Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৯ শুক্রবার, জুলাই ২০১৯ | ৩ শ্রাবণ ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

১২টি বিশেষ অভিযানেও ধরা পড়েনি 'ড্রাগ মাফিয়া কিং'

ইসতিয়াক ইসতি
ক্রাইম রিপোর্টার
প্রকাশিত: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৪:৪১ PM
আপডেট: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৪:৪২ PM

bdmorning Image Preview


ঢাকা-১৩ আসনের অন্যতম ভোট ব্যাংক হিসাবে পরিচিত জেনেভা ক্যাম্পে প্রবেশের পরে একটা জিনিস লক্ষ্য করা গেল- আগের মত কেউ আর প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করছে না। কিন্তু বিডিমর্নিং এর ইনভেস্টিগেশন টিমের হাতে থাকা তথ্য বলছে- ঢাকার মাদক সম্রাট হিসাবে পরিচিত ইশতিয়াক এখনো প্রতিদিন ইয়াবাসহ প্রায় কোটি টাকার মাদক বিক্রি এই ক্যাম্প থেকে।

মিনিট ৩০ ক্যাম্পের অলিগলি ঘোরাঘুরির পরে একটি সাত থেকে আট বছর বয়সের ছেলের কার্যক্রম সন্দেহজনক মনে হয়। তাকে অনুকরণ করলে আমাদের হাতে থাকা তথ্যের কিছু সত্যতা পাওয়া যাবে, এই আশাতে এই খুদে শিশুটিকে ফলো করা শুরু করলে মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে এর সত্যতা পাওয়া যায়।

ছেলেটি জেনেভা ক্যাম্পের বাইরে থেকে আশা একজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ক্যাম্পের ঘৃঞ্জি গলির ভিতরে চলে যায়। আর ১০ মিনিট থেকে ১২ মিনিটের মধ্যে ফিরত এসে কিছু একটা তাদের হাতে দিচ্ছে। আর সেই মানুষটি হাতে পাওয়া জিনিটি না চেক করেই পকেটে নিয়ে দ্রুততার সাথে ক্যাম্প থেকে বাবর রোডের দিকের রাস্তা ব্যবহার করে বেড়িয়ে যায়।

নিশ্চিত হওয়া গেল যে- ছেলেটি কিছু একটা ভেতর থেকে এনে বিক্রি করছে। আর ১ ঘণ্টার মত তাকে ফলো করে নিশ্চিত হওয়া যায়- শিশুটি মাদক বিক্রির সাথে যুক্ত। কিন্তু শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার জন্য শিশুর সামনে গিয়ে দাঁড়ালে; সে কাছে এসে নিচু গলাতে বলতে থাকে- "বড় মাল ৩২০ টাকা আর ছোট মাল ২০০ টাকা। মালের টান আছে তাই প্রতি পিসে ২০ টাকা করে বেশি দিতে হবে।"

এখন প্রশ্ন হচ্ছে চলতি বছরের মে মাস থেকে চলতে থাকা মাদকবিরোধী অভিযানের পরেও কিভাবে ক্যাম্পের ভিতরে এখনো মাদক বিক্রি হচ্ছে?

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে- এই ক্যাম্পসহ ঢাকার প্রায় সব স্থানে এখন মাদকের যোগান দিয়ে আসছে মোহাম্মপুর জেনেভা ক্যাম্পে বেড়ে উঠা কামরুল হাসান। আর এই কামরুল হাসান হচ্ছেন মাদক সম্রাট (ড্রাগ মাফিয়া কিং) হিসাবে পরিচিত ইশতিয়াক।

