Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৩ রবিবার, সেপ্টেম্বার ২০১৮ | ৭ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

‘স্বপ্ন বেঁচে থাক’ সাংবাদিকতার বাতিঘর

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০১৮, ০৩:০১ PM আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০১৮, ০৩:০১ PM

bdmorning Image Preview


আল-আমিন হুসাইন।।

কারো কাছে তিনি ছিলেন শিক্ষক, কারো কাছে শ্রদ্ধেয় ভাই, কারো কাছে পিতৃতুল্য পথপ্রদর্শক। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের বিকাশের পিছনে তাঁর মেধা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার মধ্যে দিয়ে তিনি হয়ে উঠেন সাংবাদিকতার বাতিঘর। তাঁর হাত ধরেই সাংবাদিকতা জগতে পদাপর্ণ হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকা ও টেলিভিশন মাধ্যমে নিয়োজিত প্রায় পাঁচ শতাধিক সাংবাদিকের। যারা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে বাতিঘরের দেখানো পথেই দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছেন।

সংবাদপত্রকে ক্ষুদ্র অবস্থা থেকে আজকের শিল্প পর্যায়ে নেওয়ার পিছনে তার অবদান অনেক। সংবাদপত্র তাঁর হাতেই পেয়েছে নতুন নতুন সাজ। তিনিই প্রথম দেশে প্রতিদিন রঙিন খেলার পাতা, বিনোদন পাতা,ফিচার প্রকাশ করার রীতি প্রবর্তন করে দৈনিক পত্রিকার চেনা অবয়বকে পাল্টে দেন।

সাংবাদিকতাকে পেশা ও সংবাদপত্রকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে অর্ধশতত বছরদেশের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার জন্য কাজ করা সাংবাদিকতার এই বাতিঘর চিরদিনের জন্য নিভে গেলেন।

তিনিই প্রথম এদেশে প্রতিদিন রঙিন খেলার পাতা, বিনোদন পাতা, নানা স্বাদের গুচ্ছ গুচ্ছ ফিচার প্রকাশ করার রীতি প্রবর্তন করে দৈনিক পত্রিকার চেনা অবয়বকে পাল্টে দিয়েছেন।

৭৫ বছর বয়সী গোলাম সারওয়ার গতকাল সোমবার  রাত ৯টা ২৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে শেষ মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে সফল সাংবাদিকতা জীবনের সমাপ্তি ঘটালেন দেশবরেণ্য সাংবাদিক, সম্পাদক পরিষদের সভাপতি এবং প্রেস ইনস্টিটিউটের (পিআইবি) চেয়ারম্যান গোলাম সারওয়ার। নিভে গেল এদেশের সাংবাদিকতার উজ্জ্বল বাতিঘর। তাঁর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশের সাংবাদিক, সংবাদপত্র ও মিডিয়া জগতে কর্মরত সবার মাঝে। সাংবাদিকতার একজন অভিভাবককে হারিয়ে শোকে বিহ্বল সাংবাদিক মহল।

দেশবরেণ্য সাংবাদিক গোলাম সারওয়ারের জন্ম বরিশাল জেলার বানারীপাড়া উপজেলায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। ১৯৪৩ সালের ১লা এপ্রিল জন্ম নেয়া গোলাম সারওয়ার ছিলেন বাবা মরহুম গোলাম কুদ্দুস মোল্লা ও মা মরহুম সিতারা বেগম দম্পতির জ্যেষ্ঠ সন্তান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্রাবস্থায় ১৯৬২ সালে চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদীর বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা হিসেবে তার সাংবাদিকতা পেশার সূচনা। বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্মানসহ এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর সাংবাদিকতার জীবন শুরু হয় ১৯৬৩ সালে দৈনিক পয়গম দিয়ে। তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।মুক্তিযুদ্ধের পর বানারীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনে কিছুদিন প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োজিত ছিলেন।

