Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২১ শুক্রবার, সেপ্টেম্বার ২০১৮ | ৬ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

‘শিক্ষা আমার স্বাধীনতার অধিকার, আমৃত্যু লড়ে যাবো অধিকার আদায়ে’

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:২১ AM আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:০৪ AM

bdmorning Image Preview


অারিফ চৌধুরী শুভ।।

বাংলাদেশে শিক্ষার অধিকার মানুষের সংবিধান স্বীকৃত জন্মগত অন্যতম একটি মৌলিক অধিকার। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের পর ২০১৪ সাল পর্যন্ত শিক্ষার বহুমুখী বাণিজ্যকরণ এবং অধিকার আদায়ে বড় ধরণের কোন আন্দোলন সংগঠিত হয়নি। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার মানুষ ধরেই নিয়েছিল, এটি একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু আমার কাছে শিক্ষা আমার স্বাধীনতার অধিকার, আমৃত্যু লড়ে যাবো অধিকার আদায়ে।

শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্ধ বাড়িয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না করে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার (ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ) অত্যন্ত নিচক চিন্তায় ও অশুভ দৃষ্টিতে বেসরকারি উচ্চ শিক্ষায় প্রথমে ১০ শতাংশ এবং পরে তা কমিয়ে ৭.৫% ভ্যাট বা কর আরোপ করে। বেসরকারি উচ্চ শিক্ষাকে কলঙ্কিত করার এমন হীন চেষ্টা বাংলাদেশ সরকার (ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ) ২০১০ সালে ৪.৫% ভ্যাট আরোপের মাধ্যমে আরো একবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তখনও ছাত্র আন্দোলনের প্রতিবাদের মুখে সফল ব্যর্থ হয়েছে।

২০১৫ সালে বেসরকারি উচ্চ শিক্ষায় ৭.৫% ভ্যাট বা কর আরোপের প্রতিবাদে সারাদেশে আন্দোলন গড়ে ওঠে। শান্তিপূর্ণভাবে ৪ মাস রাজপথে আন্দোলন আর অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা সরকারকে বাধ্য করেছে শিক্ষার উপর অন্যায়ভাবে অর্পিত মূসক তুলে নিতে। শিক্ষা হলো করমুক্ত। সৃষ্টি হলো দেশের ইতিহাসে শিক্ষা আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ইতিহাস। তাই এই আন্দোলন একটি ঐতিহাসিক শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মর্যাদা রাখে।

শিক্ষার্থীদের ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই আন্দোলনের সূচনা হয় ২০১৫ সালের ১৪ মে একজন শিক্ষার্থীর মাধ্যমে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য সূত্র মর্মে বেসরকারি উচ্চ শিক্ষায় ভ্যাট আরোপ হতে পারে এমনটা নিশ্চিত হয়ে ২০১৫ সালের ১৪ মে গণমাধ্যমে একটি চিঠি পাঠান ঐ শিক্ষার্থী। সেদিনের সেই শিক্ষার্থীটি ছিলাম আমি নিজেই। লক্ষ্মীপুর জেলায় জন্ম নিয়ে মেঠোপথে শিক্ষার অধিকার আদায়ের সংগ্রামই আমাকে এই আন্দোলনের উপলব্দি এনে দেয়। এই আন্দোলনের সময় আমি রাজধানীর স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সিদ্ধেশ্বরী ক্যাম্পাসের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৬ ব্যাচের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলাম। ২৩ বছর বয়সী বলে প্রথমে আমার কথার গুরুত্ব কেউ দেয়নি। তবে চিঠিটি গণমাধ্যমের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে। শিক্ষায় কর নিয়ে সব মহলে হৈচৈ পড়ে গেল তারপর থেকেই। এমন সাহসিকতা ও এমন বিজয় দেশ-বিদেশ ও উচ্চ মহলে আড়োলন সৃষ্টি করেছে।

