Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৭ বুধবার, জুলাই ২০১৯ | ২ শ্রাবণ ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

‘কই আমার জনগণ: আমার টুক্কা মনিরে আইনা দেন'

মেরিনা মিতু
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৯, ০৭:৪২ PM
আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৯, ০৯:৪৩ PM

bdmorning Image Preview
ছবিঃ মেরিনা মিতু


এক ভদ্রলোক ফুটপাত ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন এক জোড়া স্যান্ডেল নিয়ে। স্যান্ডেলের সাইজ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, যার জন্য নিয়ে যাচ্ছে তার বয়স তিন থেকে চার হবে। আচমকা এক টানে ভদ্রলোকের হাত থেকে স্যান্ডেল জোড়া কেড়ে নেয় এক নারী। বুকের মধ্যে স্যান্ডেল জোড়া শক্ত করে ঝাপটে ধরে বলতে থাকে, ‘আমার মা বাইচা থাকলে নতুন স্যান্ডেল কিনে দিতাম, ফ্রক কিনে দিতাম। আমার মা, আমার শিশু, আমার বুইড়া বেডি, আমার মা...। আমার মারে কেউ আইনা দে, আমার মারে, আমার মারে...। 

ভাবছেন কোনো পাগল হবে হয়তো। রাস্তায় উন্মাদের মতো আচরণ করায় যাদের কাজ! না তিনি পাগল নয়। আবার পাগলও বটে। দুই বছরের সন্তান হারানো এক পাগলিনী মা। তিনি গেন্ডারিয়াই ধর্ষণের পর হত্যা হওয়া সেই আয়েশা মনির মা রাজিয়া সুলতানা।

ঘটনা আলোকপাতঃ  

মা-বাবা ও তিন বোনের সঙ্গে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার দীননাথ সেন রোডের এক বস্তিতে থাকত শিশু আয়েশা (২)। আয়েশার বাবা মোঃ ইদ্রিস ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করেন। মা রাজিয়া সুলতানা এলাকায় বিভিন্ন বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। তাঁদের চার মেয়ের মধ্যে আয়েশা দ্বিতীয়। প্রতিদিন সকালে আয়েশার মা-বাবা কাজে যান। এই সময় গেন্ডারিয়ার সাধনা ঔষধালয়ের সামনে গলিতে খেলে বেড়াত শিশুটি। অন্যান্য দিনের মতো গত ৫ জানুয়ারি (শনিবার) বিকেলেও খেলতে বের হয় আয়েশা। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে বাড়ির পাশের চারতলা একটি ভবনের সামনে আয়েশার রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

আয়েশার পরিবার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, মো. নাহিদ (৪৫) নামের এক ব্যক্তি আয়েশাকে ধর্ষণ করেছে। পরে চারতলা ভবনের তিনতলা থেকে তাকে নিচে ফেলে হত্যা করেছেন।

আয়েশার মামা মোঃ আলী সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, আয়েশাকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছেন ৫৩/১জ দীননাথ সেন রোডের চারতলা বাড়ির মালিক নাহিদ। যে ভবনের সামনে আয়েশা মুখ থুবড়ে পড়েছিলো সেই ভবনের তিনতলায় থাকেন তিনি। আয়েশা বিকেলে যখন খেলছিল, তখন তাকে খিচুড়ি খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে নিজের ফ্ল্যাট নিয়ে যান নাহিদ। সেখানেই তাকে ধর্ষণ করা হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে ফ্ল্যাটের খোলা বারান্দা থেকে আয়েশাকে নিচে ফেলে দেন নাহিদ। এ সময় আয়েশার চিৎকার আশপাশের লোকজনও শোনে।

আয়েশার বাবা ইদ্রিস আলী বিডিমর্নিংকে বলেন, ‘আমি অইদিন এলাকাতেই এক বিল্ডিং এর ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করতে গেছিলাম। সন্ধ্যার দিকে হঠাত এক বাচ্চা আইসা কইলো, আপনের মাইয়া মইরা গেছে ছাদ থেকে পইড়া। আমি দৌড়ায় গিয়া দেখি সেখানে নাই, এর মধ্যেই হাসপাতালে নিছে। আমি পরে হাসপাতালে গিয়া শুনি আমার মাইয়া মইরা গেছে। তখনো আমি জানিনা যে আমার মাইয়াডা মরেনাই, তারে মাইরা ফালানো হয়ছে, আর শুধু মাইরাই ফেলেনাই, মারার আগে আমার মাইয়ার সাথে এমন আকাম...।’ বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পরেন তিনি।

পরে এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে আয়েশার বাবা ইদ্রিস আলী বাদী হয়ে প্রতিবেশী নাহিদের বিরুদ্ধে ‘ধর্ষণের পর হত্যার’ অভিযোগ ‘হত্যা’ মামলা করে।

