Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৯ শুক্রবার, জুলাই ২০১৯ | ৩ শ্রাবণ ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

মণিপুরী সম্প্রদায়ের সমাজ-সংস্কৃতি 

হৃদয় দেবনাথ, মৌলভীবাজার প্রতিনিধিঃ
প্রকাশিত: ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ১২:১৭ PM
আপডেট: ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ১২:৩৩ PM

bdmorning Image Preview


খাল-বিল, হাওড়, গ্রামীণ মেঠোপথ, সবুজ ফসলের মাঠ, এঁকেবেঁকে বয়ে যাওয়া নদী যেমন আকর্ষণ করে অনেককে, তেমনি আকাশ ছোঁয়া পাহাড়, গহীন অরণ্য, গ্যাস ফিল্ড আর সারিসারি চা-গাছের সবুজ সমারোহ অনেককেই কাছে টানে। তেমনি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় বসবাসকারী মণিপুরী সম্প্রদায়ের জীবন ও সংস্কৃতি অরণ্য অঞ্চলের সৌন্দর্য্যকে আরও মনোমুগ্ধকর করে তোলে।

আবহমান কাল ধরে সবুজ শ্যামল বন বনানী সুশোভিত এ প্রান্তরে সাধু সন্ত দরবেশগণ তাদের আধ্যাত্মিক বিকাশের সুযোগ লাভ করেছেন, তেমনি নানা নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বসবাসস্থল এই অঞ্চল। শত বছরের প্রাচীন মণিপুরী সংস্কৃতির স্বতন্ত্রধারা মৌলভীবাজার তথা সারাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত। মণিপুরী সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব রাসলীলার পরিচিতি সর্বমহলে।

মণিপুরীদের বসতি স্থাপনের গোড়ার কথা:

মণিপুরী জনবসতি স্থাপনের কাল নির্ণয়ে নানাজনের নানামত পরিলক্ষিত। ব্রিটিশ কর্তৃক মণিপুরী রাজ্য দখলের পর মণিপুরীরা নিজ রাজ্য ছেড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে। বিভিন্ন জনের মতে ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, শ্রীমঙ্গল ও বড়লেখা উপজেলায় মণিপুরী জনগোষ্ঠী বিষ্ণুপ্রিয়া, মৈতৈ ও পাঙন এই তিন সম্প্রদায়ের লোক সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করতে শুরু করে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৯ সালে সিলেট ভ্রমণে মণিপুরী নৃত্য দেখে মুগ্ধ হন এবং শান্তি নিকেতনে মণিপুরী ওস্তাদ নিয়োগ দিয়ে মণিপুরী নৃত্য বিভাগ চালু করে এই নৃত্যকে বিশ্বসভায় পরিচিতি লাভ করার সুযোগ করে দেন।

মণিপুরীদের জীবন জীবিকা:

মণিপুরী সম্প্রদায়ের লোক খুবই পরিশ্রমী। নারী-পুরুষ সম্মিলিতভাবে কৃষি কাজ করে থাকে। কিন্তু মণিপুরী তাঁতশিল্প তাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড। তাদের তৈরি পোশাক সারাদেশ তথা বিশ্বে সমাদৃত। তাদের বুননকৃত জামা কাপড়-কাঁথা অনেকে শখের পরিচ্ছদ হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। 

গৃহ ও গৃহস্থালী:

মণিপুরীদের প্রাচীন গৃহ সাধারণত পূর্বমুখী। প্রায় ৮টি প্রকোষ্ঠ বা কুটরীতে বিভক্ত এবং পূর্বভাগে অবস্থিত থাকায় এবং গৃহ পূর্বমুখী হওয়াতে শীতের সকালে লোকেরা এখানে বসে রৌদ্র পোহাতে পারে ও কাজ করতে পারে। অগ্নি কোণে রন্ধনাগার। দক্ষিণ ভাগে শয়নাগার। পশ্চিমে গৃহের নৈরত কোনে ধান্যগার। গৃহের বাহির প্রাঙ্গনের ঈশান কোণে তুলশী মঞ্চ অবস্থিত থাকে। ঘরে রয়েছে 'নিঙলকা' 'গিথানীপুঙ্গ' পশ্চিম বৈদিক যুগের বিধানুযায়ী এই কুণ্ডের প্রায় সর্বদা আগুন থাকে। বাসগৃহ নির্মাণে প্রকোষ্ঠের মধ্যে আসবাবপত্র, থালা বাসন, শিল-পাটা, কুলো, চালুন, ডালা, ঝাঁটা সব পরিবারেরই এর ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।

পোশাক পরিচ্ছদ:

পুরুষদের পোশাক ধুতি ও শার্ট বা পাঞ্জাবী। বাড়িতে কাজকর্মের সময়ে তাঁতের বুনা বড় মাপের লুঙ্গি সদৃশ গামছা যা অত্যন্ত টেকসই ও বুনন কারুকার্যেপূর্ণ দীর্ঘমাপের, সেগুলো পরিধান করেন। মেয়েদের পোশাক লাহিং বা ফানেক ও ওড়না বা ইনাফি। ফানেক বা লাহিঙের বুনন ডিজাইন অত্যন্ত চমৎকার। বিভিন্ন রং এর ডিজাইনে তাঁত বুনা ফানেক বা লাহিঙ টেকসই ও বৈচিত্রপূর্ণ। শহরাঞ্চলে বা বাহিরে যাতায়াতের সময় মেয়েরা শাড়ি, ব্লাউজ ও উড়না পরিধান করে থাকে। বস্ত্রশিল্পে মণিপুরী তাঁতে বুনা কাপড়ের চাহিদা ও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।

অলংকার:

মণিপুরী রমনীদের অলংকার পরিধানের রীতি প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত। বিভিন্ন প্রকার অলংকারাদির মধ্যে সেনারিক, নেকলেস, থাবরেত লিকচিক, কানের দুল, হাতের স্বর্ণবালা বা চুড়ি। মণিপুরী রমনীরা সৌন্দর্য্যে সচেতন। খোঁপায় বিভিন্ন রকমের সুগন্ধি ফুল গুজে দিয়ে রূপসজ্জা করে। এমন কোন পরিবার দেখা যায় না যাদের বাড়ির আঙ্গিনায় দু'একটি ফুলের গাছ পাওয়া না যায়। দৈনন্দিন পূজা অর্চনাতে ও ফুলের প্রয়োজন হয়। আর সুগদ্ধি ফুলের মালা গলায় পড়ে, খোঁপায় গুজে দেহমনকে পবিত্র করে রাখে। 

মণিপুরী নৃত্য:

মণিপুরীদের ধর্ম ও সংস্কৃতি অভিন্ন সূত্রে প্রোথিত। ধর্ম-কর্ম, উৎসব-অনুষ্ঠান সব কিছুতেই ঘিরে আছে নৃত্য ও গীত। মণিপুরীরা জাত শিল্পী। আবাল বৃদ্ধ বনিতা প্রায় সকলেই গাইতে ও নাচতে জানে। মণিপুরী নৃত্য অতি প্রাচীন। মহাভারতের আদিও অশ্বমেধ পর্বে পাওয়া যায় বীর চূড়ামণি অর্জুন দ্বাদশ বর্ষব্যাপী বনবাসকালে পর্যটনে এসে মণিপুরী দুহিতা চিত্রাঙ্গদাকে বিবাহ করেন। মণিপুরী দুহিতা চিত্রাঙ্গদা নৃত্যগীত পটীয়সী ছিলেন। মণিপুরী নৃত্যের প্রচলন সম্বন্ধে এক উপাখ্যানে আছে, একবার কৃষ্ণ গোপীদের সঙ্গে রাসলীলা করেন। তাঁদের নৃত্যবাসরে কোন বিঘ্ন যেন না আসে সেজন্য তিনি শিবকে দ্বার রক্ষক নিযুক্ত করেন। এই সময় পার্বতী সেখানে উপস্থিত হন এবং শিবের নিষেধ সত্ত্বে তিনি গোপনে রাসলীলা দেখেন।

এই রাস দেখে তাঁর মনে দারুন অভিলাষ জাগে যে, তিনি ও শিবের সঙ্গে রাস নৃত্য করবেন। শিব উপায়ন্তর না দেখে নৃত্যের উপযোগী জায়গার সন্ধান করলেন। এই উদ্দেশ্যে কৈলাসপর্বতের নীচে এসে একটি অঞ্চলে পর্বতশৃঙ্গে দণ্ডায়মান হন এবং চারদিকে জলবেষ্টিত স্থান নৃত্যের জন্য মনোনীত করেন। শিব তাঁর ত্রিশুল দিয়ে পাহাড়ের গায়ে ছিদ্র করেন। সমস্ত জল পার্শ্ববর্তী অঞ্চল প্লাবিত করে নদীর আকার নেয়। জমি শুকনো হলে শিব ও পার্বতী সেখানে লীলা করেন। এইভাবে নৃত্য আরম্ভ হলে সর্পরাজ অনন্ত তার মনি দিয়ে জায়গাটিকে রাজা ভাগ্যচন্দ্র মণিপুরী নৃত্যের তথা রাসলীলার প্রচলন ঘটান। মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ নির্বিশেষে রাসনৃত্য করে থাকে। মণিপুরী মন্ডপ সমূহে রাসলীলার সময় নৃত্যশিল্পীরা গোপীবেশে যখন সূক্ষ ওড়ানাতে মুখখানি ঢেকে, অলকা তিলকা শোভিত হয়ে, চরণে নুপুরে ঝঙ্কার তুলে মন্ডলীতে নৃত্য করেন, তখন অপরূপ এক মোহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আজ মণিপুরী নৃত্য বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় আসন দখল করেছে। 

