Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৫ মঙ্গলবার, জুন ২০১৯ | ১১ আষাঢ় ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

'সৈয়দ আশরাফ ছিলেন পূর্ণাঙ্গ একজন মানুষ'

ফারুক আহমাদ আরিফ
হেড অফ নিউজ
প্রকাশিত: ০৪ জানুয়ারী ২০১৯, ০৭:২২ PM
আপডেট: ০৫ জানুয়ারী ২০১৯, ১০:৩৯ AM

bdmorning Image Preview


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ৩ জানুয়ারি-২০১৯ ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। তার মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া বিরাজ করছে। দলমত নির্বিশেষে সবাই তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছেন। স্মৃতিচারণ করছেন।

এই স্রোতে যুক্ত হয়েছেন সৈয়দ আশরাফের প্রথম দিকের ছাত্রলীগ কর্মী। সাংবাদিক, সাধারণ মানুষ। সকলেই তার অমায়িক ব্যবহার, দেশপ্রেম ও ব্যক্তিত্বের ভূয়সী প্রশংসা করছেন।

সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সাথে ছাত্রজীবন থেকেই জড়িত ছিলেন। তিনি বিডিমর্নিং এর সাথে এক স্মৃতিচারণে বলেন, সৈয়দ আশরাফ ছিলেন আদর্শবান একজন মানুষ। তিনি আওয়ামী আদর্শ থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। আমরা তার নেতৃত্বে ময়মনসিংহে ছাত্র রাজনীতি করেছি। ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে এক সাথে কাজ করেছি। তার মতো মহানুভব নেতা খুব কম ছিল।

ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমরা ১৯৭১ সালে এক সাথে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। তার সাথে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এক সাথে মন্ত্রিসভায় ছিলাম। তার মতো আদর্শবান মানুষের খুব অভাব।

সৈয়দ আশরাফের ময়মনসিংহ জেলার ছাত্রলীগ সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন কর্মী ও ত্রিশাল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সেক্রেটারি আলহাজ হামিদুর রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে আমি নাসিরাদ কলেজের ছাত্র ছিলাম। ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম। তখন আনন্দমোহন কলেজে পড়ালেখা করতেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সেক্রেটারি ছিলেন। আমরা কর্মীরা যখন তার কাছে যেতাম তিনি খুব আদর-স্নেহ করতেন। সবাইকে আপন ভাইয়ের মতো মহব্বত করতেন।

তিনি বলেন, সৈয়দ আশরাফের মধ্যে কখনো কোন ধরনের নয়ছয় দেখিনি। যা সত্য সেটি তিনি অকপটে বলতেন। কোন বিষয়ে শান্ত্বনা দেওয়ার মতো তিনি ছিলেন না। যা সত্য সেটাই বলে দিতেন। কখনো কোন বিষয়ে রাখঢাক করতেন না। সত্যিকারের অভিভাবক ছিলেন তিনি।

সৈয়দ আশরাফের ছাত্রজীবনের এই কর্মী বলেন, সৈয়দ আশরাফ ছিলেন পূর্ণাঙ্গ একজন মানুষ। একজন মানুষের প্রকৃত যে পরিচয়, যে রুপ, যে ব্যক্তিত্ব সব কিছু ছিল তার মধ্যে। তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। তার একটি মেয়ে আছে সে যেন এই শোক সহ্য করতে পারে আল্লাহ তা'য়ালা তাকে সেই ধৈর্য ধরার শক্তি দেন।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের সিনিয়র সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম রনি বলেন, আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম কখনোই কাউকে তুমি বা তুই বলতেন না। তিনি সবাইকে আপনি বলে সম্বোধন করতেন। সে বয়সে যত ছোটই হোক না কেন? সৈয়দ আশরাফ খুব কম কথা বলতেন। তিনি যে কথা বলতেন তা নিয়ে সংবাদকর্মীদের পর্যালোচনা করতে কয়েকদিন লেগে যেত। তার প্রতিটি কথা, প্রতিটি শব্দ ছিল নিউজ। তিনি মিডিয়া বিমুখ ছিলেন। সব সময় মিডিয়াকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতেন। আমার যতদূর মনে পড়ে, তিনি যে কারণে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন-সেটাকে স্টাবলিস্ট করতেন। আমরা সংবাদকর্মীরা বিভিন্ন প্রশ্ন করলেও তিনি তার অবস্থানে অটল থাকতেন। তার মানে এই নয়, যে তিনি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যেতেন। তিনি মেপে মেপে কথা বলতেন। কাউকে হেয় করে কথা বলতেন না।  

