Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৭ বুধবার, অক্টোবার ২০১৮ | ২ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

বিশ্বমানবতার শিক্ষক মহানবী (সা.)-এর পাঠদান পদ্ধতি

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬ এপ্রিল ২০১৮, ০১:১৪ PM
আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০১৮, ০১:১৪ PM

bdmorning Image Preview


মুফতি তাজুল ইসলাম।।

পৃথিবীর দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও পণ্ডিতরা এটা ভেবে বিস্মিত যে কিভাবে একজন লোকের পক্ষে বিশ্বমানবতার শিক্ষক হওয়া সম্ভব। মাত্র ২৩ বছরের নবুয়তিজীবনে তিনি এত জ্ঞান বিতরণ করেছেন, দেড় হাজার বছর ধরে গোটা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করে যাচ্ছে। কিন্তু তাঁকে পাঠ করার পর্ব কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। বরং দিন যতই যাচ্ছে, ততই পৃথিবী তাঁর হাজার বছর আগের উচ্চারিত শব্দমালা থেকে নতুন দিনের দিশা খুঁজে পাচ্ছে। এটা কিভাবে সম্ভব?

পৃথিবীতে আরো বহু মনীষী এসেছেন, আরো অগণিত নবী এসেছেন; কিন্তু তাবৎ বিশ্ব মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে সব কষ্টি পাথরে যাচাই করে সর্বোৎকৃষ্টরূপে পেয়েছে। তাহলে তিনি কিভাবে ‘ক্লাস’ নিতেন? তাঁর পাঠদান পদ্ধতি কী ছিল? এ প্রশ্ন সবার। উপমহাদেশের বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার মুফতি তাকি উসমানি এ প্রশ্নের জবাব খুঁজেছেন। তিনি শিক্ষার সিলেবাস সম্পর্কে লিখেছেন ‘হামারা তালিমি নেজাম’। তাঁর মতে, মহানবী (সা.)-এর শিক্ষাবিপ্লবের পেছনে দুটি বিষয় কাজ করেছে।

এক. তিনি যে উপদেশ শিক্ষা দিতেন, তা সবার আগে নিজে করে দেখাতেন। কাউকে ফরজ নামাজের উপদেশ দেওয়ার আগে তিনি ফরজের পাশাপাশি তাহাজ্জুদ ও নফল নামাজ পড়ে পা মোবারক ফুলিয়ে ফেলতেন। মানুষকে ফরজ রোজার নির্দেশ দিয়ে তিনি নিজে ফরজ রোজার পাশাপাশি সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার; প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ, আশুরা ইত্যাদি নফল রোজা বাধ্যতামূলকভাবে রাখতেন। তিনি মানুষকে জাকাত দিতে বলতেন। কিন্তু নিজে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সর্বস্ব সদকা করে দিতেন। তিনি কাউকে মিষ্টি ত্যাগ করার পরামর্শ দেওয়ার আগে নিজে মিষ্টান্ন খাবার গ্রহণ ত্যাগ করতেন। এভাবে শিক্ষা দেওয়ার কারণে তাঁর শিক্ষা ফলপ্রসূ হয়েছে।

দুই. তাঁর সঙ্গে তাঁর ছাত্রদের সম্পর্ক ক্লাসের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর সঙ্গে ছাত্রদের যে বন্ধন তৈরি হয়েছিল, সেটি আত্মার সূতিকায় আবদ্ধ ছিল। কখনো কখনো তা আত্মীয়তার চেয়েও প্রগাঢ় সম্পর্কে রূপ নিয়েছে। কারো অনুপস্থিতি তাঁকে পীড়িত করত। কারো অনাহার তাঁকে ব্যথাতুর করত। কারো কষ্ট তাঁকে বিচলিত করে তুলত। ছাত্রদের প্রতি তিনি এতই কোমলপ্রাণ ছিলেন, তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতেও তাঁর চেষ্টার কমতি ছিল না। তাঁর সম্পর্কে কোরআন বলছে, ‘আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছ। যদি তুমি রূঢ় ও কঠিন চিত্ত হতে, তাহলে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)

কেমন ছিল মহানবী (সা.)-এর পাঠদান পদ্ধতি?

ভাষা ও দেহভাষার সমন্বয় : রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো বিষয়ে আলোচনা করলে, তার দেহাবয়বেও তার প্রভাব প্রতিফলিত হতো। তিনি দেহ-মনের সমন্বিত ভাষায় পাঠ দান করতেন। এতে বিষয়ের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা সঠিক ধারণা পেত। তিনি যখন জান্নাতের কথা বলতেন, তখন তাঁর দেহে আনন্দের স্ফুরণ দেখা যেত। জাহান্নামের কথা বললে ভয়ে চেহারার রং বদলে যেত। হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) যখন বক্তব্য দিতেন, তাঁর চোখ লাল হয়ে যেত, আওয়াজ উঁচু হয়ে যেত ও ক্রোধ বৃদ্ধি পেত। যেন তিনি (শত্রু) সেনা সম্পর্কে সতর্ককারী।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৩)

আগ্রহী শিক্ষার্থী নির্বাচন : রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষ বিশেষ শিক্ষাদানের জন্য আগ্রহী শিক্ষার্থী নির্বাচন করতেন। যেন শেখানো বিষয়টি দ্রুত ও ভালোভাবে বাস্তবায়িত হয়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমার উম্মতের মধ্য থেকে কে পাঁচটি গুণ ধারণ করবে ও তার ওপর আমল করবে? তিনি বলেন, আমি বলি, হে আল্লাহর রাসুল! আমি। তখন তিনি আমার হাত ধরেন ও হাতে পাঁচটি বিষয় গণনা করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৮০৯৫)

