Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২০ বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বার ২০১৮ | ৫ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

প্রশিক্ষণের পাশাপাশি চালকদের মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণ দরকার

আল আমিন হুসাইন
রিপোর্টার
প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:৫৪ AM আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:৩৫ AM

bdmorning Image Preview


নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর সরকার ও পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়। কিন্তু এরপরও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরেনি, কমেনি সড়ক দুর্ঘটনা। কেন সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হচ্ছে না। কেন সড়ক দুর্ঘটনার হার কমানো সম্ভব হচ্ছে না। সড়কের নৈরাজ্য থামাতে করণীয় কী এসব বিষয় নিয়ে বিডিমর্নিংকে একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের(বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের(এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। তাঁর সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আল-আমিন হুসাইন

বিডিমর্নিং: নিরাপদ সড়কের দাবিতে করা আন্দোলনের আগে ও পরে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যাগত ও ধরণগত পার্থক্যটাকে কীভাবে দেখছেন?

মিজানুর রহমান ১৯৯৬ সালে বুয়েট থেকে পুরকৌশল বিভাগ (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং) থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শেষে একই বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৪ সালে জাপানের ইয়োকোহামা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর পিএইচডি থিসিসের বিষয় ছিল ‘ট্রাফিক ফ্লো থিওরি’।২০১৮ সাল থেকে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের(এআরআই) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এছাড়া তিনি প্রকৌশল পেশাজীবীদের জাতীয় সংগঠন ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার বাংলাদেশ (আইইবি)এর পুরকৌশল বিভাগের  নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

মিজানুর রহমান: সংখ্যাগত দুর্ঘটনা আসলে খুব একটা পরিলক্ষিত হয়নি। কারণ নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের পরপরই কিন্তু ঈদুল আযহা শুরু হয়েছে। আমরা সবাই জানি যে, ঈদের আগে ও পরে সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। সেই কারণে হয়তো পরিমাণগত কোন পার্থক্য আমরা লক্ষ্য করিনি। কিন্তু ধরণগত কিছু পার্থক্য দেখা গেছে। আগে পথচারীকে আঘাত করে যে দুর্ঘটনার সংখ্যা সেটা আন্দোলনের পর কিছুটা কমেছে। এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে যে যারা পথচারী তাদের মধ্যে কিছুটা সচেতনতা তৈরি হয়েছে। আর অন্য যেগুলো যেমন বাস থেকে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে সেগুলোকে আসলে কোন দুর্ঘটনা  বলা যায় না। সেগুলো আসলে ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এগুলো কিন্তু দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করলে তার যে শাস্তি পাওয়া উচিত সেটা হবে না। এটাকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

বিডিমর্নিং: নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পরেই হঠাৎ করে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ার পিছনে কী কারণ?

মিজানুর রহমান: হঠাৎ করে কেন দুর্ঘটনার বৃদ্ধি পাচ্ছে সেটার কারণ বের করা কিন্তু কষ্টকর। একটা কারণ হতে পারে যেটা ঈদের সময়। যেহেতু এই সময়ে বছরের অন্য সময়ের তুলনায় দুর্ঘটনার হার একটু বেশি থাকে।সেটা একটি কারণ হতে পারে।আসলেই কী হঠাৎ দুর্ঘটনা বাড়লো কী না সেটা হয়তো ঈদের পরের ১৫/২০ পর্যবেক্ষণ করে সুনিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হবে।

বিডিমর্নিং: দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে বাস মালিকদের কোন গাফিলতি আছে কী না ?