মামলার পরেও পুলিশের খানিক বিলম্বতা ছিলো বলেও অভিযোগ করেন এলাকাবাসীরা। পরে ৭ জানুয়ারি সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে এলাকাবাসী নাহিদের বিচারের দাবিতে গেন্ডারিয়া থানার সামনে বিক্ষোভ করেন।

তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে নাহিদকে (৪৫) গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে সেখানেও ছিল নাটকীয়তা। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে নাহিদ বাসার তৃতীয় তলার খোলা জানালা দিয়ে লাফ দেয়। এতে তার দুই পা ভেঙে যায়। এ সময় আহত অবস্থায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। নেয়া হয় আদালতে।

পরিবার ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, ঘটনার পর আয়েশাকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরে আয়েশার লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়। সেখানে ময়নাতদন্তের পর গতকাল জুরাইন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

এলাকাবাসী ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অভিযোগ ওঠা নাহিদ পুরান ঢাকার ইসলামপুরে ব্যবসা করতেন। তবে বর্তমানে তিনি ব্যবসা করেন না। দীননাথ সেন রোডে নিজের চারতলা বাড়ির ভাড়ার টাকায় তাঁর সংসার চলে। নাহিদ উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতির লোক। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি ফের বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্ত্রী নাহিদের সংসার ছেড়ে চলে গেছেন। পরে ১২ বছরের মেয়ে বুশরাকে নিয়ে এই চারতলা ভবনে থাকেন তিনি।

মেয়ের জবানবন্দিতে ফেঁসে গেলো ‘ধর্ষক’ বাবা নাহিদঃ  

ডিএমপি উপ-কমিশনার (ডিসি) ফরিদ উদ্দিন বিডিমর্নিংকে জানান, শিশু আয়েশা হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে এগিয়ে আসে গ্রেফতারকৃত আসামি নাহিদের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে বুশরা। মঙ্গলবার (৮ জানুয়ারি) স্বেচ্ছায় আদালতে আসে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া নাহিদের মেয়ে বুশরা। নিজের বাবার কুকর্মের কথা তুলে ধরে আদালতে জবানবন্দি দেয় সে।

ফরিদ উদ্দিন বলেন, আদালতে বুশরা জানায়, ঘটনার দিন শনিবার সন্ধ্যার দিকে বাসার বারান্দায় বসে ছিল সে। এ সময় বাবা নাহিদের শোবার কক্ষ থেকে শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পায় সে। এরপর সে বাবার কক্ষে যায়। দরজা খুলে দেখে তার বাবা বিছানায় আর শিশু আয়েশা তার কোলে কাঁদছে। তখন নাহিদ বুশরাকে ধমক দিয়ে বলে, ‘এই তুই এখানে এসেছিস কেন?’ তখন বুশরা অন্য রুমে চলে যায়।  

অন্যরুমে যাওয়ার পরেও সে কান্নার আওয়াজ শুনতে পায় কিন্তু বাবার ভয়ে আর রুমে ঢুকেনি সে। কিছুক্ষণ পর কান্নার আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়, আর তারপরই ধাপাস করে কিছু নিচে পড়ে যাওয়ার মতো শব্দ শুনতে পায় বুশরা। নাহিদ শিশু আয়েশাকে তিন তলার খোলা জানালা দিয়ে ফেলে দেয়।

বিচার চেয়ে মানববন্ধনে সেই মা আর বাকি তিন মেয়েঃ  

‘আমার মা কই। তোমরা আমার মায়েরে ফিরায়া দাও। কে আছো আমার পাশে, দেখ আমার মা (ব্যানারের ছবি দেখিয়ে) সবার দিকে তাকিয়ে হাসছে। কোথায় আমার সরকার। আমারে সাহায্য করতে বলো। আমি আমার মায়ের ধর্ষণকারীর বিচার চাই, ফাঁসি চাই। আসামির হয়ে সবাই আমারে হুমকি দেয়, টাকা নিয়া পুলিশও আসামির পক্ষে কথা কয়। আমার কেউ নাই, আমি কী করুম, কার কাছে বিচার চামু।’ এভাবেই জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বিলাপ করছিলেন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার দুই বছরের শিশু আয়েশা মনির মা রাজিয়া সুলতানা। ‘আয়েশা হত্যার বিচার চাই, ধর্ষক নাহিদের ফাঁসি চাই' এই দাবিতে মানববন্ধন করছেন তিনি।

আর সেই মানববন্ধনে মানবের সংখ্যা কেবল চার। ব্যানারের এক কোণা ধরে রেখেছেন ভুক্তভোগী শিশুর মা, আরেক পাশে তার বড় বোন। দুজনের কোলেই দুটি শিশু। তারাও আয়েশার বোন।

দুপুর থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়ে ধর্ষকের বিচার দাবি করেন এই মা এবং তার বাকি সন্তানেরা। পুরোটা সময় তিনি চিরতরে হারিয়ে যাওয়া সন্তান আয়েশার স্মৃতিচারণ করে বিলাপ করেন। পরে পুলিশ এসে অনেক বুঝিয়ে তাদের বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

