Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৭ বুধবার, অক্টোবার ২০১৮ | ২ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

বীরপ্রতীক কাকন বিবি’র চিরবিদায় ও আমাদের দায়

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২ এপ্রিল ২০১৮, ০৪:৩৯ PM
আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০১৮, ০৪:৩৯ PM

bdmorning Image Preview


সুপা সাদিয়া।।

স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অন্যতম একটি নাম কাঁকন বিবি। বাবা গিশো খাসিয়া আর মা মেলি খাসিয়া। জন্মসূত্রে যিনি বাঙালি নন, সবুজ অরণ্য আর পাহাড় টিলা নিবাসী কাঁকন বিবি। পাহাড়ী এই খাসিয়া নারী নিজের জীবনের ঝুকি নিয়ে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে। কখনও অস্ত্র হাতে আবার কখনও ভিখাড়ির বেশে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তার সাহসিকতার জন্য মুক্তি পাগল এই মানুষটিকে তখন সকলে মুক্তির বেটি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।

খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশের গ্রামের কাঁকন বিবি ১৯৭০ সালে দিরাই উপজেলার শহীদ আলীর সাথে বিয়ের পর হন নূরজাহান বেগম। ১৯৭১ সালের ১৬ মার্চ তাদের কোল জুড়ে এক মেয়ে সন্তান আসে। কেন ছেলে নয়, মেয়ে এল পৃথিবীতে এই অপরাধে কাঁকন বিবি’র সাথে তার স্বামীর মৌখিক বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এপ্রিল মাসে সিলেট ইপিআর সৈনিক মজিদ খানের সাথে দ্বিতীয়বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন কাঁকন বিবি। দুইমাস সংসার করে কাঁকন বিবি আগের স্বামীর কাছ থেকে মেয়ে সখিনাকে নিয়ে গিয়ে দেখেন সৈনিক মজিদ খান নিরুদ্দেশ। কাঁকন বিবি লোকমুখে জানতে পারেন মজিদ খানকে সিলেট থেকে দোয়ার বাজার সীমান্তে বদলী করা হয়েছে। তখন ছিল জুন মাস। মার্চে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধ তখন বেশ প্রবল। মেয়ে সখিনাকে তার বাবার কাছে রেখে কাঁকন বিবি খুজতে বের হন মজিদ খানকে।

কাঁকন বিবি’র ভাষায়, ‘দোয়ারে সীমান্তে এসে দেখি পাকিস্তানি হায়েনারা বাঙালি নারী, শিশু ও পুরুষের ওপর অমানবিক অত্যাচার করছে। এসব দেখে বাঙালির জন্য আমার দরদ উথলে ওঠে। তখনই আমি এই অসহায় বাঙালিদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিজ্ঞা নেই। স্বামীকে খোঁজ করার পাশাপাশি মুক্তি বাহিনীর আস্থা অর্জন করতে আমার মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।’ (শামস শামীম-সুনামগঞ্জ; একাত্তরের বিজয়িনী; দৈনিক কালের কন্ঠ; তাং: ৯ ডিসেম্বর, ২০১০)

পাহাড়ী যুবতী মেয়ে কাঁকন বিবি নজড়ে পড়ে যান নরপিচাশ পাকবাহিনীর। বাঙ্কারে রেখে মানসিক ও শারীরিকভাবে তাকে নির্যাতন করে। অমানবিক নির্যাতনের পর বদলে যান কাঁকন বিবি। প্রতিশোধের আগুনে সব কিছু পুড়িয়ে দিতে দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে ওঠেন। জুলাই মাসে যোগাযোগ করেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে। মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী কাঁকন বিবিকে সেক্টর কমান্ডার লেফট্যানেন্ট কর্ণেল মীর শওকত-এর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি কাঁকন বিবির সাথে আলাপচারিতার পর তাকে বিশ্বস্ত গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ করেন কাঁকন বিবি সরাসরি জড়িয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে।