তিনি বলেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাহেবের দুই মেয়াদেই আমি তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। যখনই দেখা হতো- কেমন আছেন বলে সম্বোধন করতেন। সৈয়দ আশরাফ সময়কে (টাইম) গুরুত্ব দিতেন। সকাল দশটায় প্রোগ্রাম শুরু করার কথা থাকলে তিনি দশটার দু-চার মিনিট আগেই সেখানে উপস্থিত হতেন। মনে পড়ে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪০তম শাহাদাৎবাষির্কী উপলক্ষে ৪০ দিনব্যাপী কমর্সূচি হাতে নিয়েছিলেন তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। একদিন যুবলীগের কর্মসূচির সময় ছিল সকাল ১০টা। দশটা বাজার আগেই তিনি হাজির হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে। কিন্তু আয়োজকরা তখনও আসেননি। তিনি ছিলেন খুবই অমায়িক মানুষ। কখনোই রাগ করতেন না। সাংবাদিকরা উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করলেও কারো উপর বিরাগভাজন হতেন না। তার মতো সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আর কখনো পাবে কিনা জানি না। এ সময় সৈয়দ আশরাফের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন।  

অন্যদিকে দলের নেতা হিসেবে তিনি ছিলেন ‘অসাধারণ’ সাধারণ সম্পাদক। আমার দেখা সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে তিনি সত্যিই অসাধারণ মানুষ। সৈয়দ আশরাফ একমাত্র ব্যক্তি যেখানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেও কথা বললে সেটা আলাদা নিউজ হতো। সৈয়দ আশরাফ দেশের রাজনীতির খবরাখবর ছাড়াও আন্তর্জাতিক সব খবরে আপডেড থাকতেন সব সময়।  

সৈয়দ আশরাফের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় কীর্তি এক-এগারোর সময়ে দলের কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে অবস্থান নিয়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখেন। দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি দলীয় সভানেত্রীর মুক্তি আন্দোলন ত্বরান্বিত করে তাকে কারামুক্ত করেন এবং সেনাসমর্থিত সরকারের কাছ থেকে জাতীয় নির্বাচন আদায় করেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতাসীন হয়। এরপর ২০০৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর এবং ২০১২ সালের ২৮ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সৈয়দ আশরাফ টানা দুইবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম ঢাকা অবরোধকালে সংকটময় মুহূর্তে যখন দলের সব নেতা নীরব ভূমিকায় ছিলেন তখন তিনি সংবাদ সম্মেলন করে হেফাজতকে ঢাকা ছাড়ার সময় বেঁধে দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। তার হুমকিতে মানসিকভাবে পর্যুদস্ত হেফাজতকে পরে জোর করে ঢাকা থেকে বিতাড়ণ করা হয়।

এ ছাড়া ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আগে জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে কূটনীতিক দূতিয়ালীতে তিনি সফলতার পরিচয় দেন। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে টানা দু'বার ক্ষমতাসীন হয়। সৈয়দ আশরাফ একজন ভদ্রলোক, দেশপ্রেমিক ও সৎ রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও ক্ষমতা দেখানো বা কারও সঙ্গে তিনি দুর্ব্যবহার করেছেন এমন অভিযোগ ছিল না। তিনি নীরবে কাজ করতে পছন্দ করতেন। দলের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

খলিলুর রহমান আওয়ামী লীগের একজন তৃণমূল কর্মী। তিনি বলেন, ন্যায়, নিষ্ঠা, সততা ও দেশপ্রেমিক একজন মানুষ ছিলেন সৈয়দ আশরাফ। তার মতো মানুষ আমাদের দেশে অভাব। তিনি কখনো কোন দুর্নীতির সাথে নিজেকে জড়িত করেননি।

তিনি বলেন, দেশের সম্পদকে ধ্বংসের কোন চিন্তা তার মধ্যে ছিল না। দেশের মানুষের কল্যাণে সৈয়দ আশরাফ সবসময় কাজ করেছেন।

খলিল বলেন, যখন তাকে সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে ওবায়দুল কাদেরকে এই দায়িত্ব দেয়া হয়। তখন নানা ধরনের কথা উঠেছিল। তখন সৈয়দ আশরাফ বলেছিলেন ‍"আমার রক্ত কখনো বিশ্বাস ঘাতকতা করেনি।"

খলিল সৈয়দ আশরাফের পিতা সৈয়দ নজরুল ইসলামের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, তার পিতা যেমন মহানুভব ব্যক্তি ছিলেন। দেশপ্রেমিক মানুষ ছিলেন, সৈয়দ আশরাফও তেমনি ব্যক্তিত্ববান মানুষ।

Bootstrap Image Preview