সন্তানহারা মায়ের আহাজারিঃ

‘আমার মা, আমার শিশু কথা বলতে পারেনা। আমার শিশু হাঁটতেও পারেনা। আমার শিশু খালি মা, মা ডাকতে পারে, আব্বুরেও ঠিক করে ডাকতে পারেনা। আমার শিশু। আমার শিশুর গায়ে কিছু নাই, রোগা। খালি অসুস্থ থাকতো। এই নাহিদ আমার শিশুর সাথে যা করছে আমার শিশুর আত্নায় কি কইছে? আমার শিশু কেমনে সহ্য করছে! আমার শিশু, আমার মা...।’

‘আমার শিশু বুট্টো খাইবো। আমার শিশু বিস্কুট কইতে পারেনা। আমার শিশু কই বুট্টো। মা, বুট্টো, বুট্টো। আমার শিশুরে আইনা দে। তারে বুট্টো খাওয়াই। সেদিন সকালেও বুট্টো চাইছিলো, ঘরে আছিলো না, ভাবছি পরে দোকানতে আইনা দিমু। কিন্তু আমার শিশুর আর বুট্টো খাওয়া হইলোনা।’

‘আমার দেশের মানুষ কই? আমার দেশের সরকার কই? কই আমার জনগণ? আমার টুক্কা মনিরে আইনা দেন, তার আত্নায় যাতে শান্তি আসে তার জন্য নাহিদের বিচার কইরা দেন।’

প্রশ্ন করার আগেই ব্যানার বুকে জরায় নিয়ে এভাবেই বিলাপ করতে থাকেন আয়েশার মা রাজিয়া সুলতানা।

আয়েশা হত্যা: বৃহস্পতিবারের মধ্যেই চার্জশিট দিতে আল্টিমেটামঃ

সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে একাই মানববন্ধন করে আসছিলেন আয়েশার মা রাজিয়া সুলতানা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই মানববন্ধনের ছবি ভাইরাল হওয়ার পর তা চোখে পড়ে যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীজোটের। বৃহস্পতিবারের মধ্যে চার্জশিট এবং পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ভুক্তভোগীর হাতে না দিলে আগামী শুক্রবার (৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টায় গেন্ডারিয়া থানায় স্মারকলিপি প্রদান করার ঘোষণা দেন তারা। 

সোমবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর শাহবাগে এক মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

মানববন্ধনে যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীজোটের আহবায়ক শিবলী হাসান বলেন, ধর্ষক ও খুনি নাহিদকে মানসিকভাবে অসুস্থ প্রমাণের মাধ্যমে বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার একটা প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়া ভুক্তভোগীর পরিবারের অধিকার। কিন্তু আয়েশা মনির পরিবারকে তা দিতে কেনো নানা অজুহাত দেখানো হচ্ছে তা নিয়ে প্রশাসনকে জবাব দিতে হবে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আইনজীবি নীনা গোস্বামি বিডিমর্নিংকে বলেন, ‘আইনের যে ফাঁকফোকর রয়েছে সেটাই মূলত কারণ এই জঘন্য অপরাধের জন্য। মানবিক দিক থেকে বলতে গেলে ধর্ষণের একমাত্র শাস্তি হওয়া উচিত মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু আমাদের আইনে যে শাস্তির বিধান রয়েছে সেটুকু শাস্তিও পায়না এই অপরাধীরা। আইনের চোখ ফাকি দিয়ে দিব্যি ঘুরে বেরায় একেকজন ধর্ষক। এমনকি তাদের শাস্তির ব্যবস্থা না করে প্রশ্ন তোলা হয় একজন নারীর চলাফেরায় কিংবা তার পোশাকে। সেক্ষেত্রে এই দুই বছরের শিশু জামাকাপড়ে কি দোষ ছিল? সেই প্রশ্নের উত্তর কি সমাজ দিতে পারবে! ধর্ষণ সমাজের জন্য একটি ব্যধি।'

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে দন্ডবিধির ধারা ৩৭৬ অনুযায়ী বার বছরের বেশি বয়সি মেয়েকে ধর্ষণ করলে অপরাধী দুই বছরের কারাদন্ড বা অর্থ দন্ড বা উভয়দন্ড হতে পারে। পরবর্তীতে ২০০০ সালে এবং সর্বশেষ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৩ সংশোধন করা হয়। এতে নারী বা শিশুকে ধর্ষণের সাজা অনধিক দশ বছর কিন্তু অনূন্য তিন বছর সশ্রম কারাদন্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডে দন্ডিত করার বিধান করা হয়েছে। আবার ধর্ষণের পরবর্তী কোনো কার্যকলাপে যদি নারী বা শিশুটির মুত্য ঘটে তবে সেক্ষেত্রে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড হবে। এখানে শিশুর বয়স অনধিক ১৬ বছর ধরা হয়েছে।

Bootstrap Image Preview