Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৬ বুধবার, সেপ্টেম্বার ২০১৮ | ১১ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

ফেসবুকে শোক জানালেও ২৪ ঘন্টা পরও স্ত্রীর মৃত্যুর খবর ‘জানেন না’ স্বামী!

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ মার্চ ২০১৮, ০৯:৪৬ PM আপডেট: ১৩ মার্চ ২০১৮, ০৯:৪৬ PM

bdmorning Image Preview


বিডিমর্নিং ডেস্ক-

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার বিমান বিধ্বস্তের ২৪ ঘন্টা পার হয়েছে। তবে এই ঘটনায় নেপালে বেড়াতে গিয়ে মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন নিউইয়র্ক প্রবাসী বিলকিস আরা মিতুর (২৬) স্বামী ২৪ ঘন্টায়ও জানতে পারেনি যে ওই বিমানে ছিল তার স্ত্রী। এ দুর্ঘটনা দেশে-প্রবাসে সবাইকে নাড়া দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই নিজেদের মর্মাহত হওয়ার কথা জানিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন।

বাদ ছিলেন না মিতুর স্বামী নিউইয়র্কে বসবাসরত আজিজুল হকও। কাঠমান্ডুতে ইউএস-বাংলার ফ্লাইট বিধ্বস্তের পর ফেসবুকে স্ট্যাটাসে ২৪ ঘণ্টা আগে (এ রিপোর্ট লেখার সময়) নিজের মর্মাহত হওয়ার কথা লেখেন আজিজুল। তিনি এখনও জানেন না, তারই প্রিয়তমা স্ত্রী মিতু সেই বিমানেরই যাত্রী ছিলেন।

ফেসবুকে এক পোস্টে আজিজুল হক লিখেছিলেন- ‘মাঝে মাঝে কিছু সকাল অভিশপ্ত মনে হয়। তেমনি একটা সকাল শুরু হল দুটি অত্যন্ত বাজে মর্মান্তিক দুঃসংবাদ দিয়ে। ঢাকার মিরপুর-১২ আগুনে পুড়ে তছনছ, আবার ইউএস-বাংলার একটি বিমান নেপালের কাঠমান্ডু বিমানবন্দরের রানওয়েতে বিধ্বস্ত হয়েছে যাতে অনেক বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

রাজশাহীর শাহ মাখদুম থানার সপুরা এলাকার নওদাপাড়া রোডের মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া ও মনোয়ারা বেগমের দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে মিতু ছোট। তার বাংলাদেশি পাসপোর্ট নম্বর বিসি-০০৪৯০৩০। নিউইয়র্কের হাডসনে স্বামীর সঙ্গে বসবাস করতেন মিতু। দিন কয়েক আগে মায়ের অসুস্থতার কারণে তিনি বাংলাদেশে আসেন। এরপর সোমবার নেপালে বেড়াতে যাচ্ছিলেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সক্রিয় থাকার সুবাদে মিতু ছিলেন নিউইয়র্কে অনেকের পরিচিত। তার মৃত্যু সংবাদে নিউইয়র্কের ঘনিষ্ঠজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। মিতুর স্বামী আজিজুল হক ফায়ারম্যানস এসোসিয়েশন অব দ্য স্টেট অব নিউইয়র্কের স্টাফ নার্স।

গত ১১ মার্চ ভোর ৩টা ২৩ মিনিটে নিজের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আপলোড করে স্ট্যাটাস দেন মিতু ইসলাম। সেখানে তিনি লিখেন, ‘আহা পারিতাম, যদি পারিতাম/ আঙুলগুলো ছুঁয়ে থাকতাম/ বিষাদের জাল, টালমাটাল/ এ কোন দেয়াল, এ কোন আড়াল/ ছাই হয় গোধূলি, কারে যে বলি/ এ কোন শ্রাবণ পথে হয়ে চলি...।’

বিমান দুর্ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও মিতু ফেসবুকে সক্রিয় ছিলেন। মিতুর নিউইয়র্ক প্রবাসী এক বান্ধবী রবিবার দিবাগত রাত ১২টা ৪৬ মিনিটে অর্থাৎ সোমবার বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা ৪৬ মিনিটে নিজের কয়েকটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেন। তার কিছুক্ষণ পরেই ওই পোস্টে কমেন্ট করেন মিতু। তিনি লিখেন, ‘ওয়াও, লাভলি অ্যান্ড স্মার্ট অ্যান্ড কিউট’।

