Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৭ বুধবার, মার্চ ২০১৯ | ১৩ চৈত্র ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

১০ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির মেলবন্ধন

ফারুক আহমাদ আরিফ
হেড অফ নিউজ
প্রকাশিত: ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৫:৪৪ PM
আপডেট: ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৮:৪৯ PM

bdmorning Image Preview
সংগৃহীত


দীর্ঘ (২০০৯-২০১৮) ১০ বছর যাবত দেশের শাসন ক্ষমতায় রয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, অবকাঠামো নির্মাণ, বৈদেশিক বাণিজ্য, রেমিটেন্স আয়, শিল্পস্থাপন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, খনিজ সম্পদ উত্তোলন, কৃষিবিপ্লব, শিক্ষাব্যবস্থার প্রসার, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ বিভিন্ন সেক্টরে অভূত উন্নয়ন সাধন করেছে। ২০০৮ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত বিগত ১০ বছরে উন্নয়নের মেলবন্ধনের চিত্র তুলে ধরা হলো।

কৃষি: ফসলের উৎপাদন হ্রাস করতে ৪ দফা সারের দাম কমিয়েছে। টিএসপি ৮০ থেকে ২২ টাকা, এমওপি ৭০ থেকে ১৫, ডিএপি ৯০ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। শুধু ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৮০৭ দশমিক ১৪ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদন করেছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে যেখানে কৃষি বাজেট ছিল ৭৯২৪ দশমিক ৫৭ কোটি টাকা সেখানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাজেট দাঁড়িয়েছে ১০৩০৩ দশমিক ৮৪ কোটি টাকা। ধানসহ ১০৮টি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করে ধান উৎপাদনে বিশ্বের ৪র্থ স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ২ কোটি ৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৭৭ জন কৃষককে কৃষি উপকরণ প্রদান করেছে।

প্রাণিসম্পদ: প্রাণিসম্পদ খাতে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। সরকারি হিসেবে বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর ১১ শতাংশের বেশি মানুষ মৎস্য খাতের বিভিন্ন কার্যক্রমে নিয়োজিত। জাতীয় অর্থনীতিতে এই খাতের অবদান মোট রপ্তানি আয়ের জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব বাজারে আর্থিক মন্দাবস্থা থাকলেও গত অর্থবছরে প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন মাছ, চিংড়ি ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে প্রায় ৪ হাজার ৩১৩ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। গত ৯ বছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ৬৬ শতাংশ।

বিগত ১০ বছরে এ খাতে রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। নতুন খাত হিসেবে এখন সরকারের দৃষ্টি কাঁকড়াসহ বাংলাদেশে খাওয়া হয় না এমন মাছের দিকে।

মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯৪ দশমিক ০৬ লাখ মেট্রিক টন দুধ, ৭২ দশমিক ৬০ লাখ মেট্রিক টন মাংস, ১৫৫২ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়েছে। এমনকি ২০১৮ সালকে মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ঘোষণা করেছে সরকার।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে মোট মৎস্য উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৪১ দশমিক ৩৪ লাখ মেট্রিক টন এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সেটি ৪২ দশমিক ৭৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়।

২০০৭ সালে দেশে প্রথম শনাক্তকৃত এভিয়ান উনফ্লুয়েঞ্জা/বার্ড প্লু নিয়ন্ত্রণে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের ২০১২ সাল পর্যন্ত ৮০০ খামারিকে ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরন দেয়া হয়েছে। তা ছাড়া দারিদ্রবিমোচনে ৮৮ লাখ বেকার যুব মহিলা, দুস্থ, ভূমিহীন প্রান্তিক কৃষককে গবাদিপশু, হাস-মুরগি পালনে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণচন্দ্র চন্দ বলেন, দেশে বিলুপ্তপ্রায় ৬৪ জাতের মাছের মধ্যে বিএফআরআইর ১৮টি মাছের প্রজনন ও চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা দেশী মাছ রায় আশার আলো জাগিয়েছে। আর প্রাণিসম্পদেও আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে যাচ্ছি। গত কোরবানির ইদে ভারত থেকে কোন গরি আসেনি। আমরা নিজেদের পশু দিয়েই কোরবানির কার্যক্রম পরিচালনা করতে পেরেছি।

