Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৫ মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বার ২০১৮ | ৯ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

গণপরিবহনের নৈরাজ্যের আরেক নাম ধর্ষণ

তামজিদ হোসেন
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:০৮ AM আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:৩৬ AM

bdmorning Image Preview


ধর্ষণ এক আতংকের নাম। তবে এটি বর্তমান সময়ে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রকাশ্যে  চলন্ত বাসের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন অনেকে। আবার কখনো কখনো জনসমাগম স্থানেও যৌন হয়রানির শিকার হতে হয় অনেক নারীকে। এখন ধর্ষণের পাশাপাশি ধর্ষিতার হাতে নিজের প্রাণটাও সপে দিতে হয়।

ধর্ষণ সমাজ  সভ্যতার ইতিহাসে নতুন কোন ঘটনা নয়। সমাজ-সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে মানুষ যত আধুনিক হয়েছে সেই সাথে নারীকে নিত্যনতুন কৌশলে অধীনস্ত করে পুরুষের আধিপত্যও বিকশিত হয়েছে নতুনভাবে।

অনেকক্ষেত্রে আমরা নারী প্রশ্নে এখনো আদিম মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণাই পোষণ করি। যেমন, কখনো সমাজ সংস্কারের নামে, কখনো ধর্মীয় বিধি-বিধানের নামে, কখনো রাষ্ট্রীয় আইনের নামে। তবে প্রাচীন যুগেও সমাজে ধর্ষকের মন তৈরি হওয়ার যেমন বস্তুগত উপাদান বিদ্যমান ছিল তেমনি বর্তমানেও তা ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে বিদ্যমান ।

যুগ পরিবর্তন হয়েছে। এই যুগে এসে নারী-পুরুষের সম্পর্কের ধরনে অনেক পরিবর্তন এসেছে সত্যি তবে স্থান ভেদে এর পার্থক্যও আছে। তবে সকল সমাজেই এখনো নারীরা নানাভাবেই পুরুষের দ্বারা নিগৃহিত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত হয়ে আসছে।

বাংলাদেশ 'যাত্রী কল্যাণ সমিতি' নামে একটি প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট অনুযায়ী গত ১৩ মাসে গণপরিবহণে ২১ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের পর্যালোচনা করে তৈরি করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গণপরিবহনের চালক-হেলপারসহ সহযোগীরা মিলে ৯টি গণধর্ষণ, ৮টি ধর্ষণ ও ৪টি শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটিয়েছে। এসব ঘটনায় মোট ৫৫ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। প্রতিটি ঘটনায় মামলা হলেও গত ৯ই এপ্রিল মানিকগঞ্জে সংগঠিত গণধর্ষণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।

২০১৭ সালের ২১শে জানুয়ারি রাজধানীর দারুসসালামে চলন্ত বাসে যৌন হয়রানির অভিযোগে গাবতলী-নবীনগর রুটের বাস চালক ও সহকারীর বিরুদ্ধে মামলা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। ওই ঘটনায় পুলিশ গাড়ির চালক ও তার সহকারীকে গ্রেফতার করে।

ওই বছরের ১০ই ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ভালুকায় বাসে আটকে রেখে ১৩ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠে চালকের সহকারীর বিরুদ্ধে। পরে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। ১৩ই মার্চ ইজিবাইকে করে চুয়াডাঙ্গা শহর থেকে আলমডাঙ্গায় ফিরছিল এক স্কুলছাত্রী। ভাড়া মেটাতে না পারার কারণে চালক তাকে ফাঁদে ফেলে আরো তিনজনসহ ধর্ষণ করে।

২০১৭ সালের ২৫শে এপ্রিল খিলগাঁওয়ে এক গৃহবধূকে মাইক্রোবাসে যৌন নির্যাতনের পর ওই মাইক্রোবাসে চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। ১৯শে এপ্রিল ঢাকা থেকে জামালপুরগামী ট্রেনে বখাটেদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হন এক নারী। একই বছরের ২৭শে অক্টোবর চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত থেকে নগরীর বহদ্ধারহাটে যাওয়ার পথে চলন্ত বাসে তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে চালক ও তার সহকারীর বিরুদ্ধে। পরে তরুণী থানায় মামলা করলে পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করে।

গত ২২শে জানুয়ারি কলকাতা-ঢাকা মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনে নদীয়ার রেল স্টেশনে বাংলাদেশি এক নারীযাত্রী শ্লীলতাহানির শিকার হন। এই বিষয়ে ওই নারীর স্বামী জিআরপির সংশ্লিষ্ট শাখায় অভিযোগ করেন। চলতি বছরের ১০ই ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ভালুকায় বাসে আটকে রেখে ১৩ বছরের এক কিশোরী পোশাককর্মীকে ধর্ষণ করে বাসের হেলপার হাফিজুল ইসলাম। পরে পুলিশ অভিযুক্ত হেলপারকে আটক করে।

২৫শে আগস্ট ২০১৭ তারিখে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে ছোঁয়া পরিবহনের একটি বাসে এক তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় গত ১২ই জানুয়ারি টাঙ্গাইলের একটি আদালত চার জনের মৃত্যুদণ্ড এবং এক জনের কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন।

গত ১৬ই এপ্রিল ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেন তার সাথে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির কথা।

