Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১২ বুধবার, ডিসেম্বার ২০১৮ | ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

ভোলা-১ আসনে শক্ত অবস্থানে আ'লীগ, বিএনপি-বিজেপিতে দ্বন্দ্ব

এম. শরীফ হোসাইন, ভোলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ০৬:২০ PM
আপডেট: ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ০৬:২০ PM

bdmorning Image Preview


একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশের মত ভোলাতেও নির্বাচনী হাওয়া বিরাজ করছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মাঝে প্রাণ চাঞ্চল্য বিরাজ করছে। নির্বাচনে শক্ত অবস্থানের রয়েছেন তারা। বিএনপি-বিজেপিতে দ্বন্দ্ব থাকায় দ্বো-টানায় রয়েছে দল দুটি।

এছাড়া সদর আসনে অন্যান্য দলগুলোর প্রার্থীদেরও নাম শোনা যাচ্ছে। তারাও চুপিসারে চালাচ্ছেন নির্বাচনী প্রচার।

সূত্রে জানা গেছে, ভোলা-১ আসন থেকে নির্বাচন উপলক্ষে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের নির্দেশনায় সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ করে চলছে। আ'লীগ থেকে একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে তোফায়েল আহমেদের নাম শোনা যাচ্ছে। তার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জনসম্মুখে এখন পর্যন্ত কাউকে সরব দেখা না গেলেও, চুপিসারে অনেকেই ভোলা-১ আসন থেকে নমিনেশন পেপার ক্রয় করার খবর পাওয়া গেছে। তবে সর্বোপরি শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এতে কোন সন্দেহ নাই।  

এদিকে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফন্ট থেকে কাকে নমিনেশন দেয়া হবে সেটা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। তবে বিএনপি জোটের শরিকদল জাতীয় পার্টি (বিজেপি)’র চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ এ আসন থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

অন্যদিকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা এবার নিজেদের মধ্যে প্রার্থী দিতে সোচ্চার। তাই তারা জেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব গোলামনবী আলমগীরকে নিয়ে এ আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী। এছাড়া বিএনপি-বিজেপি’র মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। এখন দেখা যাক কে পান এ আসন থেকে বিএনপি জোটের অথবা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী।

অন্যদিকে এ আসন থেকে কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হায়দার আলী লেলিনও মনোনয়নের জন্য লবিং করছেন।

এছাড়া জাতীয় পার্টি (এরশাদ)’র প্রার্থী এবং ইসলামী আন্দলনের প্রার্থীও রয়েছে। তাদের কর্মকাণ্ড জনসম্মুকে দেখা না গেলেও চুপিসারে প্রচার চালাচ্ছেন এমন খবর পাওয়া গেছে। সর্বোপরি বলা যায় বিএনপি জোট কিংবা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের চেয়ে ভোলা-১ আসনে আওয়ামী লীগ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। আগামী নির্বাচনের মাঠেই দেখা যাবে কে কতটুকু ফলাফল করে বিজয়ী হন।

আওয়ামী লীগঃ ভোলা-১ আসন থেকে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অতীতে জেলার একাধিক আসনে তিনি ভোটের লড়াইয়ে নামলেও এবার ভোলা-১ কেই বেছে নিয়েছেন। ২০০১ সালে ভোলার তিনটি আসন থেকে দাঁড়িয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ এই নেতা। তবে ২০০৮ সালে তিনি নির্বাচন ভোলা-২ আসন থেকে নির্বাচন করেন। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন পান ভোলা-১ আসনে। এবারও এখান থেকেই রয়েছে ভোটের প্রস্তুতি।  জনগণের মধ্যে প্রবীণ রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। ভোলার চিত্র পাল্টে দিতে যে কয়জন অবদান রেখেছেন তিনি তাদেরই একজন এবং অন্যতম। আর এ কারণে ভোটের ময়দানে তিনি রয়েছেন শক্তিশালী অবস্থানে।

সূত্রে আরো জানা গেছে, দ্বীপজেলা ভোলার অন্যতম প্রধান সমস্যা নদীভাঙন রোধে গত ৫ বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে তোফায়েল আহমেদের প্রচেষ্টায়। ইতিমধ্যে ইলিশা ও রাজাপুরে নদীভাঙন রোধে সিসি ব্লকের কাজ চলছে। ভোলা-বরিশাল সড়ক পথে যাতায়াতের জন্য তেঁতুলিয়া নদীর ওপর নির্মাণ হবে সেতু। এরইমধ্যে যাচাই হয়েছে সম্ভাব্যতা। আর এসব উদ্যোগের সুফল পাওয়ার আশা করছে আওয়ামী লীগ।

সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল ইসলাম জানান, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোলায় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দলীয় নেতাকর্মীরা। আর সেই লক্ষ্যে জেলার বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সংগঠনের কমিটি গঠন এবং পুনর্গঠনের মাধ্যমে দলকে শক্তিশালী করা হচ্ছে। দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে মহিলা সমাবেশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই আসনে অতীতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও বিজেপি জিতেছে একাধিকবার। তবে এবার ক্ষমতাসীন দল আশা করছে তোফায়েলে বাজিমাত করবে তারাই।

