Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২১ শুক্রবার, সেপ্টেম্বার ২০১৮ | ৫ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

'মা আমি দূরের ঘাসে ঘুমিয়ে থাকবো'

আল আমিন হুসাইন
রিপোর্টার
প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০১:১০ PM আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:৩০ AM

bdmorning Image Preview


পৃথিবীর জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড হচ্ছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে। এদিন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের ১০ জন সদস্য, তার ভাগ্নে ও ভাগ্নে বউ, ভগ্নিপতির পরিবারসহ ১৯ জন মানুষকে হত্যা করে একদল বিপদগামী সেনাদল। সেই হত্যাকাণ্ডে রক্ষা পায়নি শিশু পর্যন্ত। বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি পানিমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় হামলা চালিয়ে ৮ জনকে হত্যা করা হয়।

সেই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বিডিমর্নিং এর সাথে ১৪ আগস্ট-২০১৮, একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তার পুত্র আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপির স্ত্রী বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ। তিনি বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও বর্তমান মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ'র মা। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিডিমর্নিং এর হেড অব নিউজ ফারুক আহমাদ আরিফ, ক্যামেরায় ছিলেন আবু সুফিয়ান জুয়েল ও মেরিনা মিতু। সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্যে তুলে ধরা হলো।

ফারুক আহমাদ আরিফ: ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালের ঘটনাটির সময় বা ক্ষণটি কখন ছিল? 

বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ: সকাল ঠিক আজানের সময়। অন্ধকার। কিছু কিছু আলো আজানের সময়ই ঘটনাটা।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনার কিভাবে খোঁজ পেলেন যে বাসায় হামলা চালিয়েছে?

বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ: হঠাৎ গুলির শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। একটা গুলির আওয়াজ। এর কিছুক্ষণ পরেই বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকে। আমাদের বাসার দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পাই। এরমধ্যেই দরজা দিয়ে তারা ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ে। আমাদের কাজের বুয়া লহ্মির মা। সে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে হ্যান্ডস আপ হ্যান্ডস আপ বলতে লাগলো তখন আমরা সবাই আতঙ্কিত। তখন আমার শ্বশুর বললো সবাই আল্লাহরে ডাকো। এরমধ্যেই ওরা হ্যান্ডসয়াপ করায়ে আমাদের নিচে নামিয়ে আনলো। নিচে নামার সময়েই যখন নামতে ছিলাম তখন কোলে আমার সাদিক আব্দুল্লাহ। ছোট ছিল তখন মাত্র এক বছর আট মাস তার বয়স ছিল। ওকে আমি কোলে নিই আমি এর মধ্যে সুকান্ত বাবু পেছনে ফিরে আমাকে বললো মা আমাকে কলে নাও। তখন তার বয়স মাত্র ৪ বছর। আমাকে কোলে নাও। তখন যেহেতু এক ছেলে আমার কোলে সেহেতু তখন আমি তাকে কোলে নিতে পারি নাই। আমার ভাসুর তাকে কোলে নেন। আমরা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম। আমরা থাকতাম এখন যেটা মেট্রোপলিটন হেড অফিস সেখানেই।

 
পানিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াতের সাথে যারা শহীদ হোন

ফারুক আহমাদ আরিফ: সেটা ২৭ মিন্টু রোড ছিল? 

বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ: হ্যাঁ ২৭ না ২৯ মিন্টু রোড ছিল? নিচে নামার পর তারা আমাকে একটা এলএমজি দিয়ে আলাদা করে নিয়ে বললো উপরে অার কে কে আছে? অামি বললাম উপরে কে কে আছে? হঠাৎ আমি আমার শ্বশুরের চোখের দিকে তাকালাম। তিনি চোখের ইশারায় বললেন যে, 'তুমি বলো না'। বললাম আমি নেমে আসছি উপরে কে আছে জানি না। তারপর আমাকে ভিতরে ঢুকতে দিল আমি ঘরের ভিতরে ঢুকে গেলাম। তখন আমার শ্বশুর বললেন 'তোমরা কোথা থেকে আসছো'? কি চাও, তোমাদের কমান্ডিং অফিসার কে? সমস্যা কি? তারা বললো আমাদের কোন সমস্যা নেই। কোন কমান্ডিং অফিসার নেই। এসব কথা বলেই তারা আমার শ্বশুর, ভাসুরকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার শুরু করলো। আমার শ্বশুর আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বুকে একটা গুলি লাগলো, ভাসুর শহীদ সেরনিয়াবাত, তার কোলে আমার ছেলে (সুকান্ত বাবু) ছিল। ব্রাশফায়ারে আমরা মোটামুটি সবাই কম-বেশি আহত হলাম। গুলি খেয়ে টলতে টলতে আমার শ্বশুর সোফায় গিয়ে বসলেন। আমিও পাশে বসলাম। শহীদ ভাই আর আসতে পারলেন না। তিনি বাবুকে কোলে নিয়েছিলেন। তিনি আসতে পারলেন না। বাবুকে কোলে নিয়ে ফ্লোরে পড়ে গেলেন।

