Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৩ রবিবার, সেপ্টেম্বার ২০১৮ | ৭ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

স্কুটিতে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সড়ক জয় এবং একজন আতিকা

মেরিনা মিতু
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:০৪ AM আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:০৪ AM

bdmorning Image Preview


রাজধানীতে গণপরিবহনে নারীদের যৌন হয়রানির খবর আর হয়রানির চিত্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ব্লেড দিয়ে মেয়েদের পোশাক কেটে দেয়ার ভিডিও ভীষণভাবে নাড়া দেয় আতিকা রোমাকে। ভাবতে থাকেন কীভাবে এ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। নিজের জীবনের দশ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারেন যে স্কুটির মাধ্যমে সময় এবং নিরাপত্তা দুই ই থাকে হাতের মুঠোয়। সেই ভাবনা থেকে হঠাৎ মাথায় আসে মেয়েদের স্কুটি প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়টি। এরপরই নতুন স্বপ্নের হাতছানি নিয়ে শুরু হয় তার ‘যাব বহুদূর’ নামে স্কুটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের যাত্রা।

রোমা তেজগাঁওয়ের নাবিস্কো এলাকায় স্কুটি চালনার এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। প্রশিক্ষণ নিতে আসা মেয়েদের প্রায় ৮৫ ভাগই কোনোদিন সাইকেলও চালায়নি। সেসব নারীকে প্রথম হাঁটতে শেখার মতো হাঁটি হাঁটি পা পা করে স্কুটি চালানো শেখান তিনি। প্রশিক্ষণার্থীদের কেউ শিক্ষার্থী, কেউ চিকিৎসক, কেউ গৃহিণী, আবার কেউ চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী।

গণপরিবহনের ঝামেলা এড়িয়ে জ্যাম ঠেলে নারীরা যাতে নিজস্ব বাহনে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন, সে লক্ষ্যে আত্মপ্রত্যয়ী নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহস ও প্রেরণা যোগাতে কাজ করছেন নারী বাইকার ও উদ্যোক্তা আতিকা রোমা। 

আতিকা নিজে পঞ্চম শ্রেণী থেকেই বাইক চালানো শুরু করেন। মাঝে সময়ের বিশাল একটা গ্যাপ। স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির গণ্ডি পেরিয়ে তিনি ২০০৪ সালে কর্মজীবন শুরু করেন। যাতায়াত করতেন পাবলিক ট্রান্সপোর্টে। এক পর্যায়ে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যাতায়াত তাঁর কাছে অসহনীয় লাগলে সিএনজি অটোরিক্সায় যাতায়াত করতেন। কিন্তু বেতনের সব টাকা চলে যাচ্ছিল সিএনজিওয়ালার পকেটে। সেটা ঠেকাতেই ২০০৯ সালে শুরু করেন ব্যাটারিচালিত মোটরসাইকেলে যাতায়াত।

রাজশাহী ইউনিভার্সিটি থেকে নৃবিজ্ঞান নিয়ে পড়ালেখা শেষ করে ঢাকায় এসে কাজ শুরু করেন বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থায়। সর্বশেষ জাপানি দাতা সংস্থা ‘শাপলা নীড়ে’ অ্যাডভোকেসির দায়িত্ব পালন করছিলেন আতিকা রোমা। জ্যামের শহর রাজধানীতে প্রতিদিন অফিসে যেতে-আসতে তাঁকে রাস্তায় নানান ঝুটঝামেলা পোহাতে হতো। এসব ঝামেলা এড়াতে স্কুটি চালানো শুরু করেন তিনি।

রংপুরের মেয়ে আতিকা রোমা উদ্যমী মনোভাবের কথা বলতে গেলে ফিরে দেখতে হবে গত বছরের ডিসেম্বরে দিকে। রোমা বাংলাদেশের প্রথম নারী বাইক রাইডার, যিনি ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে স্কুটি চালিয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সড়ক এবং দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সড়ক থানচি আলীকদম যাওয়ার রাস্তায় ডিম পাহাড় সড়ক অতিক্রম করেছেন। তিনি স্কুটি নিয়ে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১,২৫০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছেন। স্কুটি চালিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম-বান্দরবান-কক্সবাজার-টেকনাফ-কক্সবাজার হয়ে পুনরায় ঢাকা ফিরেছেন। এতে তাঁর সময় লেগেছে তিনদিন।