তার এক বান্ধবী বলেন, ‘গতকাল আমি ফেসবুকে কয়েকটি ছবি পোস্ট করার পর দ্বিতীয় কমেন্টটি ছিল মিতুর। এরপর আমি তার সাথে ম্যাসেঞ্জারে কথা বলি। কিন্তু সে যে এভাবে চলে যাবে ভাবতে পারছি না।’ জানা গেছে, আর দুদিন পরই মিতুর জন্মদিন। ১৫ মার্চ জন্মদিনটি তার ঢাকায় বাবা-মা ও একমাত্র ভাইয়ের সঙ্গে পালন করার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই এ করুণ পরিণতি!

পারিবারিক সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে নিউইয়র্ক প্রবাসী মার্কিন নাগরিক আজিজুল হককে বিয়ে করে পরের বছর ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে নিউইয়র্কে পাড়ি জমান মিতু। গ্রীনকার্ডধারী মিতু গত বছর দেশে এসেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ পারিবারিক কারণে তিনি ঢাকা যান। সেখান থেকে ১২ মার্চ সোমবার ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে নেপালের কাঠমান্ডু রওয়ানা দেন।

নিউইয়র্কে আসার পর স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কে একাউন্টিং এন্ড ফিনান্স নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন মিতু।

মিতুর একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, আজিজুল হক স্ত্রীকে খুব ভালবাসেন। স্ত্রী ছাড়া কিছু বোঝেন না। নিউইয়র্কে একটি বাড়ি থাকার পরও স্ত্রী মিতুর পছন্দে গত বছর আরও একটি বাড়ি কিনেছিলেন। কিন্তু বিমান দুর্ঘটনা সব কিছু কেড়ে নিল। নিউইয়র্কের হাডসনে সাজানো গোছানো সেই বাড়িটিতে আর কোনোদিন ফিরবেন না বিলকিস আরা ওরফে মিতু ইসলাম।

মিতুর ভাই গোলাম মাসুদ রানা বলেন, আমরা মঙ্গলবার সকালে মিতুর দুর্ঘটনার খবর জানতে পারি। কিন্তু বাবা-মা রাজশাহী থেকে ঢাকায় আসবেন, তাদের আমার বাসায় আনতে হবে- এজন্য নেপাল যেতে পারিনি।

এদিকে, বিলকিস আরা ওরফে মিতু ইসলামের স্বামী আজিজুল হক এখনও মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার খবর জানেন না। মিতুর ভাই মাসুদ রানা জানান, ‘আজিজুলের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করতে পারছি না। সে সম্ভবত এখনও মিতুর নিহত হওয়ার খবর জানে না।’

আজিজুলের এক প্রতিবেশি বলেন, ‘কাল রাতেও তার সঙ্গে কথা হয়েছে, আমরা তাকে মিতুর খবর জানাইনি, তিনিও কিছু জানেন না।’

তবে তার অন্য এক প্রতিবেশি বলেছেন, আজিজুল সম্ভবত মিতুর খবর জেনে গেছেন। তাই ফোন ধরছেন না। তাকে বাসায় কিংবা কর্মস্থলে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।

উল্লেখ্য, গতকাল (সোমবার) নেপালের স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২০ মিনিটে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। বিধ্বস্ত হওয়ার আগে বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। নেপাল সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্রের বরাত দিয়ে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ৫০ জনের নিহত হয়েছেন।

ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মুখপাত্র প্রেম নাথ ঠাকুর বলেছেন, দুই ইঞ্জিন বিশিষ্ট টার্বোপ্রোপ বিমানটি ৬৭ আরোহী ও ৪ জন ক্রু নিয়ে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে কাঠমান্ডুর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল। যাত্রীদের মধ্যে ৩৭ পুরুষ, ২৭ নারী ও দুই শিশু ছিল। তাদের মধ্যে ৩৩ জন নেপালের নাগরিক।

Bootstrap Image Preview