Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২০ শনিবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৫ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন স্ত্রী, প্রশ্ন একটাই ‘ওরা এখন কাকে বাবা বলে ডাকবে’

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭ মে ২০১৮, ০৯:৫৬ PM
আপডেট: ১৭ মে ২০১৮, ০৯:৫৬ PM

bdmorning Image Preview


বিডিমর্নিং ডেস্ক-

মাত্র তিনদিন আগে রাজধানীর আদ দ্বীন হাসপাতালে রাইসা আক্তার নামে একটি কন্যা সন্তানের বাবা হয়েছেন তিনি। কন্যা সন্তান হওয়ার কারণে সহকর্মীদের আজ মিষ্টি খাওয়ানোর কথা ছিল। কিন্তু সেই ইচ্ছা আর পূরণ করতে পারলেন না ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউনের বিজ্ঞাপন বিভাগের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী নাজিম উদ্দিন(৩২)।

মেয়র হানিফ উড়ালসড়কে মঞ্জিল ও শ্রাবণ সুপার পরিবহন নামের দুই বাসের  প্রতিযোগিতার মধ্যে বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়েন নাজিম।মূহুতেই বেপরোয়া চালক তাঁর বুকের ওপর দিয়ে চালিয়ে দিলো দ্রুতগতির বাসটি। সড়কে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিলে যোগ হলো আরও এক প্রাণ।

স্ত্রী সাবরিনা ইয়াসমিন আইরিন এখনো হাসপাতালে ভর্তি। প্রতিদিনের মতো তিনি অপেক্ষায় ছিলেন কাজ শেষ করে নবজাতক সন্তান ও তাকে (আইরিন) দেখতে হাসপাতালে ছুটে আসবেন স্বামী নাজিম। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। দ্বিতীয় সন্তানের বাবা হওয়ার মাত্র তিন দিন পরই তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসে তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। এদিকে স্বামীর মৃত্যুর খবর শুনে নাজিমের স্ত্রী আইরিন বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। তার একটাই প্রশ্ন, ‘ওরা (নাজিমের দুই সন্তান) এখন কাকে বাবা বলে ডাকবে।’

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মোটরসাইকেলে করে তিনি শ্যামপুর থেকে কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন। যাত্রাবাড়ীতে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে দুই বাসের প্রতিযোগিতার মাঝে পড়ে তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। নগরীতে বাসের বেপরোয়া প্রতিযোগিতার আরেক বলি হলেন তিনি। ঝরে গেল আরও একটি তাজা প্রাণ। তার এমন মৃত্যু স্বজন ও সহকর্মীরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।

নাজিম উদ্দিনের চাচাতো ভাই জামাল উদ্দিন বলেন, নাজিম এভাবে চলে যেতে পারে কখনোই ভাবিনি। ওর স্ত্রী আর দুই সন্তানকে কী সান্ত্বনা দেব ভাবতে পারছি না।

এই ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে সহকর্মীদের মাঝে। ঢাকা ট্রিবিউনের সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম বলেন, কন্যা সন্তানের জন্ম উপলক্ষে অফিসে আজ মিষ্টি খাওয়ানোর কথা ছিল নাজিম ভাইয়ের।কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা তার জীবনটাই কেড়ে নিল।

এই ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষায় এটা কোন দুর্ঘটনা না ইচ্ছাকৃতভাবেই যেন ধাক্কাটা দিলো একটি বাস।

তিনি বলেন, আমিও মোটরসাইকেলে চড়ে ফ্লাইওভারে উঠার পর দেখতে পাই যাত্রাবাড়ী থেকে দুটি বাস রেষারেষি করে চলছে। তিনি(নাজিম) ফ্লাইওভারের ডান পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় বাসগুলো একবার ডান, একবার বাম দিকে যাচ্ছিল। তাই তিনি বারবার বাসগুলোকে হর্ন দিয়ে সতর্ক করছিলেন। মাঝে মাঝে আমিও হর্ন দিচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পর সায়েদাবাদের জনপদ মোড় বরাবর প্রায় ১০০ গজ আগে বাম পাশে থাকা বাসটি উনার বাইককে ধাক্কা দেয়। তিনি বাইক থেকে রাস্তায় পড়ে যান। আমি দ্রুত আমার বাইক থেকে নেমে উনাকে তুলতে যাওয়ার আগেই ওই বাসের চালক তার ওপর পেছনের দুটি চাকা তুলে দেয়।’

তিনি বলেন, ‘এমন মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। এত জোরে চিৎকার দিলাম তবুও মনে হলো কেউ শুনেনি। আমার চোখের সামনে এখনও সেই দৃশ্যটা যেন ভাসছে। চালক তাকে ধাক্কা দেয়ার পর যদি গাড়িটি থামাতো তাহলে ভাইটা প্রাণে বেঁচে যেত। কিন্তু ঘাতক চালক গাড়ি তো থামালোই না উল্টো গলার ওপর চাকা তুলে দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল।

ওই লোক তখন আরও কয়েক জনকে সাথে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

প্রত্যক্ষদর্শী এবং নাজিমকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ওই ব্যক্তি বলেন, এটা দুর্ঘটনা নয় হত্যা। এমন হত্যা কোনোভাবেই যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া পার না পায় সেজন্য সংবাদকর্মীদের ভূমিকা রাখার অনুরোধ করেন তিনি।

এই ঘটনার পর শ্রাবণ সুপার পরিবহনের চালক ওহিদুলকে এবং অপর বাস মঞ্জিল পরিবহনের চালকের সহকারী কামালকে আটক করা হয়।

নিজামের গ্রামের বাড়ি ভোলার লালমোহন উপজেলার কালমা ইউপির বালুচরে। বাবার নাম আনিসুল হক। তারা তিন ভাই, পাঁচ বোন। ভাইদের মধ্যে সবার বড় ছিল নিজাম। তিনদিন আগে রাজধানীর আদ দ্বীন হাসপাতালে রাইসা আক্তার নামে তার একটি কন্যা সন্তান হয়েছে। এছাড়া মুনমুন নামে আট বছরের আরও একটি কন্যা রয়েছে।

নাজিমের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শ্যামপুরের ফরিদাবাদে দ্বিতীয় জানাজা শেষে সন্ধ্যায় তার লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ি ভোলার লালমোহনের উদ্দেশে রওনা হয়েছে পরিবার।

Bootstrap Image Preview