মিজানুর রহমান: বাস-মালিকদের তো কিছু দায়দায়িত্ব রয়েছেই। বিশেষ করে ঢাকা শহরে যেসব দুর্ঘটনা ঘটে থাকে এখানে পরোক্ষভাবে বাস মালিকরাই অনেকাংশে দায়ী। কারণ তারা কিন্তু বাস চালকদের কাছে চুক্তিভিত্তিক ছেড়ে দেয়। যার ফলে ওই চালকের মধ্যে একটা মনোভাব থাকে যে সবসময় আগে তাকে চুক্তির টাকাটা তুলতে হবে। এরপর যদি বেশি যাত্রী নিতে পারে তাহলে চালকের এবং তার যে সহকারী থাকে তার আয়ের সংস্থান কিন্তু সেখান থেকে আসবে। এরফলে তার(চালকের)মধ্যে সবসময় একটা প্রতিযোগীতার মনোভাব থাকে এবং সেই প্রতিযোগিতার মনোভাবের কারণে তার মধ্যে(চালকের) বেপরোয়াভাব চলে আসে এবং সেখান থেকেই অনেকসময় দুর্ঘটনা ঘটে।

বিডিমর্নিং: শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরে সরকার, পরিবহন মালিক সংগঠন থেকে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে অনেক কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এরপরও সড়কে শৃঙ্খলা কেন ফিরছে না, দুর্ঘটনা কেন কমছে না?

মিজানুর রহমান: আসলে পরিবহন সেক্টরে যে নৈরাজ্য, যে বিশৃঙ্খলা সেটাতো একদিনে তৈরি হয়নি।এজন্য পদক্ষেপ নেয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু সেই পদক্ষেপ নেয়ার ফলে যে ফলাফল সেটা যে পরেরদিন থেকেই দেখতে পাবো এরকম আশা করাও আবার ঠিক না। আমাদের একটু সময় দিতে হবে।কারণ যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তার ফলাফল হয়তো কিছুদিন পর থেকে লক্ষ্য করা যাবে।কারণ পরিবহন সেক্টরের নৈরাজ্যের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে এগুলো নিরসনে একটু সময় লাগে।কাজেই এ সকল পদক্ষেপের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে শৃঙ্খলা ফিরবে। আবার সব পদক্ষেপই যে কার্যকর হবে এমন কিন্তু না। ঢাকা শহরে গণপরিবহনের অপ্রতূলতা কিন্তু রয়ে গেছে। কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) তিনটি এমআরটি ও তিনটি বিআরটি লাইনের কথা উল্লেখ করা আছে। সেগুলোর কাজও কিন্তু চলছে। যখন এমআরটি লাইনটির কাজ শেষ হবে। তখন কিন্তু গণপরিবহনের জায়গায়  শৃঙ্খলা চলে আসবে।

বিডিমর্নিং: কুষ্টিয়ায় বাসের ধাক্কায় মায়ের কোল থেকে পড়ে নিহত শিশু আকিফা, বাসে উঠতে গিয়ে আহত হলে নদীতে ফেলে দিয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পায়েলকে হত্যা, চট্টগ্রামে ভাড়া নিয়ে বাকবিতণ্ডার জেরে রেজাউল করিম রনি নামে এক যুবককে বাস থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে হত্যা, ধাক্কা দেয়ার প্রতিবাদ করায় চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার বদ্দরহাট এলাকায় শরীর ওপর দিয়ে ট্রাক উঠিয়ে আমানুল্লাহ নামে এক বেকারী কর্মীকে হত্যা। এছাড়া নারী যাত্রীদের যৌন হয়রানি ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটাতে পিছু হটছে না পরিবহন শ্রমিকরা। তারা এতটা ভয়ংকার হয়ে উঠছে কেন বলে আপনার মনে হয়?

মিজানুর রহমান: কুষ্টিয়া, চট্টগ্রামের ঘটনাগুলো খুবই ভয়াবহ। আমাদের গাঁ শিহরে উঠে। কারণ সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে তো এই ধরনের ঘটনা ঘটানো সম্ভব না।পরিবহন শ্রমিক যারা রয়েছে তাদের আসলে যে মনস্তাত্বিক দিকগুলো রয়েছে সেগুলো নিয়ে আমাদের কাজ করার সময় এসেছে। অনেক সময় দেখা যায় যে, তারা কিন্তু সমাজের অবহেলিত অংশ বলে তারা নিজেরা মনে করে এবং সাধারণ মানুষের সাথে তাদের সম্পর্ক তেমন সুখকর হয় না। আমাদের এই মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আমার মনে হয় যে তাদের(পরিবহন শ্রমিকদের) যে মানসিক অসঙ্গতি রয়েছে সেগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। অনেক সংগঠন আসলে তাদের নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু আমার মনে হয় আরও ব্যাপকহারে তাদের এই মনস্তাতাত্বিক বিষয় নিয়ে তাদের মেন্টরিং(পরামর্শ) করতে হবে। সমাজের যারা দায়িত্বশীল ব্যক্তি আছেন যেমন আমাদের বিভিন্ন নামকরা খেলোয়াড়, বড় বড় সাংবাদিক, বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব বা সিনেমার যারা নায়ক-নায়িকা রয়েছে তাদেরকে দিয়ে মোটিভেশনাল স্পিস দিয়ে তাদের মনস্তাত্বিক বিষয় নিয়ে কাজ করার সময় এসেছে। তা না হলে পরিবহন শ্রমিকদের এই ধরনের ঘটনা বন্ধ হবে না।