সত্তর দশকের মাঝামাঝিতে চলচ্চিত্রের সোনালী সময়ে ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনায় সাপ্তাহিক পূর্বাণী নামে একটি রঙিন সাময়িকী প্রকাশিত হতো। দীর্ঘদিন চলচ্চিত্র বিষয়ক ওই সাময়িকীর নির্বাহী সম্পাদকে দায়িত্ব পালন করেন গোলাম সারওয়ার। এ দেশের চলচ্চিত্রকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলতে চিত্রালী ও পুর্বাণী পত্রিকা ওই সময় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। চলচ্চিত্র সাংবাদিকদের সংগঠন ‘বাচসাস’-এর সাধারণ সম্পাদকও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।

দেশের সংবাদপত্রশিল্পে আশির দশকে সাহিত্য সমৃদ্ধ ঈদসংখ্যা প্রকাশের রেওয়াজ শুরু হয়। সাপ্তাহিক পূর্বাণীতে প্রথম ম্যাগাজিন আকারে বৃহদায়তনের ঈদসংখ্যা তারই সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল।

১৯৭৩ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। ইত্তেফাকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত প্রধান সহসম্পাদক, যুগ্ম বার্তা সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদক পদে কর্মরত ছিলেন। ইত্তেফাকে দীর্ঘ দুই যুগ কর্মরত থাকার পর ১৯৯৯ সালে দৈনিক যুগান্তরের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন দৈনিক সমকাল। আমৃত্যু তিনি দৈনিক সমকালের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। দেশের দুটি দুটি সেরা দৈনিক 'যুগান্তর' ও 'সমকাল'-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে নজিরবিহীন সাফল্য অর্জন করেন।

২০১৪ সালে বাংলাদেশ সরকার দেশের সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদকে ভূষিত করে। এছাড়া তিনি ২০১৬ সালে কালচারাল জার্নালিস্টস ফোরাম অব বাংলাদেশ (সিজেএফবি) আজীবন সম্মাননা ও ২০১৭ সালে আতাউস সামাদ স্মারক ট্রাস্ট আজীবন সম্মাননা অর্জন করেন। সাংবাদিকতা ছাড়াও তিনি সেন্সর বোর্ডের আপিল বিভাগের সদস্য এবং সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি একাধিকবার জাতীয় প্রেসক্লাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

[caption id="attachment_423891" align="aligncenter" width="545"] সংগৃহীত ছবি[/caption]

সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি অনেকগুলো বই লেখেন। ‘সম্পাদকের জবানবন্দি’, ‘অমিয় গরল’, ‘আমার যত কথা’ ও ‘স্বপ্ন বেঁচে থাক’ নামে তাঁর চারটি প্রবন্ধ সংকলন রয়েছে গোলাম সারওয়ারের। এছাড়া শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় ‘রঙিন বেলুন’ নামে তার একটি ছড়ার বইও। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সংগীত জগতে একসময় তিনি ছিলেন ঘনিষ্ঠ।

সাংবাদিকতার উজ্জ্বল এক নক্ষত্র, সাংবাদিকতা জগতের প্রতিষ্ঠানতুল্য গোলাম সারওয়ার বার্তা কক্ষেই মৃত্যু কামনা করেছিলেন। গত ১ এপ্রিল এই গুণী সাংবাদিকের ৭৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত সম্মাননা গ্রন্থ ‘সুবর্ণ রেখায় বাতিঘর’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

সেই অনুষ্ঠানে গোলাম সারওয়ার বলেছিলেন, আমাকে দেশের মানুষ এত ভালোবাসে সত্যি আগে বুঝিনি। সকলের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। আমার জন্য দোয়া করবেন, আমি যেন আজীবন দেশের উন্নয়নধারায় আমার সাংবাদিকতা পেশাকে আরও বিকশিত করতে পারি।

দেশের সংবাদপত্রের ভিত গড়ে দেয়া তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, সিরাজুদ্দীন হোসেন, বজলুর রহমান, ফয়েজ আহমেদের মতো সাংবাদিকতা জগতে উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন সাংবাদিকতার বাতিঘর গোলাম সারওয়ার। ওপারে ভালো থাকবেন সাংবাদিকতার প্রতিষ্ঠান তুল্য গোলাম সারওয়ার।

Bootstrap Image Preview