উপমা দিয়ে বোঝানো : নবী করিম (সা.) অনেক সময় কোনো বিষয় স্পষ্ট করার জন্য উপমা ও উদাহরণ পেশ করতেন। কেননা উপমা ও উদাহরণ দিলে যেকোনো বিষয়ে বোঝা সহজ হয়ে যায়। হজরত সাহাল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমি ও এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে এমনভাবে অবস্থান করব।’ সাহাল (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) তাঁর শাহাদাত ও মধ্যমা আঙুলের প্রতি ইঙ্গিত করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০০৫)

শিক্ষার্থীর প্রশ্ন গ্রহণ : শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের আলোচনা শুনে শিক্ষার্থীর মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। এসব প্রশ্নের সমাধান না পেলে অনেক সময় পুরো বিষয়টিই শিক্ষার্থীর কাছে অস্পষ্ট থেকে যায়। রাসুল (সা.) শিক্ষাদানের সময় শিক্ষার্থীর প্রশ্ন গ্রহণ করতেন। হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-কে প্রশ্ন করে, আমাকে বলুন! কোন জিনিস আমাকে জান্নাতের নিকটবর্তী করে দেবে এবং কোন জিনিস জাহান্নাম থেকে দূরে সরিয়ে নেবে। নবী করিম (সা.) থামেন ও তাঁর সাহাবাদের দিকে তাকান। অতঃপর তিনি বলেন, তাকে তাওফিক দেওয়া হয়েছে অথবা বলেন, তাকে হেদায়েত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (রা.) জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কী বললে? বর্ণনাকারী বলেন, সে তার পুনরাবৃত্তি করে। নবী করিম (সা.) বলেন, তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না, নামাজ কায়েম করবে, জাকাত দেবে ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবে (এবার) উটনি ছেড়ে দাও।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১২)

বিবেকের মুখোমুখি করা : বিবেক জাগ্রত থাকলে মানুষ নানা অপরাধ থেকে বেঁচে যায় এবং বিবেকলুপ্ত হলে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাই মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করার সহজ উপায় হলো মানুষের বিবেক ও মনুষ্যত্ব জাগিয়ে তোলা। রাসুল (সা.) বিবেক ও মনুষ্যত্ব জাগিয়ে তোলার মাধ্যমেও মানুষকে শিক্ষাদান করেছেন। এক যুবক রাসুল (সা.)-এর কাছে গিয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে ব্যভিচারের অনুমতি দিন। তার কথা শুনে উপস্থিত লোকেরা মারমুখী হয়ে ওঠে ও তিরস্কার করে। রাসুল (সা.) তাকে কাছে ডেকে নিয়ে বলেন, ‘তুমি কী তোমার মায়ের ব্যাপারে এমনটি পছন্দ করো?’ সে বলল, ‘আল্লাহর শপথ, না। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গিত করুন।’ রাসুল (সা.) বলেন, ‘কেউ তার মায়ের ব্যাপারে এমনটি পছন্দ করে না।’ এরপর রাসুল (সা.) একে একে তার সব নিকটাত্মীয়ের কথা উল্লেখ করেন এবং সে ‘না’সূচক উত্তর দেয়। এভাবে রাসুল (সা.) তার বিবেক জাগ্রত করে তোলেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২২২১১)

রেখাচিত্রের সাহায্যে ব্যাখ্যা দেওয়া : কখনো কখনো কোনো বিষয়কে স্পষ্ট করার জন্য রাসুল (সা.) রেখাচিত্র ও অঙ্কনের সাহায্য নিতেন। যেন শিক্ষার্থীর স্মৃতিতে তা রেখাপাত করে। হজরত আবু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) একটি চারকোনা দাগ টানেন। এরপর তার মাঝ বরাবর দাগ দেন, যা তা থেকে বের হয়ে গেছে। বের হয়ে যাওয়া দাগটির পাশে ও চতুষ্কোণের ভেতরে ছোট ছোট কিছু দাগ দেন। তিনি বলেন, এটি মানুষ। চতুষ্কোণের ভেতরের অংশ তার জীবন ও দাগের যে অংশ বের হয়ে গেছে, সেটি তার আশা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪১৭)

এভাবে রাসুল (সা.) রেখাচিত্রের সাহায্যে মানুষের জীবন ও জীবনের সীমাবদ্ধতার বিষয় স্পষ্ট করে তুলতেন।

মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষাদান : মুক্ত আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে বহু জটিল ও দুর্বোধ্য বিষয় সহজ হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বহু বিষয় মুক্ত আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে শিক্ষাদান করতেন। যেমন—হুনাইনের যুদ্ধের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টন নিয়ে আনসার সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিলে রাসুল (সা.) তাঁদের সঙ্গে মুক্ত আলোচনা করেন। একইভাবে বদরের যুদ্ধের বন্দিদের ব্যাপারে সাহাবিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। (বুখারি ও মুসলিম)

গুরুত্বপূর্ণ কথার পুনরাবৃত্তি : রাসুল (সা.) তাঁর পাঠদানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তিনবার পর্যন্ত পুনরাবৃত্তি করতেন। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) তাঁর কথাকে তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন, যেন তা ভালোভাবে বোঝা যায়।’ (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস : ২২২)

এভাবে শিক্ষা দিতেন বলেই মহানবী (সা.) বিশ্বমানবতার মহান শিক্ষক উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।

লেখক : শিক্ষক, দারুল আরকাম, টঙ্গী, গাজীপুর।

Bootstrap Image Preview