Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৩ বৃহস্পতিবার, মে ২০১৯ | ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

দিল্লির হোটেলের অভিজ্ঞতা আর ইউক্রেনের কটেজ

ইন্ডিয়ার ডায়েরি-৩

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০১৮, ০২:৩৫ PM
আপডেট: ২২ অক্টোবর ২০১৮, ০২:৩৬ PM

bdmorning Image Preview
ফাইল ছবি


সরোজ মেহেদী।।

দিল্লি বিমানবন্দরে যখন নামলাম তখন রাত ১২টা। আমি, পরশমনি আর তার মা একটা ট্যাক্সিতে চেপে বসি(পরশমনি সর্ম্পকে আগের লেখায় বলেছি)। গন্তব্য নিউ দিল্লি রেলস্টেশনসংলগ্ন পাহাড়গঞ্জে আগে থেকে বুক দিয়ে রাখা (আন্টিরা বুক দিয়ে এসেছেন) হোটেল। দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছানোয় আন্টি বললেন, তুমিও চলো আমাদের সঙ্গে। আমাদের হোটেলেই একটা রুম নিয়ে থাকবা। আমি কথা না বাড়িয়ে তাদের সঙ্গে চললাম।

রোমা হোটেলের রিসিপশনে একজন বসে বসে ঘুমাচ্ছেন আরেকজন সোফায় শুয়ে শুয়ে। আমাদের কথা শুনে জানালেন, এই হোটেলে কারো নামে কোনো সিট বুকিং নেই আর কোনো সিট ফাঁকাও নেই। ততক্ষণে রাত প্রায় দুটো। পরশমনি আতঙ্কিত হয়ে হোটেল বয়কে বলছেন, এত রাতে আমরা কোথায় যাব। দেখেন আমাদের নামে রুম বুক দেয়া আছে। পরশমনি বাংলায় কথা বলছে আর হোটেল বয় হিন্দিতে।

প্রথম দিককার ইস্তানবুল জীবনের কথা মনে পড়ে আমার। একদিন ট্যাক্সিতে চেপে বসেছি। ট্যাক্সিওয়ালা আমার সঙ্গে টার্কিশ ভাষায় গল্প জুড়ে দিয়েছেন। নিজ মনে বকে যাচ্ছেন আর কিছুক্ষণ পরপর আমার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দেন। আমি সবেমাত্র টার্কিশ শেখা শুরু করেছি। ক্যাবওয়ালার ইংরেজির লেভেল “ইয়সে-নো” পর্যন্ত। কিন্তু তিনি বলেই যাচ্ছেন। বলতে বলতে, তুরস্ক বা ইস্তানবুলের কোনো এক গভীর সমস্যা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন আন্দাজ করি। সে আমাকে জিজ্ঞাসা করে আন্ডারস্টেন্ডিং? আমি “না” বলতেই তিনি উত্তেজিত হয়ে যান। টার্কিস ভাষায় জানতে চান ‘নিয়ে আনলিয়োরসুন বেনি’ এর অর্থ ছিল কেন আমাকে বুঝতে পারছ না? আবার উনি একই বিষয়ে কথা বলতে শুরু করেন। আমি এবার মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলি। হেঁসে নতুন গল্প শুরু করেন।

হট্টগোলে রোমা হোটেলের আরও একজন স্টাফ নিজে নেমে আসলেন। তারা সবাই অবাঙালি। কিন্তু পরশমনি তাদের সঙ্গে বাংলাতেই কথা বলে যাচ্ছেন। রেগে গিয়ে খুব দ্রুত বাংলা বলছেন। আলম ভাই নামে এক দালাল তাদের নামে হোটেল বুক দিয়েছে। এখন এত রাত বলে তাকে ফোন দেয়া যাবে না। সকালবেলা ঠিকই সে আসবে। কর্মচারীরা পরশমনির কথার জবাবে হিন্দিতে বকেই যাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত আমরা হোটেল থেকে বের হয়ে আসি।

একটা ছেলে দৌড়ে এসে বলে আমাদের হোটেল লাগবে কি না। আমরা হ্যাঁ বললে আমাদের একটা হোটেলে নিয়ে যায়। সেই হোটেলে কাজ করে বেশ কয়েকটা ছেলে। ওদের মধ্যে কেউ কেউ বাংলা বুঝতে পারেন। একজন আবার ভাঙা ভাঙা বাংলায় কথাও বলতে পারে।

কলকাতা থেকে দিল্লি ভ্রমণও সুখকর ছিল না। নিরাপত্তা চেকের নামে আমাকে আবারও বেশ কয়েক মিনিট দাঁড় করিয়ে রাখা হলো। আমি জানতে চাইলাম কেন আমার সঙ্গে এমনটা করছ তোমরা। আমি পৃথিবীর বেশকিছু দেশে গিয়েছি। কিন্তু তোমাদের মতো এমন ব্যবহার কারো কাছ থেকে পাইনি। একজন অফিসার বলল, এটা আমার ডিউটি। আমাদের মধ্যে তর্ক হচ্ছে দেখে, আরেকজন মধ্যবয়সী অফিসার এগিয়ে আসল।“যত সমস্যা আমাদের আর তোমাদের মতো গরিব দেশগুলোতে, বুঝলা” বলে চলে আসি।