বিদ্যুৎ উৎপাদন: ২০০৮ সালে দেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ২৭টি। উৎপাদন ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। ২০১৮ সালে এসে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৭টিতে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ হচ্ছে ১৫ হাজার ৮৩৩ মেগাওয়াট।

২০০৯ সালে মোট ১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যেগুলোর মোট ক্ষমতা ৩৫৬ মেগাওয়াট। ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে মোট ৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়, যেগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ৭৭৫ মেগাওয়াট। একইভাবে ২০১১ সালে এক হাজার ৭৬৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২২টি, ২০১২ সালে ৯৫১ মেগাওয়াটের ১১টি, ২০১৩ সালে ৬৬৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার পাঁচটি, ২০১৪ সালে ৬৩৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সাতটি, ২০১৫ সালে এক হাজার ৩৫৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার সাতটি, ২০১৬ সালে এক হাজার ১৩২ মেগাওয়াট ক্ষমতার আটটি এবং ২০১৭ সালে দেশে ১ হাজার ৮৪০ মেগাওয়াট ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সরকারি খাতে ৬ হাজার ৭০৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৬টি এবং বেসরকারি খাতে ৪ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ মোট ১১ হাজার ৩৬৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চলতি বছর থেকে ২০২১ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে চালু হবে।

এছাড়া সরকারি খাতে ২ হাজার ৭৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৮টি এবং বেসরকারি খাতে ২ হাজার ৮৪৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২৬টি বিদ্যুত কেন্দ্রসহ সর্বমোট ৪ হাজার ৯১৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন সরকারি খাতে ৬ হাজার ৪১৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১১টি বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ পরিকল্পনাধীন রয়েছে।

চলতি বছরের মধ্যে ভারত থেকে আরও ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির কার্যক্রম চলমান। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র হতে ২০২৩ সালের মধ্যে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট এবং ২০২৪ সালের মধ্যে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় আমূল পরবর্তন ঘটবে। এক নজরে ২০০৯ সাল থেকে ১৮ জুলাই ২০১৮ সাল পর্যন্ত সাড়ে নয় বছরে বিদ্যুৎ খাতের উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩১০০ মেগাওয়াট থেকে ১৭২০০ মেগাওয়াটে উন্নীতকরণ, বিদ্যুতের সর্বোচ্চ উৎপাদন ৩২৬৮ মেগাওয়াট হতে ১১৩৮৭ মেগাওয়াটে উন্নীত করা, বিদ্যুৎ সুবিধাভোগী জনসংখ্যা ৪৭% থেকে ৯০% উন্নীত করা; মাথাপিছু বিদ্যুত উৎপাদন ২২০ কিলোওয়াট আওয়ার হতে ৪৬৪ কিলোওয়াট আওয়ারে উন্নীত করা; ৯৬ লাখ নতুন গ্রাহক সংযোগের মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি গ্রাহককে বিদ্যুৎ সুবিধা প্রদান; প্রায় ২০০০ সার্কিট কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণসহ মোট সঞ্চালন লাইন (সা.কি.মি.): ১১,১২২ সর্বমোট বিতরণ লাইন ৪ লাখ ৫৫ হাজার, এবং জুন ২০১৭ সাল পর্যন্ত সিস্টেম লস দাঁড়িয়েছে ১২.১৯% বিতরণ লস: ৯.৯৮%। ২০০৯ সালে গ্রিড সাবস্টেশনের ক্ষমতা ছিল ১৫ হাজার ৮৭০ এমভিএ। এখন যার পরিমাণ ৩০ হাজার ৯৯৩ এ।

বন ও জলবায়ু পরিবর্তন: জলবায়ুর তীব্র পরিবর্তনে ভূমিকম্প, ঝড়, বন্যা, খরা, টর্নেডো, এসিড বৃষ্টি, ভূমিধস, পাহাড়ধস ও দাবদাহসহ বিভিন্ন রকমের ভয়াবহতা বিশ্বকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। বৈশ্বিক পরিবেশ-বৈরীতার ছোবল থেকে রেহাই পাচ্ছি না আমরাও। বনভূমি বিস্তারের ক্ষেত্রে ২০১৬ সালে শতকরা ১৭.৪৮ ভাগ উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ২০২০ সাল নাগাদ বনভূমির পরিমাণ ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে কার্যক্রম চলছে বলে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে সরকারের নিজস্ব সম্পদ থেকে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফাণ্ড গঠন করা হয়েছে।

