Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২১ সোমবার, জানুয়ারী ২০১৯ | ৮ মাঘ ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

মিরপুরের জল্লাদখানা: গণহত্যার এক নির্মম ইতিহাস

মোঃ সবুজ খান
সাব এডিটর
প্রকাশিত: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৬:২৫ PM
আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৬:২৮ PM

bdmorning Image Preview


‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই, আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ন নৃত্য দেখি, ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে’। দুঃস্বপ্নে ঘেরা এক মহান গৌরবের নাম ১৯৭১। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে খচিত সেই সময়টা আজও কাঁদিয়ে তোলে বাঙালির হৃদয়কে। আজও রাতের নিস্তব্ধটায় ঘুম ভেঙে যায় বুলেটের ঠা ঠা শব্দে। সেদিনের হত্যাযজ্ঞের প্রমাণ আজও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সারা দেশজুড়ে।

বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, কৃষক-মজুর থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে যুদ্ধকালীন সময়ে। এই হত্যাযজ্ঞ চালানোর জন্য পাক হানাদার ও তাদের দোসর রাজাকাররা কিছু নির্দিষ্ট স্থান বেঁছে নিয়েছিল। এসকল স্থান বধ্যভূমি নামে পরিচিত। এ যাবৎ দেশের বহু কিছু স্থানকে বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুসারে ঢাকা বিভাগে ৮৬, রাজশাহী বিভাগে ১৪৭, চট্রগ্রাম বিভাগে ৮৭, খুলনা বিভাগে ৬৭, বরিশাল ২২ ও সিলেট বিভাগে ৫৭ স্থানকে বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম বধ্যভূমি হচ্ছে রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত ‘জল্লাদখানা বধ্যভূমি’। জল্লাদখানা নাম শুনেই আমরা কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি কতটা নিসসংসভাবে এখানে জল্লাদেরা আমাদের মুক্তিকামী মানুষদের হত্যা করেছিল। মিরপুরের ১০নং সেক্টরের ডি-ব্লকে এর অবস্থান।

বধ্যভূমির বাহিরে

মিরপুরের স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দা বিডিমর্নিংকে জানায়, মিরপুর খালের ধারের এই নির্জন স্থানটিতে দুটি পয়নি স্কাসন ট্যাঙ্কের উপর একটি পরিত্যাক্ত পাম্ব হাউজ ছিল। জায়গাটি নির্জন বলে স্থানটি বেঁছে নেয় পাকিস্তানিরা। এখানে দুটি পানির কূপ ছিল। নিরীহ বাঙালিদের হত্যা করার পর এসব কূপে ফেলে দেওয়া হত। হত্যার পর একটা কূপে দেহ আর একটা কূপে মাথা ফেলে দেওয়া হত। এখানে জবাই করে হত্যা করা হতো বলেই এর নাম রাখা হয় জল্লাদখানা বধ্যভূমি।

বধ্যভূমির দলিলপত্র ঘেটে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে ১৯৯৯ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তায় জল্লাদখানা বধ্যভূমিতে আবারও খনন কাজ চালানো হয়। ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেটের সহায়তায় খননরে কাজ চলে। খননকাজ শেষে বধ্যভূমি থেকে মোট ৭০টি মাথার খুলি ও ১৫৯২টি মানুষের দেহের বিভিন্ন অংশ পাওয়া যায়।

বর্তমানে বধ্যভূমিটি মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের অধীনে রক্ষিত রয়েছে। এ ছাড়া এখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন বধ্যভূমির মাটি সংরক্ষিত রয়েছে। এ ছাড়া এখানে দেখভালের জন্য কাজের লোকও রাখা হয়েছে। সার্বিক তত্ত্বাবধানের জন্য আছেন একজন কর্মকর্তা।

এ পর্যন্ত জল্লাদখানা বধ্যভূমিতে হত্যার শিকার মোট ৪১ জন শহিদের তথ্য পাওয়া যায়। তাদের প্রায়ই ছিলেন স্থানীয় মিরপুরের বাসিন্দা। তাদের অধিকাংশই ছিলেন- ছাত্র, কৃষক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও দিনমজুর।

জল্লাদখানায় শহীদ হওয়া ব্যক্তিরা হলেনঃ

খন্দকার আবু তালেব, আবদুল হাকিম, আবদুর রহমান, হাজী আবদুর রহিম, রমিজ উদ্দিন, ররকত আলী মোল্লা, শহীদউল্ল্যা মোল্লা, আঃ আজীজ মোল্লা, ডা জইন উদ্দিন, আশ্রাব আলী দেওয়ান, আক্রব আলী, গোলাম কিবরিয়া, ইসমাইল বেপারী, বুশির মিস্ত্রি, জগত মিয়া, আবদুস সামাদ, বদরুদ্দোজা, কাশাবদ্দোজা, জমিজ মিয়া, সোলেমান, আক্কাস আলী, তপন, মালফত, সফুর উদ্দিন সফু, মোঃ সালে, মোঃ গোদা মিয়া, আঃ রহিম।