ঢাকা-চট্রগ্রাম-বান্দরবান-চিম্বুক-নীলগিরি-থানচি-আলীকদম-লামা-ফাইসসাখালি-কক্সবাজার-টেকনাফ-চট্রগ্রাম-ঢাকা-পুরো পথটা ১ হাজার ২২০ কিলোমিটার। দক্ষিন এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উঁচু সড়কপথ পাড়ি দেয়ার খবরই চোখ কপালে ওঠার জন্য যথেষ্ঠ। আর এরসঙ্গে যখন যোগ হবে, এই পুরো যাত্রাপথের মাঝেই ছিল সমুদ্র সমতল থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু সড়কপথের হিসাবটা যা পাড়ি দিয়েছেন টিভিএস উইগো ১১০ সিসির স্কুটি নিয়ে।

অ্যাডভেঞ্চারের শুরুটা হয় ২১ ডিসেম্বর রাতে। বাংলাদেশের দুইটি বাইকিং গ্রুপ টিমে এসিএস এবং এক্সপ্লোরার্স এমসি গ্রুপ রওনা হয় বান্দরবানের উদ্দেশে। যেখানে অংশ নেয় ২০ জন আর এই ২০ জনের মধ্যে নারী রাইডার ছিলেন আতিকা রোমা একাই। এই দলটির উদ্দেশ্য ডিম পাহাড়ে যাওয়া। ডিম পাহাড় বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার একটি পাহাড়। পাহাড়টি আলীকদম এবং থানচি উপজেলার ঠিক মাঝখানে অবস্থিত।

রোমার ভাষায়, ‘এখান থেকে পড়ে গেলে জীবনে দ্বিতীয় বার ভুল করার মতো জীবন পাওয়া যাবে না’। তাইতো তার চলার পথে বারবার মনে হয়েছে মা, বড় বোন নিশাত জাহান রানা এবং পোষা বিড়ালের কথা।

ডিম পাহাড় পাড়ি দেয়ার মতো ভয়ংকর অভিজ্ঞতা গল্পের ছলে বলে যাচ্ছিলেন আতিকা। তার মধ্যে দু চারটা ঘটনা এমন যে-

‘২৩ তারিখ যখন বান্দরবান ঢুকছিলাম তখন পেছনের বাইকের ছেলেটা ক্রমাগত হর্ণ দিচ্ছে, কিন্তু আমি বাইক না থামানোর কারনে একসময় সে আমাকে পার হয়ে গিয়ে আমার সামনে দাড়ায় এবং জিজ্ঞেস করে, আপা আর ইউ ওকে? আপনি টের পাননি, আপনার পেছনের চাকার মধ্যে সাপ ঢুকে গিয়ে চক্কর খাচ্ছিলো এবং সে আপনাকে বাইট করছিল। এমনকী, আপনার চাকা থেকে পড়ে গিয়ে একদম ফনা তুলে আমার পায়ে কামড় দিয়েছে। তাড়াতাড়ি জুতো মুজা খুলে দেখতে লাগলাম। কিন্তু এসব রাইডে আমরা খুব ভারি জুতো পরি থাকি বলে সে যাত্রায় বেঁচে গেলাম। এই সাপ কীভাবে কখন চাকার মধ্যে ঢুকেছে আমি বলতেই পারবো না-এটা ছিল আমার প্রথম অভিজ্ঞতা।'

‘পাহাড়ের রাস্তাগুলো ছিলো একদম খাড়া, খানিক ভুলের জন্য জীবনের সমাপ্তি ঘটতে পারে। কিন্তু কিভবাএ যেনো সে পথ পাড়ি দিয়ে দিলাম। তারপর আসলো নীলগিরি থেকে থানচি যাবার পথে সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট। সেখানে সবাইকে সব ধরণের তথ্য দিতে হয়। সেখানেই একজন সেনাসদস্য রোমাকে বলেন, আপনি এই রাস্তা দিয়ে যাবেন এই স্কুটি নিয়ে? বড় বড় বাইকরারা স্পোর্টস বাইক নিয়ে যেতে পারে না, আর আপনি স্কুটি নিয়ে যাবেন। আপনি ফিরে যান প্লিজ। কেবল তারাই নন, সঙ্গে থাকা রাইডাররাও বোঝাচ্ছিলেন ফিরে যাবার জন্য। তাও সাহস নিয়ে এগুলাম।'