অনেকেই আমাকে সাহস দিয়েছেন। উৎসাহ দিয়েছেন। অভিনন্দন জানিয়েছেন। জাতিসংঘের সাথে শিক্ষা ও মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন অনেক সংগঠনের নেতারা তখন আমার সাথে বিভিন্ন ভাবে যোগাযোগ করেছে। তারা আমাকে ২০১৫ সালে ‘স্টুডেন্টস অব দ্যা ইয়ার এওয়ার্ড ২০১৫’ নির্বাচিত করেছে। বিদেশের মাটিতে সেই পুরস্কার নিতে হবে বলে অামি নেইনি। কারণ এই আন্দোলনের পুরস্কার রাজপথের সকল সহযোদ্ধাদের সাথে করে দেশের মাটিতেই নেওয়ার প্রস্তাব দিলে তারা রাজি হননি। তবে আমি আমার দায়িত্ববোধ থেকে এই আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলাম। ভ্যাট আন্দোলনের মতো শান্তিপূর্ণ এমন আন্দোলনের উদাহরণ সৃষ্টি হলো দেশে।

এ আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে, পতিপক্ষের রোষানলে এবং রাজনৈতিক হামলায় ছাত্র-শিক্ষক ও অভিভাবকরা রক্তাক্ত হয়েছেন কিন্তু পাল্টা জবাব দিতে একটি ঢিলও ছুড়ে মারেননি কোথাও। ফলে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর এই আন্দোলন একই সাথে পৃথিবীর ইতিহাসে শান্তিপূর্ণ শিক্ষা আন্দোলনের জন্ম দিল। জীবনের দাম থেকেও অর্পিত ভ্যাট শিক্ষার্থীদের মনে যে কঠিন দাগ কেটেছে তার উদাহরণ তখনকার প্রতিবাদী স্লোগানগুলো। শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজধানী। প্রতিবাদের ভাষা হয়ে যায় উল্টো। ‘শিক্ষা কোন পণ্য নয়, শিক্ষা আমার অধিকার’ এই স্লোগন পাল্টে লাখো কণ্ঠে উচ্চারিত হতে থাকে ‘ভ্যাট দেব না গুলি কর, শিক্ষা আমার অধিকার’।

শিক্ষার্থীদের এত কঠিন প্রতিবাদ ও প্রতিবাদের ভাষা ৬২ শিক্ষা আন্দোলনকেও হার মানিয়েছে। এই আন্দোলন আগত-অনাগত সবার মনসতাত্বিক চিন্তার খোরাক হবে বলে অভিহিত করেছেন শিক্ষাবীদ, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক ও সুশীলসমাজ।

এই প্রথম, দেশকে আশা দেখিয়েছে শিক্ষার্থীরা। ৬২ শিক্ষা আন্দোলনের পরে এত বড় একটি আন্দোলন জাতিকে উপহার দিয়ে লাখ লাখ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিজেদের নন্দিত করেছে প্রথম বারের মতো। এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের জন্যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের রোল মডেল ও অদ্বিতীয় ইতিহাস সৃষ্টিকারী আন্দোলন। এই সৃষ্টির গুরু দায়িত্বটি মুখপাত্রের জায়গা থেকে শেষ দিন পর্যন্ত এগিয়ে নিয়েছেন স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ফারুক আহমাদ আরিফ।

পুরো আন্দোলনটি ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশান’ ব্যানারেই সম্পন্ন হয়েছে। শিক্ষার অধিকার আদায়ে ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশান’ সব সময় কথা বলে যাবে।

আগামীকাল ১৪ সেপ্টেম্বর ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশান’ অান্দোলনের ৩ বছর পূর্তি হবে। এই তিন বছরে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে যেমন, তেমনি এই আন্দোলন শেষ হবার পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই আন্দোলনের ইতিবাচকতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় সংগঠিত হয়েছে অারো কটি আন্দোলন। থেমে যায়নি শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের কথা বলার সাহস দিয়েছে এই আন্দোলন। শিক্ষাকে সমাজের মূল হাতিয়ার করার জন্যে সকলকে এগিয়ে আসার আহবান জানাই।

লেখক: উদ্যোগতা ও অন্যতম সংগঠক, নো ভ্যাট অন এডুকেশান

প্রতিষ্ঠাতা: শিক্ষা অধিকার আন্দোলন।

শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (বিভাগ মাস্টার্স), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Bootstrap Image Preview