Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২০ শনিবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৫ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

ধর্মঘট ও আমরণ অনশন হয়েছে , কিন্তু বয়স ও বেতন কি বেড়েছে?

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ০৬:২৮ PM
আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ০৬:২৮ PM

bdmorning Image Preview


আরিফ চৌধুরী শুভ।।

সরকারের দায়িত্বের শেষ মেয়াদে প্রেসক্লাব অনেকের ভাগ্য পরিবর্তনের অন্যতম টার্গেট ছিল। দাবি আদায়ে কেউ সফল হলেও বেশির ভাগই ব্যর্থ হয়েছেন। দুদিন আগেও প্রেসক্লাবে তিল ধরার ঠাঁই ছিল না। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়কে কেন্দ্র করে ৮ ফেব্রুয়ারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে আন্দোলনকারীদের উঠিয়ে দিয়ে দীর্ঘ অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত প্রেসক্লাব এখন স্বস্তির নিশ্বাস নিচ্ছে। নতুবা যেকোন সময় প্রেসক্লাবের শরীর দাবির ব্যানারে ন্যুঁয়ে পড়তে পারতো।

‘প্রেসক্লাবের দাবিই প্রধানমন্ত্রীর কাছে পূরণ হবার অধিক যোগ্য’ এমন ধারনাই আমাদের প্রেসক্লাবমুখি করেছে বেশি। ২০১৮ সালেই অর্ধশতাধিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান শুধু দাবির আন্দোলনই করেছে প্রেসক্লাবে। চাকুরির বয়স বাড়ানোর দাবিতে আমরণ অনশন ছিল প্রেসক্লাবের সর্বশেষ আন্দোলন। প্রশ্ন হলো আন্দোলন হয়েছে, আমরণ অনশন হয়েছে, কিন্তু দাবি কি পূরণ হয়েছে, বয়স কি বেড়েছে?

প্রেসক্লাবে এ বছর দাবির চেয়ে আমরণ অনশনের দাবিই বেশি দেখেছি। দাবি পূরণের জন্যে সবাই মরতেও দ্বিধা করে না কেন? এটা দাবির গুরুত্বের সাথে নির্ভরশীল হয়তো। কিন্তু কোন লেভেলে পৌঁছালে দাবির সমর্থনে আমরণ অনশনের সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধা করে না আন্দোলনকারীরা? আমরা আমজনতা আন্দোলনকারীদের আত্মার ব্যথা উপলব্ধি করছি ক্ষমতাহীন হৃদয় দিয়ে, কিন্তু ক্ষমতার আসনে যিনি বসে আছেন তিনি কি আন্দোলনকারীদের কথা একবারো শোনার ইচ্ছে পোষণ করেছেন? করলে আন্দোলনকারীদের ডাকেননি কেন?

প্রায় অর্র্ধমাস বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সারাদেশ থেকে প্রেসক্লাবে আমরণ অনশন পালন করেছেন। দাবি মানাতো দূরের কথা, এক বারের জন্যেও তাদের দেখতে আসেনি রাষ্ট্র কর্তারা। ইবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেলায়ও একই ঘটনা ঘটেছে।না খেয়ে শত শত শিক্ষক অসুস্থ  হয়ে হাসপাতালে ভর্তি  হয়েছেন। তাহলে তারা কার দিকে তাকিয়ে অনশনে বসেছে? রাষ্ট্রে তাদের কথা শোনার মতো কেউ কি নেই?

বেসরকারি শিক্ষকদের সাথে চাকুরি প্রার্থীরাও আমরণ অনশনে বসেছিল সরকারি চাকুরিতে প্রবেশের সময় বৃদ্ধির জন্যে। চাকুরির বয়স বাড়াতে অনশনের প্রয়োজন ছিল তা এই বাংলাদেশ এই প্রথম দেখেছে। দুর্ভাগ্য জাতির চোখে এর চেয়ে বড় লজ্জা হতে পারে না। অনশনকারীরা প্রত্যেকেই খালি হাতেই ফিরে গেছে বাড়িতে। তাদের সান্তনা জানানোর ভাষা নাই।

সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৩০ বছর। বর্তমানে এ বয়সে  চাকুরি পাওয়াটা চাকুরি প্রত্যাশিতদের ভাগ্য পরীক্ষার লড়াই। এ লড়াইয়ে যোগ্যতা, ভাগ্য, মামা আরো অনেক কিছু থাকা দরকার। বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেশের বাস্তবতায় চাকুরীর প্রবেশ সময়সীমা বৃদ্ধি করার প্রয়োজনীয়তা সময়েরই দাবি।সময়ের দাবি না হলে আমরণ অনশনে কেন বসবেন চাকুরী প্রার্থীরা। যারা সুযোগ পেলে রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দিবেন বিশ্বে তারা ভুল দাবিতে যেতে পারেন না।

খুবই দু:খ হচ্ছিল এমন দৃশ্যে যখন দেখলাম সহপাঠিরা চাকুরির জন্যে নয়, চাকুরিতে আবেদনের জন্যে সরকারের কাছে একটু  সহানুভূতি চাচ্ছে, সময় বাড়াতে আমরণ অনশন করছে। কিন্তু তাদের এমন দাবিতে কোন কর্ণপাত নেই সরকারের। মনে হচ্ছে আন্দোলনকারীদের বয়স বাড়ালেও রাষ্ট্রীয় কোষাগার ফাঁকা হয়ে যাবে। দীর্ঘদিনের আন্দোলন অনশনে বসেও বয়স আটকে আছে সরকারের একটি হুকুমে। কোথায় যাবে তারা? কার কাছে জানাবে এ দাবি?

ছোট্ট একটি দেশ। ভৌগোলিক কারণে হোক আর জাতসূত্রেই হোক, আমাদের গড় আয়ু এখন ষাটের নিচে। সঠিক সময়ে চাকুরি পেলে কি আর বয়স বাড়ানোর আন্দোলনে অযথা তারা বসতো। চাকুরি পাওয়ার পর অবসরের বয়স ৫৭ বছর বলতে না বলতেই শেষ। তাইতো কর্মদিবস বাড়িয়ে ৫৯ বছর করা হয়েছে। এটা  আরো বৃদ্ধির পরিকল্পনা থাকলেও চাকুরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর কোন পরিকল্পনা দৃশ্যমান নেই।

একজন শিক্ষার্থীর একাডেমিক পরিসংখ্যান বলছে ১৬ বছর বয়সে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে সে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার কথা ১৮ বছরে। স্নাতক বা সম্মান পাস করার কথা ২২ বছর বয়সে আর স্নাতকোত্তর ২৩ বছর বয়সে। সে অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ বছর হলে প্রত্যেকেই সাত বছর করে সময় পাবেন চাকরিতে চেষ্টার করার জন্যে। কিন্তু লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েটের বেকারত্ব জীবনে এ পরিসংখ্যান কতটুকু সঠিক হিসাব? এমনিতেই আমাদের বিভিন্ন পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে শিক্ষাজীবনে অনেক মূল্যবান সময় আমরা হারাচ্ছি। সেই সময়গুলো কি চাকুরির আগে আমরা আরেক বার পাচ্ছি? পেতে কি পারি না?

দুই বছরের স্নাতক বেড়ে তিন বছর হয়েছে। তিন বছরের সম্মান শ্রেণি  বেড়ে  চার বছর হয়েছে। স্নাতকোত্তর শেষ করতেই পাঁচ বছর লেগে যায়। একাডেমিক বয়সাটা ঠিক শীতকালের বেলার মতো যেভাবে বাড়ছে,  চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা সেভাবে বাড়েনি, কেন উদ্যোগও নেওয়া হয়নি?

পাঠক্রমকেন্দ্রিক পাঠে মনোনিবেশকারিরা চাকরির প্রস্তুতির জন্যে আলাদা ভাবে সময় পায় না এটা সত্য। তাই প্রস্তুতিটা একাডেমিক পরীক্ষার পড়াশুনা শেষ করেই শুরু করতে হয় বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর। ফলে একদিকে  চাকরির প্রস্তুতি, অন্যদিকে প্রতিযোগিতার বাজারে সোনার হরিণ চাকুরির পিছে দৌঁড়াতে একজন চাকুরি প্রার্থীর মাথায় পাথর বোঝা অনুভব হয়। শুধু বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতিই একজন পরীক্ষার্থীর জীবন থেকে দু্ই বছরের অধিক সময় কেড়ে নেয়। একদিকেতো চাকুরি প্রার্থীদের ছাড় দিতে হবে রাষ্ট্রকে। চাকুরি প্রার্থীদের ব্রেইন প্রেসার কমাতে হবে। হয় চাকুরির বয়স বাড়িয়ে প্রেসার কমাতে হবে, না হয় চাকুরির শর্ত কমিয়ে কর্মসংস্থানের অধিক সুযোগ সৃষ্টি করে বেকারত্বের হার গুছাতে হবে।

