Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৯ বুধবার, ডিসেম্বার ২০১৮ | ৫ পৌষ ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

৫ বছরে ৩৭১৯টি ধর্ষণের মধ্যে গণধর্ষণই ১০০৮টি

মেরিনা মিতু
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬ অক্টোবর ২০১৮, ০১:০৫ PM
আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০১৮, ০১:১৯ PM

bdmorning Image Preview
ফাইল ছবি


সরকারি-বেসরকারি কিংবা বর্তমানে ডিজিটাল অনেক কার্যক্রম রয়েছে চলমান নারীদের সহিংসতার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। তা স্বত্ত্বেও ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে ধর্ষণের সংখ্যা। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। যার অনুপাত গড়ে প্রতিদিন ২ জন।

মানবধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, গত ৫ বছরে দেশে ৩ হাজার ৭১৯ নারি-শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে একক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২ হাজার ২৯২ জন। আর গণধর্ষণের শিকার হয়েচেন এক হাজার ৮ জন এবং ধর্ষণের ধরণ জানা যায়নি ১১৫ জনের। যা গড় করলে দেখা যায় প্রতিদিন ২ জন নারী ও শিশু ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়।

আসকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে একক ধর্ষণ হয়েছেন ৩৮৭ জন, গণধর্ষিত হয়েছেন ২১৮ জন, ধর্ষণের ধরণ জানা যায়নি ৩১ জনের। ২০১৫ সালে একক ধর্ষিত হয়েছেন ৪৮৪ জন, গণধর্ষিত হয়েছেন ২৪৫ জন ও ধর্ষণের ধরণ জানা যায়নি ২৩ জনের।  ২০১৬ সালে একক ধর্ষিত হয়েছেন ৪৪৪ জন, গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৯৭ জন ও ধর্ষণের ধরণ জানা যায়নি ১৮ জনের। ২০১৭ সালে একক ধর্ষিত হয়েছেন ৫৯০ জন, গণধর্ষিত হয়েছেন ২০৬ জন ও ধর্ষণের ধরণ জানা যায়নি ২২ জনের এবং ২০১৮ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত একক ধর্ষিত হয়েছেন ৩৮৭ জন, গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৫২ জন ও ধর্ষণের ধরণ জানা যায়নি ২১ জনের।

কেস স্টাডি ১: "রিমা আক্তার (ছদ্মনাম)। পাবনার সুজানগর ‘ক’ এলাকার বাসিন্দা ও স্থানীয় উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। চলতি বছরের ১৯শে সেপ্টেম্বর ‘ক’ এলাকার পৌরসভার ২নং ওয়ার্ড কমিশনারের বাড়িতে নিয়ে আটকে রাখে এলাকার বখাটেরা। পরে ওই শিক্ষার্থীকে দুইদিন ধরে আনাই, নায়েবসহ ৭ যুবক মিলে উপুর্যপরি ধর্ষণ করে।

এতে সে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে মেয়েটির পরিবারে খবর দিয়ে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরে মেয়েটির পরিবার বাড়ির আসবাবপত্র বিক্রি করে ২০ হাজার টাকা দিয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। থানায় অভিযোগ দিয়ে মেয়েটিকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বলে জানান মেয়েটির মা। এ ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে আটক করেছে। কিন্তু বিচারকার্যে তেমন সুফলতা কিছু এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

এদিকে একই দিনে একই উপজেলার ‘খ’ গ্রামে বিকেলে ফাকা বাড়িতে প্রবেশ করে আকলিমা (ছদ্মনাম) নামে এক গৃহবধুকে ওড়না দিয়ে মুখ বেঁধে কাজী, বাতেন কাজী, রাসেল কাজী, আবু মুছা, আরিফ ও কালামসহ সাত জন মিলে ধর্ষণ করে ফেলে রেখে যায়। পরে প্রতিবেশীরা ধর্ষিতা ওই গৃহবধূকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। ভয়ে কিংবা সম্মানের কথা ভেবে তাদের কেউ সঠিকভাবে আইনী ব্যবস্থাও নেয়নি।"

আইনী সহযোগিতার বিষয়টি তুলে ধরে তেজগাঁও ভিক্টিম সাপোর্ট কেন্দ্রের দায়িত্বরত অফিসার আমেনা বেগম বিডিমর্নিংকে বলেন, নারী নির্যাতন নিয়ে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসলে আমরা তা যথেষ্ট গুরত্বের সাথে খতিয়ে দেখি। আর উপর্যপুরি ব্যবস্থাও নিই। কিন্তু মূলত যে বিষয়টি মূল প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে তা হলো, বেশিরভাগ মামলাতেই বাদী নিজেই আর মামলা লড়তে চায় না। কিংবা সামাজিকতার ভয়ে থানা পর্যন্তই আসে না।'

