Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৬ মঙ্গলবার, অক্টোবার ২০১৮ | ১ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

‘আমি কোথায় হারালে তুমি খুঁজে পাবে’ চোখের জলে চিরবিদায় রাজীব মীর!

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ২২ জুলাই ২০১৮, ০৭:৩৫ PM
আপডেট: ২২ জুলাই ২০১৮, ১১:০৩ PM

bdmorning Image Preview


আল-আমিন হুসাইন:

‘আমি কোথায় হারালে তুমি খুঁজে পাবে’- না, আর খুঁজে পাওয়া যাবে না; হারিয়েই গেলেন। চলে গেলেন না ফেরার দেশে। পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সহকর্মী, প্রিয়জন ও ভক্তদের কাঁদিয়ে চলে গেলেন। চোখের জলে সবাই চিরবিদায় দিলেন চট্টগ্রাম ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের  সাবেক সহযোগী অধ্যাপক কবি, গবেষক, প্রশিক্ষক, কলাম লেখক মীর মোশাররফ হোসেন রাজীবকে।

আজ রবিবার দুপুর ২টার পরে রাজীব মীরের লাশ বহনকারী  অ্যাম্বুলেন্সটি নিরবে এসে পৌঁছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। ততক্ষণে শোকে স্তব্ধ মসজিদ প্রাঙ্গণ। রাজীব মীরকে শেষ বারের মতো এক পলক দেখার জন্য অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সটি মসজিদ প্রাঙ্গণে প্র্রবেশ করলো। ততক্ষণে সবার চোখে নিরব কান্না। বেরিয়ে এলেন কবি। যে কাঁধে একমাত্র মেয়ে বিভোরকে নিয়ে খেলতেন। সেই কাঁধ অন্য কারো উপরে ভর দিয়ে নিথর দেহে বেরিয়ে এলো।

সেখানে তাঁর প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। রাজীব মীরের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সহকর্মী, মিডিয়া ব্যক্তিত্বসহ সর্বস্তরের মানুষ তাঁর জানাজায় অংশ নেয়। প্রিয় ব্যক্তিকে হারিয়ে নিরবে চোখের পানি ফেলতে থাকেন অনেকে।

এরপরই রাজীব মীরের মরদেহ নেয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে। সেখানে আগে থেকেই রাজীব মীরকে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল মঞ্চ।

‘নয়ন ছেড়ে গেলে চলে, এলে সকল মাঝে’ লেখা মঞ্চে সকলের মাঝে রাজীব মীরকে রাখা হয় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। রাজীব মীরের শিক্ষাঙ্গণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অ্যালামনাই ফুল দিয়ে রাজীব মীরকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

রাজীব মীরের শিক্ষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক প্রিয় ছাত্রকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর একে একে শ্রদ্ধা নিবেদন করে আদিবাসী জনগোষ্টীর ফোরাম থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এসময় এক পলক শেষ বারের তরুণ এই কবিকে দেখার জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান উপস্থিত সবাই। শেষ বারের সদা হাস্যোজ্জ্বল রাজীব মীরের নিথরদেহের মুখ দেখে চোখের পারি ধরে রাখতে পারেন নি অনেকে। অনেকে ডুকরে কেঁদেছেন। এসময় রাজীব মীরের স্মৃতিচারণ করে কথা বলেন তাঁর শিক্ষক, সহকর্মীসহ অনেকে।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে রাজীব মীরের মরদেহ আবার নেয়া হয় হিমায়িত লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে। ব্যস্ত নগরীতে হাস্যোজ্জ্বলভাবে দাপিয়ে বেড়ানো রাজীব মীর চললেন পিতৃভূমি ভোলাতে। সেখানে আগামীকাল সোমবার সকাল ৯টায় ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে  এবং তৃতীয় জানাজা মরহুমের নিজ এলাকা পরাণগঞ্জ হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হবে। এরপরই চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন তরুণ শিক্ষক রাজীব মীর।

এর আগে রবিবার দুপুর ১২টার দিকে তার লাশ বহনকারী শ্রীলঙ্কান বিমানের  ফ্লাইটটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। সেখানে থেকে হিমায়িত লাশ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে আনা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে।

বেশ কয়েক মাস লিভার সিরোসিসে ভুগে গত শুক্রবার( ১৭ জুলাই)  দিবাগত রাতে ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের রাজধানী চেন্নাইয়ে গ্লিনিগলস গ্লোবাল হেলথ সিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মারা যান তিনি। চলতি সপ্তাহে তার অপারেশন ও লিভার পরিবর্তনের কথা ছিল।

কিন্তু  শুক্রবার রাতে রাজীব মীর স্ট্রোক করেন। এরপর তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। রাত ১টা ৩৭ মিনিটে রাজীব মীরের লাইফ সাপোর্ট খুলে দিয়ে তাঁকে ক্লিনিক্যালি ডেড ঘোষণা করেন হাসপাতালের চিকিৎসকরা।

রাজীব মীর ১৯৯৪-৯৫ শিক্ষার্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর প্রথমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি চেয়ারপার্সন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে চলে আসেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ওসাংবাদিকতা বিভাগে।

রাজীব মীর লিখেছিলেন, ‘হয়ত গিয়েছো চলে, অথবা যাও নাই, দিয়েছো অনন্ত সাহস, আর বুঝি ভয় পাই !’ রাজীব আর কোন দিন অগণিত ভক্ত আর ভালোবাসার মানুষগুলোর কাছে ফিরবে না। কিন্তু সবাইকে ভালোবেসে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছেন। বলেছিলেন, ‘ভয়ে গল্প লিখি না। যদি সত্যি হয়ে যায়।’ রাজীব মীর সত্যিই চিরদিনের জন্য চলে গেলেন। কিন্তু অমলিন হয়ে থাকবে তাঁর ভালোবাসা। অশ্রুসিক্ত নয়নে সবাই বিদায় দিয়েছেন, বলেছেন  ওপারে ভালো থাকবেন প্রিয় রাজীব মীর।

Bootstrap Image Preview