ফারুক আহমাদ আরিফ: সেইদিন আপনাদের বাসায় কতজন মানুষ অবস্থান করতেছিল? 

বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ: পরিবারের সবাই ছিল। তিন ননদ, দুই দেবর, ভাসুর, আমার ৩ ছেলে-মেয়ে, আমার স্বামী, শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, অার ক্রিসেন্টের এক ছেলে সে গান করতো (বর্তমান অপ্সোলিন কোম্পানির ছোট ছেলে)। সে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে ছিল আর বলতে ছিল চাচা আমাদের কি হবে? আমার শ্বশুর বললেন আমাদের যা হবে তোমাদেরও তাই হবে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: সেদিন আপনাদের বাসায় কতজন শাহাদাৎবরণ করলেন? 

বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ: ৮ জন।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আহত হলো কতজন? বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ: সবাই, কাজের কিছু লোক ছিল তারাও আহত হয়।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আহতদের হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল কারা? 

বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ: পরে শুনেছি রমনা থানার ওসি সাহেব আমাদের হাসপাতালে নিয়ে যান। তাদের সাথে কোন কথাই হয়নি। তখন তো অনেকেই অজ্ঞান। আমার কিছুটা জ্ঞান ছিল। হাসপালে যাওয়ার পর দেখলাম জিপ গাড়ি থেকে শেখ মণি ভাই ও তার স্ত্রী (আরজু মণি)কে ধরাধরি করে নামাচ্ছে। তারা মৃতপ্রায় ছিল। আমরা যারা বেঁচে ছিলাম আমার শ্বাশুড়ি, দুই ননদ, হাসপাতালে মোটামুটি ট্রিটমেন্ট করলো।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আবদুর রব সেরনিয়াবাতের জীবনযাত্রাটি যদি বলতেন। 

বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ: আমার শ্বশুর আবদুর রব সেরনিয়াবাত খুব সাধারণ, সাদাসিধা জীবন-যাপন করতেন। তিনি গ্রামে থাকতেন। কখনো শহরে বাড়ি করেননি। শহরে জায়গা কিনেননি। জায়গা নেননি। তাঁর ইচ্ছা ছিল গ্রামেই জীবনটা কাটিয়ে দিবেন। তিনি বলতেন আমি গ্রামে গিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে থাকবো। সেখানেই জীবনটা কাটাবো। তিনি অ্যাডভোকেট ছিলেন। বরিশাল কোর্টে কাজ করতেন। তিনি আইন পেশায় যা পেতেন তা দিয়ে সংসার চালাতেন। সেখান থেকে গরীবদের জন্যে একটি অংশ দিয়ে দিতেন। আমরা পুরোটা জানতাম না তবে কিছু কিছু দেখেছি তিনি সেই অর্থ অনেক গরীব ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার খরচ চালাতেন। আপনার শুনতে অবাক হয়ে যাবেন। তিনি মন্ত্রী ছিলেন অথচ ঢাকায় তার কোন বাড়ি ছিল না। রাষ্ট্রের কাছ থেকে কিছু নেননি। এমনকি মৃত্যুর পর দেখা গেল তার ব্যাংকে কোন টাকা-পয়সাও জমানো নেই। আমার শ্বশুর খুব সাদাসিধা জীবন-যাপন করতেন।

ফারুক আহমাদ আরিফ: হত্যাকাণ্ডের আগে কি তিনি কোন ধরনের আভাস পেয়েছিলেন। বলা হয় মৃত্যুর আগে মানুষ কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারে? 

বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ: মৃত্যু কিছুদিন আগে তিনি কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন কিনা জানি না তবে প্রায়ই আমাদের বলতেন তোমরা বাহিরে যেওনা। বাহিরে গেলে লোক নিয়ে যেও। আমরা গ্রামে থাকতাম ১০ আগস্ট ঢাকায় আসি। আমি প্রায়ই তার সাথে থাকতাম তিনি খুব সর্তক থাকতেন।

ফারুক আহমাদ আরিফ: সব জায়গায় একটু সর্তক? 

বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ: হ্যাঁ।

ফারুক আহমাদ আরিফ: বিশ্বের একজন গ্রেট লিডারকে হত্যা করা হলো। তখন দেশের কি অবস্থা দাঁড়ালো? সাধারণ মানুষ এটা কিভাবে মোকাবেলা করলো? 

বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ: এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব না। তারা তো হতভম্ব হয়ে গেল।

ফারুক আহমাদ আরিফ: তখন তো ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ? 

বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ: হ্যাঁ, তখন ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধু ও সেরনিয়াবাতকে হত্যার কয়েক মাস পরেই জাতীয় ৪ নেতাকে মারছে (হত্যা)। নভেম্বরে। তারা নেতৃত্ব শুন্য করতে চেয়েছে। নেতৃত্ব না থাকলে তো কিছুই হবে না।

ফারুক আহমাদ আরিফ: গড়ে উঠে না। 

বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ: গড়ে উঠে না। আর হঠাৎ করে এমন একটা কিছু ঘটে গেল মানুষ তো স্তব্ধ হয়ে গেল! মানুষ কি করবে? একটা প্রতিবাদ, প্রতিরোধ বা আন্দোলন করার মতো একটা শক্তি! অথবা পরিস্থিতি থাকতে হবে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: মানুষ শোকে পাথর? 

বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ: হ্যাঁ। এটা (আন্দোলন) তৈরি হতে সময় লাগে। সময়ও লাগছে। তারপর মানুষ প্রতিবাদ করেছে। যার ফলেই তো আমাদের জননেত্রী ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে আসেন। তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অন্য রকম। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পরে মানুষ দাঁড়াতে দাঁড়াতেই তো তাদের কমর ভেঙে দেয়া হয়েছে (বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে)। এটার জন্যে তো সময় লাগবেই।

মা বেগম শাহারার আব্দুল্লাহ'র সাথে সুকান্ত আব্দুল্লাহ বাবু

ফারুক আহমাদ আরিফ: অবশ্যই। সুকান্ত বাবু আপনার ছেলে। তার কোন স্মৃতি যদি বলতেন? তার দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিকতা, অর্থাৎ ছোট সময়ই মানুষের ব্যক্তিত্বের একটা আভাস পাওয়া যায়। 

বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ: সুকান্ত বাবু খুব ঠাণ্ডা প্রকৃতির মানুষ ছিল। বাচ্চারা সাধারণত একটু চতুর বা চটপটে হয়। কিন্তু সে খুব নরম মনের ছিল। কোন কাজ করতে একবার মানা করলে সে আর তা করতো না। কথা মান্য করতো খুব।

ফারুক আহমাদ আরিফ: সে কি আপনাকে মৃত্যুর আগে তেমনি কোন কিছু বলেছে বা কোন ধরনেই ইঙ্গিত? 

বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ: সে মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগে থেকে বলতো 'মা আমি দূরে চলে যাবো, সাগরের ওপারে। মা আমি দূরের ঘাসে ঘুমিয়ে থাকবো।' তখন তো এসব বুঝতাম না। এখন চিন্তা করলে সেগুলো মনে হয় যে, সে কিছুটা হয়তো আঁচ করতে পেরেছিল।

ফারুক আহমাদ আরিফ: ১৯৭৫ সালের এই ঘটনার আগে আপনারা কি কোথাও বুঝতে পারছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু বা আপনাদের নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে? 

বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহ: আমার স্বামী আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ তখন বরিশাল পৌরসভার চেয়ারম্যান। বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে। মুক্তিযুদ্ধে বরিশাল মুজিব বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। তার সম্পর্কে কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুর কাছে নালিশ করছে। আপনার ভাগ্নে এই করছে, সেই করছে। বঙ্গবন্ধু একদিন বললেন, 'তোমার সম্পর্কে কেই কেউ অভিযোগ করছে'। আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ বললেন, 'মামা আপনার ভাগ্নে, আপনি কি কখনো শিক্ষা দিয়েছেন মানুষের ক্ষতি করতে?' বঙ্গবন্ধু বললেন 'যাও মনযোগ দিয়ে কাজ কর মানুষ বলবেই'। এমন ষড়যন্ত্র তো মুক্তিযুদ্ধ থেকেই চলে আসছিল।

Bootstrap Image Preview