বিডিমর্নিং: মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, ও রাজনৈতিক  নেতা ও তাঁদের আত্মীয়রাই পরিবহন খাতকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এটা চালক, হেলপারদের বেপরোয়া হয়ে উঠার পিছনে কোন কারণ কী না?

মিজানুর রহমান: কিছুটা হয়তো কারণ থাকতে পারে। যখন ক্ষমতাসীন যারা বা যাদের  প্রভাব প্রতিপত্তি আছে তাদের সংস্পর্শে যখন তারা (পরিবহন শ্রমিকরা) থাকেন তখন কিন্তু তাদের আচার-আচরণ একটু বেপরোয়া হয়ে যেতে পারে। এর বাইরে আরও একটি কারণ আছে। যখন তারা কোন অন্যায় করছে সেই অন্যায়ের যদি যথাযথ বিচার না হয় এবং দৃষ্টান্তমূলক কোন শাস্তি যদি তাদের সামনে না থাকে। তখন কিন্তু তারা অনৈতিক কাজ বা বেপরোয়া মনোভাব তাদের মধ্যে গড়ে উঠতে পারে।

বিডিমর্নিং: বেপরোয়াভাবে বা অবহেলা করে গাড়ি চালানোর কারণে কেউ আহত বা নিহত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড এবং সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করে সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া অনুমোদন করা হয়েছে। দুর্ঘটনা কমাতে এই শাস্তি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে  মনে করেন?

মিজানুর রহমান: আসলে একজন চালক ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে মেরে ফেললো কিনা সেটা প্রমাণ করা দুরূহ। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যেখানে এমন আইন আছে সেখানে কিন্তু ইচ্ছাকৃত মেরে ফেললো কী না এমন শর্ত থাকে না। সেখানে এমন থাকে যে কেউ যদি বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালায় বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে গাড়ি চালানোর কারণে কেউ যদি নিহত হয়। তখন তার জন্য কী সাজা হবে সেটা উল্লেখ আছে। যুক্তরাজ্যে চালকের ১৪ বছরের সর্ব্বোচ সাজা নির্ধারিত আছে যদি দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হয়। এখানে একটি জিনিস খেয়াল করতে হবে উন্নত দেশগুলোতে রোড ইনভায়রনমেন্ট সিচুয়েশন(গণপরিবহন চলা রাস্তার অবস্থা) আর আমাদের দেশের রোড ইনভায়রনমেন্ট সিচুয়েশন কিন্তু এক রকম না। বাংলাদেশের  সড়ক-মহাসড়কে চালকরা গাড়ি চালাচ্ছেন কিন্তু সেখানে দেখা যায় হঠাৎ করে একজন দৌঁড় দিয়ে রাস্তা পার হতে পারে। এই ক্ষেত্রে কিন্তু অনেক সময় চালক তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।

সর্ব্বোচ শাস্তি বাড়ানো যায় সেটা মৃত্যুদণ্ডও দিতে পারেন। কিন্তু চালককেও কিন্তু গাড়ি চালানোর মতো পরিবেশ দিতে হবে। এখন যদি পরিবেশটাই এমন থাকে যে যেকোন মূর্হুতে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাহলে তখন এত কঠোর সাজার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আগে পরিবেশটাই এমন করতে হবে যেন দুর্ঘটনার কোন সম্ভাবনা না থাকে।এরপরও যদি কেউ দুর্ঘটনা ঘটায় তখন সর্ব্বোচ শাস্তি দেয়া যেতে পারে। এখানে দুটোই একটি অপরটির পরিপূরক।কাজেই দুটো নিয়ে কাজ করতে হবে।কাজেই সাজা বাড়িয়েই কেবল সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়।