২০১৭-২১৮ অর্থবছর পর্যন্ত এ ট্রাস্টের তহবিলে মোট ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফাণ্ডের আওতায় এ যাবৎ ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুত এলাকায় ১১ হাজার ৪১৫ টি ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধী গৃহনির্মাণ, ২৩৬.৯৯ কি.মি. রাস্তা নির্মাণ, দেশব্যাপী ৮৭২ কি.মি. খাল খনন অথবা পুনখনন, ৩৫২.১২ কি.মি. বেড়িবাধ, ১৬১.২৩ কি.মি. তীর রক্ষা কাজ এবং ১৬.৪ কি.মি. উপকূল রক্ষা বাধ নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া উন্নয়ন সহযোগী এবং দাতাদের সহায়তায় জলবায়ু পরিবর্তন রিজিলায়েন্স ফাণ্ড গঠন করা হয়েছে। বন্যাপ্রবণ এলাকাসহ সারাদেশে ৪,১৮৪টি গভীর নলকূপ, ৫০টি ভ্রাম্যমান পানি শোধনাগার প্লান্ট স্থাপন, ১০৬১টি পানির উৎস, ১০৫০টি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণাগার স্থাপন করা হয়েছে। যা অত্যন্ত সময়োপযোগি।

এদিকে সবুজ বেষ্টনী সৃষ্টির মাধ্যমে সমুদ্র উপকূল রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং কার্বন নিঃসরণের ক্ষতিকর প্রভাব হ্রাসকরণের লক্ষ্যে ১৪৩ মিলিয়ন বৃক্ষরোপণ এবং ৫,১২১ হেক্টর বনভূমি বনায়নের আওতায়ভুক্ত করা, ১২ হাজার ৮১৩টি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন এবং ৯ লাখ ২৮ হাজারটি উন্নত চুলা বিতরণ করা হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে ১৭ হাজার ১৪৫টি সোলার হোম সিস্টেম, ২,৪৫১টি পানি বিশুদ্ধকরণ সৌরপ্লান্ট, ১,১৮৮টি সোলার স্ট্রিট লাইট এবং ১৭টি কম্পোস্ট প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ইতোমধ্যে ১,৬১৯টি শিল্প কারখানায় ইউটিপি (Effluent Treatment Plant ) স্থাপিত হয়েছে।

স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ-

‘বঙ্গবন্ধু-১’ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মধ্যদিয়ে গত ১১ মে বিশ্বে স্যাটেলাইটের অধিকারী ৫৭তম দেশ হিসাবে নাম লেখায় বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রথমে দেশে সেবা দিচ্ছে বিসিএসসিএল। এরই মধ্যে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনসহ বেসরকারি কয়েকটি টেলিভিশন পরীক্ষামূলক বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের তরঙ্গ ব্যবহার করছে।

বঙ্গবন্ধু-১ এর ফলে ডাইরেক্ট-টু-হোম (ডিটিএইচ) ভিডিও সার্ভিস, ই-লার্নিং, টেলি-মেডিসিন, পরিবার পরিকল্পনা, কৃষি খাতসহ দুর্যোগ উদ্ধারে ভয়েস সার্ভিসের জন্য সেলুলার নেটওয়ার্কের কার্যক্রম এবং এসসিএডিএ, এওএইচও এর ডাটা সার্ভিসের পাশাপাশি বিজনেস-টু-বিজনেস (ভিসেট) পরিচালনায় আরও সহজতর করবে। এছাড়া এটি ব্যবহার করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্রডব্যান্ড সেবা দেয়াও সম্ভব হবে৷

‘বঙ্গবন্ধু-১' স্যাটেলাইটটি ভূপৃষ্ঠ থেকে মোটামুটি ৩৫,০০০ কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থান করছে৷ এটি বাংলাদেশ এবং বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশে ভিডিও এবং যোগাযোগ স্যাটেলাইট হিসেবে কাজ করবে৷ পাশাপাশি ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন্স এবং ইন্দোনেশিয়াও স্যাটেলাইটটির কাভারেজের আওতায় থাকবে৷

