Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৪ বৃহস্পতিবার, নভেম্বার ২০১৯ | ৩০ কার্তিক ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

পরিবেশ দূষণে বাংলাদেশে এক বছরে ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১২:১১ PM
আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৪:২৭ AM

bdmorning Image Preview
ধূলিতে পথ চলছেন পথিক। ছবি: আবু সুফিয়ান জুয়েল


নিজস্ব প্রতিবেদক

পরিবেশগত দূষণের কারণে ২০১৫ সালে বাংলাদেশে ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। শুধু ঢাকা শহরেই ১৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

১৬ সেপ্টেম্বর রবিবার বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিস ‘ইনহ্যান্সিং অপারচুনিটিজ ফর ক্লিন অ্যান্ড রেসিলেন্ট গ্রোথ ইন আরবান বাংলাদেশ, কান্ট্রি এনভায়রমেন্ট অ্যানালাইসিস-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি ঢাকা, পাবনা ও কক্সবাজার শহরে পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে তৈরি।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর রাজশ্রী এস পারালকার বলেন, বাংলাদেশ উচ্চ মধ্য আয়ের দেশে যাচ্ছে। টেকসই ও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে হলে পরিবেশের ওপর নজর দিতে হবে। কেননা দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবেশগত কারণে সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে বাংলাদেশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের শহরাঞ্চলের পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত অসুস্থতায় প্রতিবছর মৃত্যু হচ্ছে ৮০ হাজার মানুষের যা মোট মৃত্যুর ২৮ শতাংশ। আর বিশ্বের হিসেবে তা ১৬ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পরিবেশ দূষণের কারণে বাংলাদেশে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। তুলনামূলক চিত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত। দেশটির শহরাঞ্চলের ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষের মৃত্যু ঘটছে পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত অসুস্থতায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে শুধুমাত্র বায়ু দূষণের কারণেই মৃত্যু ঘটছে ৪৬ হাজারেরও বেশি সংখ্যক মানুষের। আর রাজধানীতে পরিবেশ দূষণে প্রতিবছর মারা যাচ্ছে ১৭ হাজার ৮৯৭ জন যার মধ্যে বায়ু দুষণের কারণে মৃত্যু ঘটছে ১০ হাজার ১৯৪ জনের। বায়ু দূষণ ছাড়া দেশে শহরাঞ্চলে কর্মক্ষেত্রের দূষণের কারণে বেশি সংখ্যক মানুষের মৃত্যু ঘটছে। এই সংখ্যা দেশের শহরগুলোতে মোট ১৯ হাজার ৮৭ জন আর রাজধানীতে ৪ হাজার ২০৪ জন। তৃতীয় কারণ হিসেবে রয়েছে খাবার পানিতে আর্সেনিক দূষণ। প্রতিবছর আর্সেনিকযুক্ত পানির কারণে শহরাঞ্চলে ১০ হাজার ২৮ জনের মৃত্যু হচ্ছে আর রাজধানীতে এই সংখ্যা ২ হাজার ২০৯ জন।

গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধুমাত্র বাতাসে সীসা দূষণের কারণে দেশের ১০ লাখ মানুষ ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে। যার মধ্যে অধিকাংশই দরিদ্র শ্রেণির শিশু ও নারী। সীসা দূষণের ফলে শিশু মেধা বিকাশ বাঁধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরণের স্নায়ুবিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে। পরিবেশ দূষণ গর্ভপাত ও মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়েছে, শুধুমাত্র অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে গত ৪০ বছরে রাজধানীর ৭৫ শতাংশ জলাভূমি ভরাট হয়ে আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। যার ফলে রাজধানীর কিছু অংশ প্রবল বন্যার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

আর্থিক ক্ষতি সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ বছরে দেশের অর্থনীতিতে ক্ষতি হয়েছে ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা। এটি ওই বছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। শুধু ঢাকা শহরেই আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা।

২০১৫ সালে বাংলাদেশের মোট জিডিপি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে পরিবেশগত দূষণে এ সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বিডিমর্নিং এর সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, বিশ্বব্যাংকের পরিবেশগত আর্থিক ক্ষতির দিকটি ভয়াবহ। ২০১৫ সালে আর্থিক ক্ষতি বাংলাদেশের মোট জিডিপি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। পরিবেশকে রক্ষা করা সকলের দায়িত্ব। এখানে স্থানীয় সরকার, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, বন মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় জড়িত। এখানে সকলের কথা শুনতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টা না থাকলে পরিবেশকে রক্ষা করা কঠিন। আমাদের চিরাচরিত সমস্যা হচ্ছে সমন্বয়হীনতার অভাব। এক জন কি করে অপর জন তা জানে না।