বিয়ে অনুষ্ঠান:

মণিপুরীদের বিয়ে অনুষ্ঠান অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। সাধারণত কার্তিক মাসে রাসলীলা অনুষ্ঠানে হাজার হাজার মণিপুরীদের আগমণ ঘটে রাসোৎসবে। তখন ছেলে-মেয়ে একে অপরকে পছন্দ করে নেয়। এতে পরিবারের পক্ষ থেকে কোন বাধা আসে না। মা-বাবারা ছেলে-মেয়ের পছন্দমত আনুষ্ঠানিকভাবে বর ও কন্যাকে দেখে হিন্দু ধর্মাম্বলীদের রীতি অনুসারে দিন তারিখ ঠিক করে বিয়ের পিঁড়েতে বসান। বিয়ের আগের দিন গায়ে হলুদ (অধিবাস), পরের দিন বিয়ে। বরযাত্রীরা বর নিয়ে আসেন কন্যার বাড়িতে। কন্যা তখন বিয়ের পোশাক হিসেবে ৪ টি পোশাক পরিধান করে। একটি কোমর থেকে নিচে, একটি কোমর থেকে উপরে, একটি ওড়না এবং বিয়ের রকমারী ওড়না। মণিপুরী মেয়েদের গায়ের রং ফর্সা থাকায় কনে বেশে তাদেরকে অপরুপ দেখায়। বররা সাধারণ ধূতি ও পাঞ্জাবী পড়ে থাকে। বিয়ের খাবার দেয়া হয় দই, চিড়া, মুড়ি, গুড় এবং অনেকই ভাত খেয়ে থাকেন। বর রাত্রে এসে আবার বিয়ে শেষে রাত্রেই নিজ বাড়িতে ফিরে যান কনেসহ। স্বামীর বাড়িতেই বাসরঘর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

উৎসব অনুষ্ঠান:

মণিপুরী সমাজে পার্বণিক উৎসব অনুষ্ঠান ছাড়া ও রয়েছে জন্ম বিবাহ ও মৃত্যুকেন্দ্রিক শ্রাদ্ধ কীর্কনাদির অনুষ্ঠান। বিশেষ করে বিবাহ ও পার্বনিক অনুষ্ঠানগুলো সনন্ন হয় অতি উৎসব মুখর পরিবেশের মধ্যে দিয়ে। মণিপুরী সমাজ অসংখ্য সংস্কারমূলক ধর্মীয় রীতিনীতি এবং সামাজিক ভাবে পালন করে ততোধিক আচার ও আচরণ। সারা বছর পৌন:পুনিকভাবে বহু উৎসব ও অনুষ্ঠান লেগে থাকে। প্রতিটি সামাজিক উৎসবের ও বিশেস নাম রয়েছে। চৈত্র মাসে সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে নবান্ন উৎসব, কার্তি পালি, রথযাত্রা, কীর্তন সারাবছর অনুষ্ঠানাদি নিয়ে গ্রামের মণ্ডপগুলোতে মৃদঙ্গের আওয়াজে গম গম করতে থাকে। কোন কোন উৎসব টানা, কয়েকদিন ধরে চলে। খাওয়া দাওয়া, নিরামিষ-ভোজন চলে কয়েকটি বিশেষ উৎসবে। 

উপজাতীয় মণিপুরীরা আজ দেশের বিভিন্ন স্থানে উচ্চ পদে চাকরিতে নিয়োজিত আছেন। সরকার তাদেরকে আলাদা ভাবে কোটা করে দেয়। তাদের সমাজ ও সংস্কৃতি অন্যদের চেয়ে আলাদা। মণিপুরী অনেক মহিলারা তাদের স্বামীর সাথে সমানভাগে কাজ করে থাকে। অনেক মণিপুরী নিম্নবিত্ত মহিলারা হালচাষ বাদে ধান কাটা, রোয়া, হালির চারা উত্তোলন, বাজার করাসহ বিভিন্ন কাজ করে থাকেন। তাদের ছোট ছোট ছেলে মেয়েকে পিঠে গামছা দিয়ে বেঁধে রেখে কাজ করতে দেখা যায়। এ কথায় মণিপুরী সম্প্রদায়ের লোকেরা যেমন কষ্ট করছে তেমনি সমাজের সম্মানের সাথে বসবাস করছে। সমাজ জীবনে সংঘবদ্ধ ও অত্যন্ত পরিশ্রমী এই জনগোষ্ঠী তাদের শ্রম ও কর্মকুশলতা দিয়ে জেলা তথা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধে ছিল তাদের অপরিসীম ভূমিকা।

Bootstrap Image Preview