র্শীষ এই মাদক ব্যবসায়ীর সম্পর্কে গোয়েন্দা থেকে জানা যায়, জেনেভা ক্যাম্পের মাদকের মূল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং ঢাকা শহরের প্রধান ইয়াবা সরবরাহকারী ব্যক্তি তিনি। কক্সবাজার থেকে সরাসরি ইয়াবার চালান নিয়ে আসেন। তার বিরুদ্ধে মাদক ও হত্যাসহ ১৫টি মামলা রয়েছে শুধুমাত্র মোহাম্মদপুর থানায়। এর মধ্যে চারটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের দায়ের করা। তিনটি মামলার অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। মাদক ব্যবসায় শুরু থেকে তার প্রধান দুই সহযোগী হিসাবে নাদিম হোসেন ওরফে পঁচিশ ও সেলিম ওরফে চুয়া ওরফে চোরা সেলিম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০১২ সালে পর থেকে খুব অল্প সময়ে মাদক বিক্রি করে ঢাকার জেনেভা ক্যাম্পে ১টি বাড়ি, বনানীতে ১টি ফ্ল্যাট, হেমায়েতপুরে কয়েকবিঘা জায়গা নিয়ে ১টি বাংলো বাড়ি, আশুলিয়ার গাজীরচট ও বেড়িবাঁধের পাশে তার দুটি বাড়ি, ভারতে ১টি বাড়ি, পাজেরো গাড়ি ছাড়াও মালয়শিয়াতে বাড়িসহ নানা ধরণের ব্যবসা রয়েছে ইশতিয়াকের। বেশিরভাগ সময়েই বাংলাদেশ সংলগ্ন ভারতীয় বর্ডার এলাকায় থেকে মুঠোফোনের মাধ্যমে সে তার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে- এমন তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

২০১২ সালে পর থেকে খুব অল্প সময়ে মাদক বিক্রি করে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন তিনি। শুধুমাত্র মোহাম্মদপুরেই ইশতিয়াকের ১শ'টির বেশি মাদকের স্পট রয়েছে। এর মধ্যে জেনেভা ক্যাম্পেই রয়েছে ৫০টির বেশি স্পট।

এ ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ২ শতাধিক বেশি স্পটের সাথে ড্রাগ মাফিয়া কিং ইশতিয়াকের যুক্ত থাকার তথ্য দিয়েছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও গোয়েন্দা বাহিনীর তালিকাগুলোতে শীর্ষে থাকা বহুল আলোচিত ‘ড্রাগ মাফিয়া কিং’ হিসেবে খ্যাত কামরুল হাসান ওরফে ইশতিয়াক অদৃশ্য শক্তির বলে এখনো অধরাই রয়েছে। এমনিকি এই মাদক ব্যবসায়ীর অবস্থান চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়নি কেউ। আর কারণ হিসাবে প্রতিবারই উঠে এসেছে, ‘শুরু থেকে ‘এজেন্ট’ নিয়োগের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করার কারণে এখন আড়াল থেকে গিয়েছে ইশতিয়াক’। যার ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তার কোনো ছবি এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

২০১৮ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকার মধ্যে ১ নম্বরে অবস্থান থাকা এই মাদক ব্যবসায়ীকে ধরার জন্য গত দুই বছরে কমপক্ষে ১২টির বেশি বিশেষ অভিযান হলেও সব কয়টি অভিযান ব্যর্থ হয়েছে।

জেনেভা ক্যাম্পের স্থানীয় বাসিন্দারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ২০১৬ সাল পর্যন্ত ইশতিয়াক জেনেভা ক্যাম্পে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তবে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের তালিকায় তার নাম চলে আসায় তিনি আর আসেন না।

দীর্ঘদিন ধরে ইশতিয়াককে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে আসছে জেনেভা ক্যাম্পের এসপিজিআরসি। এই সংস্থার নেতার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ‘শুরু থেকেই আমরা ইশতিয়াককে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু প্রশাসন এ বিষয়ে সবসময় নিরব ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন করলে উল্টো আমাদের বিরুদ্ধেই মামলা হামলার মামলা করা হয়। এমতাবস্থায় আমরা এ থেকে অব্যাহতি চাই।'

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারি পরিচালক খোরশেদ আলম জানান, শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ইশতিয়াককে গ্রেফতারের বিষয়টিকে আমরা সর্বোচ্চ পরিমাণ গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। আমরা তার বিষয়ে অবগত রয়েছি। তাকে ধরার জন্য পরিচালিত একটি অভিযানে ইশতিয়াকের প্রধান সহকারি নাদিম ওরফে পঁচিশ বন্দুকযুদ্ধে মারা গিয়েছে।

Bootstrap Image Preview