তিনি বলেন, ধরুন পরিবেশ দূষণে বড় একটি জায়গা দখল করে আছে ইটভাটা। আর স্থানীয় সরকার যদি বলে উন্নয়নের জন্যে ইট লাগবেই তখন কি করবেন? বিকল্প কোন চিন্তা কেন মাথায় নিয়ে আসছে না?

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। স্থানীয় সামগ্রী দিয়েই অবকাঠামো নির্মাণে মনযোগ দিতে হবে। স্থানীয় নদী, জলাশয়গুলো রক্ষা করতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা ধীরে ধীরে ফিস্কেল পলিসির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আর্থিক ক্ষতি হয়তো পুষিয়ে উঠা যাবে তবে পরিবেশের ক্ষতির কারণে মানুষের রোগব্যধী, মৃত্যু এসব তো থামানো যাবে না। সে ক্ষেত্রে পরিবেশকে প্রাকৃতিকভাবে রেখে দিতে হবে।

মার্কিন পরিবেশবাদী ও প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আল গোর তার একটি প্রতিবেদনে দেখিয়েছিলেন যে, পরিবেশের দূষণের কারণে উত্তর মেরুর বরফ গলে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কার্বন ডাই-অক্সাইড এর জন্যে দায়ী। বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো কার্বন উৎপানে থামছে না। তাদের সাথে আলোচনায় বসা প্রয়োজন। 

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বিডিমর্নিং এর সাথে একান্ত আলাপে জানান, আমরা ইতিপূর্বে শুধু অর্থের পেছনে দৌড়িয়েছি। কি করে জিডিপি বাড়ানো যায় সেই চিন্তায় মশগুল ছিলাম। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন আমাদের টনক নাড়িয়ে দিয়েছে। সেখানে দেখানো হয়েছে যে, ২০১৫ সালে শুধু বাংলাদেশের শহরেই ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছে পরিবেশগত দূষণের কারণে। আমরা পরিবেশকে লালন না করে ধ্বংস করছি। একটি জিন্সের প্যান্ট উৎপাদনে ২২০ লিটার পানি খরচ হয়। আমরা কিন্তু সেটি কখনো ভাবিনি যে আমরা এসব জিনিস উৎপাদন করবো না।

তিনি বলেন, আর্থিক উন্নতির প্রয়োজন আছে তবে পরিবেশকে ধ্বংস করে নয় বরং তাকে ব্যবহার করে। যেমন স্থানীয়ভাবে যেসব দ্রব্য সামগ্রী, গাছপালা আছে তা ব্যবহার করতে পারি। ধরুন যে অঞ্চলে গোলপাতা পাওয়া যায় সেখানে গোলপাতা দিয়ে। যেখানে ছন বা ধানের খড় পাওয়া যায় সেখানে সেগুলো ব্যবহার করে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা সম্ভব। পোড়া ইটের পরিবর্তে বালু ইটা বা প্রেসারাইজ ইট ব্যবহার করা।

আবু নাসের খান বলেন, পরিবেশগত দূষণের কারণে বছরে ৫০ হাজার মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের অনেকেই চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুবরণ করে। আমার পরিবারই ২ দু’জন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। চিকিৎসা ব্যয় বহুল।

তিনি বলেন, আমরা পরিবেশকে কাজে না লাগিয়ে কিভাবে তা ধ্বংস করা যায় সেই কাজ করে যাচ্ছি। এদিকে প্রশাসনের নজর নেই। খাল-বিল, নদী-নালা ভরাট করা হচ্ছে। বড় বড় দালান তৈরি হচ্ছে কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকার উপাদানই যে হারিয়ে যাচ্ছে তা দেখছি না। বন উজাড় করা হচ্ছে। বন্যপ্রাণী হত্যা করা হচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে। ইট উৎপাদনে উচ্চ মানের সালফারযুক্ত কয়লা ব্যবহার করা হচ্ছে। খাদ্যদ্রব্যে কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। কোন সচেতনতা নেই। আমরা নিজেরাই নিজের ধ্বংস করছি।

Bootstrap Image Preview