বিএনপি না বিজেপিঃ ১৯৯৯ সালে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোট মিলে গঠন হয় চারদলীয় জোট। তবে ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে এরশাদ জোট থেকে বেরিয়ে যান। তবে তার দলের একাংশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) নামে আলাদা দল গঠন করে জোটে থেকে যান নাজিউর রহমান মঞ্জু। তবে আসনটিতে সে সময় মনোনয়ন পায় বিএনপি। যদিও নাজিউরের মৃত্যুর পর ২০০৮ সালে তার ছেলে আন্দালিব রহমান পার্থকে আসনটি ছেড়ে দেয় বিএনপি আর তিনিই সে সময় ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে জিতেন।

এবারও পার্থ ছাড়ের আশা করছেন। তবে স্থানীয় বিএনপি আবার নিজেদের প্রার্থী দেয়ার দাবিতে সোচ্চার। জেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম নবী আলমগীর এবার ধানের শীষ পাওয়ার প্রত্যাশায়। বিএনপি থেকে তিনি ছাড়া কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হায়দার আলী লেলিনও মনোনয়নের জন্য লবিং করছেন।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ ট্রুম্যান বলেন, আগামী নির্বাচন নিয়ে আমাদের ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে। ইতিমধ্যে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কমিটি গঠনও করা হয়েছে। এ আসন থেকে আমরা গোলাম নবী আলমগীরকে প্রার্থী চাই। তাকে কেন্দ্র করেই দলীয় কর্মকাণ্ড এগিয়ে চলছে। তাকে ছাড়া অন্য বিকল্প কোনো প্রার্থীর কথা চিন্তা করছিন না আমরা।

তবে বিজেপি পার্থকে ধরেই সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলের সহযোগী সংগঠন জাতীয় যুব সংহতির ভোলা শাখার সহ-সভাপতি অনুপম দত্ত বলেন, বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ ২০০৮ সালে ২০ দলীয় জোট থেকে মনোনয়ন পেয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। আগামী নির্বাচনেও তিনি দলের মনোনয়ন পাবেন, এটা প্রায় নিশ্চিত। তারা সেই লক্ষ্যেই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।

এটা স্পষ্ট যে বিএনপি ও বিজেপিতে এক ধরনের দ্বন্দ্ব-বিভেদ আছে। শেষ পর্যন্ত বিএনপি যদি ২০০৮ সালের মতোই পার্থকে বেছে নেয়, তাহলে তাকে বিএনপির পূর্ণ সহযোগিতা দরকার পড়বে। আর সেটা এবার তিনি পাবেন কি না, সেটাও দেখার অপেক্ষায়।

অন্য দলের প্রস্তুতিঃ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সম্প্রতিক ভোলা সফরে গিয়ে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। দলটির জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আজিম গোলদারের নাম উঠে এসেছে আলোচনায়। যদিও দলটি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হলে তোফায়েল আহমেদকেই সমর্থন দেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রধান দলগুলো ছাড়াও সম্প্রতি আলোচিত হয়ে উঠা ইসলামী আন্দোলনের ইয়াসিন নবীপুরীকে মনোনায়ন দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইতিমধ্যে শহরের বিভিন্ন জায়গায় প্রচারপত্র ঝুলিয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম জানান, আগামী নির্বাচনে ভোলার চারটি আসনেই এককভাবে নির্বাচন করবেন তারা। সব প্রার্থীই স্থানীয়ভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এখন শুধু কেন্দ্রের অনুমোদনের অপেক্ষা।

ফিরে দেখাঃ ১৯৭৩ সালে এ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭৯ সালে আসনটি চলে যায় এ অঞ্চলে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম মোশারেফ হোসেন শাজাহানের দখলে। এরশাদ শাসনামলে ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালে নির্বাচিত হন সাবেক মন্ত্রী জাতীয় পার্টির তৎকালীন মহাসচিব নাজিউর রহমান মঞ্জু।
এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে আবার নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। ওই সময় তোফায়েল ভোলা-২ আসনেও জিতেন। ১৯৯৬ সালেও জয়ের মালা পরেন তিনি। ওই দফায়ও দুটি আসনে জয়লাভ করেন তোফায়েল আহমেদ। ২০০১ সালে আবার জিতেন বিএনপির মোশারেফ হোসেন শাজাহান। ২০০৮ সালে চার দলীয় জোটের শরিক দল বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন আওয়ামীলীগ মনোনিত প্রার্থী বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।
আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোলা সদর-১ আসনটিতে এবার ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৬৮ হাজার ৮শ’ ২৫ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ৮৫ হাজার ৮শ’৩০ এবং নারী ৮২ হাজার ৯শ’৯৫ জন।

Bootstrap Image Preview