সাহস আর আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে থানচি থেকে আলীকদমে যাবার পথে আরেকটি সেনাবাহিনী চেকপোস্ট। সেখানেও একজন সেনাসদস্য আমাকে বলেন, আপনি কি এই স্কুটি নিয়ে এখানে উঠবেন, এটা খুব ভুল সিদ্ধান্ত হচ্ছে আপনার। আমি খানিক ঘাবড়ে যাই তখন। কিন্তু আমি এতো কাছে এসছি-সে লোভটাও সামলাতে পারছিলাম না। আর সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট থেকে কিন্তু ডিম পাহাড় দেখা যাচ্ছিল। আমি মনস্থির করলাম, যাবো। নাম এন্ট্রি শেষে যাত্রা শুরু করে ডিম পাহাড়ের দিকে এগুচ্ছি।

সেখানে একটা রাস্তা প্রায় ১ কিলোমিটার নিচে নেমে গেছে আর তারপর দেড় কিলোমিটার খাঁড়া হয়ে ওপরে উঠে গিয়েছে। যখন সেই রাস্তা ধরে নেমে যাচ্ছিলাম তখন আরেকবার আমার মা এবং আপার কথা মনে হলো, মনটা কেমন করে উঠলো-একটা সুতোর মতো রাস্তা। নুড়ি পাথর বিছানো, চাকা কাঁপছে অবিরত। আর আমি যদি পড়ে যাই, তাহলে আমার টিমমেটরা ভীষণ বিপদে পড়ে যাবেন। একেতো খাঁড়া এবং আঁকাবাঁকা পথ তারওপর পাহাড়ি রাস্তার নুড়ি পাথরের জন্য বার বার চাকা পিছলে যাচ্ছিল। আমি বুঝে গেলাম, একটু অসতর্ক হলে সোজা ২৫০০ ফুট নীচে পরে যেতে হবে, এক জীবন মরণ বাজি, সেই বাজির অনুভূতির কোন তুলনা হয় না। তারপরও যাচ্ছি এবং গেলাম। একটা পয়েন্টে গিয়ে পৌছালাম।

একসময় দেখলাম দুই টিমের সবাই উল্লাসে ফেটে পড়েছে, সে কি চিৎকার একেকজনের। আমি তখনও জানি না, আমি ডিম পাহাড়ে পৌঁছে গিয়েছি।

আতিকা রোমা বলেন, আমি স্কুটি চালানোর পর অনেক কথা শুনেছি, কেবল আমি না, আমার পরিবারের প্রতিটি মানুষকে কথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু কখনও কাউকে জবাব দেইনি। স্কুটি নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সড়কে ওঠার মধ্য দিয়ে আমি সবাইকে সামগ্রিকভাবে জবাব দিয়েছি। আর বলতে চাই, স্কুটিকে বেশিরভাগ মানুষ মনে করে স্কুটি মেয়েলি ফ্যাশনেবল, ঠুনকো বিষয়। তাই আমার এ যাত্রায় আমি স্পোর্টস বাইক নেইনি। কারণ, আমি প্রতিষ্ঠা করতে চাই, স্কুটি দিয়েই অনেক কিছু সম্ভব যদি ইচ্ছা এবং একাগ্রতা থাকে।

আতিকা রোমার সব কাজে যিনি অনুপ্রেরণা দেন, সেই নিশাত জাহান রানা বলেন, সকল মেয়ে যদি রোমার মতো সাহস নিয়ে বেরিয়ে আসত তবে আমাদের মেয়েদের সামাজিক বাধাটা ভেঙ্গে যেত। মেয়েদের জন্য আসলে সাহস দেখানোর সাহসটাই জরুরি, যেটা রোমা করেছে।

‘যাব বহুদূর’কে নিয়ে রোমার স্বপ্ন আকাশছোঁয়া। এখন ছোট পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, কিন্তু সাড়া পাচ্ছেন অনেক। প্রতিদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলাশহর থেকে অসংখ্য নারী ফেসবুকে ও ফোনে স্কুটি চালনা শেখার জন্য তাঁর সাথে যোগাযোগ করছেন। নারীদের আগ্রহ দেখে তিনি এই কার্যক্রমকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে চান। এ লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে ৭ দিন, দুই সেশনে ১৪ দিন করে মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। এছাড়াও সারাদেশের সচেতন ও প্রগতিশীল বাইকারদের মধ্য থেকে কিছুসংখ্যক বাইকারকে নিয়ে একটা টিম গড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর, যারা জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে নারী বাইকারদের নিরাপদ পথচলায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।

Bootstrap Image Preview