২০১৭ সালে ইউক্রেনে গিয়েছিলাম একটা আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামে যোগ দিতে। বিমানে যেতে যেতে এক ইউক্রেনিয়ান মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। পাশপাশি বসেছি আমরা। ইউরোপ ও আরব দেশগুলোর অভিজাত পতিতাপল্লীর একটি উল্লেখযোগ্য মেয়ে আসে রাশিয়া ও তার প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে। ভাবও জমে। মেয়েটা আমাকে গাম খেতে দেয়। বলে, তোমাকে আমি রাস্তা দেখিয়ে দেব, কীভাবে হোটেলে যাবে। আমি বুকে হাত রাখি আর মুখে হাসি। মেয়েটার ইমিগ্রেশন ছিল আমার পরে। কিন্তু ইমিগ্রেশনে আমাকে আটকানো হলো। তারপর ১৫-২০ মিনিট নানা ধরনের হেনস্তা। শেষ পর্যন্ত আমার ভিডিও করা হচ্ছে।

যে অফিসার আমার সঙ্গে প্রথমে কথা বলা শুরু করে সে ইংরেজি জানে না। পরে এক মেয়েকে নিয়ে আসা হলো ইন্টারপ্রেটার হিসেবে। আরেকজন অফিসারও এসে যোগ দিল। আমি সেই ইংরেজি না জানুয়া অফিসারের মাথার দিকে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করলাম, সে চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকাল। বললাম, প্রবলেম। ও বিস্ময়ে হতবাক।

শেষ পর্যন্ত আমাকে ছাড়া হলো। আমি মেয়েটাকে বললাম, আমি তোমাদের দেশে একজন আমন্ত্রিত অতিথি। তোমরা কেন আমার সঙ্গে এমন করলে জানতে পারি কি? ও জানাল, এখানে অনেক ইন্ডিয়ান এসে ইউরোপে পালিয়ে যায়। তাই তারা কোনো ইন্ডিয়ান দেখলে এটা করে। এতক্ষণে অরিন্দম কহিল বিষাদে, বাংলাদেশ বলে যে কোনো রাষ্ট্র আছে সেটাই ওরা জানে না।

ওকে বললাম, শোন আমি বাংলাদেশি, ইন্ডিয়ান না। ও পাল্টা জবাবে বলল, ওই অঞ্চল থেকে যারা আসে।এবার ওকে বলি, শোন, আমি ইস্তানবুলে থাকি। ইস্তানবুল হচ্ছে এশিয়া থেকে ইউরো যাওয়ার প্রধানতম রাস্তা। একজন মানুষ ইস্তানবুলে থেকে ইউক্রেন আসবে ইউরোপে পালিয়ে যাওয়ার জন্য।

তোমাদের যদি এতটুকু কমন সেন্স না থাকে তাহলে চাকরি করছ কেন। মেয়েটা বলে সরি ফর এভরিথিং। আমি বলে যাই, তোমরা যা করেছ, আমি আমার জীবনেও এই দেশকে কোনোদিন ভালোবাসতে পারব না। আমি আরও বলি, তোমরা ইউরোপের প্রতিবেশী। কিন্তু তারপরও জার্মানি কেন ধনী আর তোমরা কেন গরিব আজ বুঝতে পারলাম। মেয়েটা আবার সরি স্যার বলে। আরও কয়েকটা কথা শুনিয়ে আমি চলে আসি। বেশ কয়েকটা মেজাজ খারাপ হয়ে থাকে।

ইউক্রেনের ওদেসা নগরে একদিন আগে চলে এসেছি। ফলে এক রাত আমাকে নিজের টাকায় থাকতে হবে। থাকার জন্য আগে থেকে ঠিক করে রাখা বাসায় গিয়ে মন ভালো হয়ে যায়। এক বুড়া আর বুড়ি মিলে কটেজটা চালান। আমি আর ফিনল্যান্ডের মেয়ে তুলি একসঙ্গে থাকব। তুলি খুব হাসিখুশি। সেই বুড়াবুড়ি আরও। বুড়ি আমাকে জড়িয়ে ধরে স্বাগত জানালেন। আমি বিছানায় শুই। কিন্তু মন পড়ে আছে এয়ারপোর্টে। সেই ইউক্রেনিয়ান মেয়েটি কোথায়! হয়তো তার সঙ্গে আমার ইস্তানবুলে আবারও দেখা হতো। ফোন নম্বর নেয়া হয়নি। কিচ্ছু হলো না। ইংরেজি না জানোয়া ওই ইয়াং অফিসারের ওপর রাগ আরও বেড়ে যায়। রাগে গজগজ করতে থাকি। তুলি ডাকে, হেলসিনকির তুলিয়ানা শোনাবে  বলে।

নতুন হোটেলে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বলতে পারব না। দিল্লিতে গরম আছে তবে আমাদের চেয়ে সহনীয় মনে হলো। (নোট: এখানে তুলিয়ানা বলতে তুলির জীবনকাহিনী বোঝানো হয়েছে আর হেলসিনকি ফিনল্যান্ডের রাজধানী।)

চলবে…

লেখক: তুর্কি স্কলারশিপ ফেলো। শিক্ষক, ভাষা-যোগাযোগ ও সংস্কৃতি বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।

Bootstrap Image Preview