Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২২ মঙ্গলবার, জানুয়ারী ২০১৯ | ৮ মাঘ ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

মাটির ব্যাংকে সুখের হাসি

রাজীব আল আরাফাত, গাজীপুর প্রতিনিধিঃ
প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারী ২০১৯, ০৭:৫৮ PM
আপডেট: ১২ জানুয়ারী ২০১৯, ০৭:৫৮ PM

bdmorning Image Preview


বাণিজ্যিক ব্যাংক নয়, টাকা-পয়সা জমানোর মাটির ব্যাংক তৈরি করে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উল্টাপাড়া গ্রামের প্রায় শতাধিক পরিবার সুখের সংসার গড়ে তুলেছেন। গত ২০ বছর ধরে এটিই তাদের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন।

স্থানীয়রা জানান, এই কাজ শুরু করে ওই গ্রামের শীতল চন্দ্র পাল। ২০ বছর আগে উল্টাপাড়া গ্রামের শীতল চন্দ্র পাল ঢাকা সাভারের একটি বিদেশি মৃৎশিল্প প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। ওই প্রতিষ্ঠানে মাটি দিয়ে ব্যাংক, ফুলদানি, ফুলের টব, বসার মোড়াসহ নানা রকমের খেলনা তৈরি করা হতো। 

পরবর্তী সময়ে গ্রামের বেকার কয়েক যুবকের উৎসাহে শীতল পাল ব্যাংক থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি হুইল মেশিন (ব্যাংক তৈরির জন্য মাটি উপযোগী করার যন্ত্র) কিনে বাড়ির উঠানে বসান। শুরু হয় শীতল পালের ব্যাংক তৈরির কাজ। সহযোগিতার হাত বাড়ান তার স্ত্রী অর্চনা পাল।

অর্চনা পাল বলেন, আগে এক বেলা খেলে আরেক বেলা খেতে পারতাম না। আর এখন সংসারে কোনো অভাব নেই। একটি টিনশেড বাড়ি করেছি, ছেলেমেয়েদের স্কুলে পড়াচ্ছি। 

তাকে দেখে গ্রামের অনেক বেকার এ কাজ শুরু করেন। শীতল পাল তাদের প্রশিক্ষণ দেন বিনা পয়সায়। এভাবে পুরো গ্রামেই পরিচিত হয় মাটির ব্যাংক তৈরির কাজ।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, কালিয়াকৈর উপজেলার ঢালজোড়া ইউনিয়নের উল্টাপাড়া এলাকায় ঢুকতেই রাস্তায় ওপরে এক পাশে শুকাতে দেয়া হয়েছে মাটির ব্যাংক। ওই এলাকায় প্রবেশ করতেই দেখা গেলো শত শত মাটির কাঁচা ব্যাংক এখনো শুকাইনি। প্রতিটি বাড়ির বারান্দায় বসানো হয়েছে হুইল মেশিন (ব্যাংক তৈরির জন্য মাটি উপযোগী করার জন্য)। সেই মেশিনের শব্দে বোঝা যাচ্ছে মৃৎশিল্পীদের কর্মব্যস্ততা।

কথা হয় মৃৎশিল্পী দয়াল পালের (৮৪) সঙ্গে। তিনি জানান, দিনে কমপক্ষে ১০০ মাটির ব্যাংক তৈরি করতে হবে। মহাজনের অর্ডার আছে, সময়মতো না দিলে পরবর্তীতে তারা আর কাজ দিতে চাইবে না। তবে মহাজনের অভাব নেই, এখানে কাজেরও অভাব নেই। এই গ্রামের প্রায় শতাধিক পরিবার ব্যাংক তৈরি করে। সবাই ব্যস্ত সবারই কমবেশি অর্ডার থাকে। 

পাশের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বিমলা বিশ্বাস ও তার ছেলে বউ লিপি বিশ্বাস মাটির ব্যাংকে রং লাগাচ্ছেন। রং লাগানোর পর পলিথিন দিয়ে বিশেষ কায়দায় তা ডিজাইন করছেন। ডিজাইন করা শেষ হলে তাতে মাটির ব্যাংকের সৌন্দর্য ফুটে উঠছে। 

ওই গ্রামে মাটির ব্যাংক তৈরির প্রথম কারিগর শীতল পাল জানান, উল্টাপাড়া গ্রামে প্রায় ২০ বছর আগে তিনি ব্যাংক তৈরির কাজ শুরু করেন। সে সময় তাকে দেখে দুই একটি বাড়িতে মাটি দিয়ে ব্যাংক তৈরির কাজ শুরু হয়। ওই সময় অন্য কোনো কাজ না থাকায় আমাদের দেখে এবং আমাদের কাছ থেকে বিনা বেতনে কাজ করে প্রশিক্ষণ নিয়ে ছিলেন এ গ্রামের অন্যান্যরা। এখন যে আয় হচ্ছে তাতে খুব বেশি লাভবান না হলেও সংসার ভালো মতোই চলছে। তবে যাদের চালান বেশি আছে তাদের আয়ও বেশি হচ্ছে। তবে সরকারকে স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে মৃৎশিল্পকে আরও গতিশীল করার দাবি জানিয়েছেন ওই গ্রামের মৃৎশিল্প কারিগররা।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোঃ মোজাম্মেল হক জানান, এই পেশার মধ্যদিয়ে তাদের গ্রামের মৃৎশিল্প টিকে আছে। এই মৃৎশিল্পীদের সরকারিভাবে অল্প সুদে যদি ঋণ দেয়া যায় তবে তাদের জন্য ভালো হতো। পেশাটিও টিকে থাকবে অনেকদিন ধরে।

ঢালজোড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ আক্তারুজ্জামান বলেন, মাটির তৈরির ব্যাংক বিক্রি করে তারা সুখের সংসার করছে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাচ্ছেন। অনেকেই আধাপাকা বিল্ডিং করেছে। সর্বোপরি সবাই সাবলম্বী হচ্ছে। তাদের পরিবারে সুখের হাসি মিলছে। 


 

Bootstrap Image Preview