Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৯ সোমবার, নভেম্বার ২০১৮ | ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

রাজনৈতিক উত্তপ্ততার আড়ালে ‘নারী আসন’; কেউ কথা রাখেনি

মেরিনা মিতু
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭ নভেম্বর ২০১৮, ০৭:৩২ PM
আপডেট: ০৭ নভেম্বর ২০১৮, ০৭:৩৪ PM

bdmorning Image Preview
ফাইল ছবি


নারী অধিকার বলতে আমরা কি বুঝে থাকি? এর ব্যপ্তি আসলে কতটুকু! সেই অধিকারের প্রেক্ষিতে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ণের কি হালচাল? আসুন খানিকটা পেছনের দিকে ফিরে তাকাই। ফিরে তাকাই কিছু প্রতিশ্রুতির দিকে।

২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল। মাঝখানে ব্যবধান ১০ বছরের। এর মধ্যে নবম সংসদ পার হয়ে দশম সংসদের মেয়াদও শেষ হতে যাচ্ছে। কিন্তু ‘রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে নারীর সমান অধিকার ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের নারীনীতি পুনর্বহাল ও কার্যকর করা হবে, বৈষম্যমূলক আইনসমূহের সংস্কার করা হবে এবং সংসদে প্রত্যক্ষ ভোটে নারীর জন্য ১০০ আসন সংরক্ষিত করা হবে।’ সরকারের এই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রত্যক্ষ ভোটে সংসদে নারীর জন্য ১০০ আসন সংরক্ষণের অঙ্গীকার পূরণের কোনো লক্ষণ নেই। অথচ আমরা দেখতে পাই, চলতি বছরের ৮ জুলাই জাতীয় সংসদে আগামী ২৫ বছরের জন্য অপ্রত্যক্ষ ভোটে ৫০টি নারী আসনে নির্বাচনের ব্যবস্থা রেখে একটি আইন পাস করা হয়েছে।

এই আইন নিয়ে নারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ যে আইন পাস করার আগে কোনো নারী সংগঠন কিংবা নারী সমাজের কোনো প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ করা হয়নি। সাধারণত কোনো আইন পাস করার সময় সম্পর্কিত ব্যক্তিবর্গের সাথে আলোচনা করার রীতি রয়েছে।

বহু বছর থেকেই বিভিন্ন নারী সংগঠন সংসদে নারীর আসনসংখ্যা এক–তৃতীয়াংশ করার দাবি জানিয়ে আসছিল। বিডিমর্নিংয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, মহিলা পরিষদের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদের কাছে একটি বিলের খসড়াও স্পিকারের কাছে পেশ করা হয়, যাতে সংসদের আসনসংখ্যা বাড়িয়ে ৪৫০ এবং সংরক্ষিত নারী আসন ১৫০ করার কথা বলা হয়েছিল। তাদের সুপারিশ অনুযায়ী, নির্ধারিত ৩০০ আসনের প্রতি দুটি আসন নিয়ে সংরক্ষিত একটি নারী আসনের এলাকা হিসেবে বিবেচিত হবে। আমাদের স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোতে যেভাবে সংরক্ষিত নারী আসনগুলো বিন্যস্ত করা হয়, এটি অনেকটা সে রকম। আবার অনেকের বিকল্প প্রস্তাবও ছিল। ৩০০ আসন থেকে ১০০ আসন আলাদা করে সেখানে শুধু নারী প্রতিনিধি নির্বাচিত করার ব্যবস্থা করা। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘুদের জন্যও অনুরূপ আসন সংরক্ষণের দাবি রয়েছে।

আগামী ২৫ বছরের জন্য পরোক্ষ ভোটে ৫০টি নারী আসনে নির্বাচনের ব্যবস্থা রেখে আইন পাস করার পর মহিলা পরিষদ ক্ষোভ প্রকাশ করে স্মারকলিপিও পেশ করেছিলেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই ওয়াদা করেছিল যে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে ১০০ করা হবে এবং সেসব আসনের প্রতিনিধিরাও সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন।

ইতিহাস বলে, ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারই স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর এক-তৃতীয়াংশ নারী আসনে প্রত্যক্ষ ভোটের ব্যবস্থা করে দেন। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নারী প্রতিনিধিরা নানা বৈষম্য–বঞ্চনার শিকার হলেও ব্যবস্থাটি নারীর ক্ষমতায়নে এক ধাপ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

কিন্তু বর্তমান সংসদ ২৫ বছরের জন্য যে সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করল, সেটি ঠিক তার উল্টো। এর মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন আরও অনেক ধাপ পিছিয়ে দেওয়া হলো। এরশাদের আমলে নারী সাংসদদের ৩০ সেট অলংকার বলে যে উপহাস করা হতো। ২০১৮ সালে এসেও আমরা আমাদের চিন্তা-ভাবনায় তেমন কোনো উন্নয়ন আনতে সক্ষম হয়নি যদিও। সাধারণ আসনে নির্বাচিত অনেক পুরুষ সাংসদ এই নারী সাংসদদের ‘আপদ’ বলেই মনে করেন।

সংসদে যখন সংরক্ষিত নারী আসন রাখা হয়েছে, তখন আমরা ধরে নিতে পারি, নীতিনির্ধারকেরা এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করছেন না। প্রশ্ন হলো, সেই নারী আসনগুলো পূরণের উপায় কী হবে?

২০১১ সালে যে নারী উন্নয়ন নীতি করা হয়, তার ৩২.৭ অনুচ্ছেদে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৩৩ শতাংশ আসন বাড়ানো এবং সরাসরি ভোটে নির্বাচনের কথা বলা হয়েছিল। ২০১১ সালে যেটি নারীর অগ্রগতির জন্য জরুরি মনে হয়েছিল, সেটি এখন পরিত্যাজ্য হলো কেন? আর এখন ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষিত আসন বহাল রাখলেন এবং তাও অপ্রত্যক্ষ ভোটে। অর্থাৎ তাঁরা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হবেন না, হবেন জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা নির্বাচিত।

সংবিধানের দশম অনুচ্ছেদে আছে, ‘জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করিবার ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ অনুচ্ছেদ ২৮(২): ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ১৯৮০ সালে এক স্মারক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, অর্ধেক পুরুষ। যে সমাজ তার অর্ধেক অংশকে পঙ্গু করে, তারা নিজেকেই নিজে পঙ্গু করে রাখে। এর অর্থ হচ্ছে এক হাত বেঁধে রেখে যুদ্ধ করা।’ আমাদের নীতিনির্ধারকেরা এক হাত বন্ধ রেখেই যুদ্ধ করছেন, যদিও প্রায় তিন দশক ধরে এই রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান পদে নারীরাই আসীন আছেন।

স্বাধীনতার আগে থেকে জাতীয় সংসদে নারী সাংসদেরা পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। তবে এ ক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম হলো ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন। সেখানে নারী সংসদ সদস্যরা প্রত্যক্ষ ভোটেই নির্বাচিত হয়েছিলেন।

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন থেকে আমরা এখনো অনেক দূরে আছি। আমরা অনেক বিষয়ে বিশ্বের রোল মডেল দাবি করলেও সংসদে নারী আসনের ক্ষেত্রে পাকিস্তানেরও পেছনে আছি। পাকিস্তানে ৩৩০ জন সাংসদের মধ্যে নারী সংসদ সদস্য আছেন ৬৮ জন। আর বাংলাদেশে ৩৫০ জন সংসদ সদস্যদের মধ্যে নারী সংসদ সদস্য ৭১ জন (২০.৩ শতাংশ)। এর মধ্যে ৫০ জন এসেছেন সংরক্ষিত কোটায়। নেপালে নারী সংসদ সদস্যদের হার ৩২.৭ শতাংশ। পৃথিবীতে নারী সংসদ সদস্যদের দিক থেকে এক নাম্বারে আছে রুয়ান্ডা ৬১.৩ শতাংশ, এরপর কিউবা ও বলিভিয়া যথাক্রমে ৫৩.২ ও ৫৩.১ শতাংশ আসন নিয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে আছে। এমনকি আরব আমিরাতেও নারী সংসদ সদস্যদের হার আমাদের চেয়ে বেশি ২২.৫ শতাংশ। (সূত্র: ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন।)

২০০৮ সালের রাজনৈতিক দলবিধিতে ২০২১ সালের মধ্যে প্রতিটি দলের তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত এক-তৃতীয়াংশ পদ নারীদের দ্বারা পূরণের যে বিধান জারি হয়েছিল, ডান–বাম–মধ্য কোনো দলই সেটি করেনি কিংবা করার প্রক্রিয়ায় নেই।

ক্ষমতা হস্তক্ষেপের আগে দেয়া কথাগুলো এভাবেই আড়াল হয়ে যায়। কথা আর কারোরই রাখা হয় না।

Bootstrap Image Preview