Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২১ সোমবার, জানুয়ারী ২০১৯ | ৮ মাঘ ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

মাঠ সংকট, ডিজিটাল অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তরুণ সমাজ

ইসতিয়াক ইসতি
ক্রাইম রিপোর্টার
প্রকাশিত: ০৪ জানুয়ারী ২০১৯, ০৩:১৫ PM
আপডেট: ০৪ জানুয়ারী ২০১৯, ০৩:১৭ PM

bdmorning Image Preview


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে বলা হয়েছে বাংলাদেশের জনপ্রতি ৯ বর্গমিটার খোলামাঠ প্রয়োজন থাকলেও বর্তমানে একজনের জন্য রয়েছে মাত্র ০.১ বর্গমিটারেরও কম মাঠ। অন্যদিকে বিশেজ্ঞরা বলছেন খেলার সুযোগ না পেয়ে ডিজিটাল অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে  শিশু-কিশোরেরা।

আশিকুর রহমান শিমুল দীর্ঘদিন ধরে ডিজিলাট আইনের দায়ের করা একটা মামলায় শিশু আদালতে হাজিরা দিয়ে আসছে। তাঁর বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনের ‘১৮ ধারা’ অনুযায়ী মামলা করা হয়েছে। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে বেআইনি ভাবে প্রবেশ করে একজন নারীর নগ্ন ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রকাশ করেছেন।

শিমুলের মত অপরাধের সাথে এখন আমাদের সমাজের অনেক কিশোর কিশোরি জরিয়ে পড়ছে। এ ধরণের অপরাধের কেন তরুণরা জরিয়ে পড়ছে জানার জন্য দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে কাজ করে আশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান সাথে কথা হয়।

এ বিষয়ে অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান জানান, বর্তমানে শিশুদের খেলার জন্য উপযোগী মাঠ নেই বললেই চলে। আর যেকয়টি আছে সেগুলো খেলার উপযোগী না। তাঁর জন্য সারাদিন বাসার চার দেয়ালের মধ্যে বন্ধি থাকছে শিশুদের।

আর সন্তাদের অবসর সময় কাটার জন্য অধিকাংশ পিতা-মাতা সন্তানের হাতে তুলে দিচ্ছে নানা ধরণের ডিজিটাল ডিভাইজ। যার ফলে খুব সহজে এই শিশু কিশোরগুলো সাইবার অপরাদের সাথে  জড়িয়ে পড়ছে। 

আমার দীর্ঘদিনের কাজের সময় দেখেছি, কম বয়সে যে সব শিশুরা হাতে ডিজিটাল ডিভাইজ হাতে পেয়েছে তাঁদের ৬০ শতাংশ থেকে ৬৫ শতাংশই কোনো না কোনো ভাবে খেলার ছলে ডিজিটাল অপরাদের সাথে জড়িয়ে পরছে ।

উদাহরণ হিসাবে আমি বলতে পারি ১০ বছর থেকে ১৪ বছরের বাচ্চাদের মাঝে সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফরম ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং করার প্রতিযোগিতা চলে। যা ডিজিটাল আইনের ১৮ ধারা আওয়াতা ভুক্ত অপরাধ।

তিনি আরো জানান, আশিকুর রহমান শিমুলের সাথে দীর্ঘ কাউন্সিলিং করার পরে বেড়িয়ে এসেছে সে এমনি একটি ঘটনার শিকার। কিন্তু আইন তাকে ঠিক অপরাধীর চোখে দেখছে এবং সে এখন রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী।

অবিভক্ত ও বিভক্ত দুই অবস্থায় প্রকাশিত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সিটিজেন চার্টারগুলোতে বলা হয়েছে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে খেলার মাঠ রাখার কথা এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নীতিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকার প্রতিটি সেক্টরে একটি খেলা মাঠ রাখার নীতিমালা থাকলেও কোটি মানুষের এই মহানগরীতে খেলার মাঠ একেবারেই নগণ্য। আর বর্তমানে রাজধানীর ৯৩টি ওয়ার্ডে এখন খেলার মাঠ সর্বসাকুল্যে ২২টি। যার বেশিরভাগ মাঠে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে বসছে হকার মার্কেট। যার ফলে খেলার পরিবেশ নেই বলেই চলে।

ক্রীড়া পরিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) ডা. আমিনুল ইসলামের সাথে কথা হলে তিনি জানান, সারা দেশে মাঠগুলোর কী অবস্থা, কয়টি খেলার মাঠ আছে কিংবা কতটি মাঠ প্রয়োজন তা নির্ধারণের জন্য একটি পরিসংখ্যান সার্ভে করছে আমার দপ্তর। আশা করি দ্রুততার সাথে এই সমস্যার সমাধান আমরা দিতে পারবো।

২০১৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ইউনিসেফের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রতি আধা সেকেন্ডে ১ লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি শিশু প্রথমবারের মতো প্রতিদিন অনলাইন দুনিয়ায় প্রবেশ করছে। যাদের একটি বড় অংশ অপরাধের সাথে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।

ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে বাংলাদেশের তরুণরা যে অপরাধের সাথে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে তাঁর একটি বড় উদাহরণ প্রশ্ন ফাঁস। প্রযুক্তির ব্যবহার করে এই ভয়ংকর কাজটি সহজেই সম্পন্ন হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। ফাঁস হচ্ছে স্কুলের সাটিফিকেট পরিক্ষা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরিক্ষা পর্যন্ত সব পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র।

বিগত বছরগুলোতে এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করলে আইনশিঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে আটক হয় একাধিক অপরাধী। যাঁদের বেশির ভাগই বয়সে তরুণ। যাঁদের অনেকই পরে জানিয়েছে বন্ধুদের হেল্প করার জন্য তারা এই কাজে যুক্ত হয়েছিল।

অন্যদিকে ফেসবুক, টুইটার, ইমো, ভিগো, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবারের মতো সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে রাত জেগে অবস্থান করা এখন ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে রাত বাড়ার সাথে সাথে বসে অশ্লীলতার হাট। সাইটগুলোতে প্রকাশিত ফুটেজের মাধ্যেমে অনেকেই ব্ল্যাকমেইলের স্বীকার হচ্ছেন।

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ সাইবার হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতে ‘সাইবার হেল্প ডেস্ক' চালু করার পর থেকে প্রায় ২৫ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। যার ৭০ ভাগই অভিযোগকারী নারী।

৩০ জন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী, ১০০ জন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে নিয়ে করা এক জরিপে উঠে এসেছে গড়ে ৮২ শতাংশ ছাত্র মোবাইল ব্যবহার করে শ্রেণি কক্ষে পর্নোগ্রাফি ভিডিও দেখে। যার ফলে তাঁদের যৌন আসক্তির মাত্রা বেড়ে চলছে। ফলে বর্তমানে যুবসমাজের একটি বড় অংশ (১২-১৬ বছর) যৌন হয়রানি ও ধর্ষণসহ ভয়ঙ্কর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে।

অপরাধ বিজ্ঞানী অধ্যাপক জিয়া রহমানের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আমরা বাস করছি দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি সমাজে। যার ফলে প্রযুক্তির অনেক কিছু সহজ ভাবে আমাদের সমাজে অবস্থান করে নিয়েছে। তাই শিশু কিশোরা খুব সহজে প্রযুক্তির ব্যবহার করে নানা কিছুর সাথে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সন্তানের ইন্টারনেট ব্যবহারের উপরে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না অভিবাবকরা। যার ফলে সাইবার ক্রাইমের সাথে জড়িয়ে পড়ে ধংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের যুব সমাজ।

Bootstrap Image Preview