সময়টা এমনই স্নাতকোত্তর শেষ করতে সময় লাগে ২৬ থেকে ২৮ বছর। পদ্ধতিগত কারণে শিক্ষার্থীর কয়েক বছর ক্ষতির দায় যেমন সরকার নিচ্ছে না, তেমনি বেকারত্বের বিশাল বোঝা গিয়ে পড়ছে সমাজের গায়ে। প্রতিটি পরিবারেই এর প্রভাব পড়ছে।  বাবা মায়ের দুচিন্তার সাথে তরুণদের নি:সঙ্গতা যেমন বাড়ছে, তেমনি ঘুষ দিয়ে চাকুরি পাওয়ার পরে খুব দ্রুতই বড় হওয়া বা কাড়ি কাড়ি টাকার মোহ দুর্নীতিতে আকৃষ্ট করছে শিক্ষিত সমাজকে। একটি বিকলঙ্গ রাষ্টের পরিচিতি পেতে এর বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্রের প্রতিটি রন্দ্রে রন্দ্রে এরা দূর্নীতিকে রক্তের মতো চালিত করে। তাই রাষ্ট্র কাঠামোতে ঘুণে ধরার আগেই এ দায় মোছনের একটিই পথ বের করতে হবে রাষ্ট্রকে। কাজে লাগাতে হবে উচ্চ শিক্ষিত বেকারদের। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধি করে চাকুরির সুযোগটা অন্তত দিলে তারা প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকবে।

সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধি করা হলে ক্ষতির যুক্তিটা সরকার দেখাতে না পারলেও বয়স বাড়ানোর সকল যুক্তি দিয়েছে আন্দোলনকারীরা। নিজেদের মেধা প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের জন্য কল্যাণের কাজ করতে চান যারা, তাদের সুযোগ থেকে কোন যুক্তিতে বঞ্চিত করতে পারে রাষ্ট্র? আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেপালসহ বিশ্বের অনেক দেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৮-এর উপর। বাংলাদেশের চাকুরী প্রত্যাশীরা চান মাত্র ৩৫ বছর। সেটুকুও বাস্তবায়নে সরকারের এত গড়িমশি কেন?

মহাজোট সরকারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পরিকল্পনায় সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির অঙ্গিকার এতদিনেও বাস্তবায়ন না হওয়া অত্যন্ত দু:খের। তাহলে সরকার কাদের নিয়ে রাষ্ট্রকে সাবলম্বি করবে?

দীর্ঘদিন আন্দোলনের ইঙ্গিতহীন উত্তোরণের জন্যে অনশনের বিকল্প  ভেবেও আজ যে আন্দোলনকারীরা খালি হাতে ফিরেছেন, রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিদের উপর তাদের বিশ্বাস আর আস্থার জায়গাটা নড়বড়ে হবে এটা অন্তত নিশ্চিত। কিন্তু দাবি পূরণের লড়াইয়ে বিকল্প কি পথ থাকতে পারে একমাত্র আন্দোলনকারীরাই ভালো জানেন।

সরকারের মেয়াদ আছে আর মাত্র অল্প কদিন। আন্দোলনকারীরা সরকারের সমর্থন পাবে দিন শেষে এটাই আমাদের প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা বিবেচনা করে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হলো খালি হাতে। সরকার যদি মনে করেন একটি কঠিন সময়ে আন্দোলনকারীদের প্রেসক্লাব থেকে উঠিয়ে দিয়ে ভালো করেছেন, তাহলে সরকারের এখন উচিত হবে সময় সুযোগ করে খুব দ্রুতই আন্দোলনকারীদের ডেকে কথা বলা। তাদের সাথে কথা বলে সমস্যা সমাধানের একটা দীর্ঘ পথ বের করাই উত্তম রাষ্ট্র নায়কের দায়িত্ব।

সাংবাদিক ও লেখক

উদ্যোক্তা ও সংগঠক, নো ভ্যাট অন এডুকেশন আন্দোলন।।

Bootstrap Image Preview