এ ছাড়া পরবর্তীতে সংযোজন করা হয়, মোঃ মাহবুব, শামসুল হক, শেখ রহমত উল্লাহ, শেখ আবু হোসেন খোকা, শেখ আশরাফ আলী, আবদুল জলিল, শেখ ফজলুর রহমান, শেখ জয়নাল আবেদীন, শেখ সামসুল হক, মোফাজ্জল শেখ, মোঃ তাজুল ইসলাম ভূঁইয়া, মোঃ ইয়ার আলী, মোঃ পিয়ার আলী, শেখ মহিউদ্দিন আহমেদ।

বধ্যভূমিতে নিহত শহীদ কাশাবদ্দোজার পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কাশাবদ্দোজা ছিলেন তৎকালীন মিরপুর ৮নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগেরে সভাপতি। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ থেকে মিরপুরের বিহারীরা তাদের বাসা ঘিরে রেখেছিল। পরদিন ২৮ মার্চ বিহারীদের মাধ্যমে পাকিস্তানিরা কাশাবদ্দোজা ও তার ভাই বদরুদ্দোজাকে ধরে নিয়ে যায়।

এ সময় তাদের বাসায় থাকা সকল মালামাল ও ধন-সম্পদ লুট করে নিয়ে যায় বিহারীরা। তাদের দুজনকে ধরে নিয়ে যাওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টা পর তাদের পরিবারের কাছে খবর যায়- বায়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছে কাশাবদ্দোজা ও তার ভাই বদরুদ্দোজাকে।

বিডিমরনিং-এর এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় জল্লাদখানায় হত্যযজ্ঞের শিকার সেই সময়ের প্রখ্যাত সাংবাদিক আবু তালেবের ছেলে খন্দকার আবুল আহসান সাথে।

সাক্ষাৎকারে খন্দকার আবুল আহসান (অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা) বলেন, 'আমার বাবা স্বাধীনতাকামী একজন মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও আইনজীবী। ১৯৪৭ সালে তিনি ঢাকার 'দৈনিক আজাদ' পত্রিকায় জোগ দেন। পরে ১৯৬২ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হন।‘

‘তিনি দৈনিক ইত্তেফাক বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানে চিফ রিপোর্টার ছিলেন। ইত্তেফাক যখন তৎকালীন সরকার বন্ধ করে দেন তখন সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী ও আমার বাবা মিলে 'দৈনিক সন্ধ্যা আওয়াজ' পত্রিকা বের করেন। এই সন্ধ্যা আওায়াজ পত্রিকাতেই প্রথম বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা প্রকাশিত হয়।‘

কিভাবে তার বাবাকে নিয়ে যাওয়া হলো সেই অন্ধকার কূপে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২৯ মার্চ যখন কারফিউ ভঙ্গ করা হয়, তখন বাবা ইত্তেফাক অফিসে গিয়ে সেখানকার ধ্বংসযজ্ঞ দেখার পরে একটু চিন্তিত হয়ে পরেন। তার আরেকটি কর্মস্থান এ্যাডভাইজিং ফার্মে যাওয়ার সময় পথে ইত্তেফাকের চিফ এ্যাকাউন্ট্যান্ট আব্দল হালিমের সাথে দেখা হয়। তার বাড়ি ছিল মিরপুর ১১ নম্বরে।

‘আমরা যতদূর যানি আব্দুল হালিমের পার্সোনাল গাড়িতে করে বাবাকে বিহারীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে আমরা অনেক খুজেও আর তার খোজ পাইনি। আর মিরপুরে তখন বিহারীদের দাপট এতটাই ভয়ানক ছিল যে বাঙালিরা প্রবেশ করতে পারত না।‘

বধ্যভূমির দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এ জল্লাদখানা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। এখানে প্রবেশের জন্য কোনো টিকেট লাগে না। একটি বাক্স আছে, যার যা ইচ্ছা, সে সেখানে দিয়ে যায়।

প্রতিদিনই গড়ে দেড়শ' থেকে দুইশ' দর্শনার্থী এখানে আসেন। উদ্বোধনের পর থেকে এ পর্যন্ত এ সংগ্রহশালা পরিদর্শন করেছেন প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষ। এ ছাড়াও প্রতি শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় এখানে নতুন প্রজন্মের কাছে মিরপুরের মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনান শহীদ পরিবারের সন্তানরা।

প্রসঙ্গত, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও ১৯৭২ সেলের ৩১ জানুয়ারি মিরপুর স্বাধীন হয়। পাক হারাদার ও বিহারীদের শক্ত ঘাটি ছিল মিরপুর। ৩০ জানুয়ারি লে. সেলিমসহ ৪১ জন সামরিক বাহিনীর সদস্য, শতাধিক পুলিশ এবং মুক্তিযোদ্ধারা এই এলাকায় সম্মুখ সমরে অংশ নেয়। ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালের সারাটা দিন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩১ জানুয়ারি সকালে মুক্ত হয় অবরুদ্ধ মিরপুর।

Bootstrap Image Preview