কাঁকন বিবির অসীম ধৈর্য্য ও সাহসিকতার জন্য তিনি অল্প কিছুদিনে বেশ আস্থা অর্জন করেন। ভিখারির বেশসহ বিভিন্ন বেশে ঘুরে ঘুরে পাকবাহিনীর অনেক তথ্য পৌছে দিতেন মুক্তিবাহিনীর কাছে। আর মুক্তিবাহিনী সেই খবরের ভিত্তিতে অপারেশন চালিয়ে সফল হতেন। এই সকল অপারেশনের সফল নায়ক কাঁকন বিবি। এরই এক পর্যায়ে দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলা বাজারে পাকবাহিনীর হাতে আবার ধরা পড়েন। পাক-হানাদার আলবদর-রাজাকার বাহিনী তাকে একনাগাড়ে ৭ দিন বিবস্ত্র করে অমানুষিক নির্যাতন চালায়। লোহাড় রড গরম করে তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গে ছ্যাকা দেয়।

নির্যাতনের অসহনীয়তার এক পর্যায়ে কাঁকন বিবিকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায়। জ্ঞান ফিরে এলে বালাট সাব সেক্টরে চিকিৎসা করানো হয়, এরপর তিনি ফিরে আসেন বাংলা বাজারে। তখন তার প্রতিশোধের আগুন দ্বিগুণ হয়ে যায়, তিনি অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর কাছ থেকে। তিনি জড়িয়ে পড়েন সশস্ত্র যুদ্ধে সাথে সমান তালে চলতে থাকে গুপ্তচরের কাজ।

নভেম্বর মাসে টেংরাটিলায় পাকবাহিনীদের সাথে সম্মুখযুদ্ধে কাঁকন বিবি গুলিবিদ্ধ হন। এখন উরুতে সেই গুলির দাগগুলো আছে। তিনি টেংরাটিলাসহ আমবাড়ি, বাংলাবাজার, টেবলাই, বালিউড়া, মহববতপুর, বেতুরা, দূরবীনটিলা, আধারটিলা মোট ৯ টি যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। নভেম্বর মাসের শেষের দিকে তিনি রহমত আলীসহ আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সাথে নিয়ে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের জাউয়া ব্রীজ অপারেশনে যান। বেশ কয়েকটি সফল অপারেশনের স্বাক্ষী হয়ে থাকেন কাঁকন বিবি। আমবাড়ি বাজারের যুদ্ধে তার পায়ে আবার গুলি লাগে।

দেশ স্বাধীন হবার পর কাঁকন বিবি চলে আসেন দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়নে ঝিরাগাঁও গ্রামে। বিয়ে করেন শাহেদ আলীকে। কাঁকন বিবি’র সংসার চলত বাড়ি বাড়ি কাজ করে। এর মধ্যে স্বামীর মৃত্যু হয়।

ভিটে-জমিহীন মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবিকে এক একর খাস জমি প্রদান করেন। সিলেটের তৎকালীন মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান তাকে ওই জমিতে একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেন। এরপর জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জনকন্ঠ প্রতিমাসে কিছু অনুদান দিত; এতেই চলত তাদের সংসার। একপর্যায়ে জনতা ব্যাংক কাঁকন বিবিকে ১৫ লাখ টাকার একটি এফডিআর করে দেয়, যা বাবদ তিনি প্রতিমাসে ৭,০০০ টাকা পেয়ে আসছেন। সাথে তারা একটি পাকা বাড়ি করে দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবিকে।

কাঁকন বিবি এখন প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করেছেন জীবনের সাথে। আর স্বপ্ন দেখেছেন সুন্দর এক সোনার বাংলাদেশের। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৬ সালে তাকে বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু আজও কাঁক বিবির সেই বীরপ্রতীক উপাধিটি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় গ্যাজেট আকারে প্রকাশ করতে পারেনি। সরকারের ঘোষণার প্রায় ২২ বছরেও একজন স্বশস্ত্র বীরপ্রতিককে আমরা গ্যাজেটভুক্ত করতে পারিনি। তিনি বেঁচে থাকতে শুনে যেতে পারেননি গ্যাজেটে তাঁর নাম উঠেছে। মুক্তিযোদ্ধামন্ত্রণালয় সামান্য এটুকু কাজ করতে ব্যর্থ হলেও কাঁক বিবি আমাদের হৃদয়ের গ্যাজেটে চিরদিনই বীরপ্রতিকের মর্যাদায়ই আসীন থাকবেন।

শারীরিক জটিলতা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে ১৯ মার্চ, ২০১৮ সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন শতবর্ষী কাকন বিবি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২১ মার্চ, ২০১৮ রাত ১১টার দিকে এই বীরপ্রতীক শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।

লেখক-গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী।

Bootstrap Image Preview