বিডিমর্নিং: একটা শহরের মেরুদণ্ড বলা হয় সেখানকার গণপরিবহনকে। কিন্তু ঢাকা শহর বা বড় বড় শহরে দেখা যায় গণপরিবহনেই বেশি নৈরাজ্য। এটা কমাতে কী উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে?

মিজানুর রহমান: ঢাকা শহর কিন্তু খুব একটা বড় শহর নয়। কিন্তু সেখানে দেখা যায় যে, ২৭৯টি রুট রয়েছে। ঢাকা শহরের মতো এতটা ছোট শহরে এতগুলো রুট থাকার যৌক্তিকতা নেই।এইক্ষেত্রে যদি ঢাকা শহরকে ৪/৫টা রুটে ভাগ করে সেখানে বিদ্যামান যে বাসগুলো আছে সেগুলোকে একটা কোম্পানির আদলে নিয়ে আসতে পারি। তাহলে কিন্তু গণপরিবহন ব্যবস্থায় অনেকটা শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। আর সেখানে চালকদের মাসিক বেতনে নিয়োগ দিতে হবে। তাহলে কিন্তু তাদের মধ্যে অতিরিক্ত যাত্রী উঠানোর যে মনোভাব সেটা আর থাকবে না।

আর যখন আমরা কোম্পানির আদলে নিয়ে আসবো তখন দেখা যাবে। এখন একটি বাস প্রতিদিন ৫০০ করে যাত্রী বহন করতে পারে। কিন্তু কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসবেন সেখানে কিন্তু যাত্রী বহনের সংখ্য বাড়ানো সম্ভব। তখন ৮০০ থেকে ১০০০ এমনকি ১২০০ পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করানো যাবে। মুম্বাই শহর ঢাকা শহরের মতো জনবহুল শহর। সেখানে কিন্তু যে বাস কোম্পানি করার কারণে প্রতিটি বাস ১৩৩০ জন করে যাত্রী বহন করে। ঢাকা শহরেও সেটা ১০০০/১২০০ করতে পারবে। এটা যদি আমরা করতে পারি তাহলে এখন প্রতিদিন ঢাকা শহরে যে ৬ হাজার বাস রয়েছে। সেখান থেকে ৩০ লাখ যাত্রী বহন করতে পারি। সেখান থেকে কিন্তু ৫০ থেকে ৬০ লাখ করা যাবে। তাহলে পরিববহন ব্যবস্থায় যাত্রীদের যে হয়রানি সেটা কিন্তু অনেকাংশে কমে যাবে। এর সাথে আমাদের মাস র‌্যাপিড ট্র্যানজিট বিআরটি এবং এমআরটি নির্মাণ কাজ শেষ হলে গণপরিবহন ব্যবস্থায় অনেকটা শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

বিডিমর্নিং: বিআরটি এবং এমআরটি বিষয় দুটো একটু ব্যাখ্যা করবেন।

মিজানুর রহমান: এমআরটি হলো মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট। যেটা হলো ট্রেন। এখানে একই সময়ে অনেক যাত্রী বহন করতে পারা যায়। একটি বাসে ৫০ জন যাত্রী যদি দাঁড়িয়েও নেয়া হয় তাহলে ১০০ জন বহন করা সম্ভব হচ্ছে। অপরদিকে কোন বাধা ছাড়ায় কিন্তু ট্রেনে কয়েক হাজার যাত্রী বহন করতে পারছেন। একই সাথে কিন্তু সময়তো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছাতে পারেন। সেটা কিন্তু এমআরটি বা ট্রেন ব্যবস্থায় সম্ভব।

