Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২০ শনিবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৪ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

বাহাদুর শাহ পার্ক: স্মৃতি বহন করে সিপাহী বিদ্রোহের শহীদদের

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২ এপ্রিল ২০১৮, ০৮:২৬ PM
আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০১৮, ০৮:২৬ PM

bdmorning Image Preview


নিজাম উদ্দিন শামীম।।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) সংলগ্ন পুরান ঢাকার এতিহ্যবাহী স্থান বাহাদুর শাহ পার্ক আজও বাঙালি জাতির এক দুঃসহ স্মৃতি বহন করে চলেছে। ১৮৫৭ সালে সংগঠিত সিপাহী বিদ্রোহের বিপ্লবীদের স্মৃতিচিহ্ন ধারণ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ইংরেজদের শাসন-শোষণের ইতিহাস ও ইংরেজ সরকারের শোষণ নিপিড়নের বিরুদ্ধে সেনাদের আত্মত্যাগের সাক্ষী এ পার্ক।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে ভারতবর্ষের শাসন ক্ষমতা গ্রহন করে ইংরেজরা। ক্ষমতা গ্রহনের পর থেকেই ইংরেজদের শোসন নিপিড়ণ বন্ধের প্রশ্নে অসংখ্যবার বিদ্রোহ করে বাংলার স্বাধীনতাকামি বাংলার জনগণ। তেমনি একটি বিদ্রোহ হল ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব। ১৮৫৭ সালে সম্রাট বাহাদুর শাহকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে ঢাকায় সিপাহী বিদ্রোহ হয়।

ইংরেজ মেরিন সেনারা বাংলার সেনাদের নিরস্ত্র করার জন্য ১৮৫৭ সালের ২২ নভেম্বরে ঢাকার লালবাগ কেল্লায় আক্রমণ চালায়। স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী সৈন্যরা তাতে বাধা দিলে যুদ্ধ বেধে যায়। আহত ও পলাতক সেনাদের গ্রেফতার করা হয়। পরে এক প্রহসনমূলক বিচারে ইংরেজ সামরিক আদালতে ১১ বিপ্লবীকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। প্রকাশ্যে বাহাদুর শাহ পার্কে তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। পরে জনগণকে বিদ্রোহ না করার জন্য ভীতি প্রদর্শন করাতে লাশগুলো গাছে টাঙ্গিয়ে প্রদর্শন করা হয়। ইংরেজদের এই নিষ্ঠুর কার্যকলাপ ও সেনাদের আত্মত্যাগের সাক্ষ্য বয়ে নিয়ে চলেছে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক।

ইতিহাস মতে, আঠার শতকের শেষের দিকে পুরান ঢাকায় আর্মেনীয়রা বিলিয়ার্ড ক্লাব তৈরি করে। যেটি স্থানীয়দের কাছে আন্টাঘর নামে পরিচিত ছিল। ক্লাব ঘরের সাথেই ছিল একটি মাঠ; যেটিকে বলা হতো আন্টাঘর ময়দান। ১৮৫৮ সালে রানী ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষের শাসনভার নেওয়ার পর মাঠ সংক্রান্ত একটি ঘোষণা পত্র পাঠ করার মাধ্যমে এই স্থানের নামকরণ হয় ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’। পরবর্তীতে এ স্থানের নাম ভিক্টেরিয়া পার্ক পরিবর্তন করে রাখা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক।

ঊনিশ শতকে এ পার্কের উন্নয়নে নওয়াব আব্দুল গণির ব্যক্তিগত অবদান ছিল অনেক। তার নাতি খাজা হাফিজুাল্লহর মৃত্যুর পর তার ইংরেজ বন্ধুরা হাফিজুল্লাহর স্মৃতি রক্ষার্থে চাঁদা তুলে ১৮৮৪ সালে এখানে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করে। শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতিরক্ষার্থে উত্তর দিকে একটি সুউচ্চ স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। উঁচু বেদির ওপর নির্মিত চার স্তম্ভের গোলাকার আচ্ছাদনে ঘেরা সৌধটি।

পার্কের চারপাশে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ বেশ কিছু স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থাকার কারণে এটি পুরান ঢাকার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত।

তবে বর্তমানে পার্কটি নানা সমস্যায় জর্জরিত। পার্কের মাঝখানে আছে একটি জলহীন ফোয়ারা। সেটির বেহাল দশা। ট্যাঙ্ক থেকে পানি নিচ্ছেন হকার-দোকানদাররা। স্মৃতিস্তম্ভের ওপর জুতো পায়ে বসে থাকতে দেখা যায় দর্শনার্থীদের। ডিম্বাকার এ পার্কটির বাইরের রেলিং কেটে নিচ্ছে নেশাখোররা। রাতে বসে মাদকসেবীদের আড্ডা। সরেজমিন পার্কটির এমন চিত্র পাওয়া যায়।

ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধি ৬১ অনুযায়ী রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মহাপরিকল্পনাভুক্ত স্থাপনা হিসেবে ঐতিহাসিক গুরুত্বের বিবেচনায় বাহাদুর শাহ পার্ককে সংরক্ষণের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু পার্কের উত্তরের রাস্তয় ডাস্টবিন, ময়লার ছড়াছড়ি। উত্তর-দক্ষিণের ফুটপাতে দোকান এবং রিকশার জট। নষ্ট হচ্ছে যাচ্ছে পার্কের সৌন্দর্য। পশ্চিম দিকের প্রবেশদ্বার বন্ধ রাখা হয়েছে। পূর্ব দিকেরটা দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে।

এখানে স্থানীয়ভাবে প্রাতঃভ্রমণকারী সংঘ গড়ে তোলা হয়েছে। এ সংঘের সদস্যরা ভোর, বিকেল এবং সন্ধ্যায় হাঁটেন। এছাড়া, নানা পেশা ও চাকরিজীবী, পথচারী, ছাত্র-ছাত্রী ও সাধারণ জনগণের নিত্যপদচারণা রয়েছে কালের সাক্ষী এ পার্কে।

Bootstrap Image Preview