সমুদ্র বিজয়-

দুই বছরের ব্যবধানে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের বিরোধপূর্ণ সীমানার মীমাংসা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা অনেক বেড়েছে।

হল্যান্ডের হ্যাগে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল প্রদত্ত এ রায় দুটোকে বাংলাদেশের ‘সমুদ্র বিজয়’ বলে অভিহিত করা হয়।

আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে, ২০১২ সালে মিয়ানমার আর ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি টেরিটোরিয়াল সমুদ্র এলাকা এখন বাংলাদেশের।

এছাড়াও আছে ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল ও চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে সব ধরনের প্রাণিজ-অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার।

মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রে বিরোধপূর্ণ ১৭টি ব্লকের ১২টি পেয়েছিল বাংলাদেশ। ভারতের দাবিকৃত ১০টি ব্লকের সবই পেল বাংলাদেশ। এ ছাড়া বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার অঞ্চলের ১৯ হাজার পেয়েছে বাংলাদেশ আর বাকি ৬ হাজার গেছে ভারতের অধিকারে।

বর্তমানে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার টেরিটোরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ, অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের এই প্রাপ্তি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নবযুগের সূচনা করেছে।

সামরিক খাত-

সামরিক শক্তির বিচারে বিশ্বের ১৩৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৫৬তম। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সামরিক খাতে ব্যয় বেড়েছে ১২৩ শতাংশ।

সামরিক খাত নিয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং গবেষণা করে, বিশ্বে সুপরিচিত এমন একটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে সামরিক খাতে ব্যয় ছিল প্রায় ৬,৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৭ সালে সামরিক খাতে ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮,৮০০ কোটি টাকা।

এছাড়াও গত বছর চীনের ০৩৫-জি টাইপ দুটি ডিজেল ইলেকট্রিক সাবমেরিনের অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে নতুন যুগে পদার্পণ করে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। বিশ্বের ৪১তম দেশ হিসেবে সাবমেরিন ক্ষমতার মালিক হয় বাংলাদেশ। এমনকি ‘বানৌজা নবযাত্রা’ ও ‘বানৌজা জয়যাত্রা’ নামে সাবমেরিন দুটির কমিশনিং ফরমান হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে ত্রিমাত্রিক নৌশক্তিতে পরিণত হয় বাংলাদেশের নৌবাহিনী।

বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীতে ২ লাখ ২৫ হাজার সেনা রয়েছে। এর মধ্যে সক্রিয় সেনা সদস্যের সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজার আর সংরক্ষিত সেনা সদস্যের সংখ্যা ৬৫ হাজার।

সামরিক বাহিনীর হাতে বিমান রয়েছে ১৭৩টি। এয়ারক্রাফটের মধ্যে রয়েছে; ৪৫টি ফাইটার এয়ারক্রাফট, ৪৫টি অ্যাটাক এয়ারক্রাফট ও ৫৭টি ট্রান্সপন্ডার। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে হেলিকপ্টারের সংখ্যা ৬৪টি। এর মধ্যে কমব্যাট ট্যাংক রয়েছে ৫৩৪টি। সাঁজোয়া যান রয়েছে ৯৪২টি, সেলফ-প্রপেলড আর্টিলারি ১৮টি, এছাড়াও রকেট প্রজেক্টর রয়েছে ৩২টি।

সামরিক নৌযানের সংখ্যা মোট ৮৯টি। এর মধ্যে ফ্রিগেট রয়েছে ৬টি। সাবমেরিন আছে ২টি। প্যাট্রোল ভেসেল ৩০টি। মাইন ওয়ারফেয়ার রয়েছে ৫টি।

তথ্য-প্রযুক্তি ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন-

ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দিতে যুগান্তকারী সব পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এমনকি গত দশ বছরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ ঘটেছে। প্রযুক্তিভিত্তিক তথ্য ও সেবা সাধারণ মানুষের দোড়গোড়ায় পৌঁছে গেছে।