আইনী সহায়তা কিংবা মামলা লড়াটা একজন নারীর জন্য কতোটা অনুকূলে রয়েছে সে বিষয়ে আইনজীবী নীনা গোস্বামি বিডিমর্নিংকে বলেন, ‘সংবিধানে নারী সহিংসতা নিয়ে যে আইন রয়েছে সেটা সম্পূর্ণভাবেই নারীর অনুকূলে রয়েছে। তা ছাড়া বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি থেকে অনেক ঘটনাতেই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আইনি সহায়তার ঘটনা আমরা দেখতে পাই। তা ছাড়া দেশে অনেক আইনজীবী রয়েছে যারা নিজ ইচ্ছায় গরিব নারীদের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দিয়ে থাকেন। তাই আমি মনে করি নারী যদি নিজে তার অধিকার আদায় করে নিতে চায় তার জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।'

শুধুমাত্র ধর্ষণের এই মহাযজ্ঞ নয়। দিন দিন ধর্ষণের ধরণ নির্মম পাশবিকতাকেও হার মানাচ্ছে। তা ছাড়া ধর্ষণের পর ধর্ষিতাকে নির্মমভাবে হত্যার বিষয়টা অনেকটা নতুনই বলা যায়। যা হয়তো তনু হত্যার পর থেকেই নজরে এসেছে। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাদকের ভয়াবহতা, সামাজিক অস্থিরতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মনোভাব, পর্নোগ্রাফির ছড়াছড়ি থাকার কারণে এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক মানসিকতার বিকৃত রূপ ধারণ করছে।

আসক বলছে গত পাঁচ বছরে হত্যা করা হয়েছে ২৬১ জনকে। এরমধ্যে ২০১৪ সালে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬৮ জনকে, ২০১৫ সালে ৬০ জন, ২০১৬ সালে ৩৭ জন, ২০১৭ সালে ৪৭ জন ও ২০১৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৪৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া একই সময়ে ধর্ষণের কলঙ্ক সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন ৩৮ জন নারী। এরমধ্যে ২০১৪ সালে ১৩ জন, ২০১৫ সালে ২ জন, ২০১৬ সালে ৬৫ জন, ২০১৭ সালে ১০৪ জন ও ২০১৮ সালে ৭৮ জন।

‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব’ ধর্ষণের মূল কারণ বলে দাবি করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, ‘ধর্ষণ নতুন কিছুই নয়। আগেও হতো আর এখনও হচ্ছে। হয়তো ধরণে খানিকটা পরিবর্তন এসেছে।  মানুষ যখন মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় তখন একে অপরকে হেয় করার প্রতিযোগিতা চলে। আর প্রতিপক্ষ যদি নারী হয় তাহলে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য ধর্ষণটাই বেছে নেয়া হয়। ধর্ষণের প্রবণতা সমাজের দুই শ্রেণির মানুষের মধ্যে রয়েছে বলে আমি মনে করি। উচ্চবিত্তরা অর্থ ক্ষমতা, প্রভাবপ্রতিপত্তি দিয়ে সবকিছু বিচার করে। আর নিম্নবিত্তরা মূলত জিদ ও কাউকে সমাজে হেয় করার চিন্তা থেকে ধর্ষণের বিষয়টি সামনে আনে।'

প্রসঙ্গত, মহিলা পরিষদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী গত বছর ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৫৮ জনকে। গণধর্ষণের শিকার হয় ২২৪ জন। মোট ধর্ষণের সংখ্যা ৯৬৯ টি তন্মধ্যে গণধর্ষণ ২২৪টি।

ধর্ষণ নিয়ে সমাজের এই অবক্ষয় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বিডিমর্নিংকে বলেন, “দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়াটা একজন অপরাধীর জন্য ইতিবাচক দিক। সমাজের চোখে একজন ধর্ষিতা যা, তা ভিক্টিমের জন্য খুবই নেতিবাচক। এই ইতিবাচক আর নেতিবাচকের ভিড়েই অপরাধের সংখ্যা ক্রমন্বয় বাড়ছে। আর তার পুরোপুরি দায় সমাজকে দেয়ায় যায়। এই পাশবিকতা কমানোর একমাত্র উপায় এই যে সমাজে মতামতের সমন্বয় এনে অপরাধের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার প্রয়াস করতে হবে।’

ধর্ষণ ব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করার জন্য আমাদের সকলকেই সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সুস্থ সমাজে ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজ কখনোই কাম্য না। 

Bootstrap Image Preview