সেখানে তিনি লিখেন, আব্দুল্লাহপুর থেকে রামপুরা আসার জন্য বাসে উঠেছিলাম ৬.৩০ এ। বাসে দুজন কন্ডাক্টরের একজন মনে হয় মদ্যপ অবস্থায় ছিল। বাসে তখন অনেক ভিড় ছিল, তবে রামপুরা আসতে আসতে প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। পিছনের দিকে কয়েকজন ছেলে বসেছিল আর সামনের দিকে আমি আর আম্মু। বাসের লাইটগুলো বনশ্রীতে এসে বন্ধ করে দেয় ড্রাইভার। কারণ হিসেবে বলেন, হেডলাইট নষ্ট এজন্য বন্ধ করেছে লাইট। আগামীকাল সকালে পরীক্ষা, হাতে একদম সময় নেই বলে কেউ এটা নিয়ে ঝামেলা করিনি।

রামপুরায় পৌঁছে গেলে বাস জ্যামে পড়ে আর আমরা নামার জন্য দরজার দিকে যেতে থাকি। আম্মু প্রথমে নামে। আমি দরজা পর্যন্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন আমার হাত চেপে ধরে, আম্মু ততক্ষণে নেমে গিয়েছে। আমি নামার চেষ্টা করি। কিন্তু বাস সামনের দিকে যেতে থাকে আর পিছনে কয়েকজন বলছিল, ‘মাইয়াটারে ধর’।

কী করব বোঝার মতো সময় ছিল না। অন্য হাতে একটা স্টিলের টিফিন বক্স ছিল ঐটা দিয়ে লোকটাকে বারি মারলাম। কতটা লেগেছিল জানি না। কিন্তু আমাকে ধরে রাখা হাতটার শক্তি কমে গেল। ধাক্কা দিলাম লোকটাকে, বাস থেকে লাফ দিলাম। আমার ভাগ্য ভালো ছিল যে, বাস আস্তে যাচ্ছিল আর মধুবনের সামনে জ্যাম ছিল। নেমে পিছনে দৌড় দিলাম।

দূর থেকে আম্মুকে দেখতে পেলাম, আমাকেই খুঁজছে। জানতাম যে, রাস্তায় একা বের হলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে তবে আজকে জানলাম মায়ের সঙ্গে বের হয়েও আমি নিরাপদ না। কালকের খবরের কাগজে আমিও হয়তো একটা কলাম হয়ে যেতাম। আমার রক্ত মাংসের শরীরটার জন্য। কিছু জানোয়ারের জন্য। যে দেশে একটা মেয়ে তার মায়ের সঙ্গেও সুরক্ষিত নয়, সেই দেশ আর যাই হোক স্বাধীন নয়।

এগুলা ছিল গত বছরের কিছু আলোচিত ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনার উদাহরণ।

এছাড়া আলোচিত এ সব ঘটনা ছাড়াও বছরজুড়েই দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তুলনামূলক এক অপরাধ পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত চার বছরের তুলনায় ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটেছে। আর ধর্ষণের ঘটনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন থানায় প্রায় চার হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনায় সারা দেশে মামলা দায়ের হয়েছিল ৩ হাজার ৬ শত ৫০টি। ২০১৪ সালে ধর্ষণের ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছিল ৩ হাজার ৬শত ৩৫টি।

২০১৫ সালে ধর্ষণ মামলা দায়ের হয়েছিল ৩ হাজার ৯শত ৩০টি, ২০১৬ সালে তা হয়েছিল ৩ হাজার ৭শত ২৮টি। আর ২০১৭ সালে সারা দেশে ধর্ষণ মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৯শত ৯৫টি।

চার বছরে বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনায় মোট মামলা দায়ের করা হয়েছে ১৮ হাজার ৯শত ৯৮টি। অর্থাৎ এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৭ সালে গত চার বছরে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ও মামলা দায়ের করা হয়েছে।

আর বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক জরিপ থেকে দেখা গেছে, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৬৯ জন। গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২২৪ জন এবং ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয়েছে ৫৮ জনকে। আর ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১৮০ জন নারীকে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, নির্যাতনের ধরণ আর পরিমাণ বিচার করলে তা দিনদিন ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলেছে। তারমধ্যে অন্যতম হলো গণপরিবহনের নারীদের ধর্ষণ, যা দিন দিন ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করতেছে। আমাদের সকলকে একত্রিত হয়ে এই সমস্যা রুখে দাঁড়াতে হবে। আর তার জন্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা থাকতে হবে।

উপরের যে পরিসংখ্যানের তথ্য আমরা দেখতে পাচ্ছি তা আমাদের আতঙ্কিত করে। গণপরিবহন এখন নারীদের জন্য অনিরাপদ এই বার্তা দিচ্ছে। সড়কের নৈরাজ্যের একটা চিত্র গণপরিবহনে নারীদের ওপর অত্যাচার। জীবনটা যেন আজ পরিবহন শ্রমিকদের হাতে জিম্মি। প্রতিটি গণপরিবহনে যেন নির্যাতিত নারীর নির্যাতনের ছাপ। পরিবহন থেকে যেন নির্যাতিত নারীর চিৎকার শোনা যাচ্ছে। পরিবহন শ্রমিকরা কতটা ভয়ংকার হয়ে উঠেছে তারই চিত্র ফুটে উঠেছে  এই পরিসংখ্যানে।গণপরিবহনের নৈরাজ্যের পাশাপাশি যদি পরিবহন শ্রমিকদের লাগাম টেনে ধরা না যায় তাহলে ভবিষাতে পরিবহন থেকে নির্যাতিত নারীদের চিৎকার কমবে না।

Bootstrap Image Preview