দেশের তৃণমূল পর্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি সেবা পৌঁছে দেবার অভিপ্রায়ে দেশের ৪৫৫০টি ইউনিয়ন পরিষদে স্থাপন করা হয়েছে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার। তৈরি করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বিশাল ন্যাশনাল ওয়েব পোর্টাল। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এ পোর্টালের সংখ্যা প্রায় ২৫০০০। দেশের সবক’টি উপজেলাকে আনা হয়েছে ইন্টারনেটের আওতায়।

এছাড়াও কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, অধিকতর উন্নত জনসেবা প্রদানের জন্য প্রশাসনের সর্বস্তরে ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠা করেছে সরকার। এ প্রেক্ষাপটে দেশে সকল পর্যায়ের সরকারি দপ্তরে আইসিটি ভিত্তিক নেটওয়ার্ক স্থাপনের জন্য চীন সরকারের আর্থিক সহায়তায় মোট ১২৯৫.৯২ কোটি টাকা ব্যয় হয়। এই প্রকল্পের মেয়াদকাল ছিল জুলাই ২০১৩ হতে ডিসেম্বর ২০১৫ সাল পর্যন্ত।

এছাড়া টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। সেবা প্রদান প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে চালু করা হয়েছে ই-পেমেন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিং। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পাদন করার বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে ৪-জি প্রযুক্তির মোবাইল নেটওয়ার্কের।

এছাড়াও ইতোমধ্যে বিকেআইসিটি থেকে ৩,২৭৬ জনকে, বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের অধীন সাপোর্ট টু ডেভেলপমেন্ট অব কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক প্রকল্পের আওতায় দেশে-বিদেশে ৪,৯৮১ জনকে, ‘বাড়ি বসে বড় লোক’ কর্মসূচির অধীনে ১৪ হাজার ৭৫০ জনকে বেসিক আইসিটি, স্কিল এনহ্যান্সমেন্ট ও ফ্রিল্যান্সিং ইত্যাদি নানা ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশের সকল উপজেলার সাথে জরুরি প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সরাসরি কথোপকথনের জন্য এবং একসাথে একাধিক উপজেলায় বার্তা অথবা তথ্য প্রেরণ, সভা অথবা অনুষ্ঠান সম্পন্নের উদ্দেশ্যে ইনফো-সরকার প্রকল্প থেকে স্থাপিত ইন্টার্নেট কানেক্টিভিটির উপর ভিত্তি করে ভিডিও কনফারেন্স ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।

৮০০টি নির্ধারিত স্থানে আইটি নেটওয়ার্কের উপর ৭৬৮ কেবিপিএস থেকে ২ এমবিপিএস ব্যান্ডউইথসহ ভিডিও কনফারেন্সিং ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এই ৮০০টি সিস্টেমকে মূলত সকল মন্ত্রণালয়, ৪৮৭টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, দেশের সকল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, পিটিআই, টিটিসিসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ অফিসসমূহে স্থাপন করা হয়েছে।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কানেক্টিভিটি প্রাপ্ত ১৮ হাজার ১৩০টি অফিসে ব্যবহারের জন্য একটি করে এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে উপসচিব পর্যন্ত পদের বিপরীতে, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সকল কর্মকর্তার পদের বিপরীতে, বিভিন্ন অধিদপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদের বিপরীতে ট্যাবলেট পিসি বিতরণ করা হয়েছে।

তৃণমূল পর্যায়ে তথ্য প্রযুক্তি উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্য সেবা বিতরণের উদ্দেশ্যে ওয়ানস্টপ সার্ভিস সেন্টার হিসেবে দেশব্যাপী গ্রাম পর্যায়ে কৃষি তথ্য সার্ভিস কর্তৃক ২৫৪টি কৃষি তথ্য ও যাগাযোগ কেন্দ্র (এইসিসি) ইতোপূর্বে স্থাপন করা হয়েছে।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ২০১৫ সাল থেকে জাতীয় পর্যায়ে হাই স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা আয়োজন করেছে। এছাড়া সাইবার হয়রানি রোধে একটি সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তিভিত্তিক এই উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে ডিজিটাল নবজাগরণ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Bootstrap Image Preview