আর বিআরটি ক্ষেত্রে যদি বাসের জন্য আলাদা একটা লেন তৈরি করা যায়। তখনও কিন্তু ট্রেনের মতো হয়ে যাবে। সেই লেনে শুধু বাস চলবে অন্য কোনো যানবাহন সেখানে আসতে পারবে না। তখন ওই বাসের যাত্রী বহনও বাড়ানো যাবে। কারণ তখন বাস কোন বাধা ছাড়ায় ছেড়ে যাচ্ছে। ফলে আগের চেয়ে বেশি ট্রিপ দিতে পারবে। একটি বাস দিয়েই অধিক সংখ্যক যাত্রী কিন্তু বহন করা সম্ভব হবে।

 

ছবি: আবু সুফিয়ান জুয়েল

বিডিমর্নিং: টিআইবির খানা জরিপ-২০১৮ বলছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) দুর্নীতির তালিকায় আছে। এটা কী পরিবহন ব্যবস্থায় নৈরাজ্য তৈরিতে ভূমিকা রাখছে ?

মিজানুর রহমান: বিআরটিএ যেহেতু চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া, গাড়ির ফিটনেস দেয়া এবং গাড়ির রেজিস্টেশন দেয়া এসব দায়িত্ব যেহেতু তাদের। সে কারণে যদি কারণে নিয়মের ব্যতায় ঘটে থাকে। কেউ যদি ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেসবিহিন গাড়িও যদি ফিটনেস করিয়ে আনতে পারে। তাহলে এর দায়-দায়িত্ব বিআরটিএ কে নিতে হবে। প্রায় কিন্তু আমরা বিআরটিএর বিরুদ্ধে অভিযোগ ‍শুনে থাকি। বিআরটিএ যেসব কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থেকে থাকে। তাহলে সেগুলো তদন্ত করে তাদের ‍বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। বিআরটিএ যে কিছু ব্যতায় ঘটছে সেটা আমরা রাস্তায় অনেক ফিটনেসবিহিন গাড়ি দেখলে বুঝতে পারি। বিআরটিএ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১২/১৩ লাখ গাড়ি থাকলেও চালকদের লাইসেন্স নেই। কোন গাড়ি যখন রেজিট্রেশন করা হচ্ছে তার বিপরীত চালকের লাইসেন্স আছে কী না। এটা বিআরটিএ কে বুঝতে হবে। প্রয়োজনে কিছুদিন রেজিস্ট্রেশন বন্ধ রেখে চালক তৈরি করে রেজিস্ট্রেশন চালু করতে পারতো বিআরটিএ। আমাদের এখন গাড়ির সংখ্যা এবং চালকের সংখ্যার মধ্যে ব্যাপক ফারাক তৈরি হয়েছে যে বোঝায় যাচ্ছে যে লাইসেন্সবিহিন অনেক চালক রয়েছে এবং তারা কিন্তু গাড়িও চালাচ্ছে। যারা গাড়ি চালাচ্ছেন তাদেরকে কিছু প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়ম অনুযায়ী লাইসেন্স প্রদান করে এই সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব।

বিডিমর্নিং: বর্তমান মোটরযান আইনের বিষয়ে কী বলবেন?

মিজানুর রহমান: আমাদের যে মোটরযান আইন আছে সেটা কিন্তু অনেক ভালো। কিন্তু বিষয় হলো সেটা কতটুকু মানা হচ্ছে। কারণ আমরা দেখি অনেক সময়ে অনেকে বিআরটিএতে না গিয়েও লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে। তাহলে তো বৈধ চালক হওয়া সত্বেও তারা অনেক সময় বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে। যত চাপই থাকুক নিয়ম অনুযায়ী লাইসেন্স দেয়া উচিত এবং আমাদেরও যদি অনেক সময় প্রভাব থাকে তাহলে বিআরইটিএ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাপ দেয় লাইসেন্স দেয়ার জন্য। কাজেই আমাদেরও কিন্তু অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।

বিডিমর্নিং: ডিএমপি কমিশনার লেগুনা বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন, ১২১ জায়গায় বাস থামানোর নির্দেশ দিয়েছেন এগুলো কতটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে এবং করা সঠিক হবে বলে মনে করেন।

মিজানুর রহমান: লেগুনার রুট পারমিট কিন্তু ঢাকা শহরের প্রধান সড়কে নেই। কিন্তু এতোদিন তারা সেই সড়কগুলোতে চলছিল। ফলে সেটা আসলে অনেকটা আইনের বাইরেই তারা চলছিল। এতোদিন যেহেতু নিয়মের বাইরে ছিল এখন নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। ফলে যারা ব্যবহার করতো তারা সাময়িক অসুবিধায় পড়েছে। পাশাপাশি কিন্তু যাত্রীদের অভিযোগ ছিল যারা লেগুনা চালায় তাদের বয়স কম, লাইসেন্স নাই, বিপদজনকভাবে ড্রাইভিং করে এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ফলে এটা সাময়িক ভোগান্তি হলেও ভালো কিছুর জন্য হয়তো সহ্য করতে হবে। একই সাথে লেগুনার বিকল্প ব্যবস্থাও কিন্তু করতে হবে। আর বাস থামানোর ক্ষেত্রে ১২১ জায়গায় স্টপেজ ভালো সিদ্ধান্ত। আগে যদি চালকদের বলা হতো যত্রতত্র বাস থামানোয় জরিমানা করা হতো। তখন কিন্তু তার প্রশ্ন ছিল তাহলে কোথায় বাস থামাবো। এখন যেহেতু নিদিষ্ট করা হবে সেটা তাহলে ভালোভাবে দেখা যায়। একই সাথে যাত্রীদেরও নিদিষ্ট জায়গায় গিয়ে বাস থামলে উঠতে হবে। এটা সড়কের নিরাপত্তার দিক থেকেও যথার্থ মনে করি।

বিডিমর্নিং: সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত?

মিজানুর রহমান: সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার সাথে যে বা যারাই জড়িত আছে তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করা। গাড়ির মালিকদের লক্ষ্য রাখতে হবে গাড়িটি পরিপূর্ণ ফিট কী না। যে চালকের কাছে গাড়ি দিচ্ছেন তার বৈধ লাইসেন্স আছে কী না, সে মানসিকভাবে গাড়ি চালাতে প্রস্তুত কিনা এসব বিষয় খেয়াল করতে হবে। পাশাপাশি যারা চালক আছে তাদের দায়িত্ব নিয়ে, সতর্ক থেকে গাড়ি চালাতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় যে, মালিক তাদেরকে ৫/৬ ঘণ্টা বা তার বেশি গাড়ি চালাতে বাধ্য করে মালিকরা। সেই জন্য পরিবহন মালিকরা যেন তাদের বাধ্য করতে না পারে সেটা প্রশাসনকে দেখতে হবে। সড়কের নৈরাজ্য ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা-রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়াতে হবে। এরপরে আমরা যারা যাত্রী আছি আমাদেরও সতর্ক হতে হবে। নিদিষ্ট জায়গা থেকে বাসে উঠতে হবে, নিদিষ্টি জায়গায় নামতে হবে।

একই সাথে ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলতে হবে। যেখান দিয়ে রাস্তা পার হওয়ার কথা। জেব্রা ক্রসিং বা ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করতে হবে। যারা সড়কের নকশা করেন তাদের যথার্থভাবে সড়ক ডিজাইন করতে হবে। তাদের ক্রুটির কারণে যেন দুর্ঘটনা না ঘটে। যারা সড়ক তৈরি করে বা তৈরির সময় তদারকি করে তাদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আইনের যথাযথ নিরপেক্ষ প্রয়োগ করতে হবে। এর বাইরে দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকা রয়েছে যেগুলোকে ‘ব্লাক স্পট’ বলা হয় সে সব জায়গায় দুর্ঘটনা কমাতে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা সবসময় রিঅ্যাকটিভ অ্যাকশানে যায় অর্থ্যৎ যখন কোন বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটে, যখন সেটা নিয়ে সবাই হৈচৈ করে তখন আমরা কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করি। আমাদেরকে এই ধরনের অ্যাকশানে না গিয়ে প্রো-অ্যাকটিভ অ্যাকশানে যেতে হবে। কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে, কোথায় কোথায় ঘটছে, কারণগুলো নিরসন করার জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি রয়েছে। সেগুলো আগে থেকেই নিতে হবে।

Bootstrap Image Preview