ্ট দিন পরে  বিশেষ অভিযান পরিচালিত করা হবে।

Bootstrap Image Preview