Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৯ শুক্রবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৪ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

১৪ বছর পর জজ মিয়া নাটকের অবসান, তারেককে যাবজ্জীবন বাবরের ফাঁসি

বিডিমর্নিং : নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:৪৩ PM
আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০১৮, ১১:০২ PM

bdmorning Image Preview


আমি রায়ে সন্তুষ্ট, আবার কিছুটা অসন্তুষ্টও। ১৪ বছর পর রায় পাওয়ায় সন্তুষ্ট। কিন্তু মামলার মূলহোতার ফাঁসির দণ্ড না হওয়ায় কিছুটা অসন্তুষ্ট।যদিও আশা করেছিলাম তারেক রহমানের ফাঁসি হবে। কিন্তু তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এখন রাষ্ট্রপক্ষ হয়তো উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। উচ্চ আদালতের রায়ে তারেক রহমানের ফাঁসি হোক এটাই আমার চাওয়া।

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের নারকীয় গ্রেনেড হামলা মামলার রায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা বলেন নৃশংস এই হামলাকে ধাপাচাপা দিতে সাজানো নাটকে ভুক্তভোগী নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার কেশারপাড় ইউনিয়নের বীরকোট গ্রামের হতদরিদ্র জালাল উদ্দিন। যিনি সে সময় সাজানো মামলায় জজ মিয়া নামে পরিচিতি পান।

২০০৫ সালের ৯ জুন নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করে ঢাকায় আনা হয়। শারীরিক নির্যাতন ছাড়াও নিজের ও পরিবারের সদস্যদের প্রাণহানির ভয়ে একপর্যায়ে শেখানো জবানবন্দি দিতে রাজি হন এই নিরীহ যুবক। এর পর সিআইডির কার্যালয়ে কয়েক দিন চলে আদালতে কীভাবে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি দিতে হবে, তার রিহার্স্যাল।কিন্তু পরবর্তী সময়ে মামলাটি অধিক তদন্তের পর এর রহস্য উন্মোচিত হয়। পরবর্তীতে তাকে মামলার চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হয়। এই ঘটনা তার জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে। ঘটনার পর থেকেই বাড়িঘর ছাড়া এই জজ মিয়া।

গ্রেনেড হামলা মামলার অন্যতম সাক্ষীও ছিলেন তিনি। সেদিনের সেই সমাবেশে গ্রেনেডের স্পিল্টার বয়ে বেড়ানোদের সাথে তিনিও এতদিন অপেক্ষায় ছিলেন কবে এই মামলার রায় ঘোষণা হবে।

আজ বুধবার ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের মহাসমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় মতিঝিল থানায় করা হত্যা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ এবং তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, সাবেক সাংসদ কায়কোবাদসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে।

এই মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ থাকায় আজ সকাল থেকেই দেশবাসীর এবং ভুক্তভোগীসহ গণমাধ্যমের আলোচনার বিষয় ছিল এই রায়কে কেন্দ্র করে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা হয়। এতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী সে সময়ের মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন মারা যান। আহত হন কয়েক’শ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও সেই সময়ের বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। তবে তাঁর কান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মামলার রায়কে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয় পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকা। এরপর ১১ টার পর ঢাকার ১নং অস্থায়ী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নুর উদ্দিন এ রায় ঘোষণা করেন। এর আগে আসামীদেরকে আদালতে হাজির করা হয়।

যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া ১৯ আসামির মধ্যে ১৩ জনই পলাতক। আদালতে উপস্থিত ছিলেন ছয়জন। এদিন সকালে কারাগার থেকে ৩১ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। আলোচিত এ মামলায় ৫১১ সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। এ ছাড়া আরও ২০ জনের সাফাই সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। মামলায় ১৪৪টি আলামত ও ৫৫টি বস্তু প্রদর্শন করা হয়েছে। গত বছরের ৩০ মে এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম শেষ হয়। আর গত বছরের ১২ জুন মামলায় ৩১ আসামির আত্মপক্ষ শুনানি শেষ হয়।

আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৯ আসামি হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুর রহিম, আবদুস সালাম পিন্টু, মাওলানা মো. তাজউদ্দীন, মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, মো. আবদুল মাজেদ ভাট ওরফে মো. ইউসুফ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ, মাওলানা শওকত ওসমান, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান, মাওলানা আবু সাঈদ, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহমেদ তামিম, মঈন উদ্দিন শেখ, রফিকুল ইসলাম, উজ্জ্বল ওরফে রতন ও হানিফ।

যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- শাহাদাৎ উল্লাহ ওরফে জুয়েল, মাওলানা আবদুর রউফ ওরফের আবু ওমর আবু হোমাইরা ওরফে পীরসাহেব, মাওলানা সাব্বির আহমদ ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির, আরিফ হাসান ওরফে সুজন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, আবু বকর ওরফে হাফে সেলিম হাওলাদার, মো. আরিফুল ইসলাম ওরফে আরিফ, মহিবুল মোত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন (পলাতক), আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন (পলাতক), মো. খলিল (পলাতক), জাহাঙ্গীর আলম বদর ওরফে ওস্তাদ জাহাঙ্গীর (পলাতক), মো. ইকবাল (পলাতক), লিটন ওরফে মাওলানা লিটন (পলাতক), তারেক রহমান ওরফে তারেক জিয়া (পলাতক), হারিছ চৌধুরী (পলাতক), কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ (পলাতক), মুফতি শফিকুর রহমান (পলাতক), মুফতি আবদুল হাই (পলাতক) এবং রাতুল আহম্মেদ বাবু ওরফে বাবু ওরফে রাতুল বাবু (পলাতক)।

হত্যা মামলা

মৃত্যদণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে রায়ে উল্লেখ করা হয়, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে নিহতগণকে অভিন্ন অভিপ্রায়ে পরিকল্পনা ও অপরাধমূলণ ষডযন্ত্রের মাধ্যমে হত্যার অভিযোগে দণ্ডবিধির ৩০২/১২০ খ/৩৪ ধারায় দোষীসাব্যস্তক্রমে মৃত্যুদণ্ড, এক লাখ টাকা জরিমানা এবং মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকরের আদেশ দেয়া হলো।

যাবজ্জীবন দণ্ডের ক্ষেত্রে রায়ে উল্লেখ করা হয়, নিহতগণকে অভিন্ন অভিপ্রায়ে পরিকল্পনা ও অপরাধমূলণ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যার অভিযোগে দণ্ডবিধির ৩০২/১২০ খ/৩৪ ধারায় দোষীসাব্যস্তক্রমে যাবজ্জীবন কারদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এক বছরের কারাদণ্ড দেয়া হলো।

এছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রথম ১৯ জনের বিরুদ্ধে মোকদ্দমার জখমপ্রাপ্ত ভিকটিমগণকে অভিন্ন অভিপ্রায়ে পরিকল্পনা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে গুরুতর জখম করার অভিযোগ দণ্ডবিধির ৩০৭/১২০ খ/৩৪ ধারায় দোষীসাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়।

বিস্ফোরক মামলা

১৯০৮ সালের বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের ৩ ও ৬ ধারায় দায়ের করা মামলায় আসামিদের দোষীসাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড, এক লাখ টাকা জরিমান এবং মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকরের আদেশ দেয়া হয়।

যাবজ্জীবনপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে রায়ে বলা হয়, ১৯০৮ সালের বিস্ফোরদ্রব্য আইনের ৩ ও ৬ ধারায় দোষীসাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়।

এছাড়া ১৯০৮ সালের বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের ৪ ও ৬ ধারায় দোষীসাব্যস্ত সবাইকে (৩৮ জন) ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়।

বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পাওয়া ১১ জনের মধ্যে রয়েছেন পুলিশের তিনজন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) রয়েছেন। তারা হলেন- শহুদুল হক, মোহাম্মদ আশরাফুল হুদা ও খোদাবক্স চৌধুরী।

এর মধ্যে শহুদুল হক গ্রেনেড হামলার সময় পুলিশ প্রধান ছিলেন।কারাগারে আছেন তিনি। দুই বছরের কারাদণ্ড হয়েছে তার। গ্রেনেড হামলা হওয়ার পর শহুদলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রাষ্ট্রপক্ষ। কারণ হামলার পর ঘটনাস্থল একবারও পরিদর্শন করেননি তিনি। সেনা কর্মকর্তা থেকে তাকে পুলিশ বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর শহুদুলকে পুলিশ প্রধানের পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু বিএনপি সরকারের সময় পুলিশ প্রধান পদে খুব বেশি দিন থাকতে পারেননি তিনি। আদালত অবমাননার দায়ে তাকে সে পদ ছাড়তে হয়েছিল। ২০০৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে ২০০৪ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত, অর্থাৎ এক বছর আট মাস পুলিশ প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

আশরাফুল হুদা গ্রেনেড হামলার সময় ঢাকার মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন আশরাফুল হুদা। তাকে দেয়া হয়েছে দুই বছরের কারাদণ্ড। ২০০৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২০০৫ সালের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত অর্থাৎ চার মাসেরও কম সময় পুলিশ প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

আরেক সাবেক আইজিপি খোদাবক্স চৌধুরীর সাজা হয়েছে বেশি। তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তিনি গ্রেনেড হামলার সময় অতিরিক্ত পুলিশ প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। পরে হন পুলিশ প্রধান।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

রায়ে অস্থায়ী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নুর উদ্দিন মোট ১২ টি পর্যবেক্ষণ দেন। এগুলোর মধ্যে একটি হলো-১৯৭৫ সোলের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করার পর জাতীয় চার নেতাকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে না গিয়ে বহমান থাকে। পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শনিবার আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করার হীন প্রচেষ্টা চালানো হয়। ‘শেখ হাসিনাকে হালকা নাশতা করানো হবে’- এই উদ্বৃতি দিয়ে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনের কতিপয় সদস্য আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় হামলা করে।

মামলা

বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হন দলের তিন শতাধিক নেতাকর্মী।

ঘটনার পরদিন মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে থানা পুলিশ। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরবর্তীতে মামলাটি যায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)।শুরু থেকেই নৃশংস ওই হত্যাযজ্ঞের তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে নানা চেষ্টা করা হয়।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে নতুন করে তদন্ত শুরু করে। বেরিয়ে আসে অনেক অজানা তথ্য। ২০০৮ সালের ১১ জুনে বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তাঁর ভাই তাজউদ্দীন, জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি-বি) নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডির সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির।

বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই এ-সংক্রান্ত মামলার বিচার শুরু হয়। ৬১ জনের সাক্ষ্য নেওয়ার পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার এসে এর অধিকতর তদন্ত করে। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডির পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আখন্দ। তদন্তে বেরিয়ে আসে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ওই হামলা চালানো হয়েছিল। হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড এসেছিল পাকিস্তান থেকে।

এরপর বিএনপির নেতা তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদসহ ৩০ জনকে নতুন করে আসামি করে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। এরপর দুই অভিযোগপত্রের মোট ৫২ আসামির মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৮ জনকে পলাতক দেখিয়ে বিচার শুরু হয়। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন, যাঁরা জোট সরকারের আমলে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ও র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত ছিলেন।

জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান ও জেএমবি সদস্য শহিদুল আলম বিপুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় মামলা থেকে তাদের নাম বাদ দেয়া হয়।

ফলে এ মামলায় এখন আসামির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯ জন। এর মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৮ জন পলাতক রয়েছেন। বাকি আসামিদের মধ্যে কারাগারে রয়েছেন ৩১ জন।

কারাগারে থাকা ৩১ আসামি হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, সামরিক গোয়েন্দা অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক রেজ্জাকুল হায়দার, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক আবদুর রহিম, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. আশরাফুল হুদা, পুলিশ কর্মকর্তা শহুদুল হক, খোদা বক্স চৌধুরী, বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সাবেক এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান, আব্দুর রশীদ, সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম আরিফ, জঙ্গি সংগঠন হুজির সদস্য আবু বক্কর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, শাহদাত উল্লাহ ওরফে জুয়েল, মাওলানা শেখ আব্দুস সালাম, আব্দুল মাজেদ ভাট ওরফে ইউসুফ ভাট, আব্দুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ, মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু হোমাইরা ওরফে পীর সাহেব, মাওলানা সাব্বির আহমেদ ওরফে আব্দুল হান্নান সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মহিবুল্লাহ ওরফে মহিজুর রহমান ওরফে অভি, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ড. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহম্মেদ তামিম, মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন ওরফে খাজা ওরফে আবু জানদাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ, আরিফ হাসান ওরফে সুমন, রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ও হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া।

পলাতক ১৮ আসামি হলেন- বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিএনপি নেতা কাজী শাহ মোফাজ্জেল হোসেন কায়কোবাদ, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হানিফ, ডিএমপির সাবেক ডিসি (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান, ডিএমপির সাবেক ডিসি (দক্ষিণ) খান সাঈদ হাসান, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন, হুজি সদস্য মাওলানা তাজউদ্দিন, মহিবুল মুত্তাকিন, আনিসুল মুরছালিন, খলিল, জাহাঙ্গীর আলম বদর, ইকবাল, লিটন ওরফে মাওলানা লিটন ওরফে দোলোয়ার হোসেন ওরফে জুবায়ের, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আব্দুল হাই ও রাতুল আহম্মদ বাবু।

এদিকে বিএনপি এই রায়কে প্রত্যাখান করে দেশের সব জেলা উপজেলায় ও মহানগরীতে বিক্ষোভ করার ঘোষণা দিয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন পর্যন্ত তিন মামলায় বিভিন্ন মেয়াদের সাজা পেয়েছেন। এর মধ্যে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন দণ্ডে দণ্ডিত হন তিনি। এর আগে অর্থপাচার ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে সাত বছর ও ১০ বছরের সাজা দেয়া হয়।

২১ আগস্ট রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন,এই রায়ে বিএনপি নেতারা ন্যায় বিচার পাননি।

সে কারণে এই রায়কে প্রত্যাখান করে তিনি দলীয় কর্মসূচি থাকবে, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আইনি লড়াই করার ঘোষণা দিয়েছেন।

অন্যদিকে তারেক রহমানসহ ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মামলায় যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল করা হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

একই সময়ে রায়কে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা উল্লেখ করে আসামিপক্ষের আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া তারেক রহমানসহ বিএনপি নেতারা খালাস পাবেন আশা করে আমরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছেন।

জজ মিয়া নাটকের অবসান

ঘটনার ১০ মাসের মাথায় ২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার বীরকোট গ্রামের বাড়ি থেকে জজ মিয়া নামের এক যুবককে সিআইডি আটক করে। ১৭ দিন রিমান্ডে রেখে জজ মিয়ার কাছ থেকে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এএসপি আবদুর রশিদ ও তৎকালীন বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন। সিআইডির এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনিও সাজানো ছকে কথিত তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে যান। এই গল্প সাজানোর ঘটনায় তদন্তকারী কর্মকর্তাদের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন বলে পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে।

ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া সেই সাজানো জবানবন্দিতে জজ মিয়া বলেছিলেন, তিনি আগে কখনো গ্রেনেড দেখেননি; গ্রেনেড ও বোমার মধ্যে পার্থক্য তিনি জানেন না। পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে বড় ভাইদের নির্দেশে তিনি অন্যদের সঙ্গে গ্রেনেড হামলায় অংশ নেন। আর বড় ভাইয়েরা হচ্ছেন সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, জয়, মোল্লা মাসুদ, মুকুল প্রমুখ।

এর প্রায় দুই বছর পর ২০০৬ সালের আগস্টে এই নাটকের পেছনের ঘটনা ফাঁস করে দেন জজ মিয়ার মা জোবেদা খাতুন। সেসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন,জজ মিয়াকে গ্রেপ্তারের পর থেকেই সিআইডি তাঁর পরিবারকে মাসে মাসে ভরণপোষণের টাকা দিয়ে আসছে। জজ মিয়াকে গ্রেনেড হামলা মামলায় রাজসাক্ষী করতে সিআইডির প্রস্তাবের কথাও ফাঁস করে দেন তিনি।

সত্য উদঘাটনের শুরু

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে নতুন করে এ মামলা তদন্তের উদ্যোগ নেয়। তাতে বেরিয়ে আসে, বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর সহযোগিতায় গোপন জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি-বি) জঙ্গিরা শেখ হাসিনাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে ওই হামলা চালিয়েছিল।

তদন্ত শেষে সিআইডির এএসপি ফজলুল কবীর ২০০৮ সালের ১১ জুন হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে আদালতে দুটি অভিযোগপত্র জমা দেন। তাতে ২২ জনকে আসামি করা হয়। সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু ছাড়া বাকি আসামিদের সবাই হুজি-বির জঙ্গি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই রায়কে ঘিরে অনেক বির্তক আছে। তবে এত সব বিতর্কের মাঝেও দীর্ঘ ১৪ বছর জজ মিয়ার নাটকের অবসান হয়েছে এটাকে সবাই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। সে সময় যারা গ্রেনেডের স্পিল্টার বয়ে বেড়াচ্ছেন তারা হয়তো এই রায়ের পর কিছুটা হলেও ব্যথা বয়ে বেড়ানোর মানসিক শক্তি